Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Thursday, April 13, 2017

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক


ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭
আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের সাথে শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ পাঁচ দফার চুক্তি করেছিল তখনও প্রথম আলোরা এমনই করেছিল ৷ প্রতিক্রিয়াশীল ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠী তাদের সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে অভিন্ন সুরে পাঁচ দফার বিরুদ্ধে এবং পাঁচ দফার চুক্তি করায় আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছিল ৷ তখনও আমরা লক্ষ করেছিলাম, তিনটি মহল থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করা হয়েছিল-
এক, বামপন্থী বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিক ও সংবাদ মাধ্যম,
দুই, বিএনপি-জামাত
তিন, ইসলামপন্থীদের মধ্য থেকে একটি বড় গ্রূপ
তবে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে কঠোর বিরোধিতা ছিল বামপন্থীদের পক্ষ থেকে ৷
আজও সেই একই অভিন্ন প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ বাম-বিএনপি জামাত- ইসলামপন্থী কিছু মহল ৷
এ এক অাশ্চর্যজনক বিষয়, পরস্পর বিরোধী তিনটি পক্ষের সুর অভিন্ন হয় কী করে? তারা এক কথা বলার হেতু কী?
এর কার্যকারণ খুব কিছু অস্পষ্ট নয় ৷ এ হল স্বার্থের মাজেযা!
বামপন্থীরা বাংলাদেশে গণবিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র জাত ৷ তাদের স্বকীয় কোনো শক্তির অবস্থান নেই ৷ তাদের ইসলাম বিদ্বষী এজেণ্ডাগুলো বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামীলীগের মুখাপেক্ষী এরা ৷ আওয়ামীলীগের কাধে ভর করেই এরা সাধারনত পাগার পার হয় ৷ আওয়ামীলীগের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খেয়ে অভ্যস্ত এরা ৷ সেই আওয়ামীলীগও যদি ইসলামের কিছু এজেণ্ডা বাস্তবায়ন শুরু করে, হুজুরদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে, তাহলে তো এদের হাটুপানিতে ডুবে মরা ছাড়া উপায় নেই ৷ এ কারণে এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি আওয়ামীলীগের ভেতর-বাহির থেকে সব সময় সচেষ্ট থাকে আওয়ামীলীগ যেন কখনো ইসলামের স্বপক্ষে কোনো ভূমিকা রাখতে না পারে ৷ ইসলামের দিকে ঝুঁকে না পড়ে ৷
বাংলাদেশের জাতীয় ঈদগাহের পাশে, সুপ্রীমকোর্টের নাকের ডগায় দেবীর মূর্তিস্থাপনের সাহস তারা পেয়েছিল আওয়ামীলীগের ক্ষমতার ভরসাতেই ৷ ইতিহাস বলে, আওয়ামীলীগ যখনই এই বামগোষ্ঠীর শেকল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে তখনই এরা মরণকামড় দিয়েছে ৷ বাম গোষ্ঠীটি সংখ্যায় নগণ্য হলেও এরা হল ইহুদিদের মত ৷ পৃথিবীতে ইহুদির সংখ্যা খুবই কম ৷ কিন্তু ওরাই বিশ্বশক্তির নিয়ন্ত্রক! আওয়ামীলীগের জন্য বামরা হল ইহুদিদের মত শক্তিশালী বৃত্তবলয় ৷
দেবিমূর্তির এজেণ্ডা ইসলাম বিদ্বেষীদের জীবন-মরণের বিষয় ৷ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে এটিই সবচেয়ে বড় আঘাত বলে আমি মনে করি ৷ এর জন্য ওরা সময় নির্বাচন করেছিল আওয়ামীলীগের নিরংকুশ প্রাধান্যের এই সময়কে ৷ এ কারণেই গণ ভবনের ১১এপ্রিলের সম্মেলনে স্বীকৃতির ঘোষনার চেয়েও বড় প্রাপ্তি মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য ও প্রত্যয়কে ৷ স্বীকৃতির হাকীকত তো সামনে আসবে প্রজ্ঞাপন জারির পর ৷
এখন বাংলাদেশে কওমী ওলামা-ছাত্রদের সুখের দিন ৷ এটাই সুযোগ! এই সুযোগে কওমী মাদরাসা থেকে মক্তবের একটা পিচ্চিও চাইলে ইনুর পাছায় দুটো লাত্থি মেরে আসতে পারে ৷ জানি না, এমন সুযোগ কত দিন থাকবে?
বিএনপি এ দেশে রাজনীতি করে ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে ৷ ইসলামের সোল এজেন্ট রূপ ধরে ওরা ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করে ৷ অন্য কেউ ইসলামের জন্য কিছু করে দিলে ওদের এজেন্সি কমিশনে ভাটা পড়তে পারে এই আশংকায় সব সময় ভিতু থাকে ৷ জামাত মনে করে, নিজেদের প্রয়োজনে ওরাই কেবল কখনো বিএনপি কখনো আওয়ামীলীগের সাথে দেন-দরবার করার অধিকার সংরক্ষণ করে ৷ ওদের যখন যেদিকে স্বার্থ সেদিকে যাবে, আর হুজুররা চেয়ে চেয়ে দেখবে, পারলে সহযোগিতা করবে ৷ তাহলে হুজুররা খুব ভালো! জামাতের স্বার্থ বাদ দিয়ে ইসলামের স্বার্থ নিয়ে হুজুররা এগিয়ে গেলে তাই জামাতের গাত্রদাহ শুরু হয় ৷
এ ছাড়াও কওমী চেতনা বিরোধী আহলে শিন্নীর দল, আর বিএনপি-জামাতের হাতে বন্ধক রাখা ইসলামী দলগুলোও নাখোশ ঐ একই স্বার্থের কারণে ৷
ঐক্যবদ্ধ হক্কানী ওলামায়ে কেরাম নারী প্রধানমন্ত্রীর গণ ভবনে সম্মেলন করে ইসলামের জন্য বড় অর্জন আনলেও কিছু মানুষ খুশি হতে পারেন না নিজেদের রাজনৈতিক স্ট্যাণ্ড ভুল প্রমাণিত হওয়ায় ৷ উল্টো শায়খুল হাদীস মুফতী আমিনী রহঃএর মতো আল্লামা আহমদ শফিকেও দাড় করায় অভিযোগের কাঠগড়ায়! এটাই হল রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিভাজি!!

Tuesday, April 11, 2017

বান্দরের বাচ্চা ডারউইন…

সকালবেলা স্যারের মন-মেজাজ খুব প্রফুল্ল থাকে। বিছানার পাশেই বিশাল একটি জানালা। জানালার ওপারেই বেলি, চম্পা, শিউলির গাছ। সকাল হলেই নতুন, মিষ্টি ফুলের গন্ধে পুরো রুম মৌ মৌ করে। আজও করছে।
একটু আগেই একটি চড়ুই পাখি জানালার কাছে এসে কিচিরমিচির করছিলো। অন্য সময় হলে চড়ুইটার এই কিচিরমিচির আওয়াজকে স্যারের কাছে বিরক্তিকর লাগতো। কিন্তু আজ স্যারের মন মেজাজ একদম ফ্রেশ। অনেকক্ষণ চড়ুইপাখির কিচিরমিচির আওয়াজ শোনার পরে স্যার পা দু’খানা খাট থেকে নিচে নামালেন।
স্যার এখন এক রাঊন্ড দৌঁড়ে আসবেন। মর্নিং ওয়াক যাকে বলে। শরীর স্বাস্থ্য যদিও ফিটফাট, তবুও স্যার রোজ নিয়ম করেই ব্যায়াম করেন।
দৌঁড়ে আসার পরে স্যার ড্রয়িং রুমে এসে ধপাস করে সোপায় হেলান দিয়ে বসেন। স্যারের ঘরে যে লোকটা কেয়ার টেকারের কাজ করে, তার নাম কুদরত আলি। লোকটা নরসিংদীর। বয়স চল্লিশ কি বিয়াল্লিশ, এরকম।
স্যার প্রতিদিন এক রাঊন্ড দৌঁড়ান। আজ কি মনে করে পুরো তিন রাঊন্ড দৌঁড়ালেন। তিন রাঊন্ড মানে পুরো তিন চক্কর। স্যার আঙুলে গুনে গুনে হিসেব করলেন। তিন চক্করে হয় মোট এক মাইল।
পুরো এক মাইল দৌঁড়ে স্যার ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে এসে প্রতিদিনকার মতোন সোপায় বসলেন ধপাস করে।গা এলিয়ে দিলেন। মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে জোরে জোরে…………
‘কুদরত…….?’ – স্যার ডাক দিলেন। কিছুটা হাঁপাচ্ছেনও।
পাশের ঘর থেকে কুদরত আলি ‘জ্বে স্যার’ বলে দৌঁড় দিলো। কুদরত আলির হাতে স্যারের জন্য লেবুর শরবত।
স্যার শরবতের গ্লাসখানা হাতে নিলেন। ঢকঢক করে পুরো গ্লাসটা গলাধঃকরণ করে বললেন, ‘আরেক গ্লাস দাও তো।’
‘জ্বে স্যার’ বলে কুদরত আলি আরেক গ্লাস লেবুর শরবত আনার জন্য ছুটলো।
ইতোমধ্যেই স্যার অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। হাঁপানি কমে গেছে। দৌঁড়ালে হার্টবিট দ্রুত চলে। বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। স্যারের হার্টবিট এখন স্বাভাবিক।
স্যার সোজা হয়ে বসলেন।গুনগুন করে গাইতে শুরু করলেন, ‘এই দিন যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো……..?’
হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। স্যারের মেজাজটা গেলো খারাপ হয়ে। কত্তোদিন পরে স্যার ফুরফুরে মন নিয়ে একটি গান ধরেছেন, সেটা অল্প একটু আগাতে না আঘাতেই ব্যাঘাত ঘটলো। স্যারের ফুরফুরে মেজাজ এই মুহূর্তে তিরিক্ষি ভাব ধারণ করলো। ইচ্ছে করছিলো সামনে থাকা শরবতের খালি গ্লাসটাকে শূন্যে তুলে একটা আছাড় দিতে। যে ত্যাদড় অসময়ে কলিংবেল বাজিয়েছে তাকে যদি এই আছাড়টা দেওয়া যেতো তাহলে বেশ লাগতো। কিন্তু সে উপায় নেই।
কুদরত আলি গামছায় হাত মুছতে মুছতে দৌঁড়ে এসে দরজা খুলে দিলো।
দরজা খোলামাত্রই দু’জন ইয়াং ছেলে-মেয়ে হুঁড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো।
কুদরত আলি চেঁচিয়ে বলে উঠলো, ‘আরে খাঁড়ান খাঁড়ান। এইভাবে দৌঁড়াইয়া কই যাইতেছেন আপনেরা?’
মেয়েটা বাঁকা চোখে কুদরত আলির দিকে তাকালো।কুদরত আলি মেয়েটার এরকম চাহনিকে কোন পাত্তা দিলো বলে মনে হলো না। সে মনে মনে বললো, ‘মোর পেডের মাইয়্যার সমান মাইয়্যা আইসা আমার সামনো ভাব নেয় রে।’
কুদরত আলির নিজের মেয়ে হলে এতোক্ষণে সে তার কানের নিচে দু চারটা চড় লাগিয়ে দিতো। ‘বড় গো কিয়ানে মাইন ময্যাদা দিতে হয় এই ঢংগী মাইয়্যা পুলাপাইন শিখে নো।’- কুদরত আলি মনে মনে বিড়বিড় করে বললো।
ছেলেটা বললো, ‘আমরা স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছি। স্যার বাসায় আছে?’
কুদরত আলি এবার ছেলেটার দিকে তাকালো। বললো, ‘জ্বে, আছে।’ – এই বলে কুদরত আলি আগে আগে হাঁটা শুরু করলো। তার পেছনে ইয়াং ছেলে-মেয়ে দুজনও হেঁটে ড্রয়িং রুমে চলে এলো।
স্যারের তিরিক্ষি মেজাজের ভাব তখনো পুরোপুরিভাবে কাটেনি। ইতোমধ্যেই তিনি আরো বেশ কয়েকবার গানটার অন্তরা ধরার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বারবার ব্যর্থ হলেন।
কুদরত আলির পেছনে ওরা দু’জন। স্যার উনার মোটা কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে ওদের এক পলক দেখে নিলেন। এরপর চশমাটা একটু নড়াচড়া করে ঠিকঠাক করলেন। তারপর বললেন, ‘বসো।’
এরা স্যারের পরিচিত। একজনের নাম অনিন্দিতা। অন্যজনের নাম সাকলাইন সাকিব।
সাকিবের হাতে একটি বড় প্যাকেট।তাতে বই জাতীয় মোটা কিছু মোড়ানো। দু’জনে বসলো।
স্যার পত্রিকা খুললেন।পত্রিকার নাম ‘প্রথম আলো।’ স্যার পত্রিকার বিনোদন পাতা উল্টাচ্ছেন। প্রথম আলোর বিনোদন পাতার মধ্যে বড় বড় হরফে শিরোনাম ‘শাওনের সাথে ফারুকীর দ্বন্ধ চরমে। ‘ডুব’ পাচ্ছেনা সেন্সরবোর্ডের সম্মতি।’
স্যার পড়ছেন আর খুব মজা পাচ্ছেন।
সাকিব একটু গলা খাঁকারি দিলো প্রথমে। এরপর বললো, ‘স্যার, আমরা আপনাকে একটা ব্যাপারে জানাতে এসেছি।’
স্যার পত্রিকা থেকে মুখ তুলে বললেন, ‘কি ব্যাপার?’
সাকিব তার হাতে থাকা প্যাকেটটি স্যারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘এই যে, এইটা…’
– ‘কি ওটা?’
– ‘একটা বই।’
– ‘কার বই?’
– ‘মাওলানা বশিরুজ্জামান নামের এক লোকের।’
স্যার এবার পত্রিকা থেকে পুরোপুরিভাবে মুখ তুলে সাকিবের দিকে তাকালেন। খুব বিরক্তি উঠে গেছে স্যারের। ইচ্ছে করছে এই ছেলের বাম গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে হাতের পাঁচ আঙুল বসিয়ে দিতে। মাওলানা বশিরুজ্জামান নামের একজন মোল্লা শ্রেণীর লোকের বই এই ছেলে আমাকে দিতে এসেছে। কতোবড়ো আস্পর্ধা!
কোনরকমে রাগ সংবরণ করে স্যার বললেন, ‘কি করেন এই লোক?’
– ‘একটা মাদ্রাসায় ইংরেজি পড়ান।’
এই কথা শুনে স্যারের তো চোখমুখ কপালে উঠার জোগাড়। মাওলানা গোছের কোন লোক ইংরেজি পড়ায়- এটা স্যার বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরকম বই এটা?’
সাকিব বললো, ‘ওরা দাবি করছে এটা নাকি শিশুতোষ বই স্যার।’
– ‘হুম। তা কি লিখেছে ভিতরে? গল্প- উপন্যাস?’
– ‘না স্যার।’
– ‘কি তাহলে?’
– ‘ছড়া-কবিতা।’
– ‘ও আচ্ছা।’
এরপর স্যার আবার বললেন, ‘তা এই শিশুতোষ বই আমার কাছে নিয়ে এলে কেনো? আমি কি শিশু নাকি? আমার তো শিশু ক্যাটাগরির বাচ্চা কাচ্চাও নেই।’
সাকিব নামের ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে বললো, স্যার, বইটা যদি একটু খুলে দেখতেন।’
স্যার অবাক হলেন। বিরক্তও হলেন। সকাল সকাল এরকম বিড়ম্বনার কোন মানে হয়? একটা মোল্লা শ্রেণীর লোক একটা ছড়ার বই লিখেছে বাচ্চাদের জন্য। এটা ফুটফাতে, গাড়িতে গাড়িতে বিক্রি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরা দু’জন কেনো সেটা স্যারের কাছে নিয়ে এলো আর দেখার অনুনয় করছে সেটা স্যার বুঝতেই পারছেন না। স্যার অগত্যা বাধ্য হয়েই প্যাকেটটি হাতে নিলেন। হাতে নিয়ে খুললেন। প্যাকেট খোলার পরে স্যারের তো চক্ষু ছানাবড়া। স্যার উনার চশমার কাঁচ শার্টের কোণা দিয়ে একবার পরিষ্কার করে নিলেন। এরপর চশমাটা চোখে দিয়ে আবার দেখতে লাগলেন যে একটু আগে যা দেখেছেন তা ভুল না ঠিক।
নাহ। স্যার ভুল কিছু দেখেন নি। ঠিকই দেখেছেন। বইয়ের উপরে বড় বড় হরফে বইয়ের নাম লেখা। বইয়ের নাম- ‘বান্দরের বাচ্চা ডারউইন।’
নিচে লেখকের নাম- ‘মাওলানা বশিরুজ্জামান’।
স্যারের মেজাজ তো আরো কয়েকগুণ গরম হয়ে গেলো এটা দেখে। চোখ মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে।
অনিন্দিতা নামের মেয়েটা এতোক্ষণ চুপ করে বসে ছিলো। সে এবার মুখ খুললো। বললো, ‘স্যার, এটা দেখানোর জন্যই আপনার কাছে এটি নিয়ে এসেছি। আরো অবাক করা বিষয়, এই বই বইমেলার মতো একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হচ্ছে। দেশটা কোথায় চলে গেলো স্যার ভাবতে পারছেন?’
স্যার কিছুই বললেন না। এই বই হাত থেকে ধপাস করে নিচে রেখে দিলেন। বইয়ের নাম দেখে এই বইয়ের ভিতরে কি আছে সেটা উল্টিয়ে দেখার রুচিও স্যারের নেই। কি বিদঘুটে নাম!!
স্যার বললেন, ‘শিশুদের ছড়ার বইয়ের নাম কেনো বান্দরের বাচ্চা ডারউইন হবে?’
অনিন্দিতা বললো, ‘স্যার, ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব তো মোল্লারা স্বীকার করেনা। করবেই বা কিভাবে? এই মোল্লাগুলো কি বিজ্ঞান জানে? না বুঝে? বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে ব্যঙ্গ করে এই বইতে বেশকিছু ছড়া আছে স্যার। একটি ছড়ার দুটো লাইন এরকম- ‘বাঘ মামা বলে শোন, আয় তোরা গান ধর
মানুষ তো মানুষ আছে, ডারউইন বান্দর।’
অনিন্দিতা নামের এই মেয়েটি দেখি ছড়ার লাইনও মুখস্ত করে ফেলেছে। স্যার বললেন, ‘এটা অন্যায়! ঘোর অন্যায়! একজন প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানীর নামকে এভাবে ব্যঙ্গ করাটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
সাকিব হাত চাপড়িয়ে বললো, ‘এক্সাক্টলি স্যার….’
স্যার আবার বললেন, ‘মোল্লা শ্রেণীর কাছে এর বিরুদ্ধ্যে কোন অভিযোগ তোলা হয়নি?’
– ‘হয়েছে স্যার।’- অনিন্দিতা বললো।
– ‘কি বললো তারা?’
– ‘তারা বলতে চাচ্ছে, এই বইতে নাকি কোনভাবেই বিজ্ঞানী ডারউইনকে অসম্মান করা হয়নি। ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিয়েও নাকি ব্যঙ্গ করা হয়নি এখানে। স্রেফ শিশুদের মনোরঞ্জন আর বিনোদনের জন্য এরকম ছড়া লিখেছে নাকি। তারা বলতে চাচ্ছে,- ডারউইন নামে কি পৃথিবীতে কেবল একজনই আছে আর ছিলো? আর কারো নাম ডারউইন হতে পারেনা?’
স্যার বললেন, ‘এই মোল্লা শ্রেনীর মাথায় তো দেখি গিলু বলতে কিচ্ছু নেই। পৃথিবীতে হাজার হাজার লোক আছে যাদের নাম ডারউইন। কিন্তু কেউ যখন মুখ দিয়ে ডারউইন নামটা উচ্চারণ করে, তখন কি ইংল্যান্ডের একজন ট্যাক্সি চালক, যার নাম ডারউইন, তার কথা মানুষের মনে পড়ে? না।
জার্মানিতে ডারউইন নামের যে লোক হোটেল বয়ের কাজ করে,তার কথা মানুষের মনে পড়ে? না।
এ্যামেরিকায় ডারউইন নামের যে লোক ডাক্তারি করে, তার কথা মনে আসে? না। কানাডায় ডারউইন নামের যে লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে, তার কথা মনে আসে? না।
তাহলে ডারউইন নামটা শোনার সাথে সাথে কার কথা সর্বপ্রথম মানুষের মনে আসে? মানুষের মনে সর্বপ্রথম তার কথাই আসে যিনি এই নামে সবচে বেশি প্রসিদ্ধ।সাইন্স শব্দটার নাম শুনেছে এমন কেউ ডারউইনের নাম শুনেনি- এমনটা মেলা ভার।
পৃথিবীতে বিলিয়ন বিলিয়ন বিজ্ঞান জানা,বোঝা, বিজ্ঞানকে সম্মান করা লোকের কাছে ডারউইন একটি শ্রদ্ধার নাম। আবেগের নাম। ভালোবাসার নাম। তাহলে তার নামকে ব্যবহার করে,ব্যঙ্গ করে যখন বই লেখা হয়, তখন সেটা নিশ্চই বিশাল এই বিজ্ঞান মনস্ক শ্রেণীর মনে আঘাত দেওয়া।’
স্যার এক নাগাড়ে একটা ছোটখাটো লেকচার শেষ করলেন। সাকিব নামের ছেলেটা বলে উঠলো, ‘স্যার, ওরা দাবি করছে, এতে করে নাকি শিশুরা আনন্দ পাবে?’
স্যার কপালের ভাঁজ দীর্ঘ করে বললেন, ‘আনন্দ? একজন সম্মানিত বিজ্ঞানীর নামকে নিয়ে এভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে শিশুদের আনন্দ দেওয়ার হেতু কি আমরা বুঝি না? এরা আসলে কি চায় জানো? এরা চায় শৈশবকাল থেকেই আমাদের বাচ্চারা বিবর্তনবাদ,বিজ্
ঞানী ডারউইন ইত্যাদির ব্যাপারে নেগেটিভ ধারণা নিয়ে বড় হোক। ছড়া পড়ানোর নামে তারা সুকৌশলে আমাদের আগামী প্রজন্মের মনে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানীদের বিষয়ে বিষ ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছে যাতে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিজ্ঞানমুখী না হতে পারে।’
অনিন্দিতা বললো, ‘হ্যাঁ স্যার, একদম তাই। এই মোল্লা শ্রেণীর দূরভিসন্ধি এটাই। এরা যতোই বলুক ‘বান্দরের বাচ্চা ডারউইন’ নামটা বিজ্ঞানী ডারউইনকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া নয়, কিন্তু আমরা তো বুঝি তারা আসলে কি চায়, আর তাদের উদ্দেশ্য কি।’
(উল্লেখ্য, কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। কাহিনী এখনো অন-গোয়িং। মাওলানা বশিরুজ্জামানের ‘বান্দরের বাচ্চা ডারউইন’ নামের শিশুতোষ ছড়ার বই নিয়ে এখনো সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। দু পক্ষ থেকেই আসছে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি।)

‘স্রষ্টার অস্তিত্ব’ -আরিফ আজাদ

তর্কের একপর্যায়ে সাজিদ বললো, ‘যদি স্রষ্টা বলে কেউ না থাকে, তাহলে ‘খুন’ ‘রাহাজানি’ ‘ধর্ষণ’ এসবে কোন দোষ নেই।’
বিপ্লব দা বললেন, ‘কেনো? , খুন, রাহাজানি, ধর্ষণের সাথে স্রষ্টার থাকা না থাকার কি সম্পর্ক?’
সাজিদ বললো, ‘তার আগে তুমি বলো, এগুলো কি ভালো না খারাপ?’
বিপ্লব দা কিছুটা বিরক্ত হলেন মনে হলো। বললেন, ‘দিন দিন যে তুই চাইল্ডিশ প্রশ্ন করা শুরু করেছিস, সেটা কি বুঝতে পারছিস?’
সাজিদ নাছোড়বান্দার মতো বললো, ‘অহহ হো! আমি যা জানতে চেয়েছি, তার সোজাসুজি উত্তর দাও তো। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ কি খারাপ না ভালো? গুড অর ব্যাড?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘খারাপ।’
– ‘কেনো খারাপ?’
– ‘আজব! কেনো খারাপ সেটাও এক্সপ্লেইন করা লাগবে?’- বিপ্লব দা’র পাল্টা প্রশ্ন।
– ‘অবশ্যই।’
– ‘খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ এসব খারাপ, কারণ আমাদের কমনসেন্স বলে এগুলো খারাপ।’
সাজিদ মুচকি হাসলো। বললো, ‘কমনসেন্স বলে, তাই?’
– ‘হ্যাঁ।’
সে আবার হাসলো। বললো, ‘আচ্ছা দাদা, কমনসেন্স কি জিনিস?’
বিপ্লব দা এবার সত্যিই রেগে গেলেন। বললেন, ‘উদ্ভট প্রশ্ন করবি না তো। কমনসেন্স কি জিনিস এটা কোন প্রশ্ন হলো?’
সাজিদ বললো, ‘দাদা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ মতে, জীবনের (Life) উৎপত্তি অজৈব (Non-Life) কিছু পদার্থে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে, দূর্ঘটনাক্রমে (By Accident) এবং অন্ধ প্রক্রিয়ায় (With blind Force)। এমতাবস্থায়, যার উৎপত্তিই অজৈব পদার্থ থেকে, দূর্ঘটনাক্রমে, অন্ধ প্রক্রিয়ায়,তার মধ্যে ঠিক কখন, কোথায়, কিভাবে আত্মজ্ঞান (Consciousness) , কমনসেন্স ইত্যাদি বস্তু আসলো?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘খুব সহজ প্রশ্ন। এটা বুঝার জন্য রকেট সায়েন্স পড়া লাগে না কিংবা বায়োলোজিষ্টও হওয়া লাগে না। মানুষ তথা জীবেরা যখন থেকে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করা শুরু করলো, তখন থেকেই তারা ভালো, খারাপ, মন্দের পার্থক্য বুঝতে শুরু করেছে। পরিবেশের সাথে খাপ খেতে খেতে তার মধ্যে আস্তে আস্তে কনসাসনেস তৈরি হয়েছে, কমনসেন্স তৈরি হয়েছে। মোরালিটি (নীতি-নৈতিকতা) তৈরি হয়েছে।’
সাজিদ বললো, ‘তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, ব্যক্তি, সমাজ, বা সম্প্রদায় যখন কোন বিষয়ে সম্মত হয়, তখন সেটাই মোরালিটি? সেখান থেকেই ভালো-খারাপ-মন্দের ধারণা আসে?’
– ‘হ্যাঁ।’- বিপ্লব দা বললেন।
– ‘কিন্তু যদি সেই ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় যদি ভুল হয়?’
– ‘ভুল হবে কেনো? ভুল হবার সম্ভাবনাই নেই।’
সাজিদ বললো, ‘ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায়ের সম্মিলিত মতবাদ যদি মোরালিটির ভিত্তি হয়, তাদের ঐক্যমত্য যদি ভালো-খারাপ-মন্দ পরিমাপের মানদন্ড হয়, তাহলে গত শতাব্দীতেও সুপ্রচলিত ‘জাতিবিদ্বেষ’ কেনো আজকে খারাপ বলে বিবেচিত হবে? কেনো পূর্বের ‘দাসপ্রথা’ আজকের সময়ে এসে বাতিল গন্য হবে? হোয়াই? তারা কি ভুল ছিলো? বা, আজ তোমরা যারা তাদের ভুল বলছো, আগামী শতাব্দীতে বসে তোমাদের যে নতুন কোন প্রজন্ম ভুল বলবে না, তার কি গ্যারান্টি?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘এটা দিয়ে তুই কি বুঝাতে চাইছিস?’
– ‘কিছুই না। শুধু বলতে চাইছি, ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায়ের মতামত থেকে যা পাওয়া যায়, তা হলো ‘আত্মসম্পর্কীয়’ (Subjective)। এটা হলো ‘চুস এণ্ড পিক’ (Choose & Pick) এর মতো। যেটা ভালো মনে হচ্ছে সেটা আপাতঃ বেছে নেওয়া। কিন্তু মোরালিটি (নীতি-নৈতিকতা) সেরকম নয়। নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারটা Subjective নয়, Objective (বাস্তবসম্মত/ বস্তুনিষ্ঠ)। যা ভালো, তার বিপক্ষে যদি সারা পৃথিবীর মানুষও অবস্থান নেয়, তবুও তা ভালো। আর যা খারাপ, তার পক্ষে যদি সারা পৃথিবীর মানুষও থাকে, তবুও তা খারাপ। এতে ব্যক্তি, সমাজ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের মতামতের কোন প্রাধান্য নেই। তুমি যে বললে সমাজ এবং পরিবেশের সাথে মিশতে মিশতে জীবের মধ্যে কনসাসনেস এবং মোরালিটি এসেছে, সেটা ভুল।’
বিপ্লব দা বললেন, ‘এতে কি প্রমাণ হয়?’
সাজিদ বললো, ‘এতে প্রমাণ হয়, স্রষ্টা না থাকলে পৃথিবীতে ভালো/খারাপ বলে কিছু থাকে না। নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু থাকেনা।’
– ‘হাউ ফানি। হা হা হা।’- বিপ্লব দা’র তিরস্কার।
– ‘আচ্ছা দাদা, জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য কি?’- সাজিদ প্রশ্ন করলো।
– ‘মানে?’
– ‘মানে, তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কি? বলতে পারো, মৃত্যু পরবর্তী কোন উদ্দেশ্য আছে কি?’
– ‘আরে না না। আমার বাবা এরকম বিদঘুটে কোন উদ্দেশ্য নেই। তাও আবার মৃত্যু পরবর্তী জীবনের? হা হা হা। না রে সাজিদ। মরার পরে ভূত টুত হবারও শখ নেই। স্বর্গ-নরকে যাবারও প্ল্যান নেই। মরে মাটির সাথে মিশে যাবো- এই আর কি!….’
– ‘তাই?’
– ‘হ্যাঁ’
– ‘আচ্ছা, সব মানুষের সাথে ঠিক এটাই ঘটবে বলে কি তুমি বিশ্বাস করো? অর্থাৎ, মরার পরে সবাই মাটির সাথে মিশে যাবে। পরকাল টরোকাল বলে কিচ্ছু নেই,এরকম?’
– ‘হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি পরকাল-টরোকাল, স্বর্গ-নরক বলে কিচ্ছু নেই। সব মানুষের যাত্রা মৃত্যুর সাথে সাথেই ফিনিশ।’
– ‘তাহলে জীবনকে কিভাবে পরিচালনা করা উচিত বলে তুমি মনে করো?’
বিপ্লব দা বললেন, ‘রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন, ‘There is no God. So enjoy ur life. just do what u want’। আমিও তাই মনে করি। যেহেতু পরকাল টরোকাল বলে কিচ্ছু নেই, তাই নিজের মতো করে লাইফ এঞ্জয় করাই বলতে পারিস জীবনের লক্ষ্য।’
– ‘তাই নাকি?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘আচ্ছা, ধরো, আগামীকাল তোমার সাথে হিটলার, অথবা মাও সে তুং, অথবা পল পট,কিংবা জোসেফ ষ্ট্যালিনদের কেউ একজনের দেখা হয়ে গেলো। এদের সবাই ছিলো নাস্তিক। ঠিক?’
– ‘হুম।’
– ‘এরা মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে,তাই না?’
– ‘হ্যাঁ। তো?’
– ‘আচ্ছা বলো, তুমি এদের মধ্যে কার সাথে দেখা করতে চাও?’
বিপ্লব দা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর বললেন, ‘ কমরেড জোসেফ ষ্ট্যালিনের সাথে।’
– ‘আচ্ছা ধরো, তোমার সাথে কমরেড জোসেফ ষ্ট্যালিনের দেখা হয়ে গেলো। দেখা হওয়া মাত্রই তুমি উনাকে কি বলবে?’
বিপ্লব দা মন মরা করে বললেন, ‘বলবো, এত্তোগুলা মানুষ খুন করা উনার ঠিক হয়নি।’
– ‘কেনো ঠিক হয়নি?’- সাজিদের প্রশ্ন।
– ‘মানে?’
– ‘মানে, স্রষ্টা, পরকাল টরোকাল বলে তো কিচ্ছু নেই। জীবনকে যেহেতু যেমন খুশি তেমন উপভোগ করা উচিত, তাই ষ্ট্যালিনের যেমনি ভালো লেগেছে, সেভাবেই সে তার জীবন উপভোগ করেছে। এতে দোষের কি আছে? মরার পরে তুমি যেমন মাটিতে মিশে ফিনিশ হয়ে যাবে, ষ্ট্যালিনও ফিনিশ হয়ে যাবে। তাহলে সে তার জীবনকে একজন ‘খুনির জীবন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে নাকি একজন ‘দরবেশের জীবন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে- তাতে তো কিচ্ছু যায় আসে না। তার তো কোথাও জবাবদিহি করতে হবে না। তার চোখে না কিছু ভালো, না কিছু খারাপ।’
বিপ্লব দা চোখ রাঙিয়ে বললো, ‘কথার মারপ্যাঁচে ফেলবি না তো। খুন করা আমার চোখে খারাপ কাজ। গর্হিত কাজ।’
– ‘তুমি একজন নাস্তিক। তোমার চোখে তা খারাপ কাজ হতে পারে। ষ্ট্যালিনও একজন নাস্তিক ছিলো। কিন্তু তার চোখে Mass Killing (গণহত্যা) খারাপ কাজ ছিলো না। তাহলে এখানে কে বেশি শুদ্ধ? তুমি বিপ্লব দা? নাকি, কমরেড ষ্ট্যালিন?’
– ‘তুই কি বলতে চাইছিস পরিষ্কার করে বল তো?’
– ‘হা হা হা। আমি বলতে চাইছি, স্রষ্টা বলে যদি কেউ না থাকে, তাহলে ভালো/খারাপ বলেও কিছু থাকে না। নৈতিকতা (মোরালিটি) বলে কিছু থাকে না। কনসাসনেস বলে কিছু থাকে না। তখন সবকিছুই সমান। না ভালো না খারাপ। না ঠিক না ভুল।ভালো-মন্দের মানদন্ড কোন ব্যক্তি, সমাজ,গোষ্ঠী নির্ধারণ করতে পারে না। কোন একজন সুপার ন্যাচারাল শক্তি, যিনি এই সবকিছুর স্রষ্টা, তিনিই বাতলিয়ে দেন কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। কোনটা ভালো,কোনটা মন্দ।’
বিপ্লব দা কথা বাড়ায় না। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে বললেন, ‘আগামীকাল প্রেস ক্লাবে সেমিনার আছে। চাইলে আসতে পারিস।’
সাজিদ আসবে বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়…..

যেখানে পাবেন প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ

ঢাকা-
ঢাকা (বাংলাবাজার) বইবাজার ডটকম, ৩৪, নর্থব্রুক হল রোড (২য় তলা), বাংলাবাজার, ঢাকা। ০১৭১৬-০৭০৫০৪, ০১৭১৭-৭১৫৬৭১
নীলক্ষেতঃ দিশারী বুক হাউস, ইসলামিয়া মার্কেট, অফিস গলি ০১৮২২-১৫৮৪৪০
ঢাকা (বাংলাবাজার) কিতাবঘর.কম- ১১ বাংলাবাজার, ইসলামী টাওয়ার, ২য় তলা। (০১৭২১-৯৯৯১২২)
মিরপুরঃ আল ফুরকান শপ, ৭৭৯-মনিপুর, মিরপুর ২; মনিপুর হাইস্কুলের প্রধান ক্যাম্পাসের নিকটে, ঢাকা ১২১৬। ০১৮৫১-৩০৬২২৩
বসুন্ধরাএরিয়াঃ ফেরীম্যান ডটকম, হাউজ# ২৩৬/এ, রোড ৮, ব্লক# সি, বসুন্ধরা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, ঢাকা (০১৭২-৮১২২৯৯)
Wafi Life হাউস- ৩৭৬, রোড-২৮, মহাখালী ডিওএইচএস, ঢাকা- ১২০৬।
খিলগাঁওঃ ইসলামকে জানুন লাইব্রেরী, ১১৪১/এ, (রানী বিল্ডিং), তিলপাপাড়া, গিলগাঁও, ঢাকা।(০১৮১৮৫১৯৬০০)
টঙ্গীঃ সন্ধানে ইসলামীয়া লাইব্রেরী, হোন্ডা রোড,টঙ্গী গাজীপুর। (০১৯১২২৩১৮৪০)
পল্টনঃ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক বুক সেন্টার, খদ্দর বাজার শপিং কমপ্লেক্স। (৪র্থ তলা) দোকান নং ১৯৭/১৯৮, জিপিওর মোড়, জিপিও, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:০১৭২০-৯১১১৩১, ০১৯৭০-৯১১১৩১
উত্তরাঃ আব্দুস সোবহান পেপার স্টল, আজমপুর বাস স্ট্যান্ড। (ফুটওভার ব্রীজের পূর্ব পাশে) ০১৯১৬-৮৩০৫৫১
যাত্রাবাড়ীঃ আল-জাবিদ লাইব্রেরী, ৩১৪ মিরহাজীরবাগ, ঢাকা-১২০৪। ০১৯১৫-৮৩৯৩৫৭
____
চট্টগ্রামঃ আমানাহ রোডঃ ০৩, হাউজ- ০৬, গেট-০৮, ব্লক- কে, হালিশহর হাউজিং এস্টেট, চট্টগ্রাম। ০১৬৭০-৩২৬৩৬৩
চট্টগ্রাম; আন্দরকিল্লাঃ ফয়েজ বুকস, আন্দরকিল্লা বাজার। ০১৮৭৪৬৯৮৯৮
ফেনীঃ এডুকেশন মিডিয়া, ফেনী। ০১৮১৯৬০৭১৭০
রাজশাহীঃ বুক সেন্টার, ৩৪, নিউমার্কেট, রাজশাহী ০১৯১২-৪৫৯৭০০, ০১৭৩৪-৬০৯৮৬১
বরিশালঃ হক লাইব্রেরী, বিএম কলেজ রোড, বরিশাল ০১৭২৪৮৫১৬৫৮ (নুরুল হক)
খুলনাঃ আদ-দ্বীন শপ ৮২, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, খুলনা। ০১৭১০-৫৮৪৩৪৪, ০১৯৫২-৩৩৭১১৮ (কামরুল হাসান) ( https://www.facebook.com/addeenshop.bd )
রংপুর-উত্তরবঙ্গঃ ইসলামী অনলাইন শপ, রংপুর। নূরুদ্দিন খন্দকার (01704218287) https://facebook.com/helpfulios
রংপুর সদরঃ মিতা লাইব্রেরী, স্টেশন রোড, প্রেসক্লাব মার্কেট (২ নং গলি), রংপুর ০১৭৬১-৬৭৯৭৩৯ ( ফারুক হোসেন)
চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ রহিম বুক ডিপো, প্রোঃ জয়নাল ইসলাম, পুরান বাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ- ০৭৮১৫২৪৮৮, ০১৭১২-০৫৪১৮৮
নারায়নগঞ্জঃ বারাকাহ শপ, বুড়ির দোকান, উপজেলা রোড, পূর্ব ইসদাইর ফতুল্লা, নারায়নগঞ্জ, ০১৮২৯-৬৭৪৭৮০
নওগাঁ: জনতা লাইব্রেরী, নওগাঁ ০১৭২২-৩২০০২০
বগুড়াঃ আল হামরা লাইব্রেরী, বড় মসজিদ লেন, বগুড়া, ০১৭১২-৮৩৩৫৭৩
দিনাজপুরঃ সরোবর লাইব্রেরী, মডার্ণ মোড়, পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন, (এমটিবি ব্যাংকের বিপরীতে), দিনাজপুর। ০১৭১৭-০১৭৬৪৫ (আরিফ)
পাবনাঃ রাহমানিয়া লাইব্রেরী, পাঁচমাথা মোড়, পাবনা ০১৬২৭-০২৬৯৬৯
সিলেটঃ মাহদী লাইব্রেরী। ৬/২, হাজী কুদরত উল্লাহ মার্কেট (২য় তলা) সিলেট। ০১৭৮৮-৫২৪০৪৪
লক্ষীপুরঃ সুন্নাহ , চকবাজার, লক্ষীপুর। (০১৯১৮-১৯৫৫০০ – আহমেদ কাওসার)
অনলাইনে অর্ডার করুন-
১/ রকমারি – https://www.rokomari.com/book/129384/প্যারাডক্সিক্যাল-সাজিদ
২/ বইবাজার –  http://boibajar.com/product/paradoxicalsajid
৩/ ওয়াফী লাইফ – http://www.wafilife.com/shop/uncategorized/paradoxical-sajid/
৪/ ইত্যাদিশপ– http://www.ittadishop.com/products/details/88d321d2f5b311e6af9f0paradoxikal-sajid.html
যেকোন প্রয়োজনে-
Guardianpubs@gmail.com, ০১৭১০-১৯৭৫৫৮, ০১৯৯৮-৫৮৪৯৫৮
”প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের দুরন্ত
পথচলায়
আপনাদের আরেকবার অভিনন্দন,
এ কৃতিত্ব আপনাদেরই। ”

কওমী সনদের স্বীকৃতি: যেমন চেয়েছিলেন শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহ


মুহাম্মাদ মামুনুল হক:

কওমী মাদরাসা সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি বর্তমানে বহুল আলোচিত ৷ অন এবং অফ উভয় লাইনেই বিতর্ক তুঙ্গে উঠছে এবিষয়ক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ৷ আমার মরহুম ওয়ালেদ হযরত শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর নাম ও তাঁর স্বীকৃতির আন্দোলনের কথাও উঠে আসছে অনেকের আলোচনায় ৷ নিঃসন্দেহে কওমীর স্বীকৃতির সঙ্গে শায়খুল হাদীস (রহঃ) এর নাম জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে ৷ সুতরাং তাঁর নাম এ প্রসঙ্গে আলোচিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ৷ তবে অবশ্যই তা হওয়া চাই বাস্তবতার আলোকে ৷
হযরত শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে কওমী সনদের স্বীকৃতির দাবিতে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নানামুখী তৎপরতার পাশাপাশি বৃহত দুটি আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে ৷ ২০০৫সালে ছাত্র কনভেনশন শিরোনামে ছাত্রআন্দোলন এবং ২০০৬এ মহা-সমাবেশ ও মুক্তাঙ্গণে পাঁচ দিনের অবস্থান কর্মসূচী ৷ আল্লাহর রহমতে দুটি আন্দোলনেরই একজন সংগঠক হিসাবে বিশেষ ভূমিকা পালনের সুযোগ আমার হয়েছে ৷ আর সেই সুবাদে সম্যক অবগত রয়েছি এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ৷
পল্টন ময়দানের ছাত্র কনভেনশনে হযরত শায়খুল হাদীস রহাহিমাহুল্লাহ খুবই আবেগঘন বক্তব্য রেখেছিলেন ৷ সে বক্তব্যের মূল কথা ছিল-
"জোট সরকার যদি মনে করে তাদের ক্ষমতায় আসার পিছনে আমার বিন্দুমাত্র ভূমিকা আছে তাহলে তারা যেন আমাকে আমার ছাত্রজনতার সম্মুখে লজ্জিত না করে এই শিক্ষার স্বীকৃতির ব্যবস্থা করে" ৷
আমরা জানতাম, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া ব্যক্তিগতভাবেও হযরত শায়খুলহাদীসকে বিশেষ সন্মান ও সমীহ করতেন ৷ সরকার ও প্রশাসনে তাঁর বিশেষ এক মর্যাদা ছিল ৷ পল্টনের ঐ বক্তব্যে সরকারের মধ্যে আলোড়ন তৈরি হয় এবং কওমী স্বীকৃতির দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে মর্মে আভাস আসতে থাকে ৷ এমন প্রেক্ষিতে প্রথম বারের মত আলোচনার বিষয় হয়ে দাড়ায় "স্বীকৃতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে"? ৷ এ পর্যায়ে বলে রাখা ভালো, তখনো বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু বুযুর্গ ওলামায়ে কেরাম কওমী স্বীকৃতির ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং অহরহ স্বীকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন ৷
কওমী শিক্ষার স্বীকৃতির সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় তা বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় ৷ এপর্যায়ে বেফাকুল মাদারিসের উদ্যোগ ও ভূমিকা ছিল একক ও অনন্য উচ্চতায় ৷ এমন সময় শুরু হয় দুর্যোগের ঘনঘটা ৷ বাতাসে ভাসতে শুরু করে একটি নাম ৷ ইসলামী ব্যংক বাংলাদেশের শরীয়া কাউন্সিলের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল "ম" অদ্যাক্ষরের জামাত ঘরানার এক ব্যক্তি তিনি ৷ তার সহায়তা ও তার পেছনের মদদদাতাদের আনুকুল্যে বেফাকুল মাদারিসের প্রতিদ্বন্দি হিসাবে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হয় আরো কিছু পক্ষ ৷ উত্তরবঙ্গের মিযান জামাতের পরীক্ষার আয়োজক "তানযীমুল মাদারিস" নামক আঞ্চলিক বোর্ডটি রাতারাতি দাওরা পর্যন্ত উন্নীত হয়ে যায় ৷ স্মর্তব্য যে, আমি ১৯৯৬ থেকে ২০০০সাল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের শীর্ষস্থানীয় এক মাদরাসায় শিক্ষকতার সুবাদে তানযীমুল মাদারিস বোর্ডের হাকীকতেহাল সম্পর্কে সম্যক অবগত ৷ এহেন স্ফীত বোর্ড তানযীমের নেতৃত্বে অন্যান্য বিক্ষিপ্ত বোর্ডগুলোকে একত্রিত করে দাড় করানো হয় বেফাকের বিকল্প ও প্রতিদ্বন্দি হিসাবে ৷ অথচ তখনো উত্তরবঙ্গের তানযীম আর গওহরডাঙ্গার বোর্ড বেফাকের আওতাধীন বোর্ড হিসাবে কর্মরত এবং দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা বেফাকের অধীনেই চলমান ছিল ৷ আর পটিয়ার ইত্তেহাদ বোর্ড তো বেফাকের জন্মের পরপরই এর অধীন ছিল ও দাওরার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সুদীর্ঘকাল ৷
বেফাকুল মাদারিসের জন্মই হয়েছিল অন্যান্য বোর্ডগুলোর সহায়তায় একমাত্র জাতীয় বোর্ড হিসাবে ৷ দীর্ঘকাল স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার পর হাটহাজারী ও লালবাগ মাদরাসার মত বড় বড় মাদরাসাগুলোও যখন বেফাকে যোগ দিল তখন তো বেফাকের সার্বজনীনতা অারো বেড়ে গেল ৷ বহু আঞ্চলিক বোর্ড বেফাকের সাথে সমন্বিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যপি মাদারিসে কওমিয়ার একক প্লাটফর্ম গড়ে ওঠার অপার সম্ভাবনা দোরগোরায় ছিল ৷ স্বীকৃতির প্রসঙ্গ বিষয়টিকে আরো তরান্বিত করছিল ৷ রাজনৈতিকভাবে শতধা বিভক্ত বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গণ অন্তত মাদারিস কেন্দ্রিক একটি মযবুত ঐক্যের ভিত তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল ৷ এমন সময় সর্বনাশা ষড়য়ন্ত্রের অণলে কপাল পুড়ল ইসলামী জনতার ৷ স্বীকৃতির লোভ দেখিয়ে ঐক্যবদ্ধ বেফাক থেকে ভাগিয়ে নেয়া হল আত্নপ্রবঞ্চিত কিছু সরলপ্রাণ বুযুর্গকে ৷
হযরত শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহকে বে-চায়ন, বে-কারার করে তুলল অপার সম্ভাবনার এহেন মৃত্যুশংকা আর কওমীর শত্রুদের এই ছিনিমিনি খেলবার তামাশা ৷ তিনি অনুভব করলেন, স্বীকৃতি বাস্তবায়নের আগেই যদি শুরু হয় এমন নোংরা প্রতিযোগিতা তাহলে পরবর্তিতে পরিণাম কী হতে পারে! বিশেষ করে যদি দুর্বল অবকাঠামোর উপর সরকারী স্বীকৃতি বাস্তবায়িত হয় তাহলে সরকার নাকে দড়ি বেধে ঘোরাবে কওমী মহলকে ৷ তাই তিনি অনৈক্যের ঘোর বিরোধিতা আর ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকৃতি আদায়ের পথে সংগ্রামে নিবেদিত রইলেন ৷ এমন প্রেক্ষিত থেকেই পালিত হয়েছিল শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর ঐতিহাসিক অবস্থান কর্মসূচী ৷ পরিকল্পনা ছিল শায়খুল হাদীসের এই কর্মসূচীতে হাটহাজারীর হযরতও সংহতি প্রকাশ করবেন ৷ তাঁকেও এখানে নিয়ে আসা হবে ৷ কিন্তু রাজনীতির দৌড়ে শায়খুল হাদীসের প্রতিদ্বন্দিরা বাগড়া বাধিয়ে বাঞ্চাল করে দিল সেই পরিকল্পনা ৷
সে যাই হোক, শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর এ কর্মসূচীর উদ্দেশ্য ছিল, বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকৃতি আদায় করা ৷
আজও আমাদের বক্তব্য পরিস্কার ৷ আমরা স্বীকৃতি চাই ঐক্যবদ্ধভাবে ৷ তার সহজ উপায় তো এটাই যে, বেফাকের বাইরের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদেরকে বেফাকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক ৷ যেমনটা মরহুম খতীব উবায়দুল হক রাহিমাহুল্লাহর উদ্যোগে হয়েছিল ৷ গওহরডাঙ্গার মুফতী রূহুল আমীন হাফিজাহুল্লাহকে মহাসচিব আর অন্য বোর্ডগুলোর প্রতিনিধি নিয়োগ করে সমন্বয় করেছিলেন তিনি ৷ নিজেরা ঘরে বসে আগে প্লাটফর্ম মজবুত করুন ৷ তারপর সরকারের সাথে দেনদরবার শুরু করুন ৷ যদি সম্মিলিতভাবে বেফাক ছাড়া অন্য কোনো নামে অন্য কোনোভাবে কাজ করা যায় তাতেও আমাদের আপত্তি নেই ৷ কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবিশেষের ব্যপারে অভিযোগ অনাস্থা থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে বিচ্ছিন্নতাকে অন্তত এই জায়গাটায় মেনে নেয়া যায় না ৷ যদি দুর্ভাগা বাংলাদেশী মুসলমানদের কপালে শতভাগ ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম নাই থাকে তাহলে মন্দের ভালো হিসাবে অন্তত আশিভাগ ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম নিজস্ব বুনিয়াদের উপর কায়েম বাংলাদেশে কওমী মাদরাসার একমাত্র জাতীয় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসই হোক আস্থার শেষ ঠিকানা ৷ এটাই ছিল হযরত শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর চেতনা ৷
এখানে অবান্তরভাবে আওয়ামীলীগ বিএনপির প্রশ্ন উত্থাপনকে পানি ঘোলা করার আরেকটি অপপ্রয়াস বলে মনে হয় ৷ যে কোনো সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রাখা যেতেই পারে ৷ লেয়াঁজো করলেও ভালো কথা ৷ কিন্তু সরকারের এজেণ্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে চাইলে বা হয়ে গেলে সেটা মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই ৷ অনুকম্পা ভোগ করে কখনো অধিকার আদায় করা যায় না ৷

স্যেকুলাররা রমেন দাশ গুপ্তকে বেয়াদব রূপে গড়ে তুলে:মুনির আহমদ


বাংলা নিউজ ২৪ ডটকম-এর একজন সাংবাদিক রমেন দাশ গুপ্ত হেফাজতের মহাসচিব শীর্ষপর্যায়ের মুহাদ্দিস ও বরেণ্য আলেম আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনাগরীর নামে ভদ্র যে কোন মানুষের মুখে উচ্চারণের অযোগ্য একটা মারাত্মক অশ্লীল এবং অগ্রহণযোগ্য কমেন্ট করেন। সেই কমেন্ট তিনি পরে এডিট করেন এবং শেষমেষ মুছে দেন।
তিনি একজন সাংবাদিক, বাম রাজনীতি করতেন, ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন।
একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেমে-দ্বীন সম্পর্কে তার বিরাগ থাকা কি উচিত?? তাকে তো নির্মোহভাবে সংবাদ সংগ্রহ আর ভদ্র ভাষায় পরিবেশন করতে হবে। তিনি কেন একজন বর্ষীয়ান শীর্ষ আলেম সম্পর্কে এই ধরণের কথা বলবেন?
তিনি বলছেন, তার একাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে, তিনি নিজেই এই কমেন্ট করেছিলেন। সবকিছু যদি বাদও দেই, তাও প্রশ্ন থাকে যে, একজন প্রবীণ ও শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতা সম্পর্কে এমন অশ্লীল কমেন্ট করেন কীভাবে???
এখানেই আসে আত্মিক শিক্ষার প্রশ্ন। আমরা বারেবারে বলে আসছি যে, এই স্যেকুলার বামেরা প্রথমেই মানুষের আত্মিক সম্পদ ধ্বংস করে, তাকে দুর্বিনীত এবং বেয়াদব রূপে গড়ে তুলে। যেই মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে, তার কাছে সারা পৃথিবীর মানুষ- যা আল্লাহ্র নিয়ামত ও মর্যাদাবান সৃষ্টি, তার কি কোন মূল্য থাকে?? যার একটা প্রমাণ রমেন দাশ গুপ্ত নিজেও আলোচ্য কমেন্ট এর মাধ্যমে দেখি দিলেন। আজকে সবাই এই প্রমাণ দেখলো যে, বাম-সেক্যুলারদের কাছে কোন কিছুই কোন মানুষই সন্মানীয় ও মর্যাদার নয়। আসলে আমরা ক্রমাগতই তার প্রমাণ দেখছি।
ধিক এই শিক্ষা আর দর্শনকে, যা মানুষকে অসন্মান করতে ও অপমান করতে শেখায়। আমরা তাকে বদদোয়া দিব না। বরং কামনা করি, আল্লাহ তাকে সুপথে আনুন, মানুষের মর্যাদা যেন সে বুঝতে পারে, মুরুব্বিদের সম্মান করার নিয়ামত যেন বুঝতে পারে

সাইয়িদুল ইসতিগফার

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ:

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ﺳَﻴِّﺪُ ﺍﻟِﺎﺳْﺘِﻐْﻔَﺎﺭِ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻝَ : ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ . ﻗَﺎﻝَ : ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭِ ﻣُﻮﻗِﻨًﺎ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻣِﻦْ ﻳَﻮْﻣِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﻤْﺴِﻲَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ، ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﻮﻗِﻦٌ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼْﺒِﺢَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ .
সাইয়িদুল ইসতিগফার হচ্ছে এইরূপ বলা-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন,
আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে। স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ। কাজেই আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারে।’
তিনি বলেন, যে এই কথাগুলো দিনের বেলা মন থেকে বলে আর ঐ দিন সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতীদের শামিল হবে। তেমনি যে তা রাতের বেলায় মন থেকে বলে আর ভোর হওয়ার আগেই মারা যায় সে জান্নাতীদের শামিল হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬, ৬৩২৩
সূত্র-আলোচনা
এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস ইবনে ছাবিত রা. একজন আনসারী খাযরাজী সাহাবী। বিখ্যাত শায়ের সাহাবী হযরত হাসসান ইবনে ছাবিত রা.-এর ভাতিজা। তাঁর বাবা আওস ইবনে ছাবিত রা. বদরের যুদ্ধে শামিল ছিলেন। আর অহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উবাদা ইবনে ছামিত রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেছেন-
ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﻣﻦ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺃﻭﺗﻮﺍ ﺍﻟﻌﻠﻢَ ﻭﺍﻟﺤﻠﻢ، ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻣﻦ ﺃﻭﺗﻲ ﺃﺣﺪﻫﻤﺎ .
শাদ্দাদ ইবনে আওস ঐসব ব্যক্তিদের একজন, যাদের
‘ইল্ম’ ও ‘হিল্ম’ (জ্ঞান ও সহনশীলতা) দুটোই দেয়া হয়েছে। অথচ অনেক মানুষ আছে যারা শুধু একটি প্রাপ্ত হয়েছেন।
তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে-
ﻓﻀﻞ ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﺍﻷﻧﺼﺎﺭَ ﺑﺨﺼﻠﺘﻴﻦ : ﺑﺒﻴﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻧﻄﻖ، ﻭﺑﻜﻈﻢ ﺇﺫﺍ ﻏﻀﺐ .
আনসারীদের মাঝে শাদ্দাদ ইবনে আওস শ্রেষ্ঠ দুটি স্বভাব দ্বারা : এক. স্পষ্ট বক্তব্যে আর দুই. ক্রোধ সংবরণে।
ইমাম তবারানী রাহ. স্বীয় সনদে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ﻣﺎ ﻟﻚ ﻳﺎ ﺷﺪﺍﺩ؟ শাদ্দাদ! তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, ﺿﺎﻗﺖ ﺑﻲ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ পৃথিবী আমার জন্য সংকুচিত হয়ে গেছে! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
ﻟﻴﺲ ﻋﻠﻴﻚ، ﺇﻥّ ﺍﻟﺸّﺎﻡ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺑﻴﺖ ﺍﻟﻤﻘﺪﺱ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺗﻜﻮﻥ ﺃﻧﺖ ﻭﻭﻟﺪﻙ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻙ ﺃﺋﻤّﺔ ﻓﻴﻬﻢ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ .
না তোমার কিছু হবে না। শাম বিজিত হবে। বাইতুল মাকদিস বিজিত হবে। আর তুমি ও তোমার পরে তোমার সন্তানেরা সেখানে নেতৃস্থানীয় হবে ইনশাআল্লাহ!
পরে তিনি শামে চলে যান। এক ক্বওল অনুসারে ৫৮ হিজরীতে ৭৫ বছর বয়সে ফিলিস্তীনে ইন্তিকাল করেন।
(আল ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/২৫৮)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, সহীহ বুখারীতে তাঁর সূত্রে এই একটি হাদীসই বর্ণিত হয়েছে। -ফাতহুল বারী ১১/৯৯
এই মহান সাহাবীর সূত্রে এই হাদীস ইমাম বুখারী রাহ. ছাড়াও ইমাম ইবনে আবী শাইবা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ স্ব স্ব সনদে বর্ণনা করেছেন। (দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩০০৫২ ও টীকা শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা)
সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুদ দাআওয়াত’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এই হাদীসটি (৬৩০৬) রয়েছে। পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাবু আফযালিল ইসতিগফার’। আফযালুল ইসতিগফার মানে শ্রেষ্ঠ ইসতিগফার। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (৮৫২হি.) বলেছেন-
ﻭَﺗَﺮْﺟَﻢَ ﺑِﺎﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔِ ﻭَﻭَﻗَﻊَ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳﺚُ ﺑِﻠَﻔْﻆِ ﺍﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﻭَﻛَﺄَﻧَّﻪُ ﺃَﺷَﺎﺭَ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤُﺮَﺍﺩَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﺍﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔُ ﻭَﻣَﻌْﻨَﺎﻫَﺎ ﺍﻟْﺄَﻛْﺜَﺮُ ﻧَﻔْﻌًﺎ ﻟِﻤُﺴْﺘَﻌْﻤِﻠِﻪِ .
অর্থাৎ ইমাম বুখারী রাহ. ‘আফযাল’ শব্দের দ্বারা শিরোনাম গঠন করেছেন। তিনি সম্ভবত এর দ্বারা হাদীসের ‘সাইয়িদ’ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ সাইয়িদুল ইসতিগফার অর্থ আফযালুল ইস্তিগফার বা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার। আর এর শ্রেষ্ঠত্বের তাৎপর্য হচ্ছে, পাঠকারীর পক্ষে সর্বাধিক উপকারী হওয়া। -
ফতহুল বারী ১১/১০১
কাজেই আমরা যদি ইসতিগফারের উপরোক্ত ‘মাছূর’
পাঠটি মুখস্থ করে ফেলি এবং ভাব ও মর্ম উপলদ্ধি করে সকাল-সন্ধ্যায় মন থেকে তা পাঠ করি তাহলে অনেক খায়ের ও বরকতের ব্যাপার হবে।
ভাব ও মর্ম আলোচনা
কুরআন-সুন্নাহর শেখানো যিকির ও দুআর কালেমাগুলোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো ঈমান ও ঈমানিয়াতে পরিপূর্ণ। কাজেই ঈমান শেখার ও ঈমানকে সতেজ ও সজীব করার এক বড় উপায়,
অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে তা নিয়মিত আমলে রাখা। উপরের ইসতিগফারের বাক্যমালায় আছে ঈমানিয়াতের অনেক বিষয়। আর তা থাকাই তো স্বাভাবিক। যখন হাদীস শরীফের বর্ণনা অনুসারে স্বয়ং সাইয়িদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে
‘সাইয়িদুল ইসতিগফার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর ফযীলত বর্ণনা করে বলেছেন, যে বান্দা দিবসে তা মন থেকে পড়ে সন্ধ্যার আগে তার মৃত্যু ঘটলে সে জান্নাতী হবে। আর যে তা রাতে মন থেকে পড়ে ভোরের আগে মৃত্যু হলে সে-ও জান্নাতী হবে।
নিশ্চয়ই এতে আছে ঐ সকল কথা, যা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং যার দ্বারা আল্লাহর বান্দা হয়ে যায় আল্লাহর প্রিয়পাত্র। চলুন তবে এই সত্য-সুন্দর বাণীর ভাব ও মর্মের ভুবনে।
***
১. ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ
ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। নেই কোনো ইলাহ আপনি ছাড়া।
‘রব’ মানে প্রভু ও পরওয়ারদেগার আর ‘ইলাহ’ মানে উপাস্য ও মাবুদ। আল্লাহর বান্দা প্রথমেই স্মরণ করছে এবং স্বীকার করছে যে, আল্লাহই তার রব, তার প্রভু ও পরওয়ারদেগার এবং একমাত্র ইলাহ ও মাবুদ।
২. ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ
আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আপনার বান্দা।
আল্লাহই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে প্রতিপালন করছেন। মানুষের জীবন ও জীবনোপকরণ, তার মেধা ও শক্তি তাঁর দান। সৃজন ও প্রতিপালনে আল্লাহর কোনো শরীক নেই। কাজেই নিরঙ্কুশ ইবাদত ও চূড়ান্ত আনুগত্য একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
কুরআন মাজীদের ইরশাদ-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻜُﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽَ ﻓِﺮَﺍﺷًﺎ ﻭَّ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀَ ﺑِﻨَﺎٓﺀً ﻭَّ ﺍَﻧْﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀِ ﻣَﺎٓﺀً ﻓَﺎَﺧْﺮَﺝَ ﺑِﻪٖ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮٰﺕِ ﺭِﺯْﻗًﺎ ﻟَّﻜُﻢْ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺠْﻌَﻠُﻮْﺍ ﻟِﻠﻪِ ﺍَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻭَّ ﺍَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ .
হে মানুষ! যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর। যাতে আত্মরক্ষা করতে পার।
যিনি তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিছানা এবং আকাশকে ছাদ। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য উৎপন্ন করেছেন ফলমূল । কাজেই জেনেশুনে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না। -সূরা বাকারা (২) : ২১-২২
মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বান্দা আর আল্লাহই তার রব ও ইলাহ। ইস্তিগফারের এই বাক্যগুলোতে আছে বান্দার সাথে আল্লাহর এই সম্পর্কেরই স্মরণ ও স্বীকারোক্তি।
৩. ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ
আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
এটি উপরোক্ত সম্পর্কেরই দাবি।
আরবী ভাষায় ﻋﻬﺪ শব্দের এক অর্থ আদেশ-নিষেধ,
বিধি-বিধান। আরবী ভাষার ব্যবহারে ﻋﻬﺪ ﺇﻟﻴﻪ অর্থ তাকে আদেশ করল, নিষেধ করল। এই ব্যবহার অনুসারেই উপরোক্ত বাক্যের তরজমা করা হয়েছে।
এ শব্দের আরেক অর্থ অঙ্গিকার, চুক্তি ইত্যাদি। সেই ব্যবহার অনুসারে তরজমা হবে, ‘আমি আপনার সাথে কৃত অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলব।’
আল্লাহর যে বিধান ও ফরমান পালনে বান্দা আল্লাহর সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ এবং যার বিনিময়ে বান্দার জন্য রয়েছে মহান রবের মহা প্রতিশ্রুতি, তা হচ্ছে ঈমান ও ইতাআত তথা বিশ্বাস ও আনুগত্যের ফরমান।
বান্দা একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করবে এবং আল্লাহর আদেশকেই চূড়ান্তরূপে শিরোধার্য করবে। তাঁর আদেশের উপর আর কারো আদেশকে প্রাধান্য দিবে না।
কারণ, নিরঙ্কুশ উপাসনা ও চূড়ান্ত আনুগত্যের একমাত্র হকদার আল্লাহ তাআলা।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুদ্ধি-বিবেক দান করেছেন এবং প্রকৃতিতে তাঁর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের অসংখ্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন। এই বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা মানুষের কর্তব্য।
এরপর যুগে যুগে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর বিধান ও ফরমান সুস্পষ্টভাবে মানব জাতিকে দান করেছেন।
তো আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় দিক থেকে তাঁর ‘রুবূবিয়্যাত’ ও ‘উলুহিয়্যাত’ মানবজাতির সামনে সাব্যস্ত হয়েছে। কাজেই আল্লাহর ফরমান স্পষ্ট এবং মানুষের সর্বসত্তা আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ মেনে নেয়ার বিষয়ে অঙ্গিকারাবদ্ধ।
এরপর আল্লাহ যাকে ঈমানের তাওফীক দান করেছেন ঈমানের শাহাদতের মাধ্যমে সে আল্লাহর ফরমানকে শিরোধার্য করেছে এবং আল্লাহর সাথে তার অঙ্গিকারকে আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। এই দুআয় আছে সেই অঙ্গিকারেরই স্মরণ ও নবায়ন।
ঈমানী শাহাদাতের মাধ্যমে মুমিন ঐ সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করেছে, যা অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষ- সে ঈমান আনুক বা না আনুক, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, সে আল্লাহরই সৃষ্টি; আল্লাহর দানেই সে ধনী। দিনরাত সে ভোগ করে চলেছে আল্লাহর নিআমত। যে মুখে স্বীকার করছে না তারও সর্বসত্তা সর্বদা এই সাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, আল্লাহ তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। আর সে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালিত।
মুমিনের সৌভাগ্য যে, ঈমানের শাহাদাতের মাধ্যমে সে এই সত্য স্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহ ও অস্বীকারের হীনতা ও মহাশাস্তি থেকে মুক্তির উপায় গ্রহণ করেছে। এটাই তো পরিচয় শুভবুদ্ধির ।
কুরআনে কারীম ‘উলুল আলবাব’ ও শুভবুদ্ধির অধিকারী মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলছে-
ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾُﻮْﻓُﻮْﻥَ ﺑِﻌَﻬْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَ ﻟَﺎ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻤِﯿْﺜَﺎﻕَ
যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২০
এদেরই জন্য মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি-
ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ﺟَﻨّٰﺖُ ﻋَﺪْﻥٍ ﯾَّﺪْﺧُﻠُﻮْﻧَﻬَﺎ ﻭَ ﻣَﻦْ ﺻَﻠَﺢَ ﻣِﻦْ ﺍٰﺑَﺎٓﻯِٕﻬِﻢْ ﻭَ ﺍَﺯْﻭَﺍﺟِﻬِﻢْ ﻭَ ﺫُﺭِّﯾّٰﺘِﻬِﻢْ ﻭَ ﺍﻟْﻤَﻠٰٓﻯِٕﻜَﺔُ ﯾَﺪْﺧُﻠُﻮْﻥَ ﻋَﻠَﯿْﻬِﻢْ ﻣِّﻦْ ﻛُﻞِّ ﺑَﺎﺏٍ ﺳَﻠٰﻢٌ ﻋَﻠَﯿْﻜُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮْﺗُﻢْ ﻓَﻨِﻌْﻢَ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
এদেরই জন্য শুভ পরিণাম- স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ প্রত্যেক দরজা দিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হবে এবং বলবে, তোমাদের প্রতি শান্তি, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে। কত ভালো এই পরিমাণ। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২২-২৪
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছে তাদের সম্পর্কে ঘোষণা-
ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﻋَﻬْﺪَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻣِﯿْﺜَﺎﻗِﻪٖ ﻭَ ﯾَﻘْﻄَﻌُﻮْﻥَ ﻣَﺎۤ ﺍَﻣَﺮَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑِﻪٖۤ ﺍَﻥْ ﯾُّﻮْﺻَﻞَ ﻭَ ﯾُﻔْﺴِﺪُﻭْﻥَ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽِ ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻟﻠَّﻌْﻨَﺔُ ﻭَ ﻟَﻬُﻢْ ﺳُﻮْٓﺀُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে; যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে তাদের জন্য আছে লা‘নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৫
বস্তুত আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার স্বীকার করা এবং তাঁর ফরমান শিরোধার্য করাই শুভ বুদ্ধির পরিচয় এবং এটিই পথ বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের।
ﻣﺎ ﺍﺳﺘﻄﻌﺖ ‘যথাসাধ্য’ কথাটির উদ্দেশ্য, আপন দুর্বলতা স্বীকার করা। একে তো আল্লাহর শান মোতাবেক হক আদায় বান্দার সাধ্যেরই অতীত। আর এ কারণে আল্লাহ আপন করুণায় বান্দার উপর তার সাধ্য অনুযায়ী ভার দিয়েছেন, কিন্তু সেই বিধান পালনেও হয়ে যায় বান্দার নিজের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাজনিত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। কাজেই করুণাময় প্রভুর সাথে আনুগত্যের চুক্তি নবায়নের সাথে সাথে আপন দুর্বলতা নিবেদনও এই বাক্যের উদ্দেশ্য।
৪. ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ
‘আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে।’
আপন কৃতকর্মের অনিষ্ট ও অশুভ পরিণামই তো ভয়ের বড় কারণ। দুনিয়া ও আখিরাতে যে যে কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তন্মধ্যে নিজের কর্মভুলই তো সবচেয়ে বড় কারণ। আখিরাতের শাস্তি ও আযাবের পুরোটাই মানুষের নিজের কর্মের ফল। দুনিয়ার অশান্তি ও অস্থিরতার মূলেও তার নিজের কর্ম। তাহলে সবার আগে তো নজর ফেরানো উচিত নিজের দিকেই। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ অনিষ্টের কারণ অন্যত্র খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যকে দোষারোপ করে। না, কষ্ট ও অনিষ্টের কারণ আমার নিজেরই কর্ম। উপরের বাক্যে আছে এই সত্যের শিক্ষা ও উপলদ্ধি, আছে একমাত্র আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা।
শাক্ল ইবনে হুমাইদ রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম এবং আরজ করলাম, আমাকে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দুআ শিখিয়ে দিন। তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং বললেন, তুমি (এই কথাগুলো) বলবে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺳَﻤْﻌِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺑَﺼَﺮِﻱ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻟِﺴَﺎﻧِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻗَﻠْﺒِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﻨِﻴِّﻲ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার কানের অনিষ্ট থেকে, আমার চোখের অনিষ্ট থেকে,
আমার জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, আমার অন্তকরণের অনিষ্ট থেকে এবং আমার বীর্যের (লজ্জাস্থানের) অনিষ্ট থেকে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটি দুআ শিক্ষা দিন, যা আমি সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর! তুমি বলবে-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﻓَﺎﻃِﺮَ ﺍﻟﺴَّﻤَﻮَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ ﻋَﺎﻟِﻢَ ﺍﻟﻐَﻴْﺐِ ﻭَﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓِ، ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ، ﺭَﺏَّ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻣَﻠِﻴﻜَﻪ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻧَﻔْﺴِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻭَﺷِﺮْﻛِﻪ، ﻭَﺃَﻥْ ﺃَﻗْﺘَﺮِﻑَ ﻋَﻠَﻰ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﺳُﻮﺀًﺍ ﺃَﻭْ ﺃَﺟُﺮَّﻩُ ﺇِﻟﻰ ﻣُﺴْﻠِﻢٍ .
ইয়া আল্লাহ! আকাশম-লী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! সকল বস্তুর প্রভু ও অধিপতি! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার নিজের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় নিচ্ছি নিজের উপর বা কোনো মুসলিমের উপর কোনো প্রকার অনিষ্ট টেনে আনা থেকে। -জামে তিরমিযী,
হাদীস ৩৫২৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৬৭
হযরত ফারওয়া ইবনে নাওফিল আল আশজায়ী রা. বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দুআ করতেন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি বলতেন-
ﺍﻟﻠﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻋَﻤِﻠْﺖُ، ﻭَﻣَﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺃَﻋْﻤَﻞْ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি যা আমি করেছি তার অনিষ্ট থেকে এবং যা করিনি তারও অনিষ্ট থেকে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১৬
৫. ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ
‘স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ।’
হায়! একদিকে আল্লাহর প্রভূত দান, অন্যদিকে বান্দার নাফরমানী! এটাই তো সত্য ও বাস্তবতা। তবে এই সত্যের উপলদ্ধিও তাদের মনেই জাগে,
যাদের আল্লাহ ক্ষমা করতে চান। দেখুন, এক বেদুঈন কা‘বার গিলাফ ধরে কীভাবে কাকুতি মিনতি করছে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇﻥ ﺍﺳﺘﻐﻔﺎﺭﻱ ﻣﻊ ﺇﺻﺮﺍﺭﻱ ﻟﺆﻡٌ، ﻭﺇﻥَّ ﺗﺮﻛﻲ ﺍﻻﺳﺘﻐﻔﺎﺭَ ﻣﻊ ﻋﻠﻤﻲ ﺑﺴﻌﺔِ ﻋﻔﻮﻙَ ﻟﻌﺠﺰٌ، ﻓﻜﻢ ﺗَﺘَﺤَﺒَّﺐُ ﺇﻟﻲَّ ﺑﺎﻟﻨﻌﻢ ﻣﻊ ﻏِﻨﺎﻙَ ﻋﻨﻲ، ﻭﻛﻢ ﺃﺗﺒﻐَّﺾُ ﺇﻟﻴﻚ ﺑﺎﻟﻤﻌﺎﺻﻲ ﻣﻊ ﻓﻘﺮﻱ ﺇﻟﻴﻚ، ﻳﺎ ﻣَﻦ ﺇﺫﺍ ﻭﻋﺪَ ﻭﻓَّﻰ، ﻭﺇﺫﺍ ﺗﻮﻋَّﺪَ ﺗﺠﺎﻭﺯ ﻭﻋﻔﺎ، ﺃﺩﺧﻞْ ﻋﻈﻴﻢَ ﺟُﺮﻣﻲ ﻓﻲ ﻋﻈﻴﻢِ ﻋﻔﻮﻙَ، ﻳﺎ ﺃﺭﺣﻢ ﺍﻟﺮﺍﺣﻤﻴﻦ .
ইয়া আল্লাহ! পাপ-মগ্নতার সাথে আমার ক্ষমা চাওয়া তো হীনতা, কিন্তু, তোমার প্রশস্ত ক্ষমার সংবাদ জেনেও ক্ষমা না চাওয়া তো নির্বুদ্ধিতা। তুমি তোমার দয়া ও করুণার দ্বারা কতই না আমার প্রীতি অন্বেষণ করছ। অথচ আমার কাছে তোমার কোনোই প্রয়োজন নেই। আর আমি পাপ ও নাফরমানীর মাধ্যমে কতই না তোমার ক্রোধ আকর্ষণ করে চলেছি। অথচ তোমার কাছেই আমার সকল প্রয়োজন!
হে সকল দয়ালুর বড় দয়ালু! যিনি প্রতিশ্রুতি দিলে পূরণ করেন, আর শাস্তির ধমক দিলেও ক্ষমা করেন ও উপেক্ষা করেন আমার মহা পাপকে ডুবিয়ে দাও তোমার করুণার মহা সিন্ধুতে! (কিতাবুল আজকার,
ইমাম নববী, বর্ণনা ১২৩০-এর অধীনে)
সুবহানাল্লাহ! বাস্তবতার এই উপলদ্ধি আর নিবেদনের এই ভাষা আল্লাহ যাকে দান করেন তাকে তো ক্ষমা করার জন্যই দান করেন। কবি সত্য বলেছেন-
ﻟﻮ ﻟﻢ ﺗﺮﺩ ﻧﻴﻞ ﻣﺎ ﺃﺭﺟﻮ ﻭﺃﻃﻠﺒﻪ + ﻣﻦ ﺟﻮﺩ ﻛﻔﻴﻚ ﻣﺎ ﻋﻠﻤﺘﻨﻲ ﺍﻟﻄﻠﺒﺎ
তুমি যদি না চাইতে দু’হাতের দানে আমার আচলখানি ভরে দিতে; তাহলে তো প্রভু! এই প্রার্থনাই শেখাতে না আমাকে।
৬. ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ
‘কাজেই’...। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, বোঝা যাচ্ছে, যে আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকার করে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। ইফকের দীর্ঘ হাদীসে তা স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
ﺍﻟﻌَﺒْﺪُ ﺇِﺫَﺍ ﺍﻋْﺘَﺮَﻑَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻪِ، ﺛُﻢَّ ﺗَﺎﺏَ ﺗَﺎﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ .
বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে ও তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৬১;
ফাতহুল বারী ১১/১০৩
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺎﺏَ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻇُﻠْﻤِﻪٖ ﻭَ ﺍَﺻْﻠَﺢَ ﻓَﺎِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﯾَﺘُﻮْﺏُ ﻋَﻠَﯿْﻪِ ؕ ﺍِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻏَﻔُﻮْﺭٌ ﺭَّﺣِﯿْﻢٌ .
কিন্তু সীমালংঘন করার পর কেউ তওবা করলে ও সংশোধন করলে অবশ্যই আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন; আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা মাইদা (৫) : ৩৯
৭. ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ মাফ করে।’
গুনাহ মাফকারী তো একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বান্দার গুনাহ মাফ করতে পারে না।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻣَﻦْ ﯾَّﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮْﺏَ ﺍِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠﻪُ
আল্লাহ ছাড়া কে আছে পাপ ক্ষমা করে? -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
আরো ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﯾَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﺘَّﻮْﺑَﺔَ ﻋَﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻩٖ ﻭَ ﯾَﻌْﻔُﻮْﺍ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﯿِّﺎٰﺕِ ﻭَ ﯾَﻌْﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ .
তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। -
সূরাতুশ শূরা (৪২) : ২৫
হাদীসের এই দুআয় সহজ সরল ভাষায় যে গভীর সত্য ও অনুপম ভাবের প্রকাশ ঘটেছে তা থেকেও বোঝা যায়- কেন এই দুআ সাইয়িদুল ইসতিগফার বিশেষণে ভূষিত।
এতে যেমন আছে আল্লাহর একমাত্র মাবুদ হওয়ার সাক্ষ্য তেমনি আছে বান্দার বান্দা হওয়ার স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে খালিককে খালিক বলে স্বীকার করা তেমনি আছে তাঁর সকল বিধান ও ফরমানকে শিরোধার্য করা।
এতে যেমন আছে প্রকৃত দাতার দান স্বীকার, তেমনি আছে আপন কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে গুনাহ দ্বারা নিজের ক্ষতির উপলদ্ধি, তেমনি আছে এই মহা সত্যের সাক্ষ্য যে,
একমাত্র আল্লাহই বান্দার গুনাহ মাফকারী।
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ