Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Showing posts with label ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label ইসলাম. Show all posts

Tuesday, April 11, 2017

সাইয়িদুল ইসতিগফার

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ:

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ﺳَﻴِّﺪُ ﺍﻟِﺎﺳْﺘِﻐْﻔَﺎﺭِ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻝَ : ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ . ﻗَﺎﻝَ : ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭِ ﻣُﻮﻗِﻨًﺎ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻣِﻦْ ﻳَﻮْﻣِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﻤْﺴِﻲَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ، ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺎﻟَﻬَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﻮﻗِﻦٌ ﺑِﻬَﺎ، ﻓَﻤَﺎﺕَ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼْﺒِﺢَ، ﻓَﻬُﻮَ ﻣِﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔِ .
সাইয়িদুল ইসতিগফার হচ্ছে এইরূপ বলা-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ، ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ، ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ، ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ، ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন,
আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে। স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ। কাজেই আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারে।’
তিনি বলেন, যে এই কথাগুলো দিনের বেলা মন থেকে বলে আর ঐ দিন সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতীদের শামিল হবে। তেমনি যে তা রাতের বেলায় মন থেকে বলে আর ভোর হওয়ার আগেই মারা যায় সে জান্নাতীদের শামিল হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬, ৬৩২৩
সূত্র-আলোচনা
এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস ইবনে ছাবিত রা. একজন আনসারী খাযরাজী সাহাবী। বিখ্যাত শায়ের সাহাবী হযরত হাসসান ইবনে ছাবিত রা.-এর ভাতিজা। তাঁর বাবা আওস ইবনে ছাবিত রা. বদরের যুদ্ধে শামিল ছিলেন। আর অহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উবাদা ইবনে ছামিত রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেছেন-
ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﻣﻦ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺃﻭﺗﻮﺍ ﺍﻟﻌﻠﻢَ ﻭﺍﻟﺤﻠﻢ، ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻣﻦ ﺃﻭﺗﻲ ﺃﺣﺪﻫﻤﺎ .
শাদ্দাদ ইবনে আওস ঐসব ব্যক্তিদের একজন, যাদের
‘ইল্ম’ ও ‘হিল্ম’ (জ্ঞান ও সহনশীলতা) দুটোই দেয়া হয়েছে। অথচ অনেক মানুষ আছে যারা শুধু একটি প্রাপ্ত হয়েছেন।
তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে-
ﻓﻀﻞ ﺷﺪﺍﺩ ﺑﻦ ﺃﻭﺱ ﺍﻷﻧﺼﺎﺭَ ﺑﺨﺼﻠﺘﻴﻦ : ﺑﺒﻴﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻧﻄﻖ، ﻭﺑﻜﻈﻢ ﺇﺫﺍ ﻏﻀﺐ .
আনসারীদের মাঝে শাদ্দাদ ইবনে আওস শ্রেষ্ঠ দুটি স্বভাব দ্বারা : এক. স্পষ্ট বক্তব্যে আর দুই. ক্রোধ সংবরণে।
ইমাম তবারানী রাহ. স্বীয় সনদে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ﻣﺎ ﻟﻚ ﻳﺎ ﺷﺪﺍﺩ؟ শাদ্দাদ! তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, ﺿﺎﻗﺖ ﺑﻲ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ পৃথিবী আমার জন্য সংকুচিত হয়ে গেছে! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
ﻟﻴﺲ ﻋﻠﻴﻚ، ﺇﻥّ ﺍﻟﺸّﺎﻡ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺑﻴﺖ ﺍﻟﻤﻘﺪﺱ ﺳﻴﻔﺘﺢ، ﻭﺗﻜﻮﻥ ﺃﻧﺖ ﻭﻭﻟﺪﻙ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻙ ﺃﺋﻤّﺔ ﻓﻴﻬﻢ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ .
না তোমার কিছু হবে না। শাম বিজিত হবে। বাইতুল মাকদিস বিজিত হবে। আর তুমি ও তোমার পরে তোমার সন্তানেরা সেখানে নেতৃস্থানীয় হবে ইনশাআল্লাহ!
পরে তিনি শামে চলে যান। এক ক্বওল অনুসারে ৫৮ হিজরীতে ৭৫ বছর বয়সে ফিলিস্তীনে ইন্তিকাল করেন।
(আল ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/২৫৮)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, সহীহ বুখারীতে তাঁর সূত্রে এই একটি হাদীসই বর্ণিত হয়েছে। -ফাতহুল বারী ১১/৯৯
এই মহান সাহাবীর সূত্রে এই হাদীস ইমাম বুখারী রাহ. ছাড়াও ইমাম ইবনে আবী শাইবা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ স্ব স্ব সনদে বর্ণনা করেছেন। (দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩০০৫২ ও টীকা শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা)
সহীহ বুখারীর ‘কিতাবুদ দাআওয়াত’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এই হাদীসটি (৬৩০৬) রয়েছে। পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাবু আফযালিল ইসতিগফার’। আফযালুল ইসতিগফার মানে শ্রেষ্ঠ ইসতিগফার। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (৮৫২হি.) বলেছেন-
ﻭَﺗَﺮْﺟَﻢَ ﺑِﺎﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔِ ﻭَﻭَﻗَﻊَ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳﺚُ ﺑِﻠَﻔْﻆِ ﺍﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﻭَﻛَﺄَﻧَّﻪُ ﺃَﺷَﺎﺭَ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤُﺮَﺍﺩَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻴَﺎﺩَﺓِ ﺍﻟْﺄَﻓْﻀَﻠِﻴَّﺔُ ﻭَﻣَﻌْﻨَﺎﻫَﺎ ﺍﻟْﺄَﻛْﺜَﺮُ ﻧَﻔْﻌًﺎ ﻟِﻤُﺴْﺘَﻌْﻤِﻠِﻪِ .
অর্থাৎ ইমাম বুখারী রাহ. ‘আফযাল’ শব্দের দ্বারা শিরোনাম গঠন করেছেন। তিনি সম্ভবত এর দ্বারা হাদীসের ‘সাইয়িদ’ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ সাইয়িদুল ইসতিগফার অর্থ আফযালুল ইস্তিগফার বা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার। আর এর শ্রেষ্ঠত্বের তাৎপর্য হচ্ছে, পাঠকারীর পক্ষে সর্বাধিক উপকারী হওয়া। -
ফতহুল বারী ১১/১০১
কাজেই আমরা যদি ইসতিগফারের উপরোক্ত ‘মাছূর’
পাঠটি মুখস্থ করে ফেলি এবং ভাব ও মর্ম উপলদ্ধি করে সকাল-সন্ধ্যায় মন থেকে তা পাঠ করি তাহলে অনেক খায়ের ও বরকতের ব্যাপার হবে।
ভাব ও মর্ম আলোচনা
কুরআন-সুন্নাহর শেখানো যিকির ও দুআর কালেমাগুলোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো ঈমান ও ঈমানিয়াতে পরিপূর্ণ। কাজেই ঈমান শেখার ও ঈমানকে সতেজ ও সজীব করার এক বড় উপায়,
অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে তা নিয়মিত আমলে রাখা। উপরের ইসতিগফারের বাক্যমালায় আছে ঈমানিয়াতের অনেক বিষয়। আর তা থাকাই তো স্বাভাবিক। যখন হাদীস শরীফের বর্ণনা অনুসারে স্বয়ং সাইয়িদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে
‘সাইয়িদুল ইসতিগফার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর ফযীলত বর্ণনা করে বলেছেন, যে বান্দা দিবসে তা মন থেকে পড়ে সন্ধ্যার আগে তার মৃত্যু ঘটলে সে জান্নাতী হবে। আর যে তা রাতে মন থেকে পড়ে ভোরের আগে মৃত্যু হলে সে-ও জান্নাতী হবে।
নিশ্চয়ই এতে আছে ঐ সকল কথা, যা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং যার দ্বারা আল্লাহর বান্দা হয়ে যায় আল্লাহর প্রিয়পাত্র। চলুন তবে এই সত্য-সুন্দর বাণীর ভাব ও মর্মের ভুবনে।
***
১. ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻻَ ﺇِﻟﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ
ইয়া আল্লাহ! আপনি আমার রব। নেই কোনো ইলাহ আপনি ছাড়া।
‘রব’ মানে প্রভু ও পরওয়ারদেগার আর ‘ইলাহ’ মানে উপাস্য ও মাবুদ। আল্লাহর বান্দা প্রথমেই স্মরণ করছে এবং স্বীকার করছে যে, আল্লাহই তার রব, তার প্রভু ও পরওয়ারদেগার এবং একমাত্র ইলাহ ও মাবুদ।
২. ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ
আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আপনার বান্দা।
আল্লাহই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে প্রতিপালন করছেন। মানুষের জীবন ও জীবনোপকরণ, তার মেধা ও শক্তি তাঁর দান। সৃজন ও প্রতিপালনে আল্লাহর কোনো শরীক নেই। কাজেই নিরঙ্কুশ ইবাদত ও চূড়ান্ত আনুগত্য একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
কুরআন মাজীদের ইরশাদ-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻜُﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽَ ﻓِﺮَﺍﺷًﺎ ﻭَّ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀَ ﺑِﻨَﺎٓﺀً ﻭَّ ﺍَﻧْﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎٓﺀِ ﻣَﺎٓﺀً ﻓَﺎَﺧْﺮَﺝَ ﺑِﻪٖ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮٰﺕِ ﺭِﺯْﻗًﺎ ﻟَّﻜُﻢْ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺠْﻌَﻠُﻮْﺍ ﻟِﻠﻪِ ﺍَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻭَّ ﺍَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ .
হে মানুষ! যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর। যাতে আত্মরক্ষা করতে পার।
যিনি তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিছানা এবং আকাশকে ছাদ। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য উৎপন্ন করেছেন ফলমূল । কাজেই জেনেশুনে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না। -সূরা বাকারা (২) : ২১-২২
মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বান্দা আর আল্লাহই তার রব ও ইলাহ। ইস্তিগফারের এই বাক্যগুলোতে আছে বান্দার সাথে আল্লাহর এই সম্পর্কেরই স্মরণ ও স্বীকারোক্তি।
৩. ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ
আমি যথাসাধ্য মেনে চলব আপনার বিধান ও ফরমান।
এটি উপরোক্ত সম্পর্কেরই দাবি।
আরবী ভাষায় ﻋﻬﺪ শব্দের এক অর্থ আদেশ-নিষেধ,
বিধি-বিধান। আরবী ভাষার ব্যবহারে ﻋﻬﺪ ﺇﻟﻴﻪ অর্থ তাকে আদেশ করল, নিষেধ করল। এই ব্যবহার অনুসারেই উপরোক্ত বাক্যের তরজমা করা হয়েছে।
এ শব্দের আরেক অর্থ অঙ্গিকার, চুক্তি ইত্যাদি। সেই ব্যবহার অনুসারে তরজমা হবে, ‘আমি আপনার সাথে কৃত অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলব।’
আল্লাহর যে বিধান ও ফরমান পালনে বান্দা আল্লাহর সাথে অঙ্গিকারাবদ্ধ এবং যার বিনিময়ে বান্দার জন্য রয়েছে মহান রবের মহা প্রতিশ্রুতি, তা হচ্ছে ঈমান ও ইতাআত তথা বিশ্বাস ও আনুগত্যের ফরমান।
বান্দা একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করবে এবং আল্লাহর আদেশকেই চূড়ান্তরূপে শিরোধার্য করবে। তাঁর আদেশের উপর আর কারো আদেশকে প্রাধান্য দিবে না।
কারণ, নিরঙ্কুশ উপাসনা ও চূড়ান্ত আনুগত্যের একমাত্র হকদার আল্লাহ তাআলা।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুদ্ধি-বিবেক দান করেছেন এবং প্রকৃতিতে তাঁর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের অসংখ্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন। এই বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা মানুষের কর্তব্য।
এরপর যুগে যুগে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর বিধান ও ফরমান সুস্পষ্টভাবে মানব জাতিকে দান করেছেন।
তো আকল ও নকল তথা বুদ্ধি ও বর্ণনা উভয় দিক থেকে তাঁর ‘রুবূবিয়্যাত’ ও ‘উলুহিয়্যাত’ মানবজাতির সামনে সাব্যস্ত হয়েছে। কাজেই আল্লাহর ফরমান স্পষ্ট এবং মানুষের সর্বসত্তা আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ মেনে নেয়ার বিষয়ে অঙ্গিকারাবদ্ধ।
এরপর আল্লাহ যাকে ঈমানের তাওফীক দান করেছেন ঈমানের শাহাদতের মাধ্যমে সে আল্লাহর ফরমানকে শিরোধার্য করেছে এবং আল্লাহর সাথে তার অঙ্গিকারকে আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। এই দুআয় আছে সেই অঙ্গিকারেরই স্মরণ ও নবায়ন।
ঈমানী শাহাদাতের মাধ্যমে মুমিন ঐ সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করেছে, যা অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষ- সে ঈমান আনুক বা না আনুক, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, সে আল্লাহরই সৃষ্টি; আল্লাহর দানেই সে ধনী। দিনরাত সে ভোগ করে চলেছে আল্লাহর নিআমত। যে মুখে স্বীকার করছে না তারও সর্বসত্তা সর্বদা এই সাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, আল্লাহ তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। আর সে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালিত।
মুমিনের সৌভাগ্য যে, ঈমানের শাহাদাতের মাধ্যমে সে এই সত্য স্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহ ও অস্বীকারের হীনতা ও মহাশাস্তি থেকে মুক্তির উপায় গ্রহণ করেছে। এটাই তো পরিচয় শুভবুদ্ধির ।
কুরআনে কারীম ‘উলুল আলবাব’ ও শুভবুদ্ধির অধিকারী মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলছে-
ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾُﻮْﻓُﻮْﻥَ ﺑِﻌَﻬْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَ ﻟَﺎ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻤِﯿْﺜَﺎﻕَ
যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২০
এদেরই জন্য মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি-
ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ﺟَﻨّٰﺖُ ﻋَﺪْﻥٍ ﯾَّﺪْﺧُﻠُﻮْﻧَﻬَﺎ ﻭَ ﻣَﻦْ ﺻَﻠَﺢَ ﻣِﻦْ ﺍٰﺑَﺎٓﻯِٕﻬِﻢْ ﻭَ ﺍَﺯْﻭَﺍﺟِﻬِﻢْ ﻭَ ﺫُﺭِّﯾّٰﺘِﻬِﻢْ ﻭَ ﺍﻟْﻤَﻠٰٓﻯِٕﻜَﺔُ ﯾَﺪْﺧُﻠُﻮْﻥَ ﻋَﻠَﯿْﻬِﻢْ ﻣِّﻦْ ﻛُﻞِّ ﺑَﺎﺏٍ ﺳَﻠٰﻢٌ ﻋَﻠَﯿْﻜُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮْﺗُﻢْ ﻓَﻨِﻌْﻢَ ﻋُﻘْﺒَﯽ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
এদেরই জন্য শুভ পরিণাম- স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ প্রত্যেক দরজা দিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হবে এবং বলবে, তোমাদের প্রতি শান্তি, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে। কত ভালো এই পরিমাণ। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২২-২৪
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছে তাদের সম্পর্কে ঘোষণা-
ﻭَ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﯾَﻨْﻘُﻀُﻮْﻥَ ﻋَﻬْﺪَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻣِﯿْﺜَﺎﻗِﻪٖ ﻭَ ﯾَﻘْﻄَﻌُﻮْﻥَ ﻣَﺎۤ ﺍَﻣَﺮَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑِﻪٖۤ ﺍَﻥْ ﯾُّﻮْﺻَﻞَ ﻭَ ﯾُﻔْﺴِﺪُﻭْﻥَ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽِ ﺍُﻭﻟٰٓﻯِٕﻚَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻟﻠَّﻌْﻨَﺔُ ﻭَ ﻟَﻬُﻢْ ﺳُﻮْٓﺀُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ .
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে; যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে তাদের জন্য আছে লা‘নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৫
বস্তুত আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার স্বীকার করা এবং তাঁর ফরমান শিরোধার্য করাই শুভ বুদ্ধির পরিচয় এবং এটিই পথ বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের।
ﻣﺎ ﺍﺳﺘﻄﻌﺖ ‘যথাসাধ্য’ কথাটির উদ্দেশ্য, আপন দুর্বলতা স্বীকার করা। একে তো আল্লাহর শান মোতাবেক হক আদায় বান্দার সাধ্যেরই অতীত। আর এ কারণে আল্লাহ আপন করুণায় বান্দার উপর তার সাধ্য অনুযায়ী ভার দিয়েছেন, কিন্তু সেই বিধান পালনেও হয়ে যায় বান্দার নিজের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাজনিত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। কাজেই করুণাময় প্রভুর সাথে আনুগত্যের চুক্তি নবায়নের সাথে সাথে আপন দুর্বলতা নিবেদনও এই বাক্যের উদ্দেশ্য।
৪. ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ
‘আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি নিজ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে।’
আপন কৃতকর্মের অনিষ্ট ও অশুভ পরিণামই তো ভয়ের বড় কারণ। দুনিয়া ও আখিরাতে যে যে কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তন্মধ্যে নিজের কর্মভুলই তো সবচেয়ে বড় কারণ। আখিরাতের শাস্তি ও আযাবের পুরোটাই মানুষের নিজের কর্মের ফল। দুনিয়ার অশান্তি ও অস্থিরতার মূলেও তার নিজের কর্ম। তাহলে সবার আগে তো নজর ফেরানো উচিত নিজের দিকেই। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ অনিষ্টের কারণ অন্যত্র খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যকে দোষারোপ করে। না, কষ্ট ও অনিষ্টের কারণ আমার নিজেরই কর্ম। উপরের বাক্যে আছে এই সত্যের শিক্ষা ও উপলদ্ধি, আছে একমাত্র আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা।
শাক্ল ইবনে হুমাইদ রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম এবং আরজ করলাম, আমাকে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দুআ শিখিয়ে দিন। তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং বললেন, তুমি (এই কথাগুলো) বলবে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺳَﻤْﻌِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺑَﺼَﺮِﻱ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻟِﺴَﺎﻧِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻗَﻠْﺒِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﻨِﻴِّﻲ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার কানের অনিষ্ট থেকে, আমার চোখের অনিষ্ট থেকে,
আমার জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, আমার অন্তকরণের অনিষ্ট থেকে এবং আমার বীর্যের (লজ্জাস্থানের) অনিষ্ট থেকে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটি দুআ শিক্ষা দিন, যা আমি সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর! তুমি বলবে-
ﺍﻟﻠّﻬُﻢَّ ﻓَﺎﻃِﺮَ ﺍﻟﺴَّﻤَﻮَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ ﻋَﺎﻟِﻢَ ﺍﻟﻐَﻴْﺐِ ﻭَﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓِ، ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ، ﺭَﺏَّ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻣَﻠِﻴﻜَﻪ، ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻧَﻔْﺴِﻲ، ﻭَﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻭَﺷِﺮْﻛِﻪ، ﻭَﺃَﻥْ ﺃَﻗْﺘَﺮِﻑَ ﻋَﻠَﻰ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﺳُﻮﺀًﺍ ﺃَﻭْ ﺃَﺟُﺮَّﻩُ ﺇِﻟﻰ ﻣُﺴْﻠِﻢٍ .
ইয়া আল্লাহ! আকাশম-লী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! সকল বস্তুর প্রভু ও অধিপতি! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি আমার নিজের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় নিচ্ছি নিজের উপর বা কোনো মুসলিমের উপর কোনো প্রকার অনিষ্ট টেনে আনা থেকে। -জামে তিরমিযী,
হাদীস ৩৫২৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৬৭
হযরত ফারওয়া ইবনে নাওফিল আল আশজায়ী রা. বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী দুআ করতেন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি বলতেন-
ﺍﻟﻠﻬُﻢَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻋَﻤِﻠْﺖُ، ﻭَﻣَﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺃَﻋْﻤَﻞْ .
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি যা আমি করেছি তার অনিষ্ট থেকে এবং যা করিনি তারও অনিষ্ট থেকে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১৬
৫. ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ، ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ
‘স্বীকার করছি আমাকে প্রদত্ত আপনার সকল দান আর স্বীকার করছি আমার পাপ।’
হায়! একদিকে আল্লাহর প্রভূত দান, অন্যদিকে বান্দার নাফরমানী! এটাই তো সত্য ও বাস্তবতা। তবে এই সত্যের উপলদ্ধিও তাদের মনেই জাগে,
যাদের আল্লাহ ক্ষমা করতে চান। দেখুন, এক বেদুঈন কা‘বার গিলাফ ধরে কীভাবে কাকুতি মিনতি করছে-
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇﻥ ﺍﺳﺘﻐﻔﺎﺭﻱ ﻣﻊ ﺇﺻﺮﺍﺭﻱ ﻟﺆﻡٌ، ﻭﺇﻥَّ ﺗﺮﻛﻲ ﺍﻻﺳﺘﻐﻔﺎﺭَ ﻣﻊ ﻋﻠﻤﻲ ﺑﺴﻌﺔِ ﻋﻔﻮﻙَ ﻟﻌﺠﺰٌ، ﻓﻜﻢ ﺗَﺘَﺤَﺒَّﺐُ ﺇﻟﻲَّ ﺑﺎﻟﻨﻌﻢ ﻣﻊ ﻏِﻨﺎﻙَ ﻋﻨﻲ، ﻭﻛﻢ ﺃﺗﺒﻐَّﺾُ ﺇﻟﻴﻚ ﺑﺎﻟﻤﻌﺎﺻﻲ ﻣﻊ ﻓﻘﺮﻱ ﺇﻟﻴﻚ، ﻳﺎ ﻣَﻦ ﺇﺫﺍ ﻭﻋﺪَ ﻭﻓَّﻰ، ﻭﺇﺫﺍ ﺗﻮﻋَّﺪَ ﺗﺠﺎﻭﺯ ﻭﻋﻔﺎ، ﺃﺩﺧﻞْ ﻋﻈﻴﻢَ ﺟُﺮﻣﻲ ﻓﻲ ﻋﻈﻴﻢِ ﻋﻔﻮﻙَ، ﻳﺎ ﺃﺭﺣﻢ ﺍﻟﺮﺍﺣﻤﻴﻦ .
ইয়া আল্লাহ! পাপ-মগ্নতার সাথে আমার ক্ষমা চাওয়া তো হীনতা, কিন্তু, তোমার প্রশস্ত ক্ষমার সংবাদ জেনেও ক্ষমা না চাওয়া তো নির্বুদ্ধিতা। তুমি তোমার দয়া ও করুণার দ্বারা কতই না আমার প্রীতি অন্বেষণ করছ। অথচ আমার কাছে তোমার কোনোই প্রয়োজন নেই। আর আমি পাপ ও নাফরমানীর মাধ্যমে কতই না তোমার ক্রোধ আকর্ষণ করে চলেছি। অথচ তোমার কাছেই আমার সকল প্রয়োজন!
হে সকল দয়ালুর বড় দয়ালু! যিনি প্রতিশ্রুতি দিলে পূরণ করেন, আর শাস্তির ধমক দিলেও ক্ষমা করেন ও উপেক্ষা করেন আমার মহা পাপকে ডুবিয়ে দাও তোমার করুণার মহা সিন্ধুতে! (কিতাবুল আজকার,
ইমাম নববী, বর্ণনা ১২৩০-এর অধীনে)
সুবহানাল্লাহ! বাস্তবতার এই উপলদ্ধি আর নিবেদনের এই ভাষা আল্লাহ যাকে দান করেন তাকে তো ক্ষমা করার জন্যই দান করেন। কবি সত্য বলেছেন-
ﻟﻮ ﻟﻢ ﺗﺮﺩ ﻧﻴﻞ ﻣﺎ ﺃﺭﺟﻮ ﻭﺃﻃﻠﺒﻪ + ﻣﻦ ﺟﻮﺩ ﻛﻔﻴﻚ ﻣﺎ ﻋﻠﻤﺘﻨﻲ ﺍﻟﻄﻠﺒﺎ
তুমি যদি না চাইতে দু’হাতের দানে আমার আচলখানি ভরে দিতে; তাহলে তো প্রভু! এই প্রার্থনাই শেখাতে না আমাকে।
৬. ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ
‘কাজেই’...। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, বোঝা যাচ্ছে, যে আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকার করে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। ইফকের দীর্ঘ হাদীসে তা স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
ﺍﻟﻌَﺒْﺪُ ﺇِﺫَﺍ ﺍﻋْﺘَﺮَﻑَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻪِ، ﺛُﻢَّ ﺗَﺎﺏَ ﺗَﺎﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ .
বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে ও তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৬১;
ফাতহুল বারী ১১/১০৩
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺎﺏَ ﻣِﻦْۢ ﺑَﻌْﺪِ ﻇُﻠْﻤِﻪٖ ﻭَ ﺍَﺻْﻠَﺢَ ﻓَﺎِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﯾَﺘُﻮْﺏُ ﻋَﻠَﯿْﻪِ ؕ ﺍِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻏَﻔُﻮْﺭٌ ﺭَّﺣِﯿْﻢٌ .
কিন্তু সীমালংঘন করার পর কেউ তওবা করলে ও সংশোধন করলে অবশ্যই আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন; আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা মাইদা (৫) : ৩৯
৭. ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ .
‘আপনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে গুনাহসমূহ মাফ করে।’
গুনাহ মাফকারী তো একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বান্দার গুনাহ মাফ করতে পারে না।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻣَﻦْ ﯾَّﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮْﺏَ ﺍِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠﻪُ
আল্লাহ ছাড়া কে আছে পাপ ক্ষমা করে? -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
আরো ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﯾَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﺘَّﻮْﺑَﺔَ ﻋَﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻩٖ ﻭَ ﯾَﻌْﻔُﻮْﺍ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﯿِّﺎٰﺕِ ﻭَ ﯾَﻌْﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ .
তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। -
সূরাতুশ শূরা (৪২) : ২৫
হাদীসের এই দুআয় সহজ সরল ভাষায় যে গভীর সত্য ও অনুপম ভাবের প্রকাশ ঘটেছে তা থেকেও বোঝা যায়- কেন এই দুআ সাইয়িদুল ইসতিগফার বিশেষণে ভূষিত।
এতে যেমন আছে আল্লাহর একমাত্র মাবুদ হওয়ার সাক্ষ্য তেমনি আছে বান্দার বান্দা হওয়ার স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে খালিককে খালিক বলে স্বীকার করা তেমনি আছে তাঁর সকল বিধান ও ফরমানকে শিরোধার্য করা।
এতে যেমন আছে প্রকৃত দাতার দান স্বীকার, তেমনি আছে আপন কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি।
এতে যেমন আছে গুনাহ দ্বারা নিজের ক্ষতির উপলদ্ধি, তেমনি আছে এই মহা সত্যের সাক্ষ্য যে,
একমাত্র আল্লাহই বান্দার গুনাহ মাফকারী।
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ 

Monday, April 10, 2017

জাকির নায়েক নাস্তিকদের 'মাথাব্যথা'র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিশ্চিত: আরিফ আজাদ


জাকির নায়েক আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক, ওয়ার্ল্ডওয়াইড নাস্তিকদের 'মাথাব্যথা'র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিশ্চিত।
বাংলা নাস্তিকরা কোন মুসলিমকে কটাক্ষ করার আগে তাকে সরাসরি 'জাকির নায়েকের চ্যালা' 'জাকির নায়েকের মুরিদ' বলে থাকে।
জাকির নায়েকের নামকে বিকৃত করে তাকে 'জোকার নায়েক', এবং তার ছবিকে বিকৃত করে অসংখ্য কার্টুনও তারা বানিয়েছে এবং বানাচ্ছেও।
সে যাইহোক, জাকির নায়েক এবং উনার প্রতিষ্ঠিত 'পিস টিভি' কে গতবছর ভারত এবং বাংলাদেশে ব্যান করা হয় খুব সিলি একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে।
ইস্যুটা ছিলো- ঢাকার গুলশানের জঙ্গী হামলার সাথে জড়িতদের কোন একজন টুইটার বা ফেইসবুকে জাকির নায়েকের ফলোয়ার ছিলো এবং কোন একসময়, জাকির নায়েকের কোন একটি লেকচার সে শেয়ার করেছিলো।
এ থেকে ধারণা করা হয় যে, সেই জঙ্গীটা ডক্টর জাকির নায়েক দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে জঙ্গী কর্মকান্ডে জড়িয়েছে। মোদ্দাকথা, সেই জঙ্গীর সূত্র ধরে, জাকির নায়েক এবং উনার 'পিস টিভি' কে জঙ্গী কর্মকান্ডে উস্কানিদাতা হিসেবে দেখিয়ে ব্যান করে দেওয়া হয়।
জাকির নায়েক এবং উনার পিস টিভি ব্যান হওয়ার পর এদেশের মুক্তমনাদের মনে খুশির বন্যা বয়ে গেলো। সবাই খুশিতে বাক বাকুম বাক বাকুম করতে লাগলো। আহা! এতোদিনে সরকার একটা কাজের কাজ করেছে। এদেশের একজন নামকরা প্রফেসর, যিনি আবার নিজেকে বাক স্বাধীনতার পক্ষের লোক, অবাধ মত প্রকাশের (সে যার মত-ই হোক) পক্ষের লোক বলে জাহির করেন, যিনি নাস্তিক ব্লগারদের জন্য সবসময় মায়াকান্নায় ভেঙে পড়েন, তিনিও জাকির নায়েক এবং উনার টিভি ব্যান হওয়ার পর খুশিতে একখানা আর্টিকেল প্রসব করেছিলেন।
যাহোক, পয়েন্ট হলো- জাকির নায়েকের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই ছেলেটা জঙ্গী হয় এবং গুলশানে জঙ্গী কর্মকান্ডে জড়িয়ে এতোগুলো মানুষ খুন করে।
পয়েন্ট টু বি নোটেড- ছেলেটা জাকির নায়েককে ফলো করতো, এবং কোন এককালে জাকির নায়েকের একটা লেকচারের ভিডিও লিঙ্ক শেয়ার করেছিলো সোশ্যাল মিডিয়ায়।ছেলেটা যেহেতু জাকির নায়েককে ফলো করতো, সুতরাং, এখানে জাকির নায়েকও সমানভাবে দোষী। সুতরাং নাস্তিকদের অভিমত- জাকির নায়েক এবং তার টিভি চ্যানেল ব্যান হওয়াটা যৌক্তিক, ঠিক কাজ।
কারণ, জাকির নায়েক জঙ্গী কর্মকান্ডে উস্কানি দেয়।
এবার আরেকটা পয়েন্টে আসুন। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকে তো চিনেন, তাই না?
হ্যাঁ, সেই চার্লস ডারউইন তার বিখ্যাত (যেটাকে বিবর্তনবাদের 'বাইবেল' গন্য করা হয়) বই 'The Origin Of Species: By means Of Natural Selection' এ পৃথিবীতে কীভাবে একটি এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাণী এবং উদ্ভিদের বিবর্তন ঘটেছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
যাহোক, সেই বইতে কোন কোন প্রাণীরা পরিবেশে টিকে থাকবে, সেটাও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এটার নাম দিয়েছিলেন- 'Natural Selection'। বলা চলে, এই ন্যাচারাল সিলেকশানই তার পুরো থিওরির মূলমন্ত্র। এজন্যই, বইয়ের নামের সাথেই উনি এই নামটাও জড়িয়ে দিয়েছিলেন (By means Of Natural Selection)
Natural Selection এর মূল বক্তব্য হচ্ছে- 'প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলছে। এই সংগ্রাম হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। দিনশেষে, প্রকৃতিতে তারাই টিকবে, যারা যোগ্য। অযোগ্য, দূর্বলরা বিলুপ্ত হবে- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। যারা দূর্বল, যারা সংগ্রামে টিকে থাকার অযোগ্য, তারা প্রকৃতিতে টিকে থাকবে না।
এটাকে Survival Of the Fittest বলা হয়।
আমি যখন একদিন এডলফ হিটলারের Mein Kampf ( My Struggle) বইটা পড়ছি, তখন ঠিক একদম এরকম, হুবহু ডারউইনের কথার মতোই কিছু বক্তব্য খুঁজে পেলাম।
তিনি তার বই Mein Kampf এর ২৩৯-২৪০ পৃষ্টায় লিখেছেন- ' If nature doesn't wish that weaker individuals should mate with the stronger, she wishes even less that a superior race should intermingle with an inferior one; because in such cases all her efforts, throughout hundreds of thousands of years, to establish an evolutionary higher stage of being, may thus be rendered futile.
But, such a preservation goes hand-in-hand with the inexorable law that it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure. he who would live, must fight. he who doesn't wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn't the right to exist'
খেয়াল করুন, Hitler লিখেছে 'If Nature doesn't wish'
Nature বলতে তিনি ঠিক কী বুঝালেন? ডারউইন যে Natural Selection এর কথা বলে গেছেন, সেটা নয়তো? Hitler এখানে স্পষ্টতই একটি Superior Race এবং Inferior Race এর কথা উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, প্রকৃতিতে এটি বলবৎ আছে। দূর্বল আর সবলের মধ্যে সংঘাত।
ঠিক যে কথাগুলো ডারউইন তার 'Origin Of Species' এ বলেছে।
Hitler এরপরে বলেছে, - ' it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure.'
অর্থাৎ, যারা সবল এবং সর্বোৎকৃষ্ট, তারাই টিকে থাকবে এবং থাকা উচিত।
(যে কথাগুলো একইভাবে ডারউইনেরও)
Hitler আরো লিখেছে- 'he who doesn't wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn't the right to exist'
অর্থাৎ, সংগ্রামই যেখানে Law Of Life (Naturally) , সেখানে যারা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবেনা, তাদের বেঁচে থাকার আদতে কোন অধিকার নেই।
Hitler ভাবতো, ইহুদীরা যেহেতু ম্লেচ্ছ, Inferior (তার দৃষ্টিতে), তাই প্রকৃতিতে তাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকারই নেই। তাই সে সমানভাবে ৬০ লক্ষ ইহুদীকে গনহত্যার মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত করে দেয়।
তাহলে, আমরা যদি দাবি করি, ডারউইনের The Origin Of Species: By means Of Natural Selection' বই পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে Hitler এরকম গনহত্যা করেছে, তাহলে কি তা খুব যুক্তিবিরুদ্ধ হয়ে যাবে? যেখানে সে নিজেই Evolutionary higher Stage এর কথা উল্লেখ করেছে।
এরকম আমরা যদি Hitler এর এই অপরাধের জন্য ডারউইনকে দোষী সাব্যস্ত করি, তার মরণোত্তর (যদিও ইম্পসিবল) মৃত্যুদন্ড দাবি করি, কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে Theory Of Evolution পড়ানো বন্ধের দাবি তুলি, আমাদের নাস্তিক বন্ধুরা কি আমাদের সাথে একমত হবেন যেভাবে জঙ্গী কর্মকান্ডের সাথে জাকির নায়েকের Link করেছিলেন আপনারা? উত্তরের আশায় রইলাম।
(আমি বলছি না যে, হিটলারের কাজের জন্য ডারউইন দোষী। কিন্তু, একজন জঙ্গীর একটি সিলি ম্যাটার যদি জাকির নায়েককে বিচারের আওতায় আনে, হিটলারের ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যার জন্য ডারউইনকেও বিচারের আদালতে তোলা যায়)
'নাস্তিকদের অসততা- একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ'/ আরিফ আজাদ

গোল্ডেন রেশিও এবং কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না- এ প্রসঙ্গ

মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন

“গোল্ডেন রেশিও” (Golden ratio) অর্থ সোনালী অনুপাত/স্বর্ণানুপাত। এটা হচ্ছে একটা চমৎকার গাণিতিক অনুপাত যা কোন চিত্রকর্ম,
স্থাপত্যকলা ইত্যাদিতে প্রয়োগ করা হলে সেই চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের চমৎকারিত্ব বৃদ্ধি পায়। মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, আইফেল টাওয়ার, হোয়াইট হাউজ ইত্যাদিতে এই “গোল্ডেন রেশিও” তথা সোনালী অনুপাতের প্রয়োগ ঘটেছে বলেই বোদ্ধাদের কাছে এগুলোর চমৎকারিত্বই ভিন্ন। এতে নাকি আরকিটেকচারাল ডিজাইনের সৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্যামিতির অনেক কিছুতেও এই গোল্ডেন রেশিও” - এর প্রয়োগ থাকে।
অনেকে সৃষ্টির মধ্যে গাছপালা, ফল-ফুল, বিভিন্ন প্রাণী, মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, এমনকি উর্ধ্ব জগতের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) - এর বাহুগুলোর মাঝেও এই “গোল্ডেন রেশিও” বা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। এমনকি শামুকের খোলস,
ঘূর্ণিঝড়ের ঘুর্ণন, বৃক্ষের কাণ্ড-বিন্যাস, ফল, ফুল ইত্যাদিতেও এই “গোল্ডেন রেশিও” বা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। উদাহরণ স্বরূপ মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত অংশের মধ্যে মাথা থেকে নাভি এবং নাভি থেকে পা পর্যন্ত যে মানটি পাওয়া যাবে তা হল ১.৬১৮ অর্থাৎ, সোনালী অনুপাত। কনুই থেকে আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত এবং আঙ্গুলের মাথা থেকে কবজি পর্যন্ত এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। কাঁধ থেকে হাঁটু এবং হাঁটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত দূরত্বের মাঝেও এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। এমনিভাবে চেহারা হৃদপি-সহ অন্যান্য অনেক অঙ্গের বিভিন্ন অংশে এই অনুপাত পাওয়া যায়। মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ প্রকৃতির অনেক কিছুর মাঝে এই অনুপাত পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এটাকে Divine proportion (স্বর্গীয় অনুপাত বা ঐশ্বরিক অনুপাত) বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। গোল্ডেন রেশিওকে “গোল্ডেন মিন” (Golden mean) , “গোল্ডেন সেকশন” (Golden section) ও বলা হয়।
খ্রিস্টের জন্মেরও পাঁচশ বছর পূর্বে এই গোল্ডেন রেশিও বা সোনালী অনুপাত প্রথমে আবিস্কার করেন পিথাগোরাস। তারপর প্লেটো, ইউক্লিড,
ফিবোনাক্কি, কেপলারসহ অনেকে এই সোনালী অনুপাতের জগতে গবেষণায় অগ্রসর হন।
আমরা “গোল্ডেন রেশিও” - এর বিষয়টা আলোচনায় আনছি এজন্য যে, অনেককে ইদানিং বলতে শোনা যাচ্ছে, পৃথিবীর মাঝে বায়তুল্লাহ বা কা‘বা শরীফের যে অবস্থান তাতেও এই অনুপাত রক্ষা করা হয়েছে। তারা বলতে চান, গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি। এ সম্পর্কিত প্রচুর লেখা নেটে দেখতে পাওয়া যায়। বিচিত্র নয় যে, এই ধারায় অনেক বইয়েও বিষয়টা এসে থাকবে বা এসে যাবে।
তা বক্তব্য যদি এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত যে,
কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভির অবস্থানে রয়েছে তাহলে তা আমাদের তেমন কিছু উদ্বেগের কারণ ছিল না। কিন্তু যেহেতু অনেকে বক্তব্যকে আরও আগে বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছেন, কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি আর নাভি হচ্ছে শরীরের মাঝখান, অতএব সেই কা‘বা শরীফ যে মক্কায় অবস্থিত সেই মক্কাকে কেন্দ্র করেই সারা পৃথিবীর রোযা রাখা ও ঈদ করার প্রবর্তন হওয়া চাই,
সোজা কথায় বলতে গেলে তারা বলতে চান, মক্কা শরীফের সাথেই একসাথে রোযা ও ঈদ করতে হবে। একারণেই এ বিষয়টার প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
এটা ভিন্ন কথা যে, কা‘বা শরীফ বা মক্কা রোযা রাখা ও ঈদ করার ভিত্তি কি না - এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার কথা হল শরীয়তে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়েছে কেবল হেলাল (নতুন চাঁদ) দেখাকে। কা‘বা শরীফ বা মক্কা মুকাররমাকে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়নি। তা ছাড়া পৃথিবীর কোন একটা স্থান নাভির স্থলে হলেই সে স্থানকে সকলের জন্য অন্য কোন আমলের ভিত্তি বানাতে হবে এর পেছনে কোন যুক্তিও নেই। (এমন বলাটা কি যুক্তিযুক্ত হবে যে, মক্কা শরীফ যেহেতু নাভি তাই সকলের বিয়ে-শাদি মক্কাতেই হতে হবে, সকলের কবরও সেখানেই হতে হবে, ইত্যাদি?) আরও কথা হল নাভি তো প্রস্থের মাঝখানে হয়, অথচ কা‘বা শরীফ পৃথিবীর প্রস্থের দিকের মাঝখানে তথা বিষুব রেখাতে অবস্থিত নয়। আল্লাহ পাক যদি কা‘বা শরীফকে নাভির স্থলেই রাখতেন তাহলে কা‘বা শরীফ হত বর্তমান দ্রাঘিমার বরাবর দক্ষিণে বিষুব রেখায় তথা আফ্রিকার কেনিয়ায়। এখন কা‘বা শরীফ তথা নাভি এক সাইডে হয়ে গেল এটা কি বেখাপ্পা হয়ে যায় না? এতে কি আল্লাহর শিল্প ডিজাইন জ্ঞানের ত্রুটি প্রকাশ পায় না? নাউযু বিল্লাহ! যাহোক আমি এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত আর কিছু এখানে লিখতে চাই না। এখানে শুধু গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না - এ প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে চাই। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে যারা গোল্ডেন রেশিও সন্বন্ধে মোটেই জানেন না, তাদের সুবিধার্থে প্রথমে গোল্ডেন রেশিও - এর পরিচয় সম্বন্ধে কিছু কথা বলে নিতে চাই।
সহজে “গোল্ডেন রেশিও”-এর পরিচয় হল গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে একটি বিশেষ গাণিতিক অনুপাত। সেই অনুপাতটি হল ১.৬১৮। একটা রেখাকে যদি এমন দুই ভাগে ভাগ করা হয় যার বড় অংশকে ছোট অংশ দ্বারা ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায় উভয় অংশের যোগফলকে বড় অংশ দ্বারা ভাগ করলেও সেই ফল পাওয়া যায়, আর সেই ভাগফল হবে ১.৬১৮ (প্রকৃত সংখ্যা হচ্ছে ১.৬১৮০৩৩৯৮৮৭৫) তাহলে সেটা হচ্ছে গোল্ডেন রেশিও। যেমন ৬১০ ইঞ্চি একটা রেখাকে দুই ভাগে ভাগ করুন। বড় অংশ (এটাকে বলা যায় A অংশ) ধরুন৩৭৭ ইঞ্চি আর ছোট অংশ (এটাকে বলা যায় B অংশ) ধরুন২৩৩ইঞ্চি। এবার বড় অংশ তথা A অংশকে ছোট অংশ তথা B অংশ দ্বারা ভাগ দিন ফল হবে ১.৬১৮ (৩৭৭÷২৩৩=১.৬১৮) আবার A+ B- র টোটালকে অর্থাৎ ৬১০ কে A অংশ দ্বারা ভাগ দিন তাহলেও ফল হবে ১.৬১৮ (৬১০÷৩৭৭=১.৬১৮)। তাই সংক্ষেপে গোল্ডেন রেশিওর পরিচয় এভাবেও দেয়া হয় - a+b is to a as a is to bঅর্থাৎ, a+b÷a= a÷b । বিষয়টিকে চিত্রে এভাবে দেখানো যায় -
আবার চিত্রে এভাবেও দেখানো যায় -
গোল্ডেন রেশিওকে সাধারণত তিন প্রকারে ভাগ করা হয়। (এক) সাধারণ গোল্ডেন রেশিও। এ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। (দুই) ১.৬১৮ রেশিও রক্ষা করে কোন আয়তক্ষেত্র তৈরি করলে (যে আয়তের দৈর্ঘ প্রস্থ উভয়টার রেশিও হবে ১.৬১৮) সেটাকে বলে গোল্ডেন রেকট্যাংগ্ল্
(Golden Rectangle) বা আয়তক্ষেত্রের গোল্ডেন রেশিও। যেমন দ্বিতীয় চিত্রে দেখানো হয়েছে। (উল্লেখ্য, চার সমকোণবিশিষ্ট চতুর্ভূজকে আয়তক্ষেত্র বলা হয়।) (তিন)আবার যদি উভয় আয়তক্ষেত্রের পিঠে ফিবোনাক্কি ক্রম অনুযায়ী (এ বিষয়ে পরে বর্ণনা আসছে।) আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়, তারপর সবগুলোর পিঠে অনুরূপভাবে আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়। এভাবে কয়েকটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করার পর সবগুলো আয়তের কোণা একের পর এক প্যাঁচানো রেখা দিয়ে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেটাকে বলে গোল্ডেন স্পাইরাল (Golden Spiral) বা শঙ্খিল গোল্ডেন রেশিও।এই স্পাইরালের বক্ররেখাতেও গোল্ডেন রেশিও থাকে।
স্পাইরাল হল সমুদ্রের এক ধরনের শামুক যা প্যাঁচানো আকৃতিতে গড়ে ওঠে। সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি এবং হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলের ছাপের দিকে লক্ষ্য করলেও এই গোল্ডেন স্পাইরাল দেখতে পাওয়া যায়। নিচের ছবিতে গোল্ডেন স্পাইরাল লক্ষ্য করুন।
গোল্ডেন রেশিওর সঙ্গে ফিবোনাক্কি
(Fibonacci কেউ কেউ উচ্চারণ লেখেন ফিবোনেসি/ ফিবোনাচ্চি/ ফিবোনোচ্চি) সিরিজের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ফিবোনাক্কি সিরিজ সম্বন্ধেও কিছু কথা জানতে হয়।
ইটালিয়ান গণিতবিদ লিওনার্দ ফিবোনাক্কি
(Leonardo Fibonacci) এই সিরিজটি আবিস্কার করেন বলে একে “ফিবোনাক্কি সিরিজ” বলা হয়। এই সিরিজে কতগুলো সংখ্যা দেখানো হয়, যেগুলোর প্রতিটি সংখ্যা তার আগের দুইটি সংখ্যার যোগফলের সমান। সিরিজভুক্ত সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকটিকে তার আগের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে ভাগফল ১.৬১৮ - এর কাছাকাছি হবে এবং ১৩ তম সংখ্যা এর পরে (৬১০ থেকে)সবগুলোর ভাগফল হুবহু ১.৬১৮ হবে।
এবার “ফিবোনাক্কি সিরিজটি লক্ষ্য করুন- ১, ১, ২,
৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, ২৩৩, ৩৭৭,
৬১০, ৯৮৭, ১৫৯৭, ২৫৮৪, ৪১৮১ ...। এর পরবর্তী আরও সংখ্যা আপনি বের করতে পারবেন। শেষ সংখ্যাকে তার পূর্বের সংখ্যার সাথে যোগ দিলেই পরবর্তী সংখ্যা বের হবে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, প্রতিটি সংখ্যার A ও B অংশ কি হবে তা বের করা আজকাল সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেটে Golden ratio calculator পাওয়া যায়, তার সহযোগিতা নিলেই হয়। এমনকি একটা চিত্রে গোল্ডেন রেশিও কীভাবে অবস্থিত তা বের করাও এখন সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“ফাইমেট্রিক্স - এর সহযোগিতা নিন। ফাইমেট্রিক্স হচ্ছে এক ধরনের সফটওয়ার যা দ্বারা কোন ছবির গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট মাপা হয়।
গোল্ডেন রেশিও বোঝানোর জন্য Φ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এরূপ লেখা হয় Φ ১.৬১৮ । Φ হচ্ছে একটি ল্যাটিন ভাষার অক্ষর। এটাকে বলা হয় Phi (ফাই) এটা হচ্ছে বড় হাতের ফাই। আবার ছোট হাতের ফাই অর্থাৎ, φ ও ব্যবহৃত হয়। তখন লেখা হয়
φ ০.১৬৮। দেখা গেল ছোট হাতের ফাই ব্যবহার করলে দশমিকের পূর্বের ১ লেখা হয় না। কখনও কখনও এরূপও লেখা হয় Phi ১.৬১৮ আবার এরূপও লেখা হয় G ১.৬১৮ এই G হচ্ছে Golden ratio- এর সংক্ষেপ। তবে বেশিরভাগ Phiই লেখা হয়।
এতক্ষণ গোল্ডেন রেশিও - র পরিচয় সম্বন্ধে মোটামুটি বর্ণনা পেশ করা হল। এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি। যারা কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর নাভি বলতে চান তারা অক্ষের বিচারে দুইভাবে গোল্ডেন রেশিও দেখান এবং দ্রাঘিমার বিচারে দুইভাবে তা দেখান। এ ছাড়াও আরও একভাবে (কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে) তা দেখান। সর্বমোট ৫টা পদ্ধতিতে তারা কা‘বা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে দেখাতে চান। আর কেউ কেউ একভাবে কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান বলে দেখাতে চান। এই মোট ৬টা পদ্ধতি। নিম্নে পদ্ধতি ষষ্ট ও সে সম্বন্ধে পর্যালোচনা পেশ করা গেল।
১ম পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)
A অংশ ১১১.৮২/১৮০=১.৬০৯।
পর্যালোচনা :
এখানে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হয়নি। কেননা নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হতে হলে দু’টো অনুপাতই (B/ A এবং A /A+ B) ১.৬১৮হতে হবে। এখানে দ্বিতীয় অংশে অনুপাতটি কাছাকাছি হলেও প্রথমটি গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ১১১.৮২ হলে B অংশ হবে (১৮০-১১১.৮২=) ৬৮.১৮। অতএব
A অংশকে B অংশ দ্বারা ভাগ দিলে হবে (১১১.৮২÷৬৮.১৮=) ১.৬৪০। ১.৬৪০ কে কাছাকাছি ধরা হলেও উভয় অনুপাত এক সমান হয়নি অতএব সঠিক গোল্ডেন রেশিও হল না। সঠিক গোল্ডেন রেশিও হতে গেলে উভয় অনুপাত সমান হতে হবে। এতএব অক্ষের বিচারে এখানে গোল্ডেন রেশিও দেখানোর যে চেষ্টা করা হয়েছে তা নিখুঁত নয়। আল্লাহ পাক কা‘বা শরীফকে পরিকল্পিতভাবে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখলে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিওই থাকত। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন খুঁত থাকে না।
বস্তুত মক্কার সঠিক অবস্থান (২১.৪২২ºউত্তর অক্ষাংশ) হিসাবে A অংশ হওয়া চাই ১১১.৪২ এবং B অংশ হওয়া চাই ৬৮.৫৮। তাহলে ১১১.৪২÷৬৮.৫৮=১.৬২৪ এবং ১৮০÷১১১.৪২= ১.৬১৫। দেখা গেল কোনভাবেই সঠিক গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে না।
২য় পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)
দক্ষিণ মেরু থেকে কা‘বার দূরত্ব ১২৩৪৮.৩২ কি. মি। এটা হচ্ছে A অংশ। আর উত্তর মেরু থেকে কা‘বা শরীফের দূরত্ব হচ্ছে ৭৬৩১.৬৮ কি. মি। এটা হচ্ছে B অংশ। টোটাল - ১৯৯৮০ কি. মি। এখানে সবভাবেই গোল্ডেন রেশিও তথা ১.৬১ পাওয়া যায়।
পর্যালোচনা:
কা‘বা শরীফের উত্তর দক্ষিণে যে দূরত্ব দেখানো হয়েছে, (১২৩৪৮.৩২+৭৬৩১.৬৮=১৯৯৮০ কি. মি) তা ভুল। প্রকৃত দূরত্ব হচ্ছে ১২৪২৯.৯ মাইল= ২০০০৩.৯৩ কি. মি। (নেটে Length of Prime meridian সাইটে সার্চ দিলে বিষয়টি পাওয়া যাবে।) সম্ভবত তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ ভুল তথ্য দিয়ে গোল্ডেন রেশিওর নামে ধোঁকা দিতে চেয়েছে।
৩য় পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)
অ অংশ ২১৯.৮২/৩৬০=১.৬১
(অর্থাৎ, তারা বোঝাতে চান কা‘বা শরীফ যেহেতু ৩৯.৮২৬ºঊ য়ে অবস্থিত তাহলে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা থেকে আমেরিকা আফ্রিকার দিক হয়ে কা‘বা শরীফ পর্যন্ত হয় ২১৯.৮২º)
পর্যালোচনা:
(এক) হিসাবে ভুল হয়েছে। সঠিক ফলাফল হবে ১.৬৩৭ আর এটা সঠিক গোল্ডেন রেশিও নয়।
(দুই) এখানে দ্বিতীয় অংশে ১.৬৩৭ তথা গোল্ডেন রেশিওর কাছাকাছি হলেও প্রথম অংশে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ২১৯.৮২ হলে B অংশ হবে (৩৬০-২১৯.৮২=) ১৪০.১৮আর ২১৯.৮২÷ ১৪০.১৮=১.৫৬৮। তাহলে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও গেল না। এ জন্যই সম্ভবত তারা এই প্রথম অংশ হিসেবে দেখান না। অথচ নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও প্রমাণ করতে হলে উভয় অংশেই সমান অনুপাত ১.৬১৮ (বা অন্তত এর কাছাকাছি) থাকতে হবে।
বস্তুত সঠিক গোল্ডেন রেশিওর হিসাব মিলাতে হলে কা‘বার শরীফের অবস্থান হতে হবে ২২২.৪৯২º E তথা ৪২.৪৯º E । তাহলে A অংশ হবে ২২২.৪৯২ আর
B অংশ হবে ১৩৭.৫০৮। তাহলে ৩৬০÷২২২.৪৯২=১.৬১৮ এবং ২২২.৪৯২÷১৩৭.৫০৮=১.৬১৮। উল্লেখ্য, উক্ত ৪২.৪৯º E (এবং ২১.২৪º N )- এর অবস্থানে রয়েছে তুরবা ও রনিয়্যা নামক দুটো অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থান। এ স্থানটি মক্কা শরীফ থেকে তায়েফের অবস্থান যত দূরে তায়েফ থেকে তার চেয়ে প্রায় দেড়গুন দূরে পূর্বদিকে অবস্থিত। আল্লাহ তাআলা যদি কা‘বা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখার পরিকল্পনা রাখতেন তাহলে গোল্ডেন রেশিওর এই নিখুঁত পয়েন্টেই কা‘বা শরীফকে রাখতেন।
(তিন) দ্রাঘিমার বিচারে কা‘বা শরীফকে নাভির স্থানে দেখাতে গিয়ে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নেয়া হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু - এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দু’টো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসেবের সুবিধের জন্য মেনে নেয়া হয়েছে।। কেউ এটা না মেনে ভিন্ন রকম মানচিত্রও দাঁড় করাতে পারে। যেমন ফ্রান্স প্যারিসের উপর দিয়ে অতিক্রান্ত দ্রাঘিমা রেখাকেই মূল মধ্যরেখা গণ্য করে থাকে।
৪র্থ পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)
শোনা যায় তাদের অনেকে প্রশান্ত মহাসাগরকে চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল বলতে চায়। এ হিসেবে তারা কা‘বা শরীফকে নাভি প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন।
পর্যালোচনা:
তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে, চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল ১৭৭.৩৩৪ পূর্ব দ্রাঘিমায়। কেননা পূর্ব দ্রাঘিমার ই অংশ হতে হবে ১৩৭.৫০৮। আর ক’বা শরীফ ৩৯.৮২৬º E তে অবস্থিত। অতএব ৩৯.৮২৬+১৩৭.৫০৮=১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটতে হবে। অথচ ১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটার বিষয় না শরয়ীভাবে প্রমাণিত না বৈজ্ঞানিকভাবে।
৫ম পদ্ধতি
তারা বলতে চান, কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে কা‘বা শরীফ গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে অবস্থিত। তারা বলতে চান, পূর্ব দ্রাঘিমাংশ + ৩৯.৮২ এবং উত্তর অক্ষাংশ + ২১.৪২। এতে কা‘বা শরীফে গোল্ডেন রেশিও প্রমাণিত হয়। এভাবে - ৯০+৩৯.৮২ = ১১১.৪২
সুতরাং ১১১.৮২/১৮০= ০.৬১...
এবং ১৮০+৩৯.৮২ = ২১৯.৮২
সুতরাং ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১...
পর্যালোচনা:
(এক) পুরো হিসেবটাই ভুলে ভরা। কারণ, (১) ৯০ + ৩৯.৮২ = ১১১.৪২ ভুল বরং সঠিক হল ৯০ + ৩৯.৮২ = ১২৯.৮২ (২) অতএব অনিবার্য কারণে পরবর্তী লাইন ১১১.৮২/১৮০ = ০.৬১... এটাও ভুল। বরং এটা হবে ১২৯.৮২/১৮০ = ১.৩৮৬। তাহলে গোল্ডেন রেশিও পাওয়া গেল না। (৩) শেষ লাইনে দেখানো হয়েছে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১... এটাও ভুল। হবে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬৩৭...।
(দুই) ৩য় পদ্ধতির পর্যালোচনায় যা বলা হয়েছিল আবারও তাই বলতে চাই যে, এখানে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নিয়ে হিসেব দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু -
এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দুটো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসাবের সুবিধার জন্য মেনে নেয়া হয়েছে। অতএব এই কল্পিত বিষয়কে কেন্দ্র করে যে গোল্ডেন রেশিও দেখানো হচ্ছে তা কাল্পনিক গোল্ডেন রেশিও হতে পারে বাস্তব গোল্ডেন রেশিও নয়।
৬ষ্ঠ পদ্ধতি
কা‘বা শরীফ পৃথিবীর মাঝখান। কেননা -
(এক) কা‘বা শরীফ থেকে আলাস্কা এবং নিউজিল্যান্ড মাপলে সমান দূরত্ব পাওয়া যায়।
(দুই) কা‘বা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত।
পর্যালোচনা :
১. নিউজিল্যান্ড ছাড়াও তো তার পূর্বে চ্যাথাম দ্বিপ, বাউন্টি দ্বিপ ইত্যাদি রয়েছে, সেগুলোকে হিসেবে কেন ধরা হল না। তাছাড়া আলাস্কা কা‘বা শরীফ থেকে (গ্লোবে) সোজা উত্তরে - এদিকটা ধরা হল,
সোজা দক্ষিণের মাপ কেন আনা হল না। কা‘বা শরীফ থেকে সোজা পূর্ব পশ্চিমের মাপও কেন আনা হল না?
২. কা‘বা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হলে তার বিপরীত দিকের অঞ্চলও তো ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হবে, তাহলে সেটাকেও কি পৃথিবীর মাঝখান বলতে হবে?
সারকথা, কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর নাভি দেখাতে গিয়ে গোল্ডেন রেশিওর যে বর্ণনাগুলো পেশ করা হয়ে থাকে তা হয় ভুল না হয় খুঁতযুক্ত, যা পূর্বে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। আর কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান দেখানোর যে প্রচেষ্টা দেখানো হয়েছে তা একটা খাপছাড়া বিষয়।

অমঙ্গলের পথে শোভা-যাত্রা?

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
.
হামদ ও ছানার পর :
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﺍﻟَّﯿْﻞَ ﻭَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭَ ﺧِﻠْﻔَﺔً ﻟِّﻤَﻦْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺍَﻥْ ﯾَّﺬَّﻛَّﺮَ ﺍَﻭْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺷُﻜُﻮْﺭًﺍ .
ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ : ﻛُﻞُّ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻳَﻐْﺪُﻭ ﻓَﺒَﺎﺋِﻊٌ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﻓَﻤُﻌْﺘِﻘُﻬَﺎ ﺃَﻭْ ﻣُﻮﺑِﻘُﻬَﺎ .
[তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন; তারজন্য, যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিটি মানুষ প্রত্যুষে উপনীত হয়ে নিজেকে বিক্রয় করে। এরপর সে হয়ত নিজেকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩]
হিজরী নববর্ষ শুরু হয়েছে এক দু’মাস আগে। তখন কিন্তু পয়লা মুহাররমের কোনো অনুষ্ঠান করেননি। আসলে ইসলামে থার্টি ফার্স্ট নাইট, পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ নামে কিছু নেই। কারণ এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতায় যদি ভালো কিছু থাকে, তা বছরে একবার করার বিষয় নয়; তা হওয়া দরকার প্রতিদিন। ইসলাম শুধু নববর্ষের কদর করতে বলে না; বরং নব দিন, নবরাত, নবসকাল, নবদুপুর- সকল সময়েরই কদর করতে বলে; এ সবই তো নতুন। সবগুলোই তো আমার ইবাদতের অংশ। এ সবকিছুরই আমার কদর করতে হবে। এ সব কিছুর জন্য আমাকে মুহাসাবা করে ভালোর জন্যে শোকর আদায় করতে হবে, মন্দের জন্যে ইস্তিগফার করতে হবে।
সূরা ফুরকানের উক্ত আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﺍﻟَّﯿْﻞَ ﻭَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭَ ﺧِﻠْﻔَﺔً ﻟِّﻤَﻦْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺍَﻥْ ﯾَّﺬَّﻛَّﺮَ ﺍَﻭْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺷُﻜُﻮْﺭًﺍ .
তিনিই সেই সত্তা যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন তার জন্যে যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২
তো এই যিক্র ও ফিক্র এবং হামদ ও শোকর সময়ের প্রতিটি পরিবর্তনের সময় কাম্য। এই যে দিন রাত আরবীতে কিন্তু এ দুটিকে একসঙ্গে ‘আলজাদীদান’(দুই নতুন) বলা হয়। কারণ প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন। পেছনের কোনো দিন আবার কিন্তু ঘুরে আসছে না। তো যদি আমরা নতুন-এর জন্য কিছু করতে চাই- প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন; প্রতিটি সকাল নতুন, প্রতিটি সন্ধ্যা নতুন। শরীয়তে ইবাদতের বিধান, যিকির ও দুআর অযীফা সেভাবেই দেওয়া হয়েছে। হাদীস শরীফে মুহাসাবার যে তাকীদ করা হয়েছে, তা বছরে একবার নয় সে মুহাসাবা হতে হবে প্রতি সকালে, প্রতি সন্ধ্যায়; ২৪ ঘণ্টায় একবার তো বটেই। শোয়ার সময় তুমি হিসাব লাগাও তোমার দিন কেমন কেটেছে। আজকে কার উপর যুলুম করেছ, কার হক নষ্ট করেছ। তোমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছ কি না। আল্লাহর হকগুলো পালন করেছ কি না। বান্দার হকগুলো আদায় করেছ কি না। দৈনিক কমছেকম একবার তোমার হিসাব মিলাও। শুধু দোকানের খাতার হিসাব নয়, এটাও মিলাও। তোমার নিজের আমলের, নিজের আখলাকের, নিজের চরিত্রের, দিনরাত কার সাথে কী আচরণ করেছ- এরও হিসাব লাগাও। কোন্ আচরণে আল্লাহ খুশি হয়েছেন, কোন্ আচরণে আল্লাহ নারায হয়েছেন। এ হালখাতা বছরে একবার হয় না! এ হালখাতা দৈনিকের!
আলী রা.-এর ঘটনা কতবার শুনিয়েছি- আলী রা. কী বলেছিলেন? আমাদের মাযহাবের ইমামের কী নাম? হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানীফা রাহ.।ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আব্বার নাম ছাবিত। দাদার নাম যূতাহ। প্রথমে তিনি (দাদা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা পারস্যের ছিলেন। অগ্নি পূজক ছিলেন। তাঁর সন্তান হলেন ছাবিত, ছাবিতের সন্তান হলেন ইমাম আবু হানীফা রাহ.।ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর পিতা ছাবিতকে তার আব্বা নিয়ে গিয়েছিলেন আলী রা.-এর কাছে। কুফাতে থাকতেন তাঁরা। আলী রা.ও তাঁর খেলাফতের সময় কুফায় ছিলেন। তিনি ছাবিতকে আলী রা.-এর কাছে নিয়ে বললেন- এ আমার ছেলে। ছাবিত রাহ.-এর জন্য দুআ করে দিয়েছেন আলী রা.।দুআর সময় শুধু ছাবিতের জন্য দুআ করেন নি; ছাবিত এবং তার বংশধরের জন্য করেছেন। ওই দুআর সবচেয়ে বেশি ভাগ পেয়েছেন ইমাম আবু হানীফা রাহ.।যেহেতু আলী রা.-এর সাথে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর দাদার সম্পর্ক ছিল, তাই বিভিন্ন উপলক্ষে যাতায়াত ছিল। তাঁরা যেহেতু পারস্য থেকে এসেছেন, নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এখনও ইসলামের সব বিধিবিধান আয়ত্তে আসেনি। তাই আগের তালে তালে মনে হল যে, আজকে তো আমাদের নওরোয, এটা একটা সুযোগ, তিনি আলী রা.-এর জন্য কিছু হাদিয়া নিলেন। হাদিয়া নিলেন নববর্ষ উপলক্ষে। আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, এটাকী? তিনি বললেন, আজকে তো আমাদের ওখানো (পারস্যে) নওরোয, সে হিসেবে কিছু হাদিয়া আনলাম। এ কথা শুনে আলী রা. বললেন, ‘নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম’(প্রতিটি দিনই আমাদের নববর্ষ)।তুমি তো মুসলিম, ইসলাম গ্রহণ করেছ; জান মুসলিমের নওরোয কী? প্রতিটি দিনই মুসলিমের নওরোয। এটা বছরে একবার আসে না, প্রতিদিন আসে।
এখন আমরা সেই ইসলামী শিক্ষা ভুলে গিয়েছি। যখন আমার প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বাঙালী’, তো বাঙালী নববর্ষ আমি পালন করব। এখন প্রশ্ন হল, বাঙালী নববর্ষ কোন্টা? ২০ বছর আগে আমরা যেটা দেখিছি ওটা? ৫০ বছর আগে যেটা দেখেছি ওটা, নাকি বছর বছর এর সাথে যুক্ত হওয়া সবকিছু? কোন্টার নাম বাঙালী নববর্ষ? আপনারা মুরব্বিরা বলেন আমাদেরকে, কোনটার নাম? আমরা তো ছোট, কালো দাড়িওয়ালা, আপনারা যারা মুরুব্বী আপনারা বলেন, আপনারা কী নববর্ষ দেখেছেন? মুরুব্বীদের দায়িত্বে পড়ে নতুন প্রজন্মকে জানানো, বুঝানো- এটা কি আসলে নববর্ষ পালন, না ঈমান ও আখলাক নষ্ট করা। পশ্চিম বঙ্গে যারা আসা যাওয়া করেন, অনেকের তো বাড়িও আছে পশ্চিম বঙ্গে। এখানে থাকেন, জন্ম হয়েছে পশ্চিম বঙ্গে। কিছু দিন পশ্চিম বঙ্গে কাটিয়েছেন। পশ্চিম বঙ্গে নববর্ষের কথা বলুন। যে ভয়াবহ অবস্থা হয় এখানে, ওখানেও কি ঠিক এরকম?
শুভ নববর্ষ। মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? মঙ্গল-কল্যাণ দান করবেন কে? আল্লাহ। আল্লাহ তাআলার বিধান কি আপনি শোনেন? মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে কি রহমত আছে, কল্যাণ-মঙ্গল আছে? এর সাথে কোনো রহমত নেই, কল্যাণ নেই। আমার নববর্ষ যদি মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে যুক্ত হয়, রহমত আসবে কোত্থেকে? মঙ্গল হবে কীভাবে? আমার বছর শুভ হবে কীভাবে?
যত অশ্লীলতা আছে, আল্লাহ তা অপছন্দ করেন। আল্লাহ কোনো ধরনের অশ্লীলতা পছন্দ করেন না। ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻔُﺤْﺶَ، ﻭَﻟَﺎ ﺍﻟﺘَّﻔَﺤُّﺶَ ।রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পছন্দ করেন না। অশ্লীলতার প্রতি আল্লাহ তাআলার ক্রোধ অনেক বেশি। পৌত্তলিকতার সাথে, অশ্লীলতার সাথে, পর্দাহীনতার সাথে যে যাত্রা হবে সেই যাত্রায় মঙ্গল হবে কীভাবে? এর মাধ্যমে আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? আর যদি আমাদের আকিদা হয় -নাউযুবিল্লাহ- হিন্দুদের মতো! এক একটা দেব-দেবী এক একটার মালিক। ওরা যেভাবে মঙ্গল কামনা করে আমরাও...।তাহলে তো আর ‘লা-ইলাহা ইল্লাহ’থাকল না। শুভ-অশুভর মালিক যদি আল্লাহ হন, লাভ-ক্ষতির মালিক যদি আল্লাহ হন, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক যদি আল্লাহ হন, আমার বছর শুভ হবে কীভাবে তা আল্লাহর কাছ থেকে জানতে হবে। আল্লাহর দ্বীন থেকে আল্লাহর শরীয়ত থেকে জানতে হবে।
আমি মুরুব্বীদের কাছে অনুরোধ করব, সামনের প্রজন্মকে আমরা জানাই- এটা আসলে নববর্ষ নয়, এটা আমাদের ঈমান ও আখলাককে নষ্ট করা। একেকবার একেক ধরনের অশ্লীলতা যোগ হচ্ছে, একেক ধরনের পৌত্তলিকতা যোগ হচ্ছে, আর সব নববর্ষের নাম দিয়ে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। কেউ কিছু বলতে পারবে না; কারণ, বললেই তো শেষ। কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাবে। যে বলল, সে দেশের সভ্যতার বিরুদ্ধে বলল নববর্ষের বিরুদ্ধে বলল। আমরা তো ভয় পাই না। আমরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় পাই। একমাত্র আল্লাহকে ভয় করি। আমরা এসব ফাঁক-ফোঁকর আল্লাহর রহমতে বুঝি। কোন্টা বাঙালী সংস্কৃতি আর কোন্টা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, বাংলার সভ্যতা বলে আমাদেরকে খাইয়ে দিবেন, খেয়ে খেয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম নষ্ট হবে, আমরা কিছু বলতেও পারব না, এই কি তাহলে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ? এটা কী স্বাধীনতা যে, হক কথা বলতে পারব না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সুন্নত মোতাবেক চলার তাওফিক দান করুন। মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলের সুন্নাহ। বাংলার মুমিন হোক, হিন্দুস্তানের মুমিন হোক, পাকিস্তানের মুমিন হোক, আমেরিকার-লন্ডনের মুমিন হোক, যেই জায়গার মুমিন হোক, মুসলিম হোক; মুসলিম আর মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ।
ﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺃُﺳْﻮَﺓٌ ﺣَﺴَﻨَﺔٌ
রাসূলুল্লাহ্র কালচার যা, আমাদের কালচারও তা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সহীহ সমঝ নসীব করুন। আল্লাহ বলেছেন- ﺇِﻥْ ﺗَﻜُﻮﻧُﻮﺍ ﺻَﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
তোমরা যদি উপযুক্ত হয়ে যাও, ভালো হয়ে যাও। ভালো মানে? এমনি বলে দিলাম, সে ভালো মানুষ। এটাকে ভালো বলে না। ভালো মানে, সব দিক থেকে আল্লাহ্র বিচারে, আল্লাহ্র আদালতে আমি উপযুক্ত হই তাহলেই আমি ছালেহ-ভালো। ভালো হলে কী পাওয়া যাবে? আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালেহ হও, আমি চাই তোমরা ছালেহ হয়ে যাও। ছালেহ হলে তোমাদের দোষত্রুটি যা হয়েছে তওবা করে ফেল, ক্ষমা করে দিব। কিন্তু হতে তো হবে! নিয়ত তো করতে হবে ছালেহ হওয়ার, উপযুক্ত হওয়ার, আমরা তো নিয়তই করছি না। হিম্মত করতে হবে, নিয়ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাওফিক নসীব করুন। আমীন!
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ .
[ধারণ : মাওলানা যুবায়ের আহমাদ
অনুলিখন : খায়রুল বাশার]
.
[ মাসিক আলকাউসার » রজব ১৪৩৮ . এপ্রিল ২০১৭ ]

Sunday, April 9, 2017

নম্রতা ও কোমলতা

ইবনে নসীব
মনে করা হয়, রুক্ষতা ও কঠোরতা তারবিয়তের পক্ষে সহায়ক। কিন্তু তা ঠিক নয়। কঠোরতার দ্বারা শিশু-কিশোরদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, একে তারবিয়ত বলে না। প্রকৃত অর্থে তারবিয়ত হচ্ছে শিশুর প্রতিভাগুলোকে বিকশিত হতে সাহায্য করা। মানুষের প্রতিভাগুলো অতি নাযুক ও সংবেদনশীল। সদ্য অঙ্কুরিত চারা গাছের মতোই কোমল। এর পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন খোলা আকাশের আলো আর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা। আলোহীন বদ্ধ ঘরে চারাগাছ যেভাবে হলদে হয়ে শুকিয়ে যায় সেভাবে স্তব্ধ মানসের মধ্যেও প্রতিভাগুলো শুকিয়ে যায়। তাই শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক বিকাশের জন্য তারবিয়তকারীর কোমল আচরণ অতি প্রয়োজন।
শুধু শিশু-কিশোরদের বেলায়ই নয়, সকল শ্রেণীর তারবিয়ত গ্রহণকারীর জন্য নম্রতা ও কোমলতা অত্যন্ত ফলপ্রসু। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-(তরজমা) আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের জন্য কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার চার পাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। অতএব তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং (বিভিন্ন) বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এরপর যখন কোনো বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ হবেন তো আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন।-সূরা আল ইমরান : ১৫৯
এই আয়াতের তাফসীরে মুফতী শফী রাহ. লেখেন-উপরোক্ত বিষয়গুলো থেকে ইসলাহ ও সংশোধন এবং তাবলীগ ও দ্বীন প্রচারের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া গেল। তা এই যে, যে ব্যক্তি মানুষের ইসলাহ ও সংশোধন এবং দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজে আত্ম নিয়োগ করতে চায় তার জন্য উপরোক্ত গুণাবলি-নম্রতা ও সুন্দর ব্যবহার এবং কোমলতা ও ক্ষমাশীলতা, অর্জন করা অপরিহার্য। কেননা, আল্লাহর পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ হতে কঠোরতা হলে তাও মানুষ বরদাশত করতে পারে না তাহলে আর কার পক্ষে সম্ভব হবে যে, রুক্ষতা ও মন্দ ব্যবহার দ্বারা আল্লাহর বান্দাদের নিজের সঙ্গে একত্র করবে এবং তাদের ইসলাহ ও সংশোধনের কাজ আঞ্জাম দিবে?-তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ২/২১৬-২১৭ কোমলতা ও এর ফলাফল উল্লেখ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে বিষয়ে কোমলতা আছে তা সৌন্দর্যমণ্ডিত। আর যেখানে কোমলতা নেই তা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ।-সহীহ মুসলিম হাদীস : ২৫৯৪
কোমলতার দ্বারা মানুষের কথাবার্তা ও আচার-ব্যবহার সুন্দর হয়। আর সুন্দর ব্যবহার মানুষের মনে যে প্রভাব সৃষ্টি করে তা অন্য কোনোভাবে সৃষ্টি হয় না।
এ প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত থেকে কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করছি।
হযরত মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আসসুলামী রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে জামাতে নামায পড়ছিলাম। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি বললাম, ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ।’ এতে অন্য মুসল্লীরা আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, হা! আমার মরণ! তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? এতে তারা আরো বিচলিত হল এবং তাদের উরুতে চাপড় দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করতে চাইল। এতে আমি নিশ্চুপ হলাম। নবীজী যখন নামায সমাপ্ত করলেন-আমার পিতামাতা তাঁর ওপর কুরবান হোক! কোনো শিক্ষককে তাঁর চেয়ে উত্তমরূপে শিক্ষা দিতে আমি দেখিনি! না তার আগে আর না তার পরে।-খোদার কসম, তিনি আমাকে কোনো ধমক দিলেন না, প্রহার করলেন না, কোনো কটুবাক্য বললেন না। শুধু বললেন-‘এ নামাযে জাগতিক কথাবার্তা বলা যায় না।’-সহীহ মুসলিম
আরেকটি দৃষ্টান্ত দেখুন। হযরত আবু উমামা রা. বলেন, এক যুবক এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে যিনা করার অনুমতি দিন।’ একথা শুনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠলেন এবং তাকে তিরস্কার করতে লাগলেন, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার কাছে এস। সে কাছে এল। বললেন, বস। সে বসল। এরপর বললেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এটা পছন্দ করবে?’ সে বলল, না ইয়া রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গিত করুন। কোনো মানুষই তার মায়ের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তাহলে তোমার মেয়ের জন্য?’ যুবকটি বলল, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার
মেয়ের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে তোমার বোনের জন্য?’ যুবক বলল, ‘না ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে তোমার ফুফুর জন্য?’ যুবক বলল, ‘না ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার ফুফুর জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে তোমার খালার জন্য?’ যুবক বলল, না কক্ষনো না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। কোনো মানুষই তার খালার জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শরীরে হাত রাখলেন এবং দুআ করলেন- ইয়া আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করুন, তার অন্তর পবিত্র করুন এবং তার চরিত্র রক্ষা করুন। বর্ণনাকারী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষার ফলাফল এই হল যে, পরবর্তী জীবনে সে কোনো দিকে চোখ তুলেও তাকাত না।- মুসনাদে আহমদ ৫/২৫৬-২৫৭

কওমী মাদরাসা এবং সন্ত্রাসের অভিযোগ : কিছু কথকতা

অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
এ দেশের ঐতিহ্যবাহী কওমী মাদরাসার বিরুদ্ধে বিষোদগারের এক সুগভীর চক্রান্ত নতুনভাবে শুরু হয়েছে। এ চক্রান্তের নেটওয়ার্ক সুবিস্তৃত ও সুসংগঠিত। আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি হচ্ছে এ চক্রান্তের মূল। তাদের বৃত্তিভোগী এজেন্টরা সুকৌশলে কুর’আন ও হাদীসের শিক্ষার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে। এসব এজেন্টরা সরকারের অভ্যন্তরে, বিরোধী দলে, প্রশাসনে, বেসরকারী সেবা সংস্থায়, সংবাদপত্রে ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমানভাবে সক্রিয় থেকে অভিন্ন ভাষায় কথা বলছেন এবং একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন নানা অজুহাত খাড়া করে। এনজিও সমর্থিত বেশ ক‘টি সংবাদপত্র তিলকে তাল করে এবং তালগোল পাকিয়ে তথ্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, যাতে জনমত বিভ্রান্ত হচ্ছে। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলো প্রকৃত অর্থে কোনো সরকারেরই বন্ধু নয়; সরকারকে ব্যবহার করে নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাই হচ্ছে তাদের কর্মকৌশল। ভোলার গ্রীন ক্রিসেন্ট এনজিও প্রতিষ্ঠানকে কওমী মাদরাসা নামে প্রতিষ্ঠিত করার যে আয়োজন চলেছিল তা ছিল একই ষড়যন্ত্রের অংশ বিশেষ। ব্রিটেনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত গ্রীন ক্রিসেন্ট এনজিও কার্যালয় যে আদৌ কোন কওমী মাদরাসা নয় এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। সরকার, সরকারী এজেন্সীসমূহ যে কোন দিন, যে কোন সময়, বাংলাদেশের যে কোন কওমী মাদরাসা পরিদর্শন করতে পারেন, তাদের সার্বিক কর্মকান্ডও মনিটর করতে পারেন। কেবল এক শ্রেণীর বিদ্বিষ্ট সংবাদপত্রের কল্পিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কওমী মাদ্রাসাকে টার্গেট করলে সরকার ও জনগণের মধ্যে অহেতুক দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যাবে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর পরই উত্তর ভারতের দেওবন্দ কেন্দ্রিক যে দ্বীনি শিক্ষাধারা চালু হয়েছিল এখন তা এ উপমহাদেশসহ গোটা দুনিয়ায় কওমী মাদরাসা শিক্ষা নামে বেশ সুখ্যাতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই এ শিক্ষা ধারার উদ্দেশ্য ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার, জান্নাতমুখী জনগোষ্ঠী তৈরীকরণ, সামাজিক কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতা বিদূরিকরণ ও ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন। প্রচলিত ও দলীয় রাজনীতির প্রভাব বলয় থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে কওমী মাদরাসার পরিচালক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ পবিত্র কুরআন, হাদীস, ফিক্হ, ভাষা-সাহিত্য, ক্লাসিক্যাল দর্শনের শিক্ষা ও খিদমত সুচারূরূপে আঞ্জাম দিয়ে আসছেন শত বছর ধরে। বাংলাদেশের বিগত ৩৮ বছরের ইতিহাসে কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী কোন কর্মকান্ডে বা সন্ত্রাসী কোন তৎপরতার সাথে জড়িত থাকার কোন প্রমাণ নেই। কওমী মাদরাসা শিক্ষার সুদীর্ঘ ইতিহাসে খুন-খারাবী, টেন্ডার বা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ন্যুনতম কোন নজির নেই। এসব মাদরাসায় রাজনীতিভিত্তিক কোন ছাত্র সংসদ নেই এবং ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততাও একপ্রকার নিষিদ্ধ। ফলে এখানে বিরাজ করে রাজনীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সুষ্ঠু শিক্ষার শান্ত পরিবেশ। সুতরাং মাদরাসায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পরিকল্পনার প্রশ্নই অবান্তর। আর সন্ত্রাসের আওতায় পড়ে এমন ঘটনা কোথাও ঘটলে তা নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ যদি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারের চেষ্টা চালায়, সে দায় কোন মাদরাসা নিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বা সব মাদরাসাকে ঢালাওভাবে দায়ী করাও যুক্তি সংগত নয়। সত্যিকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ অবদমনে সরকারকে সহযোগিতা করতে এ দেশের ওলামা-মাশায়েখগণ সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত বলেই বার বার প্রমাণিত। স্মর্তব্য যে, কওমী মাদরাসারসমূহ পরিচালিত হয় মূলত এ দেশের জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অর্থায়নে; সরকারী কোন অনুদান তাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে গ্রহণ করেন না। এদেশের কোটি কোটি জনগণের সাথে কওমী মাদরাসার প্রাণের সম্পর্ক বিদ্যমান। কওমী মাদরাসা থেকে পাশ করা ছাত্ররা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরাপের সরকারী-বেসরকারী পদে, মসজিদ, মাদরাসা পরিচালনায়, দাওয়াত-তাবলীগে, সমাজ সংস্কারে, নিরক্ষরতা দূরিকরণে এবং শিক্ষা বিস্তারে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখে চলেছেন। কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ঈমানী চেতনা, মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ ও দেশপ্রেমের আদর্শে প্রবলভাবে উদ্দীপিত। দাওয়াতী মেযাজ সবার মধ্যে কমবেশী ক্রিয়াশীল। আমার ব্যক্তিগত প্রবল অনুমান যে, বর্তমান সরকার ও কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৃতীয় একটি শক্তি সক্রিয়। প্রকাশ্য ও নেপথ্য চক্রান্তের মূল হোতা হচ্ছে এক শ্রেণীর এনজিও। তারা সমান্তরাল একটি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় এবং বিনষ্ট করতে চায় সরকারের ভাবমূর্তি, কারণ এনজিওগুলো এদেশের এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধিত হলেও তাদের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক ইহুদি-খ্রিষ্টান-সাম্রাজ্যবাদী অক্ষ শক্তি। এ দেশের মানুষ ভালভাবে জানেন যে, মাদরাসায় চরিত্রবান ও আদর্শ ছাত্র তৈরী হয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার সাথে দীক্ষার (তারবিয়ত) ব্যবস্থা আছে, যা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ থাকায় কোন ছাত্রসংসদ নেই। ফলে সংগত কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে হানাহানিও নেই। রাজনৈতিক হাঙ্গামা বা সন্ত্রাসের কারণে এদেশের কোন মাদরাসা একদিনের জন্য বন্ধ হয়নি। অথচ এদেশের হাতেগোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কমবেশি সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মিনি ক্যান্টনমেন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন সময় বন্ধ থাকায় প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট সৃষ্টি এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাজারো টগবগে মেধাবী তরুণ নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ধর্ষণ জাতির কপালে কলংকের তিলক রেখা অংকিত করেছে। সামপ্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যেভাবে অস্ত্রের মহড়া চললো এবং প্রাণহানি ঘটলো তাতে পুরো জাতি উদ্বিগ্ন হয়েছে। এতদসত্ত্বেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কোন দাবি কেউ উঠায়টি। তাই সাজানো কিছু নাটক, পাতানো কিছু খেলা ও কল্পিত তথ্যকে ভিত্তি করে কিংবা অতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার সূত্র ধরে মাদরাসা বন্ধের দাবি তোলা রীতিমত হাস্যকর ও উদ্ভট। এদেশে দ্বীনি শিক্ষার বিরুদ্ধে যে চক্রটি সক্রিয়, বিশেষত এনজিও গোষ্ঠী, তারা তাদের এজেন্টদের সহায়তায় এবং নিজস্ব সংবাদপত্রের মাধ্যমে সরকারকে প্ররোচিত করছে, যাতে সরকার মাদরাসার বিরুদ্ধে দমননীতি জোরদার করে এবং নেতিবাচক সিদ্ধান- গ্রহণ করে। সরকারের প্রশাসন যন্ত্রে বা নীতি নির্ধারক মহলে এনজিও সমর্থক যেমন আছেন, তেমনি দ্বীনি শিক্ষাকে মোহাব্বত করেন এমন ব্যক্তিরও আশা করি অভাব নেই। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার প্রকৃত সত্য অনুধাবন এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সেন্টিমেন্ট ও আবেগের দিকে লক্ষ্য রেখে দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষার পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। কারণ এটা বুমেরাং হওয়ার আশংকা আছে। দ্বীনি শিক্ষার বিকাশধারায় সরকার যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন অবদান রাখতে পারেন, তাহলে এটা হবে তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু কায়েমী স্বার্থবাদীদেরক
ে মাদরাসার বিরুদ্ধে বিষোদগার অব্যাহত রাখার সুযোগ দিলে পরিস্থিতি আক্ষেপ, ক্ষোভ ও বেদনার মিলিত সংকট মোহনায় চলে যেতে পারে, এমন আশংকা অমূলক নয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইস্যুর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারকে অকার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার খেলায় মেতে উঠেছে, এ কথাটি সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অখণ্ডতার চেতনাকে দৃঢ়ভাবে লালনের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষাই সত্যিকারের মানুষ গড়ে তোলার আদর্শ শিক্ষাঙ্গন। মাদরাসাগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের দেশপ্রেম, কর্তব্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ব পালন, ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া হয়। নৈতিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সুনাগরিক উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে কওমী মাদরাসাগুলোর রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। বর্তমানে কওমী মাদরাসার ওপর যে সব বহুমূখি বিষোদগার হচ্ছে তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গোটা দেশ জুড়ে প্রতিনিধিত্বশীল কওমী মাদরাসার একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যে প্লাটফরমের মাধ্যমে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সংলাপ, কর্মশালা করে নিজেদের অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা যেতে পারে। এতে এ বিষয়ক অজ্ঞতা ও বিভ্রানি- যেমন দূর হবে তেমনি আন্তরিকতা বাড়বে। সামাজিক ও সেবামূলক বিভিন্ন প্রোগ্রামে মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের সংযুক্তি বাড়াতে হবে। স্থানীয় ছোট ছোট বৈধ উপলক্ষগুলোতেও মাদরাসার পক্ষ থেকে ইতিবাচক অংশগ্রহণ বজায় রাখার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আধুনিক শিক্ষিত ও সাধারণ জনগণকে এ সংগঠনের মাধ্যমে অথবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ দ্বারা কওমী মাদরাসার প্রতি আরো সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলা যাবে। সুচিন্তিত পন্থায় এসব প্রোগ্রামের সঙ্গে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে মাদরাসার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন স্বার্থান্বেষী মহল রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হবে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সাথে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রকার যোগাযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং বাড়িয়ে তুলতে হবে। সাংবাদিকদের মধ্যে বহু দ্বীন দরদী ব্যক্তি আছেন যারা আলেম-উলামা ও মাদ্রাসাকে মুহাব্বত করেন; কিন্তু যোগাযোগের অভাবে গ্যাপ তৈরী হয়ে আছে। এ গ্যাপ যত তাড়াতাড়ি দূর করা সম্ভব হবে ততই মঙ্গল। ইতিবাচক সব কাজ ও লক্ষ্যের সঙ্গে মিডিয়াও কিছুটা অনূকুলে থাকলে আগ্রাসীদের অপতৎপরতা রুখে দেওয়া ইনশাআল্লাহ কোনো কঠিন ব্যাপার হবে না।

শিশু-কিশোর : আমরা কাউকে গালি দিব না

ইবনে নসিব

ভালো মানুষ কখনো গালি দেয় না। দিতেই পারে না। কারো প্রতি রাগান্বিত হলেও সে খারাপ ভাষা ব্যবহার করে না। ভালো মানুষের রাগ প্রকাশের ভঙ্গিটাও হয় সুন্দর ও সংযত। পক্ষান্তরে মন্দ মানুষ যখন রাগান্বিত হয় তখন সে ভুলে যায় ভদ্রতা এবং তার আসল রূপ বের হয়ে পড়ে। সে তখন গালি দিতে থাকে। সে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চায়, কিন্তু নিজেই পরাস্ত হয়ে যায়। কেননা, সবাই তাকে অভদ্র বলে চিনে ফেলে।
কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ভদ্রতা শিক্ষা দিয়েছেন, (তরজমা) ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কোনো দল যেন অপর কোনো দলকে উপহাস না করে। কেননা, যাদের উপহাস করা হল তারা উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অপর নারীদের উপহাস না করে। কেননা, যাদের উপহাস করা হল তারা উপহাসকারীনী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর ফুসূক অতি মন্দ। যারা তওবা করে না তারাই যালেম।’-সূরা হুজুরাত : ১১
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন ও মনাফিকের পরিচয় দিয়ে বলেছেন-‘চারটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে কোনো একটা পাওয়া যাবে তার মধ্যে মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেল, যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। সেই বিষয়গুলো এই যে, যখন তাকে বিশ্বাস করা হয় সে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। যখন কথা বলে তো মিথ্যা বলে। যখন অঙ্গিকার করে তো অঙ্গিকার ভঙ্গ করে এবং যখন বিবাদ-বিসম্বাদে উপনীত হয় তখন অন্যায় পথ অবলম্বন করে।’-সহীহ বুখারী হাদীস : ৩৪; সহীহ মুসলিম হাদীস : ১০৬
অন্য হাদীসে আছে, ‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল ও গালিগালাজকারী হয় না।’-জামে তিরমিযী হাদীস : ২০৪৩ এমনকি ইসলামের মাহাত্ম দেখ। মক্কার কাফিরেরা নবীজীকে কত কষ্ট দিল, সাহাবীদেরকে কষ্ট দিল কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বিজয় দান করলেন তখন কাফিরদের প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলুম করা হয়নি। তাদের জান-মাল, ইযযত-আব্রু সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন এবং মুমিনগণ আল্লাহর আদেশের অনুগত ছিলেন।
ইসলাম এসেছে মানুষকে ভালো বানানোর জন্য। তাই যারা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে তারা হয় ভদ্র ও শালীন। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে বলেছেন, (তরজমা) ‘যারা পবিত্র মসজিদ থেকে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করেছিল, সেই সমপ্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা।’-সূরা মাইদা : ২
এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। এই শিক্ষাই আমাদের জন্য অনুসরণীয়। কেননা, এর চেয়ে উত্তম শিক্ষা আর হতে পারে না। আজকের আধুনিক শিক্ষা আজ পর্যন্ত এই পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এজন্য কোনো ‘শিক্ষিত’ মানুষকেও যদি দেখি তিনি তার প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করছেন এবং বিভিন্ন মন্দ উপাধী ব্যবহার করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছেন তবে তার ওই কাজটা আমরা বর্জন করব। তিনি ‘শিক্ষিত’ বা ‘ভদ্র’ বলেই তার অভদ্র আচরণকে আমরা অনুসরণ করব না।
আমরা কিন্তু এমন দৃষ্টান্ত অহরহ দেখছি। বেশ কিছুদিন আগে একজন ‘শিক্ষিত’ মানুষ একটি দৈনিক পত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন। তাতে তিনি কী ধরনের শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন দেখ-‘ধর্মান্ধ এই শক্তিটা হচ্ছে অশুভ শক্তি। আমাদের দেশে এই অশুভ শক্তিটা কীভাবে জানি নিজেদের উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়িত করে ফেলছে। তাঁরা (যারা এই শক্তিকে সহযোগিতা করেন) যদি সারাক্ষণ ধর্মব্যবসায়ীদের মতো ‘ইসলাম গেল, ইসলাম গেল, বলে আহাজারি করতেন তাহলেও আমরা বুঝতে পারতাম। কিন্তু আধুনিক চেহারার প্রগতিশীল মানুষ কাজ করে যাচ্ছেন মধ্যযুগের ধর্মান্ধ মানুষের জন্য-এর চেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।
‘... যাদের লক্ষ্য করে এই আলোচনা (অর্থাৎ মাদারাসার ছাত্র-শিক্ষক) তাদের কানে তুলো ঠেসে দেওয়া হয়েছে, কালো কাপড় দিয়ে তাদের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কাজেই সেই আলোচনা বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই।’
(ড. জাফর ইকবাল, এখন তারুণ্যের সময়, দৈনিক প্রথম আলো) পুরো নিবন্ধে বহুবার তিনি এভাবে গালাগালি করেছেন।
আরেকজনের দৃষ্টান্ত দেই। তিনিও একজন অধ্যাপক।
বললেন, ‘চারদিকে দাঁতাল দানবেরা মাথা তুলে দাড়িয়েছে। অসহায়দের (অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক, সংস্কৃতির প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার আহ্বান, দৈনিক প্রথম আলো ১৫ নভেম্বর ’০৮)
এ ধরনের বাক্যই তারা লিখে থাকেন এবং সেগুলো পত্রিকার পাতার প্রকাশিতও হয়। তা লেখুন গে। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু তাঁরা যে নিজেদেরকে ভদ্র, শিক্ষিত, সুশীল এবং আলোকিত মানুষ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন! এগুলোও কি তাদের আলোকিত কর্মকাণ্ড! আমরা এই চরিত্র অনুসরণ করব না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হবে শালীন ও যুক্তিপূর্ণ। আমরা মোকাবেলা করব দলীলপ্রমাণ দিয়ে, গালাগাল দিয়ে নয়। আমাদের আদর্শ ও সুমহান ঐতিহ্য এরই নির্দেশনা দেয়।
আমাদের আদর্শ আলকুরআন ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ। আমাদের রয়েছে সাহাবা-তাবেয়ীন এবং ফুকাহা-মুহাদ্দিসীনের আদর্শিক উত্তরাধিকার। তাহলে আমরা কেন বিভ্রান্ত হব? এই আদর্শ আমাদেরকে আলোকিত পথে মনযিলে মাকসূদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বলাবাহুল্য, সে আদর্শের ধারে কাছে পৌঁছতেও আমাদের ‘সুশীল’ বন্ধুদের অনেক সময় লাগবে।

Saturday, April 8, 2017

মোবাইল ব্যাংকিং : পর্যালোচনা ও শরঈ দৃষ্টিকোণ

 মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

দেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হওয়ার পর থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এ বিষয়ে শরীয়তের হুকুম জানতে চাচ্ছেন। আজকের নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা একমাত্র তাওফীকদাতা।
শরঈ আলোচনা শুরু করার আগে মোবাইল ব্যাংকিং-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জানা যাক।
মোবাইল ব্যাংকিং কী?
এককথায় বলতে গেলে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের নামই হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং। শাখা বা অফিসবিহীন এ ব্যাংকিং জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রথমে ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ বাংলা ব্যাংক এ কার্যক্রম শুরু করলেও এখন অনেক ব্যাংকই এ ধারায় প্রবেশ করছে। সন্দেহ নেই, মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।
কি কি সেবা দিয়ে থাকে?
এখন পর্যন্ত যে সেবাসমূহ মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো দিচ্ছে তা নিম্নরূপ :
১. এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা প্রেরণ।
২. মোবাইল ফোন রিচার্জ।
৩. মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে জমা টাকা এজেন্ট থেকে উত্তোলন।
৪. মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে জমা টাকা ব্যাংকের এটিএম থেকে উত্তোলন।
৫. মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টের টাকা ব্যাংক একাউন্টে এবং ব্যাংক একাউন্টের টাকা মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে স্থানান্তর।
৬. নির্ধারিত দোকানপাট ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ সুবিধা।
৭. দেশের বাইরে বসবাসরত আপনজন কর্তৃক প্রেরিত অর্থ (র্যামিটেন্স) গ্রহণ।
এছাড়া একাউন্টধারী কর্তৃক নিজ হিসাবের স্থিতি, মিনি স্টেটম্যান্ট দেখার সুবিধাও রয়েছে।
মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়?
দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তফসীলী ব্যাংকগুলো এ ব্যবসা করে থাকে। এজন্য তাদেরকে মোবাইল কোম্পানিগুলোর সাথেও চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হয়। মোবাইল অপারেটরদের দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে শাখাবিহীন এ মিনি ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে ব্যাংকগুলো।
অনেকগুলো পক্ষের সংশ্লিষ্টতায় এ কারবার পরিচালিত হয়ে থাকে। যেমন,
ক) মূল কোম্পানি। যথা, বিকাশ, এমক্যাশ ইত্যাদি।
খ) মোবাইল কোম্পানিগুলো।
গ) ডিস্ট্রিবিউটর।
ঘ) এজেন্ট।
ঙ) গ্রাহক তথা একাউন্ট হোল্ডার। এছাড়াও রয়েছে,
চ) বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা ও সেবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান যাদেরকে মার্চেন্ট বলা হয়।
ছ) প্রবাসী অর্থ তথা রেমিটেন্স গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে ভিন্ন চুক্তি।
মূলকাজ
মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্যাবলি ও তাদের প্রচারপত্র পড়ে দেখা হয়েছে। কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন এজেন্টদের সাথে এবং উচ্চপদসস্থ মোবাইল ফোন কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তার সাথে। সবকিছু দেখে ও শুনে যা স্পষ্ট হয়েছে তা হল, মূলত গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী লোকদেরকে কিছুটা ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার মানসেই এ কার্যক্রমের সূত্রপাত ঘটেছে। এবং যত সেবাই মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে দেওয়া হোক এর মধ্যে সবগুলোর শীর্ষে রয়েছে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে টাকা প্রেরণ ও গ্রহণ। মোবাইল ব্যাংকিং-এর পরিভাষায় যাকে বলা হয় সেন্ড মানি ও ক্যাশ আউট। অর্থাৎ ব্যাংকের টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার (টিটি) এবং ডাক বিভাগের মানি অর্ডারের সহজ বিকল্প হচ্ছে বর্তমান সময়ের মোবাইল ব্যাংকিং।
শরঈ বিশ্লেষণ
এবার মোবাইল ব্যাংকিং-এর বর্তমান কার্যক্রমকে একে একে ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করা যাক।
একাউন্ট খোলা
মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধাগুলো নেওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির একটি একাউন্ট থাকতে হয়, যে কোনো ব্যক্তি কোম্পানির এজেন্টদের কাছে গিয়ে নির্ধারিত ফরম পূরণের মাধ্যমে এ একাউন্ট খুলতে পারে। (যদিও টাকা প্রেরণ ও গ্রহণের জন্য নিজস্ব একাউন্ট না থাকলেও চলে। সেক্ষেত্রে এজেন্টদের মাধ্যমে তা করা যায়।) আমরা বিকাশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং, এমক্যাশসহ কয়েকটি কোম্পানির একাউন্ট খোলার ফরম ও নিয়মাবলি পড়ে দেখেছি। সেগুলোতে মৌলিকভাবে শরীয়া পরিপন্থী কোনো শর্ত আছে বলে মনে হয়নি। তবে ভবিষ্যতে নিয়মাবলি পরিবর্তন করার একক অধিকার কোম্পানি বহন করবে এমন শর্ত শরীয়তের
‘আলইজারা’ নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং উভয় পক্ষের সম্মতিতে এমনটি করাই শরীয়তের নিয়ম। বিকাশ এর একাউন্ট ফরমের অপর পৃষ্ঠায় ছাপানো শর্তাবলির ১১ নং ধারায় বলা হয়েছে
‘‘গ্রাহককে কোনো পূর্ব ঘোষণা অথবা বিজ্ঞাপনজারি ব্যতিরেকে যে কোনো সময়ে যে কোনোভাবে বর্তমান নিয়মাবলি সংশোধন, উন্নয়ন, পরিবর্তন করার ক্ষমতা বিকাশ সংরক্ষণ করে।’’ ভাবতে অবাক লাগে, এ ধরনের একচ্ছত্র ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন করে কি করে? একটি চুক্তি মানেই হল তাতে একাধিক পক্ষ জড়িত। সেখানে কোনো এক পক্ষের এত নিরঙ্কুশ অধিকার ভোগ করা কোনোক্রমেই ইনসাফপূর্ণ নয়। বিষয়টি এমনও হতে পারত যে, কোনো সময় নিয়মাবলি পরিবর্তন, সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করে এবং গ্রাহকের মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে জানানো হবে।
তবে যেহেতু একজন একাউন্ট হোল্ডার যে কোনো সময় কোনো খরচ ছাড়াই তার একাউন্ট বন্ধ করে দিতে পারে, তাই উপরোক্ত শর্তের কারণে একাউন্ট খোলা নাজায়েয হবে বলে মনে হয় না।
বিকাশ ফরমের ৭নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘গ্রাহক হিসাবে জমাকৃত তহবিল নিরাপত্তা জামানত বিবেচিত হবে। বিকাশ এর নিকট কৃত অঙ্গীকার এবং/অথবা দায়িত্ব অগ্রাহ্য অথবা যথাযথ পূরণ না করা হলে কোনো পূর্ব ঘোষণা প্রদান ব্যতিরেকে উক্ত তহবিল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যবহারের অধিকার বিকাশ সংরক্ষণ করে।’’ এ ধারাটি দেখলে কারো হয়ত ফিকহে ইসলামীর ‘রাহান’ বলে সন্দেহ হতে পারে। বাস্তবে এটি ‘রাহান’ নয়। কারণ ‘রাহান’ হয় কোনো জিম্মা/পাওনার নিরাপত্তার জন্য, কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটি উল্টো। একাউন্ট হোল্ডারের টাকা বরং কোম্পানির কাছে জমা থাকে। কোম্পানি তার কাছে কিছু পাওনা থাকে না। এটি হয়ত প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফিকহে ইসলামীর ‘আযযফার বিল হক’-এর মাসআলার সাথে মিলতে পারে।
বিকাশ এর শর্তাবলির ১৩ নং ধারায় বলা হয়েছে,
‘‘বিকাশ একাউন্ট-এ জমাকৃত টাকার উপর কোনো প্রকার সুদ প্রদান করা বা না করার যাবতীয় অধিকার বিকাশ সংরক্ষণ করে।’’ বলা নিষ্প্রয়োজন যে, একজন মুসলমানের কোনোক্রমেই সুদ গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তাই ভবিষ্যতে কখনো মোবাইল একাউন্টধারীকে সুদ দেওয়া হলে কিছুতেই তা ব্যবহার করবে না-এমন সংকল্প ফরমে দস্তখত করার সময়েই মনে মনে রাখতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকের এমক্যাশ-এর প্রচার পত্রে এজেন্টদের জন্য একটি অতিরিক্ত শর্ত দেখা গেল। তা হচ্ছে, এজেন্টকে ২৫০০০/- টাকা ইসলামী ব্যাংকে এফডিআর করে রাখতে হবে। যার উপর তাকে মুনাফা দেওয়া হবে। এটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয় শর্ত। যেখানে অন্যান্য কোম্পানি কোনো জামানত নিচ্ছে না, সেখানে এমক্যাশ কেন জামানত নিচ্ছে? আর ইসলামী ব্যাংকগুলো শরীয়া পরিপালনে এত নিষ্ঠাবানও হয়ে উঠেনি যে, তারা মানুষকে হালাল মুনাফা প্রদানের গ্যারান্টি দিবে। মোটকথা মোবাইল একাউন্টে যেহেতু সামান্য টাকাই জমা রাখার সুযোগ আছে তাই এর উপর সুদ বা মুনাফা দেওয়ার বিষয়টি জড়িত করার কোনোই দরকার নেই। এ বিষয়ে সামনে আরো কিছু কথা আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
ক্যাশইন
মোবাইল একাউন্ট খোলার পর গ্রাহক নিজ একাউন্টে এজেন্টের মাধ্যমে টাকা জমা করতে পারেন, কোনো কোনো মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানি তাদের ব্যাংকে গ্রাহকের একাউন্ট থাকলে সেখান থেকেও মোবাইল একাউন্টে স্থানান্তরের সুবিধা দিয়ে থাকে। এ সুবিধাগুলো বিনামূল্যে বা ন্যূনতম (ফ্ল্যাট রেটে) মাশুলে (৫/১০ টাকা) হয়ে থাকে। অতএব এতে শরয়ী অসুবিধা আছে বলে মনে হয় না।
সেন্ড মানি
একজন মোবাইল একাউন্টধারী তার হিসাব থেকে অন্য একাউন্টধারীর হিসাবে নির্ধারিত পরিমাণে টাকা পাঠাতে পারে। এটিকে বলা হচ্ছে সেন্ড মানি। ২/৫ টাকার ফ্ল্যাট রেটে এই সুবিধা দেওয়া হয়। এতেও শরয়ী সমস্যা নেই।
ক্যাশ আউট
মোবাইল ব্যাংকিং-এর বহুল ব্যবহৃত সুবিধা এটি। নিজ একাউন্ট থেকে অথবা এজেন্টের কাছে প্রেরিত টাকা উত্তোলনই মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে সবচাইতে বেশি হয়ে থাকে। আর দুঃখজনক সত্য হল এ সেবাটির জন্যেই মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানি অনেক বেশি মাশুল নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের চার্জ হচ্ছে ১.৮৫% তথা প্রতি ১০০ টাকায় এক টাকা পঁচাশি পয়সা। আর হাজারে ১৮.৫০ টাকা।
সংশ্লিষ্ট এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, মোবাইল অপারেটরকে এ টাকা থেকে নির্ধারিত কমিশন প্রদানের পর অবশিষ্টাংশ কোম্পানি তথা ব্যাংক পেয়ে থাকে।
ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে এটি ‘আলইজারাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে টাকা জমা/উত্তোলনকারী হচ্ছে শ্রম/সেবা গ্রহীতা বা ‘মুসতাজির’। আর এজেন্ট হচ্ছে শ্রম/সেবাদাতা যাকে বলা হয়
‘আজীর’ (আলোচিত ক্ষেত্রে মূল ‘আজীরে’র প্রতিনিধি)। এক সময়ে ডাক বিভাগের মানি অর্ডারকেও তখনকার উলামায়ে কেরাম এভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। ‘আলইজারা’ এর মৌলিক শর্তগুলো পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টিকে জায়েয বলা যায় তবে এক্ষেত্রে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। যথা :
১. ক্যাশ আউটের বর্তমান চার্জ সার্বিক বিবেচনায় পরিমাণে বেশি। যেহেতু কোম্পানিকে কোনো পর্যায়েই নিজ থেকে কোনো টাকা দিতে হয় না; বরং বিভিন্ন পর্যায়ে ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট ও গ্রাহকের অনেক অনেক টাকা তাদের কাছে জমা থাকে তাই এ সার্ভিসটির চার্জ আরো কম হওয়া উচিত। জনবহুল বাংলাদেশে সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় সামান্য চার্জ নিলেও তা একত্র হয়ে মোটা অংকের টাকায় পরিণত হবে। সরকারী নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।
২. বর্তমান নিয়মে টাকা যত বাড়বে চার্জও একই হারে বাড়বে। এটি সংশোধন করে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ একটি সীমা নির্ধারণ করা দরকার। কারণ টাকার অংক বাড়লেও সার্ভিস তো সমানই হচ্ছে। বর্তমান নিয়মে কোনো প্রবাসী যদি আপনজনের মোবাইল একাউন্টে এক লক্ষ টাকা প্রেরণ করে তবে সে টাকা ক্যাশ আউট (উত্তোলন) করতে গিয়ে তাকে গুণতে হবে ১৮৫০/- টাকা। যা অবশ্যই জুলুম।
৩. অভিযোগ আছে যে, কোনো কোনো এজেন্ট ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি রাখে। হাজারে ১৮.৫০ টাকার জায়গায় ২০/- টাকা রাখার কথা তো ব্যাপকভাবেই শোনা যায়। কেউ কেউ নাকি তার চেয়েও বেশি নিয়ে থাকে। এটি কোনোক্রমেই জায়েয হবে না। মনে রাখতে হবে, এজেন্টগণ হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির নিযুক্ত শ্রম/সেবাদাতা প্রতিনিধি (উকীল)। কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত চার্জের বেশি নেওয়ার অধিকার তাদের নেই।
ব্যাংকের কাউন্টারে অফিসার কর্তৃক নির্ধারিত চার্জের অতিরিক্ত নেওয়া যেমন রিশওয়াত তথা উৎকোচের শামিল হবে এক্ষেত্রেও বিষয়টি এমনি দাঁড়াবে। কোম্পানিগুলোকে এ দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার, যেন সাধারণ মানুষ তাদের কোনো এজেন্ট কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
৪. কেউ কেউ পার্সোনাল একাউন্ট দ্বারাও ব্যবসা করে থাকে। আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ। এমনটি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. আর এটিএম থেকে ক্যাশ আউটের হার বিকাশ রেখে থাকে হাজারে ২০ টাকা। অথচ এখানে এজেন্ট বা ডিস্ট্রিবিউটর কারো মধ্যস্থতা নেই।
শুধু এটিএম-এর সাথে মোবাইল ব্যাংকিং সফটওয়্যার এর লিংক স্থাপিত করলেই হল। তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে এটিএম থেকে নিজের জমা টাকা উঠাতে ২% চার্জ দেওয়া কতটুকু জুলুম তা ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। হয়ত বিকাশ তার এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটরদের সুবিধা দিয়ে ব্যবসা বাড়ানোর মানসেই এ কৌশল নিয়েছে। কিন্তু গ্রাহকদের স্বার্থ কি উপেক্ষিতই থাকবে? এক্ষেত্রে কোনোক্রমেই ৫/১০ টাকার বেশি চার্জ হওয়া উচিত নয়। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের চার্জ এক্ষেত্রে বর্তমানে কম ও যুক্তিসঙ্গত।
মোবাইল রিচার্জ
মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের নিজ নিজ একাউন্টের মাধ্যমে মোবাইল ফোন রিচার্জের সুযোগও দিয়ে থাকে। এ জন্য বাড়তি কোনো ফী নেওয়া হয় না। তবে মোবাইল অপারেটরদের থেকে তারা কমিশন পেয়ে থাকে নিশ্চয়ই। শরীয়তের দৃষ্টিতে এতে সমস্যা নেই।
রেমিটেন্স গ্রহণ
আরেকটি সেবা দেওয়া হয় বিদেশ থেকে প্রেরিত টাকা মোবাইল একাউন্টে গ্রহণের। প্রেরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা না দিতে হলেও উত্তোলনের ক্ষেত্রে ক্যাশ আউটের পুরো ফী-ই গ্রাহককে প্রদান করতে হয়। আগেই বলা হয়েছে যে, বর্তমানে তা হাজারে ১৮.৫০ টাকা ও লাখে ১৮৫০ টাকা। মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের উপর এটি অন্যায় হস্তক্ষেপ। তবে কোনো গ্রাহক মোবাইল একাউন্টের মাধ্যমে রেমিটেন্স গ্রহণ করলে তা নাজায়েয হবে না।
পেমেন্ট
মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো বর্তমানে গ্রাহকদেরকে নিজ নিজ একাউন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে খরিদকৃত পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধেরও সুযোগ দিচ্ছে। এর জন্য গ্রাহক থেকে অতিরিক্ত চার্জ করা হয় না। পণ্য বিক্রয়কারী বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় ‘মার্চেন্ট।’ গ্রাহকের মোবাইল একাউন্ট এবং এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটরের একাউন্টের মতো তাদেরও থাকে মার্চেন্ট একাউন্ট। কোম্পানি মার্চেন্ট থেকে কমিশন পেয়ে থাকে।
এটিকে তুলনা করা যায় ডেবিটকার্ড ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের সাথে। মৌলিকভাবে এটি জায়েয। তবে একটি বিষয় লক্ষণ্যীয়। তা হচ্ছে, যদিও বাহ্যিকভাবে এসকল সেবার মাধ্যমে মানুষ ক্যাশ টাকা বহন করার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে কিন্তু ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল একাউন্ট থেকে পেমেন্ট ইত্যাদি সুবিধা ব্যাংকগুলো আবিষ্কার করেছে তাদের লাভের জন্য। এসবের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো মার্চেন্ট তথা ব্যবসায়ীর লাভে ভাগ বসিয়ে থাকে। নিয়ে থাকে বিভিন্ন হারে কমিশন। যা সুস্পষ্ট মধ্যসত্ত্বভোগ। কারণ আধুনিক মার্চেন্টগণ এসব কমিশন ও চার্জের কথা মাথায় রেখেই তাদের পণ্য/সেবার মূল্য বাড়িয়ে ধরে থাকে। যার মাশুল গুণতে হয় সাধারণ ভোক্তাকে। ইসলাম এ ধরনের মধ্যসত্ত্বভোগকে নিরুৎসাহিত করে থাকে।
মোবাইল একাউন্টধারী একজন গ্রাহক বর্তমানে উপরোল্লেখিত সেবাগুলোই পেয়ে থাকে।
প্রসঙ্গ সুদ
শোনা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা জারি করা হতে পারে যেন গ্রাহক একাউন্টকে সেভিংস একাউন্ট হিসাবে ধরে একাউন্ট ব্যালেন্স এর উপর সুদপ্রদান করা হয়। এমনটি করা হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক নিন্দনীয় কাজ। এ কথা অনুধাবন করা দরকার যে, মানুষ টাকা জমা রাখা বা সুদ/মুনাফার জন্য মোবাইল একাউন্ট করে না। এখানে তার টাকা থাকে প্রয়োজনে আপনজনকে প্রেরণ বা দরকারি কাজে লাগানোর জন্য। অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান গ্রাহক, এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটর মোবাইল ব্যাংকিং-এর সাথে জড়িত। তাদেরকে সুদের মতো একটি নিকৃষ্ট হারামের সাথে জুড়ে দেওয়া কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারে না। (এমনটি করা হলে এমক্যাশ ওয়ালারা হয়ত তাদের একাউন্টকে মুদারাবা বলে দাবি করে মুনাফা দেওয়ার কথাও বলতে পারে!) কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়ত ভাবছে গ্রাহককে সুদপ্রদান করা হলে তারা সেখানে ১০/১৫% হারে ভ্যাট বসাতে পারবে।
এ চিন্তা বাদ দিয়ে তাদেরকে ভাবা দরকার কিভাবে মোবাইল ব্যাংকিং-এর চার্জগুলো, বিশেষত ক্যাশ আউটের চার্জ কমানো যায়। সুদের উপর ভ্যাট বসিয়ে লাভবান না হয়ে তারা বরং নজরদারির জন্য ব্যাংকগুলো থেকে ন্যায়সঙ্গত ফী নিতে পারে। মনে রাখা দরকার যে, অসংখ্য অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত লোক প্রয়োজনের তাকিদে মোবাইল ব্যাংকিং এর গ্রাহক হয়েছে ও হচ্ছে। তাদের একাউন্টে ১০/২০ টাকা সুদ দেওয়া হলে তাদের তেমন কোনো লাভ হবে না কিন্তু ঐ টাকা হিসাব করে আলাদা করা এবং তা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হবে। সুতরাং আমরা জোর দিয়েই বলতে চাই, যেন মোবাইল একাউন্টকে সেভিংস একাউন্ট ঘোষণা করা না হয়।
উপসংহার
মোটকথা হল, সার্বিক বিবেচনায় (আমাদের জানা তথ্যগুলো অনুযায়ী) বর্তমানে প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম জায়েয। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগণকে উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার। অদ্য ২২/০৯/২০১৩ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী উপরোক্ত আলোচনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানি কোনো নতুন নিয়ম করলে সেক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য কোনো আলেম থেকে পুনরায় মাসআলা জেনে নিতে হবে।

Wednesday, April 5, 2017

মক্কা-মদিনার ইমামগনের তালিকা


মক্কা
ﺻﺎﻟﺢ ﺁﻝ ﻃﺎﻟﺐ - Sheikh Aal Talib
ﻋﺒﺪﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺠﻬﻨﻲ - Sheikh Juhany
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺴﺪﻳﺲ - Sheikh Sudais
ﺧﺎﻟﺪ ﺍﻟﻐﺎﻣﺪﻱ - Khalid Al Ghamdi
ﻣﺎﻫﺮ ﺍﻟﻤﻌﻴﻘﻠﻲ - Mahir Al Mu'ayqali
ﻓﻴﺼﻞ ﻏﺰﺍﻭﻱ - Sheikh Ghazzawi
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺸﺮﻳﻢ - Sheikh Shuraim
ﺷﻴﺦ ﺑﻠﻴﻠﺔ - Sheikh Baleela
ﺷﻴﺦ ﺣﻤﻴﺪ - Sheikh Humaid
ﺷﻴﺦ ﺧﻴﺎﻁ - Sheikh Khayyat
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺴﺒﻴﻞ - Sheikh Subbyyil
ﺷﻴﺦ ﻋﻠﻲ ﺟﺎﺑﺮ - Sheikh Jaber
ﺍﻟﺸﻴﺦ ﺍﻟﻜﻠﺒﺎﻧﻰ - Sheikh Kalbani
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺪﻭﺳﺮﻱ - Sheikh Dosary
ﻋﺒﺪﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺨﻠﻴﻔﻲ - Sheikh Khulaifi
ﺷﻴﺦ ﻋﻤﺮ ﺍﻟﺴﺒﻴﻞ - Sheikh Omer Makkah Imams
মদিনা
ﺍﻟﺸﻴﺦ ﺇﺑﻦ ﺣﻤﻴﺪ - Sheikh Hameed
ﺍﻟﺸﻴﺦ ﺍﻷﺧﻀﺮ - Sheikh Al Akhdar
ﺍﻟﺸﻴﺦ ﺍﻟﺒﻌﻴﺠﺎﻥ - Sheikh Bu'ayjaan
ﺷﻴﺦ ﺁﻝ ﺍﻟﺸﻴﺦ - Sheikh Ale Sheikh
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺒﺪﻳﺮ - Sheikh Budair
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺜﺒﻴﺘﻲ - Sheikh Thubaity
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﺤﺬﻳﻔﻲ - Sheikh Hudaify
ﺷﻴﺦ ﺍﻟﻘﺎﺳﻢ - Sheikh Qasim
ﻣﺤﻤﺪ ﺃﻳﻮﺏ - Sheikh Ayub

Sunday, April 2, 2017

বেফাক পরিচিতি

দেশে প্রচলিত কওমী মাদরাসাসমূহের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বোর্ড হচ্ছে বেফাকুল
মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড), সংক্ষেপে বেফাক। ১৯৭৮ সনের এপ্রিল মাসে ৩ দিনব্যাপী মহাসম্মেলনের আয়োজন করে এবং দেশের ছোট বড় সর্বস্তরের কওমী মাদরাসা সমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ, পূর্ব প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক বোর্ড সমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং দেশের উলামা-মাশাইখগণের উপস্থিতিতে ও সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে একমাত্র ও একক প্রতিষ্ঠান ও বোর্ড হিসেবে বেফাক প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চিন্তাধারা এবং দারুল উলূম দেওবন্দের অনুসরণীয় পথই হবে
কওমী মাদরাসাসমূহের এবং বেফাক-এর একমাত্র পথ ও আদর্শ।
০১. কওমী মাদরাসা সমূহকে এক প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ করা। ০২. তালীম ও তারবিয়াতের মান উন্নয়ন। ০৩. সমাজের দ্বীনী চাহিদা পূরণ। ০৪. ইসলামের হিফাযত, প্রচার, প্রসার, দাওয়াত ও তাবলীগ এবং ইসলামের উপর আবর্তিত যে কোন হামলার সুদৃঢ় ও প্রামাণ্য জবাব দান। ০৫. সমাজে উলামায়ে
কিরামের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিষ্ঠা। ০৬. সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সমূহ কর্মসূচী গ্রহণ। ০৭. মাদরাসা ফারেগীনদের জন্য তাখাছ্ছুছ্ কোর্স ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরণ। ০৮. ইসলামের মূল ঘাটি মসজিদ সমূহের মান উন্নয়ন এবং পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ নির্মাণ ও মসজিদকেন্দ্রিক মক্তব প্রতিষ্ঠা ও এর মান উন্নয়ন। ০৯. জনগণের ধর্মীয় চাহিদা পূরণ করার জন্য বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ। ১০. দ্বীনের হিফাযতের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় কর্মসূচী গ্রহণ। ১১. আধুনিক সমস্যাবলীর ইসলামী সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ।
০১. শিক্ষকদেরকে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দান। ০২. শ্রেণী শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা গ্রহণ এবং সনদ ও বৃত্তি দান। ০৩. নেছাবে তা’লীমের সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ। ০৪. পাঠদান পদ্ধতির মান উন্নয়ন। ০৫. ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তক এবং দ্বীন প্রচারমূলক ও দ্বীন বিরোধী ষড়যন্ত্রের জবাব দান মূলক বই পুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশ। ০৬. মাদরাসা পরিদর্শন। ০৭. মাদরাসার হিসাব নিরীক্ষণ ও হিসাব রক্ষকদের প্রশিক্ষণ দান। ০৮. নিরক্ষরতা ও মূর্খতা দূরীকরণ কল্পে মসজিদকেন্দ্রিক মকতব শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থাকরণ। ০৯. আধুনিক সমস্যাবলীর ইসলামী সমাধান পেশকল্পে দারুল ইফতা প্রতিষ্ঠা এবং ফতোয়া দানের ব্যবস্থাকরণ। ১০. প্রশিক্ষণমূলক ও বিশেষায়িত কোর্স চালু করে ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে দক্ষ, বিশেষজ্ঞ ও গবেষক তৈরি করা।

মাহফিল নয়.... দাওয়াতের মিশন: হারুন ইজহার

যেখানে ইমান জাগল...
 চিন্তা শাণিত হল...
স্বপ্ন উঁকি দিল...
 তাকবীর ধ্বনিত হল...
দাওয়াত বিকশিত হল...
তাওহীদের প্যান্ডেলে ওলামা- জনতা- প্রশাসন একাকার হল...
নাস্তিক্যবাদ ধিকৃত হল...
সন্ত্রাসবাদ অস্বীকৃত হল...
শান্তির কথা উচ্চারিত হল...
 সমাজবিপ্লবের ম্যাপ অঙ্কিত হল...
শত্রু-মিত্র তত্ত্ব হাজির হল...
সীরাতে রাসূলের কথা বিবৃত হল...
 কোরআানে পানে সকলকেই ফিরে আসতে বলা হল...
নবচেতনার আযান দেয়া হল....
বাকি ভরসাটুকু একমাত্র মহান আল্লাহর উপর।
ইসলামী মহাসম্মেলন-৩১ মার্চ, জামেয়া লালখানবাজার চট্টগ্রাম;

Saturday, April 1, 2017

আব্দুল্লা'র কুড়ানো প্রেম 'ব্রেকআপ' অ্যাট ফাস্ট সাইট!


রশীদ জামীল
 পথ আগলে দাঁড়ালো মেয়ে। সামনে এসে কোনো রকম ভনিতা ছাড়া সরাসরিই বলে ফেললো, আই লাভ য়্যূ! ভিষম খেলেন আব্দুল্লাহ।
- হোয়াট!
- আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। উইল ইউ মেরি মী?
- হোয়াট!!
- প্লিজ মেরি মী, প্লিজ প্লিজ ...
আব্দুল্লাহ ঢোক গিললেন। পাগল নাকি মেয়েটি! তাকালেন তার দিকে। চেহারায় সিরিয়াসনেস। চোখে মুখে মশকারির চিহ্ন নেই! তার মানে মেয়ে ইয়ার্কি করছে না। বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, সরি মেয়ে। আই’ম অ্যাঙ্গেইজড।
- তাহলে আমার সাথে একবার বেডে চলো, প্লিজ!
আব্দুল্লাহ এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠলেন! বলে কি এই মেয়ে! দেখতে পাগল না লাগলেও এই মেয়ের মাথার তার যে বেশ কয়েক স্থানে ছেড়া, এ ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ রইল না তাঁর। তিনি বললেন, দেখো মেয়ে, তুমি কে সেটা আমি জানি না। জানতেও চাই না। তবে তুমি যথেষ্ট সুন্দরী। তোমার মতো মেয়ের এমন অফার আরবের যে কোনো যুবককেই হয়ত পাগল করে তুলবে। কিন্তু আই’ম সো সরি। তোমাকে আমার ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। তোমার সাথে অবৈধভাবে বেডে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি জীবনেও আমার চরিত্রের সাথে বেইমানি করিনি! আমি আমার চরিত্র কোনো দাগ লাগতে দিইনি।
.
এটা সেই যুগের কথা, যখন আরবের সভ্যতাই ছিল অবিচার আর ব্যভিচারের। ছোট্ট মেয়েরা হত অবিচারের শিকার। আর বড় মেয়েরা ব্যভিচারের! সেই যুগে যে আব্দুল্লার বিবেকি চরিত্রই ছিল এমন, সেই আব্দুল্লাহ একত্ববাদের বিপরিত থাকবেন, শিরক করবেন, বিশ্বাসযোগ্য না। প্রশ্নই আসে না।
.
বিয়ে করে আব্দুল্লাহ ফিরছিলেন যখন, তখন সেই মেয়ের সাথে তাঁর আবার দেখা হয়ে গেল। তিনি লক্ষ্য করলেন মেয়ে তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না! ব্যাপার কী! কৌতূহল জাগলো আব্দুল্লার মনে। তিনি নিজে থেকেই কথা বললেন তার সাথে।
- অ্যাই মেয়ে! সেদিন তুমি এতো আগ্রহ দেখালে আমার ব্যাপারে। আর আজ রীতিমত এভয়েড করছো। দেখেও যেনো দেখছো না। ঘটনা কী তোমার?
মেয়েটি বললো, শোনো ছেলে! তোমার প্রতি আমার মোটেও কোনো ইন্টারেস্ট নেই। যাও রাস্তা মাপো।
- মানে কী! তাহলে সেদিন এমন করেছিলে কেনো!
- সেদিন তুমি যা ছিলে, আজ আর তা নেই!
- মানে কী?
- মানে হল, সেদিন তোমার চেহারায়, আরো স্পেসিফিক করে বললে তোমার কপালের ঠিক মধ্যেখানে আমি যে আলোর ঝলকানি দেখেছিলাম, সেটি আজ আর নেই। সুতরাং তোমার প্রতি আমার আর আগ্রহ থাকারও কোনো কারণ নেই।
- বুঝলাম না কিছু। কিসের ঝলকানি বললে?
- সেদিন আমি তোমার কপালে যে আলোক ছটা দেখেছিলাম, সেটা ছিল শেষনবীর আগমনি চিহ্ন। আমি চাইছিলাম তোমার বউ হতে। আমার ইচ্ছা ছিল বিশ্বনবীকে পেটে নিয়ে ভাগ্যবতী হতে। সে জন্যই তোমার পিছে পড়েছিলাম বেহায়ার মতো। কিন্তু আজ তোমার চেহারায় সেই আলোর ঝলকানি আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। ভাগ্যবতী সে। নাম কী তাঁর?
- কার কথা জানতে চাইছো?
- তোমার বউয়ের।
- ওর নাম আমিনা।
- আমিনা ভাগ্যবতী। আমার ভাগ্যে নেই বিশ্বনবীর মা হওয়া। বলেই মেয়েটি চলে যেতে লাগলো। আব্দুল্লাহ বিস্মিত হয়ে তাঁর চেয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
'লাভ এট ফাস্ট সাইট' বা প্রথম দেখায় প্রেম' বলে একটা কথা আছে। হযরত আব্দুল্লা'র বেলায় বলা যায়, 'ব্রেকআপ' অ্যাট ফাস্ট সাইট!
.
----------- সেই আব্দুল্লাহ, অনুপম চরিত্রের আব্দুল্লাহ, বিশ্বনবীর জন্মদাতা পিতা হযরত আব্দুল্লাহ। সম্প্রতি আহাফিদের নতুন টার্গেট বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাবা-মা। নবীজির মা-বাবাকে কীভাবে জাহান্নামী প্রমাণ করা যায়, এ নিয়ে তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। খেয়ে কাজ না থাকলে যা হয় আর কি! কিংবা কে জানে, এটাই তাদের আসল কাজ কিনা! কোন জাতের হাড্ডি দিয়ে যে এই প্রাণীগুলোকে আল্লাহ পয়দা করেছেন, আল্লাহই ভাল জানেন।

পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ : কয়েকটি বাহন

অধ্যাপক মুরতাহিন বিল্লাহ জাসির
অবস্থা দেখে মনে হয়, এ দেশের বৃহত্তর জনগণের মুসলিম-পরিচিতি বিলুপ্ত করার ও তাদেরকে মুশরিক (পৌত্তলিক) বানানোর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। কাজটি হচ্ছে একটি অতি সূক্ষ্ম, সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায়। পরিকল্পনাটি বহুমাত্রিক, যাতে রয়েছে শিক্ষাকেন্দ্রিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা দিক। এ নিবন্ধটি এমন কিছু বিষয় নিয়ে লেখা, যেগুলো শিরকি (পৌত্তলিক) ধ্যান-ধারণার বাহন হিসেবেই কাজ করছে। এসব কাজের দ্বারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে, বিশেষত তরুণসমাজের মধ্যে যে মগজ ধোলাই হচ্ছে, তাতে ধীরে ধীরে আমাদের ঈমানী শক্তি লোপ পাচ্ছে এবং পৌত্তলিকতার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বলে মনে করার কারণ আছে।
মঙ্গলপ্রদীপ
কোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো একটি হিন্দু ধর্মীয় রীতি। মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোর উদ্দেশ্য অনুষ্ঠানটি যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় তার জন্য অগ্নি-দেবতার আশির্বাদ কামনা করা। বাংলাদেশের বৃহত্তর সমাজে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোর এ হিন্দু-প্রথাটি চালু করেছে থিয়েটার। সর্বপ্রথম বাংলা ১৪০০ সালকে বরণ করা হয় মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে। মঙ্গলপ্রদীপ প্রথমে থিয়েটার শুরু করলেও তা অনেকটা ব্যাপকভাবে চালু হয়ে গিয়েছে। ১৯৯৫ সালের ২৭ শে নভেম্বর কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে বাংলা মঞ্চ-নাটকের দু’শ বছর পূর্তি এবং বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ৭০তম জন্মবার্ষিকীকে ঢাকঢোল বাজিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় শিবের নৃত্যভঙ্গিমায় তৈরি প্রতিকৃতি গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো ছিল। তিনটি মেয়ে মঙ্গলপ্রদীপ নিয়ে নৃত্যের তালে তালে এগিয়ে আসে (ইনকিলাব, ২৯-০৩-০৪ ঈ.)
ধীরে ধীরে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোর এ রীতিটি আরো ব্যাপকতা লাভ করে। বর্তমানে মুসলিমপ্রধান এ দেশের কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। কাজটি এমনভাবে করা হয় যেন তা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি হিন্দু রেওয়াজকে এভাবে চালু করার যৌক্তিকতা কোথায়? এ দেশের বৃহত্তর জনগণ কি অগ্নিদেবতার ভক্ত? আমাদের দেশে চিরাচরিত নিয়ম হচ্ছে অনুষ্ঠান শুরু করার সময় পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করা। এ নিয়ম বাদ দিয়ে মঙ্গলপ্রদীপ চালু করা আর হিন্দুত্ব বরণ করে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এসব বিজাতীয় আচার-অনুষ্ঠান কেবল বর্জন নয়, প্রতিহত করা আজ আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।
বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা
১৯৬৭ সালের আগে বৈশাখী মেলা নামের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এ দেশে ছিল না। সর্বপ্রথম এ মেলা আরম্ভ হয় ১৯৬৭ সালে, ছায়ানটের উদ্যোগে। প্রথম অনুষ্ঠানটি হয় ঢাকাস্থ রমনার বটমূলে (শান্তা মরিয়া, নববর্ষ, জনকণ্ঠ ১২-০৪-২০০০)। শুরুতে ‘বৈশাখ বরণ’ অনুষ্ঠান অনেকটা ক্ষুদ্র আকারে হলেও ক্রমে তা একটি বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং বছর বছর এর সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন অনুষঙ্গ।
বর্ষবরণ উৎসব পালনকালে যা করা হয় তা-ও বিজাতীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে নেয়া হয়েছে। বর্ষ বা বৈশাখ হচ্ছে সময়ের নাম। ‘এসো হে বৈশাখ’ বলে ‘কালবৈশাখী’ হিসেবে পরিচিত মাসটিকে যেভাবে বরণ করা হয় তাতে মনে হয় তার একটি জীবন্ত সত্তা আছে। এটা প্রকৃতি পূজার সমান বা সেদিকে নিয়ে যায় কি না ভেবে দেখা দরকার। বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলায় নাচ-গান, নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ পরা, নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা, রাখিবন্ধন প্রভৃতি যেসব কাজ হয়, তা কি হিন্দুদের পূজা-উৎসবের অনুকরণ নয়? ভেবে দেখার দরকার আছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা
বর্ষবরণের একটি অনুষ্ঠান হিসেবে ইদানিং শুরু হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটা বর্ষবরণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম শুরু হয়েছে ১৯৮৯ সালে, চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকে বিশাল আকারের রাজা-রানীর পুতুল ও পেঁচাসহ নানা ধরনের পশু-পাখির মূর্তি। এসব মূর্তিকে সাথে নিয়ে বাদ্যের তালে তালে এগিয়ে যায় শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রায় যারা অংশগ্রহণ করে তাদের অনেকেই পরে নানা ধরনের মুখোশ।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও নানা পেশার ও বয়সের লোক যোগ দিয়ে থাকেন। পয়লা বৈশাখে কেবল ঢাকায় নয়, মফস্বলের কোনো কোনো শহরেও এ শোভাযাত্রা চালু হয়েছে এবং ক্রমে তা চারদিকে বিস্তার লাভ করছে। বলা হয়, সারা বছর সবাই যাতে নিরাপদ থাকে সেটাই হচ্ছে এ শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নিরাপত্তা দেবার মালিক কে? যদি এ শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিরাপত্তা চাওয়া হয় তবে কার কাছে এ কামনা বা প্রার্থনা? মুসলমানের তো আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করার অবকাশ নেই। আর যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না বা বস্ত্তবাদী, নাস্তিক, তাদের তো এমন কেউ নেই যার কাছে তারা প্রার্থনা করতে পারে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে যারা বেশি মাতামাতি করেন তারা অসাম্প্রদায়িক হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এ শোভাযাত্রার মূল অনুষঙ্গ ঢোলের বাদ্য- যা দেবী দূর্গাকে আহবান করাসহ অন্যান্য মূর্তিপূজার মূল বাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়- তা একটি বিশেষ সম্প্রদায় হিন্দুদের পূজার উপাদান।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে (১) মহান আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কারো কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা (২) হিন্দুদের দেবদেবীর পূজার অনুকরণে বাদ্য বাজানো (৩) নানা ধরণের মূর্তি ও মুখোশ বহন করা (৪) দলে দলে যুবক-যুবতী মিলে পথে-ঘাটে নৃত্য করা, এসব কি এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সংস্কৃতি? কিংবা এ-ই কি অর্থ অসাম্প্রদায়িকতার? এ অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করা কি আমাদের ঈমানী দায়িত্ব নয়?
বসন্ত উৎসব
গত কয়েক বছর থেকে আমাদের দেশে বসন্ত-উৎসব নামে একটি অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছে। বসন্ত ঋতুর শুরুতে পৌষ মাসে ‘পৌষমেলা’ নামে উৎসবটি সর্বপ্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে (জনকণ্ঠ, ২০-১২-৯৮)।
রমনা বটমূলে পালিত এ উৎসবে যা করা হয় তার অনেক কিছুই মিলে যায় মূর্তি ও প্রকৃতি-পূজারীদের আচার-অনুষ্ঠানের সাথে। মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, এটাও বিজাতীয় উৎসবের অনুকরণ বৈ কিছু নয়। বসন্ত উৎসবটি সম্পর্কে অমলচন্দ্র চক্রবর্তী বলেন ‘‘ফাল্গুনের পূর্ণিমা তিথিতে শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণের পূজো করে তাঁদের পায়ে আবির, কুমকুম ও পুষ্প দিয়ে রাধাকৃষ্ণ আরাধনা করা হয়। এভাবেই আনন্দ উৎসব আর কীর্তনের মধ্য দিয়ে বসন্ত বরণ ও দোলযাত্রা উৎসব পালিত হয়’’ (দৈনিক সিলেটের ডাক, ১০ এপ্রিল ২০১০)।
চৈত্রসংক্রান্তি
বহু কাল থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবটি চালু আছে। এ হিন্দু উৎসব সম্পর্কে আমাদের বলার কিছুই ছিল না যদি না একে বাঙালী উৎসবের লেবাস পরিয়ে সার্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হত। ইসলামবৈরীদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার বদৌলতে ইতিমধ্যে উৎসবটি ব্যাপক
বিস্তার লাভ করেছে।
বাংলা সালের শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। এ দিনটি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি উৎসবের দিন। হিন্দুদের বিশ্বাস, এ দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপাসনা প্রভৃতি ক্রিয়াকর্ম পুণ্যজনক (বাংলাপিডিয়া)। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রেওয়াজ আছে, চৈত্রমাসের শেষ দিনটিকে এসব কাজের ভেতর দিয়ে উদযাপন করার।
চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চৈত্রমেলা। এ মেলার প্রধান আকর্ষণ নানা ধরনের পণ্য কেনাবেচা ও পুতুলনাচ, নাগরদোলা, ম্যাজিক, যাত্রা ও সার্কাসসহ নানা বিনোদনমূলক আয়োজন। তবে ইতিহাসের কোথাও এমন কোনো রেকর্ড নেই যে, চৈত্রসংক্রান্তির মেলাকে মুসলমানগণ বাঙালী মুসলিম-সমাজের উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বাঙালী উৎসবের লেবেল লাগিয়ে চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব উদযাপনের সময় যা করা হয় তার মধ্যে রয়েছে, ঢোল, বেহালা, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, ব্যান্ডপার্টি, নৃত্যানুষ্ঠান. নাট্যানুষ্ঠান, গানের আসর, প্রকৃতিপূজা, যুবক-যুবতীর অবাধ মেলামেশাসহ নানা ধরনের বেহায়াপনা। এ দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জনসমাগম, বিশেষত তরুণ সমাজের ভীড়ের কারণ, প্রায় সব অনুষ্ঠানেই রয়েছে যুবক-যুবতীর অবাধ মেলামেশাসহ আমোদষ্ফূর্তির নানা আয়োজন।
এ দেশের আবেগপ্রবণ লোকদের দিয়ে অনেক কিছুই করানো সহজ, কিন্তু ভিন্ন সম্প্রদায়কে খুশি করার জন্য কিছু মতলববাজ লোক কি ইচ্ছেমত যা-তা করে যেতে থাকবে? আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির কি কোনো অভিভাবক নেই? এ ব্যাপারে দেশের অলেমসমাজ, ঈমানদার বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মুসলিমদের কোনো দায়িত্ব নেই?
শিখাচিরন্তন/শিখা অনির্বাণ
দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একটি আগুনের শিখা জ্বালাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিখা অনির্বাণ’। পরে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সরকারের সময় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে আরেকটি শিখা জ্বালাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে; এর নাম দেওয়া হয়েছে (শিখাচিরন্তন)। শিখা অনির্বাণকে মাধ্যম বানিয়ে বিশেষ বিশেষ দিন সামরিক বাহিনীর মরহুম সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। আর শিখা
চিরন্তনকে মাধ্যম বানিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ৭ই মার্চের ভাষণের জন্য।
শিখা অনির্বাণ বা শিখাচিরন্তনকে কেউ পূজা করে না তবে শ্রদ্ধা জানাবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলো সম্মানিত বস্ত্ততে পরিণত হয়েছে। পৌত্তলিক হিন্দুরাও মূলত মূর্তির পূজা করে না, করে দেবতার পূজা। দেবতাকে ভক্তি জানাবার মাধ্যম হিসেবেই তারা মূর্তি ব্যবহার করে। কিন্তু তবুও তারা মূর্তিপূজারী।
অগ্নি হচ্ছে হিন্দু ও মাজুসিদের (অগ্নি উপাসকদের) দেবতা। কাজেই প্রশ্ন হচ্ছে, অগ্নি-শিখার মাধ্যমে কাউকে শ্রদ্ধা জানানো ইসলামসম্মত কি না। এখানে সহীহ বুখারির একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। তখনও নামাযের আযান প্রবর্তিত হয়নি। নামাযের ঘোষণা কীভাবে দেওয়া যায়, সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং সাহাবিদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। তখন একটি প্রস্তাবে বলা হয়, নামাযের সময় নির্দেশ করার জন্য উঁচু জায়গায় আগুন জ্বালানো যেতে পারে। এ প্রস্তাবটি ছিল কেবল নামাযের সময় ঘোষণার জন্য, আগুনের শিখাকে সম্মান দেখানোর জন্য নয়। কিন্তু অগ্নি মাজুসিদের ধর্মীয় নিদর্শন হওয়ার কারণে একবাক্যে সবাই প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। এ ঘটনাটি থেকে এ কথা উপলব্ধি করতে বেগ পেতে হয় না যে, কোনো কিছুর প্রতীক বা নিদর্শন হিসেবে অগ্নিকে অভিবাদন করা, একে পুষ্পমাল্য দেওয়া, এর সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করা, নীরবতা পালন করা বা অন্য কোনো পন্থায় এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা বা একে নিয়ে আনন্দ-উৎসব পালন করা ইসলামসম্মত নয়।
অন্য ধর্মের পূজনীয় বস্ত্ত হওয়ায় শিখা চিরন্তন বা অন্য কোনো নামে অগ্নিকে শ্রদ্ধা জানাবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের তাওহীদের চেতনা ও বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ জাতীয় প্রয়াস জাতিকে পৌত্তলিকতার দিকেও ঠেলে দিবে।
শহীদ মিনারকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠান
একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের প্রায় নববই শতাংশ মুসলমান। কিন্তু এ দিবস উদযাপন উপলক্ষে যা করা হয় তা মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। শহীদ মিনারকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের অনেক কিছুরই মিল আছে হিন্দুদের পূজা-পার্বণের সাথে। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি :
১. হিন্দু দেবদেবীর প্রতিমাকে যে উঁচু স্থানে স্থাপন করা হয় সে স্থানকে বলা হয় বেদী, শহীদ মিনারের পদমূলকেও বলা হয় বেদী। বেদী শব্দটির অর্থ ‘হিন্দুদের যজ্ঞ বা পূজার জন্য প্রস্ত্তত উচ্চভূমি।’ (সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী)
২. প্রতিমা বা মূর্তির বেদীমূলকে পবিত্র মনে করা হয়, তাই সেখানে যেতে হয় নগ্নপদে। শহীদ মিনারের মূলকেও পবিত্র মনে করার কারণেই সেখানে নগ্নপদে যেতে হয়।
৩. লক্ষ্মীপূজার সময় আলপনা আঁকা হয়। শহীদ মিনারের পদমূলে যাবার পথেও আলপনা আঁকা হয়। আলপনা অর্থ ‘মেঝে, দেয়াল, সিঁড়ি প্রভৃতিতে অঙ্কিত হিন্দুদের মঙ্গলসূচক চিত্রবিশেষ’। (সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী)
৪. হিন্দু দেবদেবীর পূজার সময় কয়েকটি বিষয় অপরিহার্য। এগুলো হল : লগ্ন, অর্ঘ্য বা নৈবেদ্য, স্তব বা স্ত্ততি, পুরোহিত, দেবতা ও অর্চনা। এসবের সাথেও একুশে ফেব্রুয়ারির আচার-আচরণের সাদৃশ্য আছে। যেমন, অনুষ্ঠান জিরো আওয়ারে শুরু করা (লগ্ন), অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (পুরোহিত), নির্দিষ্টভাবে আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো ...
’ গান গেয়ে কাজ করা (স্তব/স্ত্ততি), শহীদ মিনার (জড়পদার্থ)-কে নীরবে শ্রদ্ধা জানানো (অর্চনা)।
৫. দূর্গাপূজার সময় দেখা যায়, দূর্গার মূর্তির পাশে রয়েছে আরো চারটি (দূর্গার পুত্র গণেষ ও কার্তিক এবং কন্যা সরস্বতী ও লক্ষ্মীর) মূর্তি। এভাবে সব মিলে মূর্তির সংখ্যা হয়েছে পাঁচ। শহীদ মিনারেও মিনারগুলোর সংখ্যা পাঁচ। মিনারের সংখ্যা পাঁচ হওয়ার কারণ কী? ভাষা শহীদদের সংখ্যা কি পাঁচ ছিল? আবার মধ্যবর্তী মিনারটির আকার অন্যদের তুলনায় বড় কেন? এ প্রশ্নগুলোর জবাব পাওয়া দরকার।
মুসলিম-সমাজে রীতি আছে, মৃত বা শহীদ মুসলমানের মাগফেরাতের জন্য দুআর অনুষ্ঠান করা। কিন্তু ভাষা শহীদদের জন্য তাও করা হয় না; যা করা হয় তার সাথে ইসলামের রীতির মিল নেই। হিন্দুরা প্রতিমা-পূজার পক্ষে এ যুক্তি পেশ করেন যে, দেবতা পূজারীদের নাগালের ভেতর নেই, তাই তার প্রতিমার মাধ্যমে তাঁকে পূজা দেওয়া হয়। শহীদ মিনারের বেলায়ও এ বিশ্বাস করা হয় যে, শহীদ মিনারকে সম্মান দেখানো ভাষা শহীদদেরকে শ্রদ্ধা করার সমতুল্য।
শহীদ মিনারকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখার দরকার আছে। ভাষা শহীদরা সবাই ছিলেন মুসলমান। কাজেই তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমরা এমন কিছু করতে পারি না যা ইসলামী চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া কোনো মুসলমানই তাওহীদ-বিরোধী কোনো কাজ করতে পারে না।
আলপনা আঁকা
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, আলপনা শব্দটির অর্থ, সিঁড়ি প্রভৃতিতে অঙ্কিত হিন্দুদের মঙ্গলসূচক চিত্রবিশেষ। আজকাল শিক্ষিত ও ধনী মুসলমান পরিবারের প্রায় বাড়িতে বিয়ে-শাদি উপলক্ষে আলপনা আঁকা হয়। আর শহীদ দিবস উদযাপন উপলক্ষে শহীদ মিনার ও আশপাশ এলাকার পথেঘাটে ব্যাপক আকারে যে আলপনা আঁকা হয়, তা আমাদের সবার জানা কথা।
আলপনা আঁকা হিন্দুদের একটি ধর্মীয় বিষয়। নিজেদের অজান্তে অনেকে হিন্দু দেবীর উপাসনার অনুষঙ্গ এ কাজটি করে যাচ্ছেন। বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা দরকার।
‘‘হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব লক্ষ্মীপূজা। শারদীয় দূর্গার বিজয়া দশমীর পরের পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। দেবী দূর্গার কন্যা এবং ধন ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর পূজা হয় মূলত ঘরে ঘরে। হিন্দু নারীরা উপবাস থেকে দেবীর প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেন। সরা এবং প্রতিমা দিয়ে পূজা সম্পন্ন করার পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা ও ঘরের মেঝেতে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ ও ধানের ছড়ার আলপনা আঁকাও এই পূজার অন্যতম অনুষঙ্গ। পারিবারিক ধন-সম্পদ অর্জন করার মানসে লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। লক্ষ্মীর সঙ্গে থাকে তাঁর লক্ষ্মীপেঁচা। তাই লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানো হয়।’’ (প্রথম আলো, ১৬-১০-২০০৮)
ভাষ্কর্য
দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে এখানে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ভাষ্কর্য নামক মানুষের মূর্তি। কোনো সাধারণ লোকের নয়, বরং যারা সম্মানীয়, বরণীয় ব্যক্তি কেবল তাদেরই ভাষ্কর্য বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়। কাজটির মূলে যে অনুভূতি রয়েছে, তা হল শ্রদ্ধাবোধ। এক সাথে একাধিক ব্যক্তির ভাষ্কর্য (অপরাজেয় বাংলা) নির্মাণের মূলেও রয়েছে শ্রদ্ধামিশ্রিত এক বিশেষ অনুভূতি। কাজেই, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি এবং ভাষ্কর্য নির্মাণের উদ্দেশ্য মূলত এক। আর তা হচ্ছে শ্রদ্ধা জানানো। এ কারণেই ভাষ্কর্য নির্মাণ এবং এটাকে ফুলের তোড়া দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে শ্রদ্ধা জানানো আর মূর্তিপূজার মাঝে সাদৃশ্য রয়েছে। এ কারণে এ ব্যাপারে সচেতনতার প্রয়োজন।
প্রসঙ্গক্রমে একটি প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। যে ঢাকা শহর হাজার বছর থেকে ‘মসজিদের নগরী’ নামে পরিচিত ছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হঠাৎ করে সেখানে শত শত ভাষ্কর্য বা মূর্তি নির্মাণ করার কারণ কী? এগুলো কারা করছে, কারা এগুলো নির্মাণের অর্থ যোগাচ্ছে আর কারা এ কাজের প্রেরণা দিচ্ছে, জানার দরকার আছে।
কপালে টিপ দেওয়া
প্রাচীন কালে হিন্দুধর্মে বিবাহের আটটি পদ্ধতির একটি ছিল নারী অপহরণ। হিন্দু দেবতা কৃষ্ণও কয়েকজন নারীকে অপহরণের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন। প্রাচীনকাল থেকে বিবাহিত হিন্দু নারীদের সিঁথিতে সিঁদুর দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল এটা বোঝানো যে, তার বিবাহ হয়ে গিয়েছে। সিঁথিতে সিঁদুর থাকলে কোনো নারীর অপহৃত হওয়ার ভয় থাকত না। হিন্দু এ সংস্কৃতির অনুকরণে আজকাল মুসলমান নারীরা কপালে টিপ দিতে শুরু করেছে। মনে করা হয়, এটা সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু আসলে এটা হচ্ছে পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে বরণ করে নেওয়া। কপাল হচ্ছে দেহের শ্রেষ্ঠ অংশ, যা দিয়ে আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করা হয়। আফসোসের বিষয়, অনেক মুসলিম নারীর দেহের এ অংশটিকে পৌত্তলিক সংস্কৃতি দখল করে নিয়েছে।
রাখিবন্ধন
হিন্দু সম্প্রদায় শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় প্রিয়জনের মণিবন্ধে একটি গেরুয়া সুতো বেঁধে দেয়। এ সুতোকে বলা হয় মঙ্গল-সূত্র। সূতো-বাধার কাজকেই বলা হয় রাখিবন্ধন। এটা একটা হিন্দু-সংস্কৃতি। কিন্তু নিজেদের হীনম্মন্যতার কারণে একশ্রেণীর লোক আমাদের দেশে রাখিবন্ধনের প্রচলন করেছে। আজকাল অনেক মুসলিম তরুণকে অতি উৎসাহের সাথে এ কাজটি করতে দেখা যায়।
হিন্দু দেবদেবীর নামে নামকরণ
হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের বিভিন্ন নাম এমনকি দেবদেবীর নামেও আজকাল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুসলমানদের বহু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নামের অংশ হিসেবে ‘শতরূপা’ (সরস্বতীর নাম) শব্দটি দেখা যায়। শব্দটির আসল অর্থ বা ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু জানা না থাকায় হয়ত কেউ কেউ নিজেদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য এ নাম মনোনীত করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি : শতরূপা টেক্সটাইলস, রাজলক্ষ্মী রেস্টুরেন্ট, ইন্দ্রপুরী হোটেল। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, আজকাল অনেকেই অতি বাঙালিত্ব দেখাতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের এমন সব নাম রাখেন যেগুলো কেবল হিন্দুরাই রাখতে পারে। কেউ কেউ আবার আসল মুসলমানি নাম বাদ দিয়ে নিজের জন্য হিন্দু নাম রাখেন। এ প্রসঙ্গে কবি সমুদ্রগুপ্তকে উল্লেখ করা যায়। তিনি যে মুসলিম ছিলেন তা অনেকেই জানতেন না। ২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পরই জানা গেল তাঁর আসল নাম ছিল আবদুল মান্নান বাদশা। এ তথ্য জানা না থাকার কারণে তাঁর গুণগ্রাহী অনেকেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে
‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়েননি।
পবিত্র কুরআনের সাথে অন্যান্য ধর্মশাস্ত্র পাঠ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বেতারে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সাথে গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ করার নিয়ম চালু হয়েছিল। এ কাজের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হতো, বাংলাদেশ যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, তা দেখানোই এর উদ্দেশ্য। পরে রাষ্ট্রীয় নানা অনুষ্ঠানেও পবিত্র কুরআনের সাথে এসব ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সভায়ও এ নিয়ম চালু করা হয়েছে।
যারা এ কাজ করেন তাদের জানা থাকা দরকার যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে একটি কুফরী মতবাদ। তাছাড়া এ কাজের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনকে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়। এ ধরনের কাজের ফলে আমাদের সরলমনা তরুণদের মনে এ ধারণা জন্মাতে পারে যে পবিত্র কুরআন অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের মতোই একটি গ্রন্থ। এভাবে তাদের মন থেকে কুরআনের প্রতি বিশেষ মর্যাদাবোধ দূর হয়ে যেতে পারে। এটা বোঝা দরকার যে, ধর্মীয় ব্যাপারে অন্যান্য ধর্মের সাথে ইসলামকে সমপর্যায়ভুক্ত করা করা হলে ঈমান থাকার কথা নয়।
মসজিদ ও মন্দিরে ‘সমতা’ বিধানের চেষ্টা
সরকারি পর্যায়ে আজকাল এমন সব কাজ করা হয় যা দেখে মনে করার কারণ আছে যে, মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যকার পার্থক্য সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঠিক ধারণা নেই। তারা মনে করেন, মসজিদের জন্য কিছু করতে হলে মন্দিরের জন্যও তা করতে হবে। আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এটা বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছুই নয়। মসজিদকেন্দ্রিক কোনো প্রকল্প হাতে নিলে মন্দিরের ব্যাপারেও যে তা করতে হবে, তা মোটেই ঠিক নয়।
মসজিদ ও মন্দির এক নয়; দু’ টোর মধ্যে পার্থক্য অনেক। মুসলমান পুরুষদের প্রতিদিন পাঁচবার ফরয নামায আদায় করার জন্য মসজিদে যেতে হয়। মন্দিরের ব্যাপারটি কিন্তু ভিন্ন। কোনো কোনো মন্দিরে বছরে মাত্র একবার পূজা হয়। আবার এমন বহু মন্দির আছে যেখানে বছরে একবারও কেউ যায় না।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা লাভ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয। হিন্দু ধর্মে কিন্তু এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জাতিভেদভিত্তিক হিন্দুধর্মের অনুসারীরা একসাথে বসার কোনো সুযোগ নেই। তাদের অনেকেরই মন্দিরে প্রবেশের অধিকার নেই। এসব কারণে, মুসলমান শিশুদের জন্য মসজিদভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম গ্রহণ করলেই যে মন্দিরের বেলায়ও তা করতে হবে এমন কোনো কথা নয়। কিন্তু এখন এমনটাই করা হচ্ছে।
ভারতের কোনো মন্দিরেই মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম নেই। কারণ জাতিভেদভিত্তিক হিন্দুধর্মের সাথে এটা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশই হচ্ছে কথিত নিম্নবর্ণের লোক। নিচ জাতের লোক (?) হওয়ার কারণে তারা মন্দিরের ধারে কাছেও যেতে পারে না। কাজেই, মসজিদের সাথে ‘সমতা’ বিধানের চেষ্টা খোদ হিন্দুদের ধর্ম-বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক।
প্রতিকৃতি ও মাজারকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান
আমাদের দেশে পীর-আউলিয়াদের মাজারে বাতি জ্বালানো প্রভৃতি কাজকে হক্কানি আলিমগণ বিদআত বলে থাকেন। কেবল যিয়ারত ছাড়া মৃত ব্যক্তির কবরে গিয়ে আর কিছু করার বিধান ইসলামে নেই। মরহুম শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মরহুম এ.কে ফজলুল হক ও মরহুম খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা শহরেই শায়িত আছেন। তাঁদের অনেক ভক্তও দেশে আছেন। কিন্তু বছরে একবারও তাঁদের মাজারে গিয়ে ফুল দিতে কাউকে দেখা যায় না। কিন্তু মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ও মরহুম জিয়াউর রহমানের মাজার একটি ব্যতিক্রম। শুধু তাদের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে নয়, বছরের আরো বহু দিন দলীয়ভাবে বা ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রকাশের জন্য এঁদের মাজারে গিয়ে ফুলের তোড়া দেওয়া হয় এবং আরো অনেক কাজ করা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের অতি সম্মানিত জাতীয় নেতাদের জন্য এমন কিছু কেন করা হয় না, যার দ্বারা তাঁদের পরকালীন কল্যাণ হতে পারে। আর যা করা হয়, তা কি শরীয়তসম্মত? একজন মৃত ব্যক্তির জন্য তো কেবল এমন কাজ করা উচিত যা ইসলামী অনুশাসনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ইতিহাসে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির প্রতি ভক্তি দেখাতে গিয়ে অতি বাড়াবাড়ির পথ ধরেই পৃথিবীতে মূর্তিপূজা শুরু হয়েছে।
মৃত ব্যক্তির কফিনে ফুল দেওয়া
আজকাল প্রায়ই কোনো বিশিষ্ট লোক মারা গেলে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তার কফিনে ফুলের তোড়া দেওয়া হয়। এটা একটা অর্থহীন কাজ। এ ধরনের কোনো প্রথা কিছুদিন আগেও এদেশে ছিল না। এটা বর্জনীয়। কারণ ১. এটা একটা বিজাতীয় কালচার। ২. এতে মৃত ব্যক্তির কোনো কল্যাণ হয় না এবং ৩. মৃত ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র দাফন করার যে নির্দেশ ইসলামে রয়েছে এতে তা লঙ্ঘিত হয়।
মৃত ব্যক্তির সম্মানে নীরবতা পালন
আজকাল দেখা যায়, কোনো মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখাবার জন্য কিছু সময় নীরবতা পালন করা হয়। এটা অমুসলমানদের রীতি। মৃত ব্যক্তির কল্যাণে কিছু করার বিধান তাদের ধর্মে না থাকার কারণেই তারা এ কাজ করে থাকে। একজন মৃত ব্যক্তির জন্য কী করতে হবে তার সুস্পষ্ট বিধান ইসলাম দিয়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে বিধর্মীদের অনুকরণ করা হীনম্মন্যতারই শামিল।
উপসংহার
ইসলাম এমন একটি দ্বীন, যাতে রয়েছে পরিপূর্ণ জীবনবিধান। মানুষের জীবনে যা কিছুর প্রয়োজন, তা সবই ইসলামে আছে, এতে কোনো অপূর্ণতা নেই। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বা নিদর্শনমূলক আচার-আচরণ অনুসরণ করার সুযোগ ইসলামে নেই। বিধর্মীদের অনুসরণ একজন মুসলমানকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। এজন্য এ থেকে আমাদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফ থেকে দুটো উদ্ধৃতি দিচ্ছি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, (তরজমা) কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব। আর তা কতই না মন্দ নিবাস। (সূরা নিসা ৪ : ১১৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসেও এ ব্যাপারে সাবধানবাণী এসেছে। তিনি বলেছেন, যে কেউ কোনো কওমের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৩৩) ষ