Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Tuesday, April 11, 2017

‘স্রষ্টার অস্তিত্ব’ -আরিফ আজাদ

তর্কের একপর্যায়ে সাজিদ বললো, ‘যদি স্রষ্টা বলে কেউ না থাকে, তাহলে ‘খুন’ ‘রাহাজানি’ ‘ধর্ষণ’ এসবে কোন দোষ নেই।’
বিপ্লব দা বললেন, ‘কেনো? , খুন, রাহাজানি, ধর্ষণের সাথে স্রষ্টার থাকা না থাকার কি সম্পর্ক?’
সাজিদ বললো, ‘তার আগে তুমি বলো, এগুলো কি ভালো না খারাপ?’
বিপ্লব দা কিছুটা বিরক্ত হলেন মনে হলো। বললেন, ‘দিন দিন যে তুই চাইল্ডিশ প্রশ্ন করা শুরু করেছিস, সেটা কি বুঝতে পারছিস?’
সাজিদ নাছোড়বান্দার মতো বললো, ‘অহহ হো! আমি যা জানতে চেয়েছি, তার সোজাসুজি উত্তর দাও তো। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ কি খারাপ না ভালো? গুড অর ব্যাড?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘খারাপ।’
– ‘কেনো খারাপ?’
– ‘আজব! কেনো খারাপ সেটাও এক্সপ্লেইন করা লাগবে?’- বিপ্লব দা’র পাল্টা প্রশ্ন।
– ‘অবশ্যই।’
– ‘খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ এসব খারাপ, কারণ আমাদের কমনসেন্স বলে এগুলো খারাপ।’
সাজিদ মুচকি হাসলো। বললো, ‘কমনসেন্স বলে, তাই?’
– ‘হ্যাঁ।’
সে আবার হাসলো। বললো, ‘আচ্ছা দাদা, কমনসেন্স কি জিনিস?’
বিপ্লব দা এবার সত্যিই রেগে গেলেন। বললেন, ‘উদ্ভট প্রশ্ন করবি না তো। কমনসেন্স কি জিনিস এটা কোন প্রশ্ন হলো?’
সাজিদ বললো, ‘দাদা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ মতে, জীবনের (Life) উৎপত্তি অজৈব (Non-Life) কিছু পদার্থে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে, দূর্ঘটনাক্রমে (By Accident) এবং অন্ধ প্রক্রিয়ায় (With blind Force)। এমতাবস্থায়, যার উৎপত্তিই অজৈব পদার্থ থেকে, দূর্ঘটনাক্রমে, অন্ধ প্রক্রিয়ায়,তার মধ্যে ঠিক কখন, কোথায়, কিভাবে আত্মজ্ঞান (Consciousness) , কমনসেন্স ইত্যাদি বস্তু আসলো?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘খুব সহজ প্রশ্ন। এটা বুঝার জন্য রকেট সায়েন্স পড়া লাগে না কিংবা বায়োলোজিষ্টও হওয়া লাগে না। মানুষ তথা জীবেরা যখন থেকে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করা শুরু করলো, তখন থেকেই তারা ভালো, খারাপ, মন্দের পার্থক্য বুঝতে শুরু করেছে। পরিবেশের সাথে খাপ খেতে খেতে তার মধ্যে আস্তে আস্তে কনসাসনেস তৈরি হয়েছে, কমনসেন্স তৈরি হয়েছে। মোরালিটি (নীতি-নৈতিকতা) তৈরি হয়েছে।’
সাজিদ বললো, ‘তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, ব্যক্তি, সমাজ, বা সম্প্রদায় যখন কোন বিষয়ে সম্মত হয়, তখন সেটাই মোরালিটি? সেখান থেকেই ভালো-খারাপ-মন্দের ধারণা আসে?’
– ‘হ্যাঁ।’- বিপ্লব দা বললেন।
– ‘কিন্তু যদি সেই ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় যদি ভুল হয়?’
– ‘ভুল হবে কেনো? ভুল হবার সম্ভাবনাই নেই।’
সাজিদ বললো, ‘ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায়ের সম্মিলিত মতবাদ যদি মোরালিটির ভিত্তি হয়, তাদের ঐক্যমত্য যদি ভালো-খারাপ-মন্দ পরিমাপের মানদন্ড হয়, তাহলে গত শতাব্দীতেও সুপ্রচলিত ‘জাতিবিদ্বেষ’ কেনো আজকে খারাপ বলে বিবেচিত হবে? কেনো পূর্বের ‘দাসপ্রথা’ আজকের সময়ে এসে বাতিল গন্য হবে? হোয়াই? তারা কি ভুল ছিলো? বা, আজ তোমরা যারা তাদের ভুল বলছো, আগামী শতাব্দীতে বসে তোমাদের যে নতুন কোন প্রজন্ম ভুল বলবে না, তার কি গ্যারান্টি?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘এটা দিয়ে তুই কি বুঝাতে চাইছিস?’
– ‘কিছুই না। শুধু বলতে চাইছি, ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায়ের মতামত থেকে যা পাওয়া যায়, তা হলো ‘আত্মসম্পর্কীয়’ (Subjective)। এটা হলো ‘চুস এণ্ড পিক’ (Choose & Pick) এর মতো। যেটা ভালো মনে হচ্ছে সেটা আপাতঃ বেছে নেওয়া। কিন্তু মোরালিটি (নীতি-নৈতিকতা) সেরকম নয়। নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারটা Subjective নয়, Objective (বাস্তবসম্মত/ বস্তুনিষ্ঠ)। যা ভালো, তার বিপক্ষে যদি সারা পৃথিবীর মানুষও অবস্থান নেয়, তবুও তা ভালো। আর যা খারাপ, তার পক্ষে যদি সারা পৃথিবীর মানুষও থাকে, তবুও তা খারাপ। এতে ব্যক্তি, সমাজ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের মতামতের কোন প্রাধান্য নেই। তুমি যে বললে সমাজ এবং পরিবেশের সাথে মিশতে মিশতে জীবের মধ্যে কনসাসনেস এবং মোরালিটি এসেছে, সেটা ভুল।’
বিপ্লব দা বললেন, ‘এতে কি প্রমাণ হয়?’
সাজিদ বললো, ‘এতে প্রমাণ হয়, স্রষ্টা না থাকলে পৃথিবীতে ভালো/খারাপ বলে কিছু থাকে না। নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু থাকেনা।’
– ‘হাউ ফানি। হা হা হা।’- বিপ্লব দা’র তিরস্কার।
– ‘আচ্ছা দাদা, জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য কি?’- সাজিদ প্রশ্ন করলো।
– ‘মানে?’
– ‘মানে, তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কি? বলতে পারো, মৃত্যু পরবর্তী কোন উদ্দেশ্য আছে কি?’
– ‘আরে না না। আমার বাবা এরকম বিদঘুটে কোন উদ্দেশ্য নেই। তাও আবার মৃত্যু পরবর্তী জীবনের? হা হা হা। না রে সাজিদ। মরার পরে ভূত টুত হবারও শখ নেই। স্বর্গ-নরকে যাবারও প্ল্যান নেই। মরে মাটির সাথে মিশে যাবো- এই আর কি!….’
– ‘তাই?’
– ‘হ্যাঁ’
– ‘আচ্ছা, সব মানুষের সাথে ঠিক এটাই ঘটবে বলে কি তুমি বিশ্বাস করো? অর্থাৎ, মরার পরে সবাই মাটির সাথে মিশে যাবে। পরকাল টরোকাল বলে কিচ্ছু নেই,এরকম?’
– ‘হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি পরকাল-টরোকাল, স্বর্গ-নরক বলে কিচ্ছু নেই। সব মানুষের যাত্রা মৃত্যুর সাথে সাথেই ফিনিশ।’
– ‘তাহলে জীবনকে কিভাবে পরিচালনা করা উচিত বলে তুমি মনে করো?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন, ‘There is no God. So enjoy ur life. just do what u want’। আমিও তাই মনে করি। যেহেতু পরকাল টরোকাল বলে কিচ্ছু নেই, তাই নিজের মতো করে লাইফ এঞ্জয় করাই বলতে পারিস জীবনের লক্ষ্য।’
– ‘তাই নাকি?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘আচ্ছা, ধরো, আগামীকাল তোমার সাথে হিটলার, অথবা মাও সে তুং, অথবা পল পট,কিংবা জোসেফ ষ্ট্যালিনদের কেউ একজনের দেখা হয়ে গেলো। এদের সবাই ছিলো নাস্তিক। ঠিক?’
– ‘হুম।’
– ‘এরা মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে,তাই না?’
– ‘হ্যাঁ। তো?’
– ‘আচ্ছা বলো, তুমি এদের মধ্যে কার সাথে দেখা করতে চাও?’
বিপ্লব দা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর বললেন, ‘ কমরেড জোসেফ ষ্ট্যালিনের সাথে।’
– ‘আচ্ছা ধরো, তোমার সাথে কমরেড জোসেফ ষ্ট্যালিনের দেখা হয়ে গেলো। দেখা হওয়া মাত্রই তুমি উনাকে কি বলবে?’
বিপ্লব দা মন মরা করে বললেন, ‘বলবো, এত্তোগুলা মানুষ খুন করা উনার ঠিক হয়নি।’
– ‘কেনো ঠিক হয়নি?’- সাজিদের প্রশ্ন।
– ‘মানে?’
– ‘মানে, স্রষ্টা, পরকাল টরোকাল বলে তো কিচ্ছু নেই। জীবনকে যেহেতু যেমন খুশি তেমন উপভোগ করা উচিত, তাই ষ্ট্যালিনের যেমনি ভালো লেগেছে, সেভাবেই সে তার জীবন উপভোগ করেছে। এতে দোষের কি আছে? মরার পরে তুমি যেমন মাটিতে মিশে ফিনিশ হয়ে যাবে, ষ্ট্যালিনও ফিনিশ হয়ে যাবে। তাহলে সে তার জীবনকে একজন ‘খুনির জীবন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে নাকি একজন ‘দরবেশের জীবন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে- তাতে তো কিচ্ছু যায় আসে না। তার তো কোথাও জবাবদিহি করতে হবে না। তার চোখে না কিছু ভালো, না কিছু খারাপ।’
বিপ্লব দা চোখ রাঙিয়ে বললো, ‘কথার মারপ্যাঁচে ফেলবি না তো। খুন করা আমার চোখে খারাপ কাজ। গর্হিত কাজ।’
– ‘তুমি একজন নাস্তিক। তোমার চোখে তা খারাপ কাজ হতে পারে। ষ্ট্যালিনও একজন নাস্তিক ছিলো। কিন্তু তার চোখে Mass Killing (গণহত্যা) খারাপ কাজ ছিলো না। তাহলে এখানে কে বেশি শুদ্ধ? তুমি বিপ্লব দা? নাকি, কমরেড ষ্ট্যালিন?’
– ‘তুই কি বলতে চাইছিস পরিষ্কার করে বল তো?’
– ‘হা হা হা। আমি বলতে চাইছি, স্রষ্টা বলে যদি কেউ না থাকে, তাহলে ভালো/খারাপ বলেও কিছু থাকে না। নৈতিকতা (মোরালিটি) বলে কিছু থাকে না। কনসাসনেস বলে কিছু থাকে না। তখন সবকিছুই সমান। না ভালো না খারাপ। না ঠিক না ভুল।ভালো-মন্দের মানদন্ড কোন ব্যক্তি, সমাজ,গোষ্ঠী নির্ধারণ করতে পারে না। কোন একজন সুপার ন্যাচারাল শক্তি, যিনি এই সবকিছুর স্রষ্টা, তিনিই বাতলিয়ে দেন কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। কোনটা ভালো,কোনটা মন্দ।’
বিপ্লব দা কথা বাড়ায় না। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে বললেন, ‘আগামীকাল প্রেস ক্লাবে সেমিনার আছে। চাইলে আসতে পারিস।’
সাজিদ আসবে বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়…..

No comments:

Post a Comment