মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ:
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ﺳَﻴِّﺪُ ﺍﻟِﺎﺳْﺘِﻐْﻔَﺎﺭِ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻝَ : ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ . ﻗَﺎﻝَ : ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭِ ﻣُﻮﻗِﻨًﺎ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻣِﻦْ ﻳَﻮْﻣِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﻤْﺴِﻲَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ، ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﻮﻗِﻦٌ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼْﺒِﺢَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ .
সাইয়িদুল ইসতিগফার হচ্ছে এইরূপ বলা-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন,
আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে। স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ। কাজেই আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারে।’
তিনি বলেন, যে এই কথাগুলো দিনের বেলা মন থেকে বলে আর ঐ দিন সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতীদের শামিল হবে। তেমনি যে তা রাতের বেলায় মন থেকে বলে আর ভোর হওয়ার আগেই মারা যায় সে জান্নাতীদের শামিল হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬, ৬৩২৩
সূত্র-আলোচনা
এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস ইবনে ছাবিত রা. একজন আনসারী খাযরাজী সাহাবী। বিখ্যাত শায়ের সাহাবী হযরত হাসসান ইবনে ছাবিত রা.-এর ভাতিজা। তাঁর বাবা আওস ইবনে ছাবিত রা. বদরের যুদ্ধে শামিল ছিলেন। আর অহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উবাদা ইবনে ছামিত রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেছেন-
ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﻣﻦ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺃﻭﺗﻮﺍ ﺍﻟﻌﻠﻢَ ﻭﺍﻟﺤﻠﻢ، ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻣﻦ ﺃﻭﺗﻲ ﺃﺣﺪﻫﻤﺎ .
শাদ্দাদ ইবনে আওস ঐসব ব্যক্তিদের একজন, যাদের
‘ইল্ম’ ও ‘হিল্ম’ (জ্ঞান ও সহনশীলতা) দুটোই দেয়া হয়েছে। অথচ অনেক মানুষ আছে যারা শুধু একটি প্রাপ্ত হয়েছেন।
তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে-
ﻓﻀﻞ ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﺍﻷﻧﺼﺎﺭَ ﺑﺨﺼﻠﺘﻴﻦ : ﺑﺒﻴﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻧﻄﻖ، ﻭﺑﻜﻈﻢ ﺇﺫﺍ ﻏﻀﺐ .
আনসারীদের মাঝে শাদ্দাদ ইবনে আওস শ্রেষ্ঠ দুটি স্বভাব দ্বারা : এক. স্পষ্ট বক্তব্যে আর দুই. ক্রোধ সংবরণে।
ইমাম তবারানী রাহ. স্বীয় সনদে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ﻣﺎ ﻟﻚ ﻳﺎ ﺷﺪﺍﺩ؟ শাদ্দাদ! তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, ﺿﺎﻗﺖ ﺑﻲ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ পৃথিবী আমার জন্য সংকুচিত হয়ে গেছে! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
ﻟﻴﺲ ﻋﻠﻴﻚ، ﺇﻥّ ﺍﻟﺸّﺎﻡ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺑﻴﺖ ﺍﻟﻤﻘﺪﺱ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺗﻜﻮﻥ ﺃﻧﺖ ﻭﻭﻟﺪﻙ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻙ ﺃﺋﻤّﺔ ﻓﻴﻬﻢ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ .
না তোমার কিছু হবে না। শাম বিজিত হবে। বাইতুল মাকদিস বিজিত হবে। আর তুমি ও তোমার পরে তোমার সন্তানেরা সেখানে নেতৃস্থানীয় হবে ইনশাআল্লাহ!
পরে তিনি শামে চলে যান। এক ক্বওল অনুসারে ৫৮ হিজরীতে ৭৫ বছর বয়সে ফিলিস্তীনে ইন্তিকাল করেন।
(আল ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/২৫৮)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, সহীহ বুখারীতে তাঁর সূত্রে এই একটি হাদীসই বর্ণিত হয়েছে। -ফাতহুল বারী ১১/৯৯
এই মহান সাহাবীর সূত্রে এই হাদীস ইমাম বুখারী রাহ. ছাড়াও ইমাম ইবনে আবী শাইবা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ স্ব স্ব সনদে বর্ণনা করেছেন। (দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩০০৫২ ও টীকা শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা)
সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুদ দাআওয়াত’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এই হাদীসটি (৬৩০৬) রয়েছে। পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাবু আফযালিল ইসতিগফার’। আফযালুল ইসতিগফার মানে শ্রেষ্ঠ ইসতিগফার। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (৮৫২হি.) বলেছেন-
ﻭَﺗَﺮْﺟَﻢَ ﺑِﺎﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔِ ﻭَﻭَﻗَﻊَ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳﺚُ ﺑِﻠَﻔْﻆِ ﺍﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﻭَﻛَﺄَﻧَّﻪُ ﺃَﺷَﺎﺭَ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤُﺮَﺍﺩَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﺍﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔُ ﻭَﻣَﻌْﻨَﺎﻫَﺎ ﺍﻟْﺄَﻛْﺜَﺮُ ﻧَﻔْﻌًﺎ ﻟِﻤُﺴْﺘَﻌْﻤِﻠِﻪِ .
অর্থাৎ ইমাম বুখারী রাহ. ‘আফযাল’ শব্দের দ্বারা শিরোনাম গঠন করেছেন। তিনি সম্ভবত এর দ্বারা হাদীসের ‘সাইয়িদ’ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ সাইয়িদুল ইসতিগফার অর্থ আফযালুল ইস্তিগফার বা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার। আর এর শ্রেষ্ঠত্বের তাৎপর্য হচ্ছে, পাঠকারীর পক্ষে সর্বাধিক উপকারী হওয়া। -
ফতহুল বারী ১১/১০১
কাজেই আমরা যদি ইসতিগফারের উপরোক্ত ‘মাছূর’
পাঠটি মুখস্থ করে ফেলি এবং ভাব ও মর্ম উপলদ্ধি করে সকাল-সন্ধ্যায় মন থেকে তা পাঠ করি তাহলে অনেক খায়ের ও বরকতের ব্যাপার হবে।
ভাব ও মর্ম আলোচনা
কুরআন-সুন্নাহর শেখানো যিকির ও দুআর কালেমাগুলোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো ঈমান ও ঈমানিয়াতে পরিপূর্ণ। কাজেই ঈমান শেখার ও ঈমানকে সতেজ ও সজীব করার এক বড় উপায়,
অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে তা নিয়মিত আমলে রাখা। উপরের ইসতিগফারের বাক্যমালায় আছে ঈমানিয়াতের অনেক বিষয়। আর তা থাকাই তো স্বাভাবিক। যখন হাদীস শরীফের বর্ণনা অনুসারে স্বয়ং সাইয়িদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে
‘সাইয়িদুল ইসতিগফার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর ফযীলত বর্ণনা করে বলেছেন, যে বান্দা দিবসে তা মন থেকে পড়ে সন্ধ্যার আগে তার মৃত্যু ঘটলে সে জান্নাতী হবে। আর যে তা রাতে মন থেকে পড়ে ভোরের আগে মৃত্যু হলে সে-ও জান্নাতী হবে।
নিশ্চয়ই এতে আছে ঐ সকল কথা, যা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং যার দ্বারা আল্লাহর বান্দা হয়ে যায় আল্লাহর প্রিয়পাত্র। চলুন তবে এই সত্য-সুন্দর বাণীর ভাব ও মর্মের ভুবনে।
***
১. ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ
ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। নেই কোনো ইলাহ আপনি ছাড়া।
‘রব’ মানে প্রভু ও পরওয়ারদেগার আর ‘ইলাহ’ মানে উপাস্য ও মাবুদ। আল্লাহর বান্দা প্রথমেই স্মরণ করছে এবং স্বীকার করছে যে, আল্লাহই তার রব, তার প্রভু ও পরওয়ারদেগার এবং একমাত্র ইলাহ ও মাবুদ।
২. ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ
আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আপনার বান্দা।
আল্লাহই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে প্রতিপালন করছেন। মানুষের জীবন ও জীবনোপকরণ, তার মেধা ও শক্তি তাঁর দান। সৃজন ও প্রতিপালনে আল্লাহর কোনো শরীক নেই। কাজেই নিরঙ্কুশ ইবাদত ও চূড়ান্ত আনুগত্য একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
কুরআন মাজীদের ইরশাদ-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻜُﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽَ ﻓِﺮَﺍﺷًﺎ ﻭَّ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀَ ﺑِﻨَﺎٓﺀً ﻭَّ ﺍَﻧْﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀِ ﻣَﺎٓﺀً ﻓَﺎَﺧْﺮَﺝَ ﺑِﻪٖ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮٰﺕِ ﺭِﺯْﻗًﺎ ﻟَّﻜُﻢْ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺠْﻌَﻠُﻮْﺍ ﻟِﻠﻪِ ﺍَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻭَّ ﺍَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ .
হে মানুষ! যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর। যাতে আত্মরক্ষা করতে পার।
যিনি তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিছানা এবং আকাশকে ছাদ। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য উৎপন্ন করেছেন ফলমূল । কাজেই জেনেশুনে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না। -সূরা বাকারা (২) : ২১-২২
মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বান্দা আর আল্লাহই তার রব ও ইলাহ। ইস্তিগফারের এই বাক্যগুলোতে আছে বান্দার সাথে আল্লাহর এই সম্পর্কেরই স্মরণ ও স্বীকারোক্তি।
৩. ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ
আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
এটি উপরোক্ত সম্পর্কেরই দাবি।
আরবী ভাষায় ﻋﻬﺪ শব্দের এক অর্থ আদেশ-নিষেধ,
বিধি-বিধান। আরবী ভাষার ব্যবহারে ﻋﻬﺪ ﺇﻟﻴﻪ অর্থ তাকে আদেশ করল, নিষেধ করল। এই ব্যবহার অনুসারেই উপরোক্ত বাক্যের তরজমা করা হয়েছে।
এ শব্দের আরেক অর্থ অঙ্গিকার, চুক্তি ইত্যাদি। সেই ব্যবহার অনুসারে তরজমা হবে, ‘আমি আপনার সাথে কৃত অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলব।’
আল্লাহর যে বিধান ও ফরমান পালনে বান্দা আল্লাহর সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ এবং যার বিনিময়ে বান্দার জন্য রয়েছে মহান রবের মহা প্রতিশ্রুতি, তা হচ্ছে ঈমান ও ইতাআত তথা বিশ্বাস ও আনুগত্যের ফরমান।
বান্দা একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করবে এবং আল্লাহর আদেশকেই চূড়ান্তরূপে শিরোধার্য করবে। তাঁর আদেশের উপর আর কারো আদেশকে প্রাধান্য দিবে না।
কারণ, নিরঙ্কুশ উপাসনা ও চূড়ান্ত আনুগত্যের একমাত্র হকদার আল্লাহ তাআলা।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুদ্ধি-বিবেক দান করেছেন এবং প্রকৃতিতে তাঁর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের অসংখ্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন। এই বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা মানুষের কর্তব্য।
এরপর যুগে যুগে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর বিধান ও ফরমান সুস্পষ্টভাবে মানব জাতিকে দান করেছেন।
তো আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় দিক থেকে তাঁর ‘রুবূবিয়্যাত’ ও ‘উলুহিয়্যাত’ মানবজাতির সামনে সাব্যস্ত হয়েছে। কাজেই আল্লাহর ফরমান স্পষ্ট এবং মানুষের সর্বসত্তা আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ মেনে নেয়ার বিষয়ে অঙ্গিকারাবদ্ধ।
এরপর আল্লাহ যাকে ঈমানের তাওফীক দান করেছেন ঈমানের শাহাদতের মাধ্যমে সে আল্লাহর ফরমানকে শিরোধার্য করেছে এবং আল্লাহর সাথে তার অঙ্গিকারকে আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। এই দুআয় আছে সেই অঙ্গিকারেরই স্মরণ ও নবায়ন।
ঈমানী শাহাদাতের মাধ্যমে মুমিন ঐ সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করেছে, যা অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষ- সে ঈমান আনুক বা না আনুক, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, সে আল্লাহরই সৃষ্টি; আল্লাহর দানেই সে ধনী। দিনরাত সে ভোগ করে চলেছে আল্লাহর নিআমত। যে মুখে স্বীকার করছে না তারও সর্বসত্তা সর্বদা এই সাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, আল্লাহ তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। আর সে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালিত।
মুমিনের সৌভাগ্য যে, ঈমানের শাহাদাতের মাধ্যমে সে এই সত্য স্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহ ও অস্বীকারের হীনতা ও মহাশাস্তি থেকে মুক্তির উপায় গ্রহণ করেছে। এটাই তো পরিচয় শুভবুদ্ধির ।
কুরআনে কারীম ‘উলুল আলবাব’ ও শুভবুদ্ধির অধিকারী মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলছে-
ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾُﻮْﻓُﻮْﻥَ ﺑِﻌَﻬْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَ ﻟَﺎ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻤِﯿْﺜَﺎﻕَ
যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২০
এদেরই জন্য মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি-
ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ﺟَﻨّٰﺖُ ﻋَﺪْﻥٍ ﯾَّﺪْﺧُﻠُﻮْﻧَﻬَﺎ ﻭَ ﻣَﻦْ ﺻَﻠَﺢَ ﻣِﻦْ ﺍٰﺑَﺎٓﻯِٕﻬِﻢْ ﻭَ ﺍَﺯْﻭَﺍﺟِﻬِﻢْ ﻭَ ﺫُﺭِّﯾّٰﺘِﻬِﻢْ ﻭَ ﺍﻟْﻤَﻠٰٓﻯِٕﻜَﺔُ ﯾَﺪْﺧُﻠُﻮْﻥَ ﻋَﻠَﯿْﻬِﻢْ ﻣِّﻦْ ﻛُﻞِّ ﺑَﺎﺏٍ ﺳَﻠٰﻢٌ ﻋَﻠَﯿْﻜُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮْﺗُﻢْ ﻓَﻨِﻌْﻢَ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
এদেরই জন্য শুভ পরিণাম- স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ প্রত্যেক দরজা দিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হবে এবং বলবে, তোমাদের প্রতি শান্তি, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে। কত ভালো এই পরিমাণ। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২২-২৪
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছে তাদের সম্পর্কে ঘোষণা-
ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﻋَﻬْﺪَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻣِﯿْﺜَﺎﻗِﻪٖ ﻭَ ﯾَﻘْﻄَﻌُﻮْﻥَ ﻣَﺎۤ ﺍَﻣَﺮَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑِﻪٖۤ ﺍَﻥْ ﯾُّﻮْﺻَﻞَ ﻭَ ﯾُﻔْﺴِﺪُﻭْﻥَ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽِ ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻟﻠَّﻌْﻨَﺔُ ﻭَ ﻟَﻬُﻢْ ﺳُﻮْٓﺀُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে; যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে তাদের জন্য আছে লা‘নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৫
বস্তুত আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার স্বীকার করা এবং তাঁর ফরমান শিরোধার্য করাই শুভ বুদ্ধির পরিচয় এবং এটিই পথ বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের।
ﻣﺎ ﺍﺳﺘﻄﻌﺖ ‘যথাসাধ্য’ কথাটির উদ্দেশ্য, আপন দুর্বলতা স্বীকার করা। একে তো আল্লাহর শান মোতাবেক হক আদায় বান্দার সাধ্যেরই অতীত। আর এ কারণে আল্লাহ আপন করুণায় বান্দার উপর তার সাধ্য অনুযায়ী ভার দিয়েছেন, কিন্তু সেই বিধান পালনেও হয়ে যায় বান্দার নিজের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাজনিত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। কাজেই করুণাময় প্রভুর সাথে আনুগত্যের চুক্তি নবায়নের সাথে সাথে আপন দুর্বলতা নিবেদনও এই বাক্যের উদ্দেশ্য।
৪. ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ
‘আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে।’
আপন কৃতকর্মের অনিষ্ট ও অশুভ পরিণামই তো ভয়ের বড় কারণ। দুনিয়া ও আখিরাতে যে যে কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তন্মধ্যে নিজের কর্মভুলই তো সবচেয়ে বড় কারণ। আখিরাতের শাস্তি ও আযাবের পুরোটাই মানুষের নিজের কর্মের ফল। দুনিয়ার অশান্তি ও অস্থিরতার মূলেও তার নিজের কর্ম। তাহলে সবার আগে তো নজর ফেরানো উচিত নিজের দিকেই। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ অনিষ্টের কারণ অন্যত্র খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যকে দোষারোপ করে। না, কষ্ট ও অনিষ্টের কারণ আমার নিজেরই কর্ম। উপরের বাক্যে আছে এই সত্যের শিক্ষা ও উপলদ্ধি, আছে একমাত্র আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা।
শাক্ল ইবনে হুমাইদ রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম এবং আরজ করলাম, আমাকে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দুআ শিখিয়ে দিন। তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং বললেন, তুমি (এই কথাগুলো) বলবে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺳَﻤْﻌِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺑَﺼَﺮِﻱ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻟِﺴَﺎﻧِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻗَﻠْﺒِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﻨِﻴِّﻲ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার কানের অনিষ্ট থেকে, আমার চোখের অনিষ্ট থেকে,
আমার জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, আমার অন্তকরণের অনিষ্ট থেকে এবং আমার বীর্যের (লজ্জাস্থানের) অনিষ্ট থেকে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটি দুআ শিক্ষা দিন, যা আমি সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর! তুমি বলবে-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﻓَﺎﻃِﺮَ ﺍﻟﺴَّﻤَﻮَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ ﻋَﺎﻟِﻢَ ﺍﻟﻐَﻴْﺐِ ﻭَﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓِ، ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ، ﺭَﺏَّ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻣَﻠِﻴﻜَﻪ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻧَﻔْﺴِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻭَﺷِﺮْﻛِﻪ، ﻭَﺃَﻥْ ﺃَﻗْﺘَﺮِﻑَ ﻋَﻠَﻰ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﺳُﻮﺀًﺍ ﺃَﻭْ ﺃَﺟُﺮَّﻩُ ﺇِﻟﻰ ﻣُﺴْﻠِﻢٍ .
ইয়া আল্লাহ! আকাশম-লী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! সকল বস্তুর প্রভু ও অধিপতি! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার নিজের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় নিচ্ছি নিজের উপর বা কোনো মুসলিমের উপর কোনো প্রকার অনিষ্ট টেনে আনা থেকে। -জামে তিরমিযী,
হাদীস ৩৫২৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৬৭
হযরত ফারওয়া ইবনে নাওফিল আল আশজায়ী রা. বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দুআ করতেন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি বলতেন-
ﺍﻟﻠﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻋَﻤِﻠْﺖُ، ﻭَﻣَﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺃَﻋْﻤَﻞْ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি যা আমি করেছি তার অনিষ্ট থেকে এবং যা করিনি তারও অনিষ্ট থেকে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১৬
৫. ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ
‘স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ।’
হায়! একদিকে আল্লাহর প্রভূত দান, অন্যদিকে বান্দার নাফরমানী! এটাই তো সত্য ও বাস্তবতা। তবে এই সত্যের উপলদ্ধিও তাদের মনেই জাগে,
যাদের আল্লাহ ক্ষমা করতে চান। দেখুন, এক বেদুঈন কা‘বার গিলাফ ধরে কীভাবে কাকুতি মিনতি করছে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇﻥ ﺍﺳﺘﻐﻔﺎﺭﻱ ﻣﻊ ﺇﺻﺮﺍﺭﻱ ﻟﺆﻡٌ، ﻭﺇﻥَّ ﺗﺮﻛﻲ ﺍﻻﺳﺘﻐﻔﺎﺭَ ﻣﻊ ﻋﻠﻤﻲ ﺑﺴﻌﺔِ ﻋﻔﻮﻙَ ﻟﻌﺠﺰٌ، ﻓﻜﻢ ﺗَﺘَﺤَﺒَّﺐُ ﺇﻟﻲَّ ﺑﺎﻟﻨﻌﻢ ﻣﻊ ﻏِﻨﺎﻙَ ﻋﻨﻲ، ﻭﻛﻢ ﺃﺗﺒﻐَّﺾُ ﺇﻟﻴﻚ ﺑﺎﻟﻤﻌﺎﺻﻲ ﻣﻊ ﻓﻘﺮﻱ ﺇﻟﻴﻚ، ﻳﺎ ﻣَﻦ ﺇﺫﺍ ﻭﻋﺪَ ﻭﻓَّﻰ، ﻭﺇﺫﺍ ﺗﻮﻋَّﺪَ ﺗﺠﺎﻭﺯ ﻭﻋﻔﺎ، ﺃﺩﺧﻞْ ﻋﻈﻴﻢَ ﺟُﺮﻣﻲ ﻓﻲ ﻋﻈﻴﻢِ ﻋﻔﻮﻙَ، ﻳﺎ ﺃﺭﺣﻢ ﺍﻟﺮﺍﺣﻤﻴﻦ .
ইয়া আল্লাহ! পাপ-মগ্নতার সাথে আমার ক্ষমা চাওয়া তো হীনতা, কিন্তু, তোমার প্রশস্ত ক্ষমার সংবাদ জেনেও ক্ষমা না চাওয়া তো নির্বুদ্ধিতা। তুমি তোমার দয়া ও করুণার দ্বারা কতই না আমার প্রীতি অন্বেষণ করছ। অথচ আমার কাছে তোমার কোনোই প্রয়োজন নেই। আর আমি পাপ ও নাফরমানীর মাধ্যমে কতই না তোমার ক্রোধ আকর্ষণ করে চলেছি। অথচ তোমার কাছেই আমার সকল প্রয়োজন!
হে সকল দয়ালুর বড় দয়ালু! যিনি প্রতিশ্রুতি দিলে পূরণ করেন, আর শাস্তির ধমক দিলেও ক্ষমা করেন ও উপেক্ষা করেন আমার মহা পাপকে ডুবিয়ে দাও তোমার করুণার মহা সিন্ধুতে! (কিতাবুল আজকার,
ইমাম নববী, বর্ণনা ১২৩০-এর অধীনে)
সুবহানাল্লাহ! বাস্তবতার এই উপলদ্ধি আর নিবেদনের এই ভাষা আল্লাহ যাকে দান করেন তাকে তো ক্ষমা করার জন্যই দান করেন। কবি সত্য বলেছেন-
ﻟﻮ ﻟﻢ ﺗﺮﺩ ﻧﻴﻞ ﻣﺎ ﺃﺭﺟﻮ ﻭﺃﻃﻠﺒﻪ + ﻣﻦ ﺟﻮﺩ ﻛﻔﻴﻚ ﻣﺎ ﻋﻠﻤﺘﻨﻲ ﺍﻟﻄﻠﺒﺎ
তুমি যদি না চাইতে দু’হাতের দানে আমার আচলখানি ভরে দিতে; তাহলে তো প্রভু! এই প্রার্থনাই শেখাতে না আমাকে।
৬. ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ
‘কাজেই’...। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, বোঝা যাচ্ছে, যে আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকার করে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। ইফকের দীর্ঘ হাদীসে তা স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
ﺍﻟﻌَﺒْﺪُ ﺇِﺫَﺍ ﺍﻋْﺘَﺮَﻑَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻪِ، ﺛُﻢَّ ﺗَﺎﺏَ ﺗَﺎﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ .
বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে ও তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৬১;
ফাতহুল বারী ১১/১০৩
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺎﺏَ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻇُﻠْﻤِﻪٖ ﻭَ ﺍَﺻْﻠَﺢَ ﻓَﺎِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﯾَﺘُﻮْﺏُ ﻋَﻠَﯿْﻪِ ؕ ﺍِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻏَﻔُﻮْﺭٌ ﺭَّﺣِﯿْﻢٌ .
কিন্তু সীমালংঘন করার পর কেউ তওবা করলে ও সংশোধন করলে অবশ্যই আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন; আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা মাইদা (৫) : ৩৯
৭. ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ মাফ করে।’
গুনাহ মাফকারী তো একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বান্দার গুনাহ মাফ করতে পারে না।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻣَﻦْ ﯾَّﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮْﺏَ ﺍِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠﻪُ
আল্লাহ ছাড়া কে আছে পাপ ক্ষমা করে? -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
আরো ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﯾَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﺘَّﻮْﺑَﺔَ ﻋَﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻩٖ ﻭَ ﯾَﻌْﻔُﻮْﺍ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﯿِّﺎٰﺕِ ﻭَ ﯾَﻌْﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ .
তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। -
সূরাতুশ শূরা (৪২) : ২৫
হাদীসের এই দুআয় সহজ সরল ভাষায় যে গভীর সত্য ও অনুপম ভাবের প্রকাশ ঘটেছে তা থেকেও বোঝা যায়- কেন এই দুআ সাইয়িদুল ইসতিগফার বিশেষণে ভূষিত।
এতে যেমন আছে আল্লাহর একমাত্র মাবুদ হওয়ার সাক্ষ্য তেমনি আছে বান্দার বান্দা হওয়ার স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে খালিককে খালিক বলে স্বীকার করা তেমনি আছে তাঁর সকল বিধান ও ফরমানকে শিরোধার্য করা।
এতে যেমন আছে প্রকৃত দাতার দান স্বীকার, তেমনি আছে আপন কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে গুনাহ দ্বারা নিজের ক্ষতির উপলদ্ধি, তেমনি আছে এই মহা সত্যের সাক্ষ্য যে,
একমাত্র আল্লাহই বান্দার গুনাহ মাফকারী।
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ﺳَﻴِّﺪُ ﺍﻟِﺎﺳْﺘِﻐْﻔَﺎﺭِ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻝَ : ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ . ﻗَﺎﻝَ : ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭِ ﻣُﻮﻗِﻨًﺎ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻣِﻦْ ﻳَﻮْﻣِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﻤْﺴِﻲَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ، ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﻮﻗِﻦٌ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼْﺒِﺢَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ .
সাইয়িদুল ইসতিগফার হচ্ছে এইরূপ বলা-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন,
আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে। স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ। কাজেই আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারে।’
তিনি বলেন, যে এই কথাগুলো দিনের বেলা মন থেকে বলে আর ঐ দিন সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতীদের শামিল হবে। তেমনি যে তা রাতের বেলায় মন থেকে বলে আর ভোর হওয়ার আগেই মারা যায় সে জান্নাতীদের শামিল হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬, ৬৩২৩
সূত্র-আলোচনা
এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস ইবনে ছাবিত রা. একজন আনসারী খাযরাজী সাহাবী। বিখ্যাত শায়ের সাহাবী হযরত হাসসান ইবনে ছাবিত রা.-এর ভাতিজা। তাঁর বাবা আওস ইবনে ছাবিত রা. বদরের যুদ্ধে শামিল ছিলেন। আর অহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উবাদা ইবনে ছামিত রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেছেন-
ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﻣﻦ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺃﻭﺗﻮﺍ ﺍﻟﻌﻠﻢَ ﻭﺍﻟﺤﻠﻢ، ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻣﻦ ﺃﻭﺗﻲ ﺃﺣﺪﻫﻤﺎ .
শাদ্দাদ ইবনে আওস ঐসব ব্যক্তিদের একজন, যাদের
‘ইল্ম’ ও ‘হিল্ম’ (জ্ঞান ও সহনশীলতা) দুটোই দেয়া হয়েছে। অথচ অনেক মানুষ আছে যারা শুধু একটি প্রাপ্ত হয়েছেন।
তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে-
ﻓﻀﻞ ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﺍﻷﻧﺼﺎﺭَ ﺑﺨﺼﻠﺘﻴﻦ : ﺑﺒﻴﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻧﻄﻖ، ﻭﺑﻜﻈﻢ ﺇﺫﺍ ﻏﻀﺐ .
আনসারীদের মাঝে শাদ্দাদ ইবনে আওস শ্রেষ্ঠ দুটি স্বভাব দ্বারা : এক. স্পষ্ট বক্তব্যে আর দুই. ক্রোধ সংবরণে।
ইমাম তবারানী রাহ. স্বীয় সনদে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ﻣﺎ ﻟﻚ ﻳﺎ ﺷﺪﺍﺩ؟ শাদ্দাদ! তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, ﺿﺎﻗﺖ ﺑﻲ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ পৃথিবী আমার জন্য সংকুচিত হয়ে গেছে! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
ﻟﻴﺲ ﻋﻠﻴﻚ، ﺇﻥّ ﺍﻟﺸّﺎﻡ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺑﻴﺖ ﺍﻟﻤﻘﺪﺱ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺗﻜﻮﻥ ﺃﻧﺖ ﻭﻭﻟﺪﻙ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻙ ﺃﺋﻤّﺔ ﻓﻴﻬﻢ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ .
না তোমার কিছু হবে না। শাম বিজিত হবে। বাইতুল মাকদিস বিজিত হবে। আর তুমি ও তোমার পরে তোমার সন্তানেরা সেখানে নেতৃস্থানীয় হবে ইনশাআল্লাহ!
পরে তিনি শামে চলে যান। এক ক্বওল অনুসারে ৫৮ হিজরীতে ৭৫ বছর বয়সে ফিলিস্তীনে ইন্তিকাল করেন।
(আল ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/২৫৮)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, সহীহ বুখারীতে তাঁর সূত্রে এই একটি হাদীসই বর্ণিত হয়েছে। -ফাতহুল বারী ১১/৯৯
এই মহান সাহাবীর সূত্রে এই হাদীস ইমাম বুখারী রাহ. ছাড়াও ইমাম ইবনে আবী শাইবা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ স্ব স্ব সনদে বর্ণনা করেছেন। (দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩০০৫২ ও টীকা শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা)
সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুদ দাআওয়াত’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এই হাদীসটি (৬৩০৬) রয়েছে। পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাবু আফযালিল ইসতিগফার’। আফযালুল ইসতিগফার মানে শ্রেষ্ঠ ইসতিগফার। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (৮৫২হি.) বলেছেন-
ﻭَﺗَﺮْﺟَﻢَ ﺑِﺎﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔِ ﻭَﻭَﻗَﻊَ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳﺚُ ﺑِﻠَﻔْﻆِ ﺍﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﻭَﻛَﺄَﻧَّﻪُ ﺃَﺷَﺎﺭَ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤُﺮَﺍﺩَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﺍﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔُ ﻭَﻣَﻌْﻨَﺎﻫَﺎ ﺍﻟْﺄَﻛْﺜَﺮُ ﻧَﻔْﻌًﺎ ﻟِﻤُﺴْﺘَﻌْﻤِﻠِﻪِ .
অর্থাৎ ইমাম বুখারী রাহ. ‘আফযাল’ শব্দের দ্বারা শিরোনাম গঠন করেছেন। তিনি সম্ভবত এর দ্বারা হাদীসের ‘সাইয়িদ’ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ সাইয়িদুল ইসতিগফার অর্থ আফযালুল ইস্তিগফার বা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার। আর এর শ্রেষ্ঠত্বের তাৎপর্য হচ্ছে, পাঠকারীর পক্ষে সর্বাধিক উপকারী হওয়া। -
ফতহুল বারী ১১/১০১
কাজেই আমরা যদি ইসতিগফারের উপরোক্ত ‘মাছূর’
পাঠটি মুখস্থ করে ফেলি এবং ভাব ও মর্ম উপলদ্ধি করে সকাল-সন্ধ্যায় মন থেকে তা পাঠ করি তাহলে অনেক খায়ের ও বরকতের ব্যাপার হবে।
ভাব ও মর্ম আলোচনা
কুরআন-সুন্নাহর শেখানো যিকির ও দুআর কালেমাগুলোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো ঈমান ও ঈমানিয়াতে পরিপূর্ণ। কাজেই ঈমান শেখার ও ঈমানকে সতেজ ও সজীব করার এক বড় উপায়,
অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে তা নিয়মিত আমলে রাখা। উপরের ইসতিগফারের বাক্যমালায় আছে ঈমানিয়াতের অনেক বিষয়। আর তা থাকাই তো স্বাভাবিক। যখন হাদীস শরীফের বর্ণনা অনুসারে স্বয়ং সাইয়িদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে
‘সাইয়িদুল ইসতিগফার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর ফযীলত বর্ণনা করে বলেছেন, যে বান্দা দিবসে তা মন থেকে পড়ে সন্ধ্যার আগে তার মৃত্যু ঘটলে সে জান্নাতী হবে। আর যে তা রাতে মন থেকে পড়ে ভোরের আগে মৃত্যু হলে সে-ও জান্নাতী হবে।
নিশ্চয়ই এতে আছে ঐ সকল কথা, যা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং যার দ্বারা আল্লাহর বান্দা হয়ে যায় আল্লাহর প্রিয়পাত্র। চলুন তবে এই সত্য-সুন্দর বাণীর ভাব ও মর্মের ভুবনে।
***
১. ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ
ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। নেই কোনো ইলাহ আপনি ছাড়া।
‘রব’ মানে প্রভু ও পরওয়ারদেগার আর ‘ইলাহ’ মানে উপাস্য ও মাবুদ। আল্লাহর বান্দা প্রথমেই স্মরণ করছে এবং স্বীকার করছে যে, আল্লাহই তার রব, তার প্রভু ও পরওয়ারদেগার এবং একমাত্র ইলাহ ও মাবুদ।
২. ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ
আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আপনার বান্দা।
আল্লাহই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে প্রতিপালন করছেন। মানুষের জীবন ও জীবনোপকরণ, তার মেধা ও শক্তি তাঁর দান। সৃজন ও প্রতিপালনে আল্লাহর কোনো শরীক নেই। কাজেই নিরঙ্কুশ ইবাদত ও চূড়ান্ত আনুগত্য একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
কুরআন মাজীদের ইরশাদ-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻜُﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽَ ﻓِﺮَﺍﺷًﺎ ﻭَّ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀَ ﺑِﻨَﺎٓﺀً ﻭَّ ﺍَﻧْﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀِ ﻣَﺎٓﺀً ﻓَﺎَﺧْﺮَﺝَ ﺑِﻪٖ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮٰﺕِ ﺭِﺯْﻗًﺎ ﻟَّﻜُﻢْ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺠْﻌَﻠُﻮْﺍ ﻟِﻠﻪِ ﺍَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻭَّ ﺍَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ .
হে মানুষ! যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর। যাতে আত্মরক্ষা করতে পার।
যিনি তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিছানা এবং আকাশকে ছাদ। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য উৎপন্ন করেছেন ফলমূল । কাজেই জেনেশুনে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না। -সূরা বাকারা (২) : ২১-২২
মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বান্দা আর আল্লাহই তার রব ও ইলাহ। ইস্তিগফারের এই বাক্যগুলোতে আছে বান্দার সাথে আল্লাহর এই সম্পর্কেরই স্মরণ ও স্বীকারোক্তি।
৩. ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ
আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
এটি উপরোক্ত সম্পর্কেরই দাবি।
আরবী ভাষায় ﻋﻬﺪ শব্দের এক অর্থ আদেশ-নিষেধ,
বিধি-বিধান। আরবী ভাষার ব্যবহারে ﻋﻬﺪ ﺇﻟﻴﻪ অর্থ তাকে আদেশ করল, নিষেধ করল। এই ব্যবহার অনুসারেই উপরোক্ত বাক্যের তরজমা করা হয়েছে।
এ শব্দের আরেক অর্থ অঙ্গিকার, চুক্তি ইত্যাদি। সেই ব্যবহার অনুসারে তরজমা হবে, ‘আমি আপনার সাথে কৃত অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলব।’
আল্লাহর যে বিধান ও ফরমান পালনে বান্দা আল্লাহর সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ এবং যার বিনিময়ে বান্দার জন্য রয়েছে মহান রবের মহা প্রতিশ্রুতি, তা হচ্ছে ঈমান ও ইতাআত তথা বিশ্বাস ও আনুগত্যের ফরমান।
বান্দা একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করবে এবং আল্লাহর আদেশকেই চূড়ান্তরূপে শিরোধার্য করবে। তাঁর আদেশের উপর আর কারো আদেশকে প্রাধান্য দিবে না।
কারণ, নিরঙ্কুশ উপাসনা ও চূড়ান্ত আনুগত্যের একমাত্র হকদার আল্লাহ তাআলা।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুদ্ধি-বিবেক দান করেছেন এবং প্রকৃতিতে তাঁর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের অসংখ্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন। এই বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা মানুষের কর্তব্য।
এরপর যুগে যুগে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর বিধান ও ফরমান সুস্পষ্টভাবে মানব জাতিকে দান করেছেন।
তো আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় দিক থেকে তাঁর ‘রুবূবিয়্যাত’ ও ‘উলুহিয়্যাত’ মানবজাতির সামনে সাব্যস্ত হয়েছে। কাজেই আল্লাহর ফরমান স্পষ্ট এবং মানুষের সর্বসত্তা আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ মেনে নেয়ার বিষয়ে অঙ্গিকারাবদ্ধ।
এরপর আল্লাহ যাকে ঈমানের তাওফীক দান করেছেন ঈমানের শাহাদতের মাধ্যমে সে আল্লাহর ফরমানকে শিরোধার্য করেছে এবং আল্লাহর সাথে তার অঙ্গিকারকে আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। এই দুআয় আছে সেই অঙ্গিকারেরই স্মরণ ও নবায়ন।
ঈমানী শাহাদাতের মাধ্যমে মুমিন ঐ সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করেছে, যা অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষ- সে ঈমান আনুক বা না আনুক, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, সে আল্লাহরই সৃষ্টি; আল্লাহর দানেই সে ধনী। দিনরাত সে ভোগ করে চলেছে আল্লাহর নিআমত। যে মুখে স্বীকার করছে না তারও সর্বসত্তা সর্বদা এই সাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, আল্লাহ তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। আর সে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালিত।
মুমিনের সৌভাগ্য যে, ঈমানের শাহাদাতের মাধ্যমে সে এই সত্য স্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহ ও অস্বীকারের হীনতা ও মহাশাস্তি থেকে মুক্তির উপায় গ্রহণ করেছে। এটাই তো পরিচয় শুভবুদ্ধির ।
কুরআনে কারীম ‘উলুল আলবাব’ ও শুভবুদ্ধির অধিকারী মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলছে-
ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾُﻮْﻓُﻮْﻥَ ﺑِﻌَﻬْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَ ﻟَﺎ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻤِﯿْﺜَﺎﻕَ
যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২০
এদেরই জন্য মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি-
ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ﺟَﻨّٰﺖُ ﻋَﺪْﻥٍ ﯾَّﺪْﺧُﻠُﻮْﻧَﻬَﺎ ﻭَ ﻣَﻦْ ﺻَﻠَﺢَ ﻣِﻦْ ﺍٰﺑَﺎٓﻯِٕﻬِﻢْ ﻭَ ﺍَﺯْﻭَﺍﺟِﻬِﻢْ ﻭَ ﺫُﺭِّﯾّٰﺘِﻬِﻢْ ﻭَ ﺍﻟْﻤَﻠٰٓﻯِٕﻜَﺔُ ﯾَﺪْﺧُﻠُﻮْﻥَ ﻋَﻠَﯿْﻬِﻢْ ﻣِّﻦْ ﻛُﻞِّ ﺑَﺎﺏٍ ﺳَﻠٰﻢٌ ﻋَﻠَﯿْﻜُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮْﺗُﻢْ ﻓَﻨِﻌْﻢَ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
এদেরই জন্য শুভ পরিণাম- স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ প্রত্যেক দরজা দিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হবে এবং বলবে, তোমাদের প্রতি শান্তি, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে। কত ভালো এই পরিমাণ। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২২-২৪
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছে তাদের সম্পর্কে ঘোষণা-
ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﻋَﻬْﺪَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻣِﯿْﺜَﺎﻗِﻪٖ ﻭَ ﯾَﻘْﻄَﻌُﻮْﻥَ ﻣَﺎۤ ﺍَﻣَﺮَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑِﻪٖۤ ﺍَﻥْ ﯾُّﻮْﺻَﻞَ ﻭَ ﯾُﻔْﺴِﺪُﻭْﻥَ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽِ ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻟﻠَّﻌْﻨَﺔُ ﻭَ ﻟَﻬُﻢْ ﺳُﻮْٓﺀُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে; যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে তাদের জন্য আছে লা‘নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৫
বস্তুত আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার স্বীকার করা এবং তাঁর ফরমান শিরোধার্য করাই শুভ বুদ্ধির পরিচয় এবং এটিই পথ বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের।
ﻣﺎ ﺍﺳﺘﻄﻌﺖ ‘যথাসাধ্য’ কথাটির উদ্দেশ্য, আপন দুর্বলতা স্বীকার করা। একে তো আল্লাহর শান মোতাবেক হক আদায় বান্দার সাধ্যেরই অতীত। আর এ কারণে আল্লাহ আপন করুণায় বান্দার উপর তার সাধ্য অনুযায়ী ভার দিয়েছেন, কিন্তু সেই বিধান পালনেও হয়ে যায় বান্দার নিজের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাজনিত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। কাজেই করুণাময় প্রভুর সাথে আনুগত্যের চুক্তি নবায়নের সাথে সাথে আপন দুর্বলতা নিবেদনও এই বাক্যের উদ্দেশ্য।
৪. ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ
‘আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে।’
আপন কৃতকর্মের অনিষ্ট ও অশুভ পরিণামই তো ভয়ের বড় কারণ। দুনিয়া ও আখিরাতে যে যে কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তন্মধ্যে নিজের কর্মভুলই তো সবচেয়ে বড় কারণ। আখিরাতের শাস্তি ও আযাবের পুরোটাই মানুষের নিজের কর্মের ফল। দুনিয়ার অশান্তি ও অস্থিরতার মূলেও তার নিজের কর্ম। তাহলে সবার আগে তো নজর ফেরানো উচিত নিজের দিকেই। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ অনিষ্টের কারণ অন্যত্র খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যকে দোষারোপ করে। না, কষ্ট ও অনিষ্টের কারণ আমার নিজেরই কর্ম। উপরের বাক্যে আছে এই সত্যের শিক্ষা ও উপলদ্ধি, আছে একমাত্র আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা।
শাক্ল ইবনে হুমাইদ রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম এবং আরজ করলাম, আমাকে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দুআ শিখিয়ে দিন। তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং বললেন, তুমি (এই কথাগুলো) বলবে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺳَﻤْﻌِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺑَﺼَﺮِﻱ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻟِﺴَﺎﻧِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻗَﻠْﺒِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﻨِﻴِّﻲ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার কানের অনিষ্ট থেকে, আমার চোখের অনিষ্ট থেকে,
আমার জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, আমার অন্তকরণের অনিষ্ট থেকে এবং আমার বীর্যের (লজ্জাস্থানের) অনিষ্ট থেকে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটি দুআ শিক্ষা দিন, যা আমি সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর! তুমি বলবে-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﻓَﺎﻃِﺮَ ﺍﻟﺴَّﻤَﻮَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ ﻋَﺎﻟِﻢَ ﺍﻟﻐَﻴْﺐِ ﻭَﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓِ، ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ، ﺭَﺏَّ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻣَﻠِﻴﻜَﻪ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻧَﻔْﺴِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻭَﺷِﺮْﻛِﻪ، ﻭَﺃَﻥْ ﺃَﻗْﺘَﺮِﻑَ ﻋَﻠَﻰ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﺳُﻮﺀًﺍ ﺃَﻭْ ﺃَﺟُﺮَّﻩُ ﺇِﻟﻰ ﻣُﺴْﻠِﻢٍ .
ইয়া আল্লাহ! আকাশম-লী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! সকল বস্তুর প্রভু ও অধিপতি! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার নিজের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় নিচ্ছি নিজের উপর বা কোনো মুসলিমের উপর কোনো প্রকার অনিষ্ট টেনে আনা থেকে। -জামে তিরমিযী,
হাদীস ৩৫২৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৬৭
হযরত ফারওয়া ইবনে নাওফিল আল আশজায়ী রা. বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দুআ করতেন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি বলতেন-
ﺍﻟﻠﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻋَﻤِﻠْﺖُ، ﻭَﻣَﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺃَﻋْﻤَﻞْ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি যা আমি করেছি তার অনিষ্ট থেকে এবং যা করিনি তারও অনিষ্ট থেকে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১৬
৫. ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ
‘স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ।’
হায়! একদিকে আল্লাহর প্রভূত দান, অন্যদিকে বান্দার নাফরমানী! এটাই তো সত্য ও বাস্তবতা। তবে এই সত্যের উপলদ্ধিও তাদের মনেই জাগে,
যাদের আল্লাহ ক্ষমা করতে চান। দেখুন, এক বেদুঈন কা‘বার গিলাফ ধরে কীভাবে কাকুতি মিনতি করছে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇﻥ ﺍﺳﺘﻐﻔﺎﺭﻱ ﻣﻊ ﺇﺻﺮﺍﺭﻱ ﻟﺆﻡٌ، ﻭﺇﻥَّ ﺗﺮﻛﻲ ﺍﻻﺳﺘﻐﻔﺎﺭَ ﻣﻊ ﻋﻠﻤﻲ ﺑﺴﻌﺔِ ﻋﻔﻮﻙَ ﻟﻌﺠﺰٌ، ﻓﻜﻢ ﺗَﺘَﺤَﺒَّﺐُ ﺇﻟﻲَّ ﺑﺎﻟﻨﻌﻢ ﻣﻊ ﻏِﻨﺎﻙَ ﻋﻨﻲ، ﻭﻛﻢ ﺃﺗﺒﻐَّﺾُ ﺇﻟﻴﻚ ﺑﺎﻟﻤﻌﺎﺻﻲ ﻣﻊ ﻓﻘﺮﻱ ﺇﻟﻴﻚ، ﻳﺎ ﻣَﻦ ﺇﺫﺍ ﻭﻋﺪَ ﻭﻓَّﻰ، ﻭﺇﺫﺍ ﺗﻮﻋَّﺪَ ﺗﺠﺎﻭﺯ ﻭﻋﻔﺎ، ﺃﺩﺧﻞْ ﻋﻈﻴﻢَ ﺟُﺮﻣﻲ ﻓﻲ ﻋﻈﻴﻢِ ﻋﻔﻮﻙَ، ﻳﺎ ﺃﺭﺣﻢ ﺍﻟﺮﺍﺣﻤﻴﻦ .
ইয়া আল্লাহ! পাপ-মগ্নতার সাথে আমার ক্ষমা চাওয়া তো হীনতা, কিন্তু, তোমার প্রশস্ত ক্ষমার সংবাদ জেনেও ক্ষমা না চাওয়া তো নির্বুদ্ধিতা। তুমি তোমার দয়া ও করুণার দ্বারা কতই না আমার প্রীতি অন্বেষণ করছ। অথচ আমার কাছে তোমার কোনোই প্রয়োজন নেই। আর আমি পাপ ও নাফরমানীর মাধ্যমে কতই না তোমার ক্রোধ আকর্ষণ করে চলেছি। অথচ তোমার কাছেই আমার সকল প্রয়োজন!
হে সকল দয়ালুর বড় দয়ালু! যিনি প্রতিশ্রুতি দিলে পূরণ করেন, আর শাস্তির ধমক দিলেও ক্ষমা করেন ও উপেক্ষা করেন আমার মহা পাপকে ডুবিয়ে দাও তোমার করুণার মহা সিন্ধুতে! (কিতাবুল আজকার,
ইমাম নববী, বর্ণনা ১২৩০-এর অধীনে)
সুবহানাল্লাহ! বাস্তবতার এই উপলদ্ধি আর নিবেদনের এই ভাষা আল্লাহ যাকে দান করেন তাকে তো ক্ষমা করার জন্যই দান করেন। কবি সত্য বলেছেন-
ﻟﻮ ﻟﻢ ﺗﺮﺩ ﻧﻴﻞ ﻣﺎ ﺃﺭﺟﻮ ﻭﺃﻃﻠﺒﻪ + ﻣﻦ ﺟﻮﺩ ﻛﻔﻴﻚ ﻣﺎ ﻋﻠﻤﺘﻨﻲ ﺍﻟﻄﻠﺒﺎ
তুমি যদি না চাইতে দু’হাতের দানে আমার আচলখানি ভরে দিতে; তাহলে তো প্রভু! এই প্রার্থনাই শেখাতে না আমাকে।
৬. ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ
‘কাজেই’...। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, বোঝা যাচ্ছে, যে আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকার করে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। ইফকের দীর্ঘ হাদীসে তা স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
ﺍﻟﻌَﺒْﺪُ ﺇِﺫَﺍ ﺍﻋْﺘَﺮَﻑَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻪِ، ﺛُﻢَّ ﺗَﺎﺏَ ﺗَﺎﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ .
বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে ও তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৬১;
ফাতহুল বারী ১১/১০৩
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺎﺏَ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻇُﻠْﻤِﻪٖ ﻭَ ﺍَﺻْﻠَﺢَ ﻓَﺎِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﯾَﺘُﻮْﺏُ ﻋَﻠَﯿْﻪِ ؕ ﺍِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻏَﻔُﻮْﺭٌ ﺭَّﺣِﯿْﻢٌ .
কিন্তু সীমালংঘন করার পর কেউ তওবা করলে ও সংশোধন করলে অবশ্যই আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন; আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা মাইদা (৫) : ৩৯
৭. ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ মাফ করে।’
গুনাহ মাফকারী তো একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বান্দার গুনাহ মাফ করতে পারে না।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻣَﻦْ ﯾَّﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮْﺏَ ﺍِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠﻪُ
আল্লাহ ছাড়া কে আছে পাপ ক্ষমা করে? -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
আরো ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﯾَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﺘَّﻮْﺑَﺔَ ﻋَﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻩٖ ﻭَ ﯾَﻌْﻔُﻮْﺍ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﯿِّﺎٰﺕِ ﻭَ ﯾَﻌْﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ .
তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। -
সূরাতুশ শূরা (৪২) : ২৫
হাদীসের এই দুআয় সহজ সরল ভাষায় যে গভীর সত্য ও অনুপম ভাবের প্রকাশ ঘটেছে তা থেকেও বোঝা যায়- কেন এই দুআ সাইয়িদুল ইসতিগফার বিশেষণে ভূষিত।
এতে যেমন আছে আল্লাহর একমাত্র মাবুদ হওয়ার সাক্ষ্য তেমনি আছে বান্দার বান্দা হওয়ার স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে খালিককে খালিক বলে স্বীকার করা তেমনি আছে তাঁর সকল বিধান ও ফরমানকে শিরোধার্য করা।
এতে যেমন আছে প্রকৃত দাতার দান স্বীকার, তেমনি আছে আপন কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে গুনাহ দ্বারা নিজের ক্ষতির উপলদ্ধি, তেমনি আছে এই মহা সত্যের সাক্ষ্য যে,
একমাত্র আল্লাহই বান্দার গুনাহ মাফকারী।
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ
No comments:
Post a Comment