Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Showing posts with label নসিহত/উপদেশ. Show all posts
Showing posts with label নসিহত/উপদেশ. Show all posts

Sunday, April 9, 2017

নম্রতা ও কোমলতা

ইবনে নসীব
মনে করা হয়, রুক্ষতা ও কঠোরতা তারবিয়তের পক্ষে সহায়ক। কিন্তু তা ঠিক নয়। কঠোরতার দ্বারা শিশু-কিশোরদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, একে তারবিয়ত বলে না। প্রকৃত অর্থে তারবিয়ত হচ্ছে শিশুর প্রতিভাগুলোকে বিকশিত হতে সাহায্য করা। মানুষের প্রতিভাগুলো অতি নাযুক ও সংবেদনশীল। সদ্য অঙ্কুরিত চারা গাছের মতোই কোমল। এর পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন খোলা আকাশের আলো আর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা। আলোহীন বদ্ধ ঘরে চারাগাছ যেভাবে হলদে হয়ে শুকিয়ে যায় সেভাবে স্তব্ধ মানসের মধ্যেও প্রতিভাগুলো শুকিয়ে যায়। তাই শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক বিকাশের জন্য তারবিয়তকারীর কোমল আচরণ অতি প্রয়োজন।
শুধু শিশু-কিশোরদের বেলায়ই নয়, সকল শ্রেণীর তারবিয়ত গ্রহণকারীর জন্য নম্রতা ও কোমলতা অত্যন্ত ফলপ্রসু। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-(তরজমা) আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের জন্য কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার চার পাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। অতএব তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং (বিভিন্ন) বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এরপর যখন কোনো বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ হবেন তো আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন।-সূরা আল ইমরান : ১৫৯
এই আয়াতের তাফসীরে মুফতী শফী রাহ. লেখেন-উপরোক্ত বিষয়গুলো থেকে ইসলাহ ও সংশোধন এবং তাবলীগ ও দ্বীন প্রচারের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া গেল। তা এই যে, যে ব্যক্তি মানুষের ইসলাহ ও সংশোধন এবং দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজে আত্ম নিয়োগ করতে চায় তার জন্য উপরোক্ত গুণাবলি-নম্রতা ও সুন্দর ব্যবহার এবং কোমলতা ও ক্ষমাশীলতা, অর্জন করা অপরিহার্য। কেননা, আল্লাহর পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ হতে কঠোরতা হলে তাও মানুষ বরদাশত করতে পারে না তাহলে আর কার পক্ষে সম্ভব হবে যে, রুক্ষতা ও মন্দ ব্যবহার দ্বারা আল্লাহর বান্দাদের নিজের সঙ্গে একত্র করবে এবং তাদের ইসলাহ ও সংশোধনের কাজ আঞ্জাম দিবে?-তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ২/২১৬-২১৭ কোমলতা ও এর ফলাফল উল্লেখ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে বিষয়ে কোমলতা আছে তা সৌন্দর্যমণ্ডিত। আর যেখানে কোমলতা নেই তা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ।-সহীহ মুসলিম হাদীস : ২৫৯৪
কোমলতার দ্বারা মানুষের কথাবার্তা ও আচার-ব্যবহার সুন্দর হয়। আর সুন্দর ব্যবহার মানুষের মনে যে প্রভাব সৃষ্টি করে তা অন্য কোনোভাবে সৃষ্টি হয় না।
এ প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত থেকে কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করছি।
হযরত মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আসসুলামী রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে জামাতে নামায পড়ছিলাম। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি বললাম, ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ।’ এতে অন্য মুসল্লীরা আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, হা! আমার মরণ! তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? এতে তারা আরো বিচলিত হল এবং তাদের উরুতে চাপড় দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করতে চাইল। এতে আমি নিশ্চুপ হলাম। নবীজী যখন নামায সমাপ্ত করলেন-আমার পিতামাতা তাঁর ওপর কুরবান হোক! কোনো শিক্ষককে তাঁর চেয়ে উত্তমরূপে শিক্ষা দিতে আমি দেখিনি! না তার আগে আর না তার পরে।-খোদার কসম, তিনি আমাকে কোনো ধমক দিলেন না, প্রহার করলেন না, কোনো কটুবাক্য বললেন না। শুধু বললেন-‘এ নামাযে জাগতিক কথাবার্তা বলা যায় না।’-সহীহ মুসলিম
আরেকটি দৃষ্টান্ত দেখুন। হযরত আবু উমামা রা. বলেন, এক যুবক এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে যিনা করার অনুমতি দিন।’ একথা শুনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠলেন এবং তাকে তিরস্কার করতে লাগলেন, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার কাছে এস। সে কাছে এল। বললেন, বস। সে বসল। এরপর বললেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এটা পছন্দ করবে?’ সে বলল, না ইয়া রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গিত করুন। কোনো মানুষই তার মায়ের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তাহলে তোমার মেয়ের জন্য?’ যুবকটি বলল, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার
মেয়ের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে তোমার বোনের জন্য?’ যুবক বলল, ‘না ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে তোমার ফুফুর জন্য?’ যুবক বলল, ‘না ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার প্রতি উৎসর্গিত। কোনো মানুষই তার ফুফুর জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে তোমার খালার জন্য?’ যুবক বলল, না কক্ষনো না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। কোনো মানুষই তার খালার জন্য এটা পছন্দ করবে না।’ এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শরীরে হাত রাখলেন এবং দুআ করলেন- ইয়া আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করুন, তার অন্তর পবিত্র করুন এবং তার চরিত্র রক্ষা করুন। বর্ণনাকারী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষার ফলাফল এই হল যে, পরবর্তী জীবনে সে কোনো দিকে চোখ তুলেও তাকাত না।- মুসনাদে আহমদ ৫/২৫৬-২৫৭

Tuesday, April 4, 2017

আপনার মা কিংবা বাবা-কেউ কি এমন একা?


আতিকুল্লাহ আতিক:

বার্ধক্য আর মৃত্যু। মানুষের জীবনের দুটো অমোঘ
সত্য। কিন্তু আমরা কি সেই সময়গুলোর কথা
চিন্তা করি যখন আমরা বার্ধক্যে পৌঁছাবো, যখন
আমাদের জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী আর আমাদের
পাশে থাকবে না।তখন আল্লাহ ব্যতীত আমাদের
আর কে থাকবে? জীবনের দীর্ঘ সময় একসাথে
কাটিয়ে দেয়া স্বামী বা স্ত্রীকে হারিয়ে
আমরা কিভাবে দিন যাপন করব? চিন্তাটা
স্বাভাবিকভাবেই ভীতিকর।
.
আপনার মা কিংবা বাবা-কেউ কি এমন একা?
যার সারা জীবনের সাথী মারা গেছেন,
সন্তানেরা সবাই বড় হয়ে গিয়েছে, সবাই
নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একবারও ভেবে
দেখেছেন কি যে কিভাবে এই বৃদ্ধ বয়সে আপনার
বাবা কিংবা মা সারাদিন কি করছেন?
কিভাবে একা একা চার দেয়ালের ভিতরে
দিনাতিপাত করছেন? আপনি কি কখনো নিজের
জন্য এরকম জীবন কামনা করবেন?
.
ভাই ও বোনেরা, এই সময়টা একদিন আপনার
জীবনেও আসবে। সুতরাং, আপনার
পিতামাতাকে সময় দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা
করুন। এটা আমাদের দায়িত্বসমূহের অন্তর্ভুক্ত
একটি দায়িত্ব। একাকিত্বের দুর্বিষহ যন্ত্রণায়
যেন তাদের শেষ দিনগুলো না কাটে। তারা হয়ত
মুখে বলবেন যে কদাচিৎ তাদেরকে দেখতে
গেলেই তারা খুশি, কিন্তু ভালো করে তাদের
চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বুঝতে পারবেন
যে এটা তাদের মনের কথা নয়। তাদের অন্তরের
ব্যথা যদি দেখতে পেতেন তাহলে আপনি কেঁদে
দিতেন।
.
পিতামাতা আমাদের মাঝে বেচে থাকা
অবস্থায় যদি আমরা তাদের জন্য কিছু করতে না
পারি তাহলে আমাদের মাঝে ভাল বলে আর কিছু
কি থাকবে? তারা জীবনভর আমাদের জন্য কতটা
ত্যাগ করেছেন সেটা আমরা কল্পনাও করতে
পারিনা। তাদেরকে এর কিছুটা হলেও ফিরিয়ে
দেয়া কি আমাদের দায়িত্ব নয়?

Monday, April 3, 2017

তাফসীরে কালামুল্লাহ -হযরত মাওলানা মুফতী জসিমুদ্দীন হাটহাজারী


ﺳﺒﺤﺎﻥ ﺍﻟﺬﯼ ﺍﺳﺮﯼ ﺑﻌﺒﺪﮦ ﻟﯿﻼ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﺴﺠﺪ ﺍﻟﺤﺮﺍﻡ ﺍﻟﯽ ﺍﻟﻤﺴﺠﺪ ﺍﻻﻗﺼﯽ ﺍﻟﺬﯼ ﺑﺎﺭﮐﻨﺎ ﺣﻮﻟﮧ ﻟﻨﺮﯾﮧ ﻣﻦ ﺁﯾﺎﺗﻨﺎ ﺍﻧﮧ ﮨﻮ ﺍﻟﺴﻤﯿﻊ ﺍﻟﺒﺼﯿﺮډ
তরজমাঃ
পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বন্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারপাশকে করেছি আমি বরকতময়- যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চই তিনিই পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। (সূরা- বনী ইসরাঈল, আয়াত- ১)।
শানে নুযূলঃ
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রাহ.) তাফসীরে কাবীরে উল্লেখ করেছেন যে, হুযূরে আকরাম (সা.) মিরাজের রাতে সাত আসমান এবং সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে যখন মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে হাজির হলেন, তখন আল্লাহ পাক তাঁকে সম্বোধন করে ইরশাদ করলেন- হে মুহাম্মাদ! আমি কোন শব্দ দিয়ে আপনাকে সম্বোধন করবো? তখন হুযূর (সা.) বললেন যে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আপনার আবদ্’ (দাস) বলে সম্বোধন করুন। অর্থাৎ- আমি আপনার বান্দা, এই ঘোষণা দিন। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করলেন।
ব্যখ্যাঃ
আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের হাবীব (সা.)এর জন্য ‘আবদ্’ শব্দ ব্যবহার করে আপন মাহবুবের উচ্চ সম্মানের অধিকারী হওয়াকে প্রকাশ করেছেন। কেননা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যদি এ কথা বলেন যে, এটা আমার বন্দা, তাহলে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের আর কী আছে? যেমনটি অন্য এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- ﻭﻋﺒﺎﺩ ﺍﻟﺮﺣﻤﺎﻥ ﺍﻟﺬﯾﻦ ﯾﻤﺸﻮﻥ۔۔۔
যাতে আল্লাহ তায়া’লা নিজের প্রিয় মাকবুল বান্দাদের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। সুতরাং এতে এ কথাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ও কামিয়াবী হল যে, সে পরিপূর্ণরূপে আল্লাহ তায়া’লার বান্দা (দাস) হতে পারা। কেননা বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হুযূরের অন্নান্য সব গুণাবলীর মধ্যে হতে উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের গুণকে বাছাই করেছেন।
ﻋﺒﺪ ব্যবহারের আরেকটি বিশেষ কারণ হলো- মি’রাজের এই বিস্ময়কর সফরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা স্বাভাবিক নিয়ম-পরিস্থিতির বিপরীত। সুতরাং কেউ যেন এতে ধোঁকায় পড়ে নবীকে প্রভু মনে না করে। যেমনটি হযরত ঈসা (আ.)এর ক্ষেত্রে হয়েছে তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর। তাই ﻋﺒﺪ শব্দ এনে এ কথা স্পষ্ট করে দেওয়া হল যে- এত সব অলৌকিকত্ব-মু’জিযাতের পরেও মুহাম্মাদ (সা.) বান্দাই আছেন, আল্লাহর গোলাম হিসেবেই আছেন, আল্লাহর মাকামে পৌঁছে যাননি।
সুতরাং আয়াত দ্বারা ঐ সমস্ত বাতেল ও ভ্রান্ত মতালম্বীদেরও খন্ডন হয়ে যায়, যারা নবী (সা.)কে বাশারিয়্যাত (মানুষ) থেকে মালাকিয়্যাতে (ফেরেশতা) পৌঁছিয়ে দেয়। আর বলে যে, নবী নূরের তৈরী, মাটির নয়। সাথে সাথে যারা বলে যে- নবীর মি’রাজ স্ব-শরীরে হয়নি বরং স্বপ্নযোগে রুহানীভাবে হয়েছে, তাদেরও খন্ডন এই আয়াত দ্বারা হয়ে গেছে। কেননা ‘আবদ্’ বান্দা- কেবল রুহের নাম নয়। বরং রুহ এবং শরীর উভয়ের সমষ্টির নাম হল ‘আবদ’ তথা বান্দা।
আয়াতের মধ্যে ‘লাইলান’কে আরবী গ্রামার মতে নাকেরা এনে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইসরা এবং মি’রাজের পূর্ণ ঘটনা সম্পূর্ণ রাতে নয়, বরং ঘটনাটি রাতের অল্প কিছু সময়ের মধ্যে ঘটেছে। উল্লেখ্য, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফরকে ইসরা এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত সফরকে মি’রাজ বলা হয়। তবে কারো কারো নিকট দুটোকেই ইসরা এবং মি’রাজ বলে।
আর ‘বা-রাকনা হাওলাহু’, অর্থাৎ- আমি তার চারপাশকে করেছি বরকতময়। এখানে ‘হাওলাহু’ তথা চারপাশ দ্বারা পুরো সিরিয়াকে (বর্তমান ফিলিস্তিন) বুঝানো হয়েছে। এর বরকত সমূহ নানাবিধ- ধর্মীয় দিক দিয়েও এবং পার্থিব দিক দিয়েও। ধর্মীয় বরকত হল-আল্লাহ তায়া’লা অনেক নবী রাসূলকে এই শহরে প্রেরণ করেছিলেন। এখানে অনেক আম্বিয়ায়ে কেরামের কবর রয়েছে। আর পার্থিব বরকত হল- এর উর্বর জমি, অসংখ্য ঝর্ণা ও বহমান নদী এবং অসংখ্য সুমিষ্ট ফল-ফলাদির বাগান। তাই এই অঞ্চলটি নানান প্রকারের উৎকৃষ্ট ফল-ফলাদি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অতুলনীয়।

মি’রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা
মি’রাজের সফরের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ মক্কার মসজিদে হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদে আকসা পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপ মসজিদে আকসা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত। এবং তৃতীয় ধাপ সেখান থেকে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একান্ত সান্নিধ্যে। হুযূর (সা.) প্রসিদ্ধ বর্ণনা মতে হযরত উম্মে হানী (রাযি.)এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) তাশরীফ আনেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জাগ্রত করে প্রথমে সাক্কে ছদর অর্থাৎ- বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে অন্তর মোবারক যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন।
অতঃপর বোরাক যোগে মদীনা, তারপর মসজিদে আকসা গমন করেন। সেখানে তিনি সকল নবীকে নিয়ে দু’রাকাত নামায আদায় করেন। যদিও কোন কোন রেওয়ায়াতে আসার পথে নামায পড়ার কথা রয়েছে, তবে প্রথম মতটিই অগ্রগণ্য। পথিমধ্যে আপন রবের অনেক কুদরত ও নিদর্শন অবলোকন করেন। অতঃপর আসমান থেকে একটি সিঁড়ি আনা হয়। এ সিঁড়িটি কী এবং এর বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল তা আল্লাহ তায়া’লাই ভাল জানেন। যাতে নিচ থেকে উপরে উঠার জন্য ধাপ ধাপ বানানো ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) ঐ সিঁড়ির মাধ্যমে আসমানের দিকে অগ্রসর হন। কতেক রেওয়াতের মধ্যে আছে যে- বোরাকের উপর সাওয়ার হয়ে উক্ত সিঁড়ির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে প্রথম আসমানে, তারপর পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট আসমানে তাশরীফ নিয়ে যান।
প্রত্যেক আসমানে নিযুক্ত ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে স্বাগতম ও মুবারকবাদ জানান। প্রত্যেক আসমানে ঐ সমস্ত নবী-রাসূলদের সাথেও মুলাকাত হয় যাঁরা নির্দিষ্ট কোন আসমানে রয়েছেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.)এর সাথে, দ্বিতীয় আসমানে হযরত ইয়াহয়া ও হযরত ঈসা (আ.)এর সাথে, তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.)এর সাথে, চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরিস (আ.)এর সাথে, পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.)এর সাথে, ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ.)এর সাথে এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহীম (আ.)এর সাথে মুলাকাত করেন।
অতঃপর এমন এক ময়দানে পৌঁছলেন যেখানে তাক্বদীর লিপিবদ্ধকারী কলমের লেখার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ দেখেন, যেখানে আল্লাহ তাআলার হুকুমে বিভিন্ন রঙের এবং স্বর্ণের প্রজাপতি এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা ঐ স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত জিবরাঈল (আ.)কে স্বরূপে দেখতে পান। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি ‘রফরফ’ (সবুজ রঙের গদি বিশিষ্ট পালকী) দেখতে পান, যা দিগন্ত ব্যাপী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বাইতুল মা’মূরকেও দেখেন, যেটা বাইতুল্লাহ (কা’বা ঘর)এর বরাবর উপরে সপ্তম আসমানে অবস্থিত। যার দেওয়ালের সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.) হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বাইতুল মা’মূরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। যারা একবার প্রবেশ করেছে, তাদের কেয়ামত পর্যন্ত পুনরায় প্রবেশের পালা আসবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মি’রাজের সেই ঐতিহাসিক সফরে আপন প্রভুর জান্নাত দেখেন, যা আপন রবের নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং জাহান্নাম দেখেন, যেখানে বিভিন্ন প্রকারের আজাব ও শাস্তিতে ভরপুর ছিল। সিদরাতুল-মুনতাহা থেকে উপরে উঠে দরবারে ইলাহিতে হাজির হন, যে সম্পর্কে পবিত্র কালামে পাকে মহান রব্বুল আলামীনের ইরশাদ হয়েছে- ﻓﮑﺎﻥ ﻗﺎﺏ ﻗﻮﺳﯿﻦ ﺍﻭ ﺍﺩﻧﯽ এবং স্বীয় মহবুবের সাথে সরাসরি কোন মাধ্যম ছাড়াই কথা বলেন।
মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে স্বীয় উম্মতের জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের তোহফা নিয়ে আসেন। তারপর হযরত মূসা (আ.)এর পরামর্শে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবার থেকে কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্ত পর্যন্ত নামিয়ে আনেন। সেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়ে আসার সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, যারা এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিকভাবে আদায় করবে তাদেরকে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সাওয়াব দেওয়া হবে। অতঃপর বুরাকের উপর আরোহণ করে রাতের অন্ধকারেই মক্কা মুকাররামায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ হল মি’রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা।
এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষনীয়ঃ
মহানবী (সা.) রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্য থেকে আমাদের জন্য কী এনেছেন এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর হাবীবকে মি’রাজে নিয়ে তাঁর উম্মতের জন্য কী উপহার দিয়েছেন? মুসলিম শরীফের এক হাদীসে মি’রাজে আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য তিনটি জিনিষের কথা বর্ণিত হয়েছে। ১. পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, ৩. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করলে গুনাহ মাফ হওয়ার ঘোষণা। তবে নামাযের বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পায়। সুতরাং নামাযকে গুরুত্ব ও পাবন্দির সাথে আদায় করা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে কাউকে শরীক না করা একজন মুসলমানের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
আরও শিক্ষনীয় বিষয় হল, নবীর মি’রাজের ঘটনা সত্য এবং তা রূহানী ছিল না, বরং তা স্ব-শরীরে হয়েছে। অসংখ্য সহীহ এবং মুতাওয়াতের হাদীস দ্বারা এবং উম্মতের ইজমার দ্বারা এসব কিছু প্রমাণিত। আর নবীও অন্যদের মত মাটির তৈরী মানুষ, নূরের তৈরী ফেরেশতা নয়। কেননা উক্ত আয়াত দ্বারা এটা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। সুতরাং নবীর বর্ণনা করা খবরকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মেনে নিতে হবে। তবেই তো হওয়া যাবে প্রকৃত নবী প্রেমি আশেক। চাই তা যত অবাস্তবই মনে হোক না কেন। আর তখনই হওয়া যাবে ‘সিদ্দীক’, যেমনটি হতে পেরেছিলেন খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর (রাযি.)।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আল্লাহর বাণী ও নবী (সা.)এর ফরমানকে পরিপূর্ণ বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে ঈমানকে মুকাম্মাল করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥
লেখকঃ উস্তাযুল ফিক্বহ ওয়াল হাদীস এবং বিভাগীয় পরিচালক- উচ্চতর তাফসীর ও কুরআন গবেষণা বিভাগ, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী।
মাসিক মুঈনুল ইসলাম

Sunday, April 2, 2017

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেবের জীবনী


আওয়ার সাইট ব্লগ: মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক (জন্মঃ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ,১৩৮৯ হিজরী) বাংলাদেশের একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি ঢাকার ইসলামী গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ারউলূমুল হাদীস অনুষদ এবং রচনা ও গবেষণা বিভাগের প্রধান এবং মাসিক
আলকাউসারের তত্ত্বাবধায়ক। এছাড়াও তিনি ২০১২ সালে সরকারের গঠিত বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের সদস্য এবং হাদীসশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ গবেষক ও পণ্ডিৎ ব্যক্তিত্ব।
শিক্ষাজীবন
তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় চাঁদপুর শাহরাস্তির খেড়িহর কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে। সেখানে তিনি মিশকাত (ফযীলত) জামাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের করাচিতে বিনোরি
টাউন জামিয়াতুল উলুম আলইসলামিয়া য় ভর্তি হন।১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দেতিনি সেখানে তাকমীল ( ইসলামিক স্টাডিজ-এ মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি) সমাপন করেন। এরপর তিনি ঐ জামিয়াতেই মাওলানা
আব্দুর রশীদ নোমানীর তত্ত্বাবধানে তিন বছর হাদীসশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা (তাখাসসুস ফিল হাদীস) গ্রহণ করেন এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে তাখাসসুস ফিল হাদীস সমাপন করেন। এরপর তিনি দুই বছর করাচির দারুল উলুম
মাদ্রাসা য় মুফতি তাকী উসমানীর তত্ত্বাবধানে ফিকহ এবং ফতোয়া বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ( তাখাসসুস ফিল ইফতা ) গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তাখাসসুস ফিল ফিকহ ওয়া আল-ইফতা সমাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে আল্লামা আব্দুল
ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ -এর তত্ত্বাবধানে ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর হাদীসশাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার কাজ করেন।
কর্মজীবন
১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকায় উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ
আলইসলামিয়া যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাসচিব এবং উলুমুল হাদীস অনুষদের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে মারকাযুদ্ দাওয়াহ
আলইসলামিয়ার মুখপত্র ইসলামী ম্যাগাজিন মাসিক আলকাউসারের প্রকাশনা শুরু হয়। তখন থেকেই তিনি এই ম্যাগাজিনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।তিনি ঢাকার শান্তিনগরের আজরুন কারীম জামে মসজিদে জুমার নামাজের পরিচালনা করেন এবং জামিয়াতুল উলুম
আলইসলামিয়া কওমি মাদরাসা য় হাদীসশাস্ত্রে অধ্যাপনা করেন। এছাড়া তিনি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে সরকার গঠিত বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের একজন সদস্য।
রচনাবলী মাসিক আলকাউসারসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় তিনি হাদীসশাস্ত্র, হাদীস সম্পর্কিত বিভ্রান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যেগুলোর মাঝে কিছু পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি বাংলা এবং আরবি ভাষায় বেশকিছু মৌলিক ও গবেষণাধর্মী বই রচনা করেছেন।[৫] নিচে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলোঃ 1. নবীজীর নামাজ (ভূমিকা) 2. তালিবুল ইলমের পথ ও পাথেয়: মাসিক আলকাউসারের শিক্ষাপরামর্শ
বিভাগে শিক্ষক-এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরসমূহের একটি সংকলন। 3. উম্মাহর ঐক্য : পথ ও পন্থা: মার্চ ১৭ ২০১২ খ্রীষ্টাব্দে মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া র উদ্যোগে আয়োজিত "ওয়াহদাতুল উম্মাহ ওয়া ইত্তিবাউস সুন্নাহ" (মুসলিম উম্মাহর সংহতি এবং সুন্নাহের অনুসরণ) শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ। যা পরবর্তীতে মাসিক আলকাউসারে ধারবাহিকভাবে ছাপানো হয় এবং বই আকারে প্রকাশিত হয়। 4. তারাবীর রাকাআত সংখ্যা ও ঈদের নামায
5. হাদীস ও সুন্নাহয় নামাযের পদ্ধতি 6. প্রচলিত ভুল: মাসিক আলকাউসারে "প্রচলিত ভুল" বিভাগে প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহের সংকলন। 7. কাবলাল জুমা: কিছু নিবেদন 8. হাদীস ও সুন্নাহ্য় কাবলাল জুমা 9. ঈমান সবার আগে 1. আল মাদখাল ইলা উলুমিল হাদীসিস শারীফ: (আরবীতেঃ ﺍﻟﻤﺪﺧﻞ ﺇﻟﻰ ﻋﻠﻮﻡ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ )- হাদিসের রেফারেন্স বের করা, সনদ বা সূত্রে উল্লেখিত বর্ণনাকারীদের পরিচয় উদঘাটন করা এবং হাদিস ও হাদিস বর্ণনাকারীর মান নির্ণয়ের নিয়মাবলী সংশ্লিষ্ট বই।

মুফতী আমিনী রাহ. : সংগ্রামী এক আলেমের জীবন

মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ

তিনি হঠাৎ করে চলে গেলেন। সবাইকে হতবুদ্ধি,
নির্বাক ও শোকবিদ্ধ করে চলে গেলেন। ঘরবাড়ি-ময়দান শূন্য করেই চলে গেলেন। ঝড়ের রাতে জাহাজ থেকে নাবিক নেমে গেলে যেমন হয়, গহীন অরণ্যে কাফেলার রাহবার নিখোঁজ হয়ে গেলে যেমন হয়—
দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজের অবস্থা তার চলে যাওয়ায় তেমনই হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন মুফতী ফজলুল হক আমিনী।
জাতীয় ঈদগাহে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় বুধবার বিকাল সাড়ে তিনটায়। ওইদিন আসরের পর লালবাগ শাহী মসজিদের সামনের সংরক্ষিত করবস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এক নজরে তার জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ই নভেম্বর বি-বাড়ীয়া জেলার আমীনপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বি, বাড়ীয়া জামেয়া ইউনুসিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলাধীন বিক্রমপুরের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায় তিন বছর পড়াশুনা করেন। তারপর ১৯৬১ সালে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসায় চলে আসেন। এখানে তিনি হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহ. ও হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ., কিংবদন্তী মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ রাহ., শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা আজিজুল হক রাহ., আরেফ বিল্লাহ মাওলানা সালাহ উদ্দীন রাহ. এবং হযরত মাওলানা আব্দুল মজীদ ঢাকুবী রহ. -এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদীসের সনদ লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরী [রহঃ]-এর কাছে হাদীস পড়ার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান করাচী নিউ টাউন মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি উলুমুল হাদীসের উপর পাঠ গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন।
কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। প্রথমে মাদরাসা-ই- নূরিয়া কামরাঙ্গীরচরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই তিনি হজরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর কন্যার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭২ সালে মাত্র নয় মাসে তিনি কুরআন শরীফ হেফয করেন। এ সময় তিনি ঢাকার আলু বাজারে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে আলু বাজার মসজিদের খতীবের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে তিনি জামেয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসার শিক্ষক ও সহকারী মুফতী নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি লালবাগ জামেয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রধান মুফতীর দয়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর ইন্তেকালের পর থেকে তিনি লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে পান বড়কাটারা হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব। ইন্তেকালের আগ পর্যন্তই এই দুইটি মাদরাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পাশাপাশি ঢাকার কাকরাইল, দাউদকান্দির গৌরীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু মাদরাসার প্রধান অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুফতী আমিনী রাহ.-এর বিশেষত্ব কী ছিল? তিনি
একজন প্রজ্ঞাবান বড় আলেম ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী দুটি বড় মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীস ছিলেন। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হিসেবে সরব একজন ইসলামী রাজনীতিক ছিলেন। তার পরিচয় এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গত দুই যুগ ধরে তিনি ছিলেন এদেশের ধর্মপ্রাণ-দেশপ্রেমিক মানুষ ও সর্বস্তরের আলেম সমাজের একজন প্রধান প্রতিনিধি। তিনি তাদের ভাই ছিলেন। তিনি তাদের দুঃখ ও দ্রোহের কণ্ঠ ছিলেন। তিনি তাদের বন্ধু, নেতা ও অভিভাবক ছিলেন। সঙ্কটকালে তার গমগমা কণ্ঠ আর হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন তারা। আহা! এত সুন্দর করে জনসভা ও মাহফিলগুলোতে ইসলামের অতীত গৌরব, বীরত্ব, আশাব্যঞ্জকতা,
উদ্দীপনা, আল্লাহনির্ভরতা আর সাহসের পঙক্তিমালা তিনি উচ্চারণ করতেন যে মুহূর্তের
মধ্যেই লাখো মানুষের ছায়াচ্ছন্ন, চিন্তাক্লিষ্ট চেহারায় প্রত্যয় ও আশ্বাসের রোদ হেসে উঠত। তিনি তার বক্তব্যে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা পেশ করতেন। তিনি বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী,
গাজী নুরুদ্দীন জঙ্গি রাহ.-এর অমিত সাহসের ইতিহাস
উচ্চারণ করতেন। শাহ ওয়ালি উল্লাহ, সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, কাসেম নানুতুবী ও শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রাহ.-এর জীবনব্যাপী সংগ্রামের দাস্তান শোনাতেন। শেখ সাদী, জালালুদ্দীন রূমী, আকবর এলাহাবাদী, ইকবাল, হালী, জিগার মুরাদাবাদী ও খাজা আজিজুল হাসান মজযুব রাহ.-এর শের আবৃত্তি করতেন। তার কণ্ঠের উঠানামায় লাখো মানুষের মজমা তরঙ্গের মতো দুলতে থাকতো। তিনি সাহসের কণ্ঠ ছিলেন। সংগ্রামের ময়দানে অবিচলতার পাহাড় ছিলেন।
আশির দশকের শুরু পর্যন্ত তিনি ছিলেন অতি মনোযোগী ও নীরবতাবাদী একজন মেধাবী আলেম-শিক্ষক। তার শিক্ষক ও অভিভাবক হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ. তাকে রাজনীতিতে নামালেন। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সেই যে নামলেন তিনি,
আর সরে গেলেন না। তিনি যখন গেলেন তখন কোটি মানুষকে রাস্তায় রেখে একদমই তিনি চলে গেলেন।
নব্বই দশকের শুরুতে ভারতের উত্তর প্রদেশে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলে এই দেশে লংমার্চের ডাক দেয়া হয়। সেই লংমার্চ আন্দোলনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ও প্রধান নির্বাহী ছিলেন মুফতী আমিনী রাহ.। তার শিক্ষক শায়খুল হাসীস আল্লামা আজিজুল হক র
াহ. ছিলেন এ লংমার্চের আহ্বায়ক ও অভিভাবক। মুফতী আমিনী রাহ. ছিলেন এর কার্যনির্বাহী প্রধান। ১৯৯৪ সালে এক নাস্তিক মহিলা লেখক পবিত্র
কুরআন পরিবর্তনের ডাক দিলে তিনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সারা দেশে ছুটে বেড়িয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেন। হরতাল পালন করেন। সেই মুরতাদ মহিলা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০০১ সালে সব রকম ফতোয়া নিষিদ্ধ করার একটি রায় উচ্চ আদালত থেকে ঘোষিত
হলে তিনি বিচারপতিকে মুরতাদ ঘোষণা করে ঝুঁকিপূর্ণ ও ঘটনাবহুল এক আন্দোলনে নেমে পড়েন। তখন চার মাসের জন্য তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। বর্তমান সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতি ও নারীনীতি নিয়ে তিনি সোচ্চার প্রতিবাদ করেন। নারীনীতির মধ্যে উত্তরাধিকারসহ সবপর্যায়ে নারীর সম-অধিকারের কুরআনবিরোধী ধারা বাতিলের জন্য দেশবাসীর প্রতি আন্দোলনের ডাক দেন। এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে বহু প্রতিকূলতা ও প্রশাসনিক প্রতিরোধের মুখে ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল দেশব্যাপি সফল হরতাল পালন করেন। এর ঠিক ছয়দিন পর তার ছোট ছেলেকে গুম করে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাকে কোনোভাবেই নমনীয় করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে সেই ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। প্রতিটি আন্দোলনেই তিনি ছিলেন মূল আহ্বায়ক এবং আগাগোড়া অনমনীয় ও দৃঢ়পদ। সারাদেশের শীর্ষ আলেমরা প্রতিটি আন্দোলনে তার সঙ্গে ও পাশে থেকে তাকে সহযোগিতা করেন। প্রতিবাদ, আন্দোলন, সংগ্রামে ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থা ও আশ্বাসের মিনারে
পরিণত হন তিনি।
আন্দোলন-সংগ্রামে প্রবীণত্ব ও নেতৃত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি সব সময় সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন ছিলেন না। কিন্তু কার্যনির্বাহী দায়িত্ব তাকেই আঞ্জাম দিতে হয়েছে সব সময়। তার সময়কালে
প্রায় সময়ই তিনি তার গুরুজনদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ স্নেহ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছেন। খতিব উবায়দুল হক রাহ., বি-বাড়িয়ার বড়হুজুর মাওলানা সিরাজুল ইসলাম রাহ., শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রাহ. ও আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মতো বটবৃক্ষরা সব সময় তাকে স্নেহ-ছায়া বিলিয়ে এসেছেন। বড়দের সঙ্গে তিনি এভাবেই শ্রদ্ধা ও আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখতেন।
সংগ্রামী আলেম মুফতী ফজলুল হক আমিনী রাহ.-এর জীবনে তার প্রত্যক্ষ উস্তায তিন মনীষীর প্রভাবের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। সবচেয়ে বেশি বলতেন বাংলার সংস্কারক পুরুষ মোজাহেদে আযম হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী-ছদর ছাহেব রাহ.-এর কথা। বলতেন প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ও সংগ্রামী আলেম করাচির হযরত ইউসুফ বিন্নৌরী রাহ.-এর কথা। আর পরবর্তী পর্যায়ে দেশবরেণ্য বুযুর্গ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‌'তাওবার রাজনীতিক' হযরত মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর জীবন ও সংগ্রামের প্রভাবের কথা বিভিন্ন সময় উল্লেখ করতেন। তার পড়াশোনা, মেযাজ, চিন্তাধারা ও বিভিন্ন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তিনি এই মনীষীদের কথা শ্রদ্ধা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে উল্লেখ করতেন।
মুফতী আমিনী রাহ. মেধাবী ও সংগ্রামী একজন আলেম ছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণের কারণে তার আচরণে কখনো কখনো একটা আটপৌড়ে ও গাম্ভীর্যহীন ভাব বিরাজ করত। খোলামেলা ভাষায়
বক্তব্য দিতেন। প্রাণ খুলে মিশতেন। জোরের সঙ্গে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতেন। কখনো বয়ানের মধ্যেও হেসে উঠতেন। যা দেখলে অনেক সময় তাকে গভীর মনের ও চিন্তার মানুষ বলে মনে হতো না। একটা বিভ্রম তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবতা এ রকম ছিল না। যারা জানেন তারা জানেন যে, তিনি কেবল হাদীসের দরসের প্রস্তুতির জন্য নয়, বরাবর অধ্যয়ন পাগল একজন মানুষ ছিলেন। গভীর অধ্যয়ন ও পাঠনিমগ্নতায় তিনি অনেক সময়ই বিভোর থাকতেন। মাঝে মাঝেই ইসলামী জ্ঞান, দর্শন, ফিকহ ও চিন্তাধারা বিষয়ে নতুন প্রকাশিত আরবি-উর্দু-ফার্সির বহু কিতাব কার্টন ধরে ধরে তিনি কিনে আনতেন। ইসলাম বিষয়ে আলোচিত নতুন প্রকাশিত কোনো গ্রন্থ তার অপঠিত থাকত না। লালবাগ মাদরাসার বিশাল লাইব্রেরির প্রাচীন শত শত কিতাবের
কোনো কোনো পৃষ্ঠায় কাঠপেন্সিলে তার নোট ও পর্যবেক্ষণ আঁকা আছে। তার অন্তরে আচরণে আধ্যাত্মিকতার একটি স্বচ্ছ ঝর্ণা প্রবাহিত থাকতো। বেশিরভাগ সময়ই তার বক্তব্যে থাকতো আকাবিরে দ্বীন ও আসলাফে উম্মতের চোখভেজা বর্ণনা।
যারা জানেন তারা মুফতী আমিনী রাহ.-এর আরেকটি বিষয় সম্পর্কেও জানেন। বছরের প্রায় প্রতি রাতে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেঁদে-কেটে দুআ করতেন। এ
দুআ কখনও মাদরাসায় তার রুম বন্ধ করে করতেন,
কখনও ছাত্রদের ডেকে এনে দফতরে সম্মিলিতভাবে করতেন। দুআয় সময় দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকতেন। সে কান্না সহজে শেষ হতো না। লালবাগ মাদরাসায় প্রতি বৃহস্পতিবার শেষ রাতে তিনি একটি সম্মিলিত দুআর আয়োজন করতেন। রাত ৩টার আগেই সারা মাদরাসার ছাত্ররা উঠে এসে শাহী মসজিদের বারান্দায় তাহাজ্জুদ পড়ত। তেলাওয়াত করত। ফজরের আযানের আধা ঘণ্টা আগে তিনি সবার মুখোমুখি দাঁড়াতেন। এরপর সবাইকে নিয়ে দু’হাত আল্লাহর দরবারে তুলে ধরতেন। সামনে ছাত্ররা বসা। উল্টোদিকে একা তিনি দাঁড়ানো। মসজিদের বাতিগুলো থাকত নেভানো। রাজনীতির ময়দানে হুঙ্কার দেয়া মুফতি আমিনী সেই অন্ধকার শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে অসহায়ের মতো, ভিক্ষুকের মতো, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মতো চিত্কার করে কাঁদতে থাকতেন। তার সঙ্গে সারাটা মসজিদ যেন কাঁদতে থাকত। মনে হতো তার বুক যেন ফেটে যাচ্ছে। কান্নায়-কষ্টে, আবেদনে-আবদারে, দুঃখে-কাতরতায় তিনি নুয়ে নুয়ে পড়তেন। এবং অপরিহার্যভাবে এসব দুআয় তিনি দেশ, দেশের মানুষ, দেশের স্বাধীনতা ও শান্তির জন্য বড় একটি সময় জোরে জোরে দুআ করতেন।
দীর্ঘ বিশ মাস গৃহবন্দী থেকে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। কাছের মানুষরা জানেন, তাকে কতটা চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল। কতবার তাকে আদালতের বারান্দায় টেনে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো একটি মামলা কি তার ব্যক্তিগত ‘দুর্নীতি’, ‘উপার্জন’ কিংবা
‘অনৈতিকতা’ নিয়ে ছিল? দেশ ও ইসলামের জন্য লড়তে লড়তে, কুরআন ও সুন্নাহর জন্য বলতে বলতে তিনি অবরুদ্ধ হলেন। বছরের পর বছর অবরুদ্ধ ও
প্রায় নির্বাক থাকতে বাধ্য হলেন। আমার মতো তার হাজার হাজার অকৃতজ্ঞ ছাত্র, লাখ লাখ আলেম আর কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ তাকে মুক্ত করার কোনো চেষ্টা করিনি। তিনি তো আমাদের হয়েই লড়েছিলেন। তিনি তো দ্বীনের জন্যই টার্গেট হয়েছিলেন। আহা! ক্ষমাহীন নিস্পৃহা ও নির্বিকারত্ব নিয়ে আমরা তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে রাখলাম। কোনো প্রতিবাদ,
কোনো আন্দোলন, কোনো শব্দ আমরা করলাম না। এমনকি চিত্কার করে কাঁদলামও না। আমাদের এ অপরাধ কি আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন?
মুফতি আমিনী রাহ.। আমার শিক্ষক। আমাদের শিক্ষক। আমরা তার জন্য বেহেশতে উঁচু মাকামের প্রার্থনা করি। জানাযার লাখো মানুষের জনসমুদ্র তার জন্য হাউমাউ করে কেঁদেছে, ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। আর ঘন ঘন চোখ মুছেছেন হাজার হাজার মানুষ। তাকে হারানোর কষ্ট অনেকের চোখে স্রোত সৃষ্টি করেছে। শেষ জীবনে তাকে কষ্ট
দেওয়ার কষ্টে অনেকের বুকে পাথর জমেছে।
ইয়া আল্লাহ! তোমার প্রিয় এই মর্দে মুমিন ও মর্দে মুজাহিদকে তুমি শান্তির ছায়ায় টেনে নাও। আমীন। l
আরো পড়ুন এখানে

Saturday, April 1, 2017

দোলনায় কথা বলা তিন শিশু

মাহফুজ
আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, (বনী ইসরাঈলের মধ্যে)তিন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই দোলনায় কথা বলেনি।
(১) ঈসা ইবনে মারইয়াম।
মারইয়াম (আলাইহিসসালাম)-এর গর্ভে ঈসা (আলাইহিসসালাম) অলৌকিক ভাবে জন্মগ্রহণ করলে লোকজন তার ব্যাপারে সন্দিহান হ’ল।তখন মারইয়াম (আলাইহিসসালাম)-এর ইঙ্গিতে ঈসা (আলাইহিসসালাম) তাঁর মাতার পক্ষ থেকে জবাব দিয়ে বললেন, ‘আমি আল্লাহ্র দাস। তিনি আমাকে কিতাব (ইনজীল) প্রদান করেছেন এবং আমাকে নবী করেছেন’। ‘আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন ছালাত ও যাকাত আদায় করতে এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি’। ‘আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন জীবিত পুনরুত্থিত হব’ {মারিয়াম ১৯/২৯-৩৩}।
(২) ছাহেবে জুরাইজ (জুরাইজের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বাচ্চা)।
জুরাইজ একজন আবেদ বান্দা ছিলেন। তিনি নিজের জন্য একটি ইবাদতগাহ তৈরী করলেন। তিনি সেখানে থাকা অবস্থায় একদিন তার মা সেখানে আসলেন। এ সময় তিনি ছালাতে রত ছিলেন। তার মা বললেন, ‘হে জুরাইজ! তখন তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’।
জুরাইজ ছালাতেই রত থাকলেন। তার মা চলে গেলেন। পরবর্তী দিন তার মা আসলেন । এবারও তিনি ছালাতে মগ্ন ছিলেন। তার মা তাকে ডাকলেন, ‘হে জুরাইজ’! তিনি (মনে মনে) বলেন, ‘হে প্রভু! একদিকে আমার ছালাত আর অন্যদিকে আমার মা’।
তিনি তার ছালাতেই ব্যস্ত থাকলেন। এভাবে তৃতীয় দিনেও জুরাইজ একই কাজ করলে তার মা বললেন, ‘হে আল্লাহ! একে তুমি যেনাকারী নারীর মুখ না দেখা পর্যন্ত মৃত্যু দিও না’। বনী ইসরাঈলের মধ্যে জুরাইজ ও তার ইবাদতের কথা আলোচিত হ’তে লাগল। এক ব্যভিচারী নারী ছিল। সে উল্লেযোগ্য রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারিণী ছিল। সে বলল, তোমরা যদি চাও, আমি তাকে (জুরাইজ) বিভ্রান্ত করতে পারি। সে তাকে ফুসলাতে লাগল, কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। অতঃপর সে তার ইবাদতগাহের কাছাকাছি এলাকায় এক রাখালের কাছে আসল। সে নিজের উপর তাকে অধিকার দিল এবং উভয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হ’ল। এতে সে গর্ভবতী হ’ল। সে বাচ্চা প্রসব করে বলল, এটা জুরাইজের সন্তান। বনী ইসরাঈল (ক্ষিপ্ত হয়ে) তার কাছে এসে তাকে ইবাদতগাহ থেকে বের করে আনল, তার ইবাদতগাহ ধূলিসাৎ করে দিল এবং তাকে মারধর করতে লাগল। জুরাইজ বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তারা বলল, তুমি এই নষ্টা মহিলার সাথে যেনা করেছ। ফলে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তিনি বললেন, শিশুটি কোথায়? তারা শিশুটিকে নিয়ে আসল। জুরাইজ বললেন, আমাকে একটু সুযোগ দাও ছালাত আদায় করে নেই। তিনি ছালাত আদায় করলেন। ছালাত শেষ করে তিনি শিশুটির কাছে এসে তার পেটে খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শিশু! তোমার পিতা কে’? সে বলল, ‘আমার পিতা অমুক রাখাল’।
উপস্থিত লোকেরা তখন জুরাইজের নিকটে এসে তাকে চুম্বন করতে লাগল এবং তার শরীরে হাত বুলাতে লাগল। আর তারা বলল, এখন আমরা তোমার ইবাদতগাহটি সোনা দিয়ে তেরী করে দিচ্ছি। তিনি বললেন, দরকার নেই, বরং পূর্বের মত মাটি দিয়েই তৈরী করে দাও। অতঃপর তারা তাই করল।
(৩) একটি শিশু
তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় একটি লোক দ্রুতগামী ও উন্নত মানের একটি পশুতে সওয়ার হয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তার পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল উন্নত। শিশুটির মা বলল, ‘হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে এই ব্যক্তির মত যোগ্য কর’।
শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে লোকটির দিকে এগিয়ে এসে তাকে দেখতে লাগল। অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এই ব্যক্তির মত কর না’? অতঃপর ফিরে এসে পুনরায় মায়ের দুধ পান করতে লাগল। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি যেন এখনও দেখছি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিশুটির দুধ পানের চিত্র তুলে ধরছেন এবং নিজের তর্জনী মুখে দিয়ে চুষছেন। তিনি বলেন, লোকেরা একটি বাঁদিকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। আর বলছিল, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। মেয়ে লোকটি বলছিল, ‘আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক’।
শিশুটির মা বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানকে এই নষ্টা নারীর মত কর না’।
শিশুটি দুধ পান ছেড়ে দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল, অতঃপর বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এই নারীর মত কর’।
এ সময় মা ও শিশুটির মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। মা বলল, হায় দুর্ভাগা! একটি সুশ্রী লোক চলে যাওয়ার সময় আমি বললাম,‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এরূপ যোগ্য করে দাও’। তুমি প্রত্যুত্তরে বললে, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এর মত কর না’।
আবার এই ক্রীতদাসীকে লোকেরা মারধর করতে করতে নিয়ে যাচ্ছে এবং বলছে, তুমি যেনা করেছ এবং চুরি করেছ। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এরূপ করোনা। তুমি বললে ,”হে আল্লাহ্ আমাকে এরূপ কর ।” শিশুটি এবার জবাব দিল, প্রথম ব্যক্তি ছিল স্বৈরাচারী যালেম। সেজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এ ব্যক্তির মত কর না? আর এই মহিলাটিকে তারা বলল, তুমি যেনা করেছ। প্রকৃতপক্ষে সে যেনা করেনি। তারা বলছিল, তুমি চুরি করেছ। আসলে সে চুরি করেনি। এজন্যই আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এই মেয়ে লোকটির মত কর’
{বুখারী হা/৩৪৩৬ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮, হা/২৪৮২ ‘মাযালিম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৫; মুসলিম হা/২৫৫০ ‘সদ্ব্যবহার ও শিষ্টাচার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২}
শিক্ষা :
১. আল্লাহ্র উপর পূর্ণ আস্থা থাকলে কেউ পদস্খলন ঘটাতে পারবে না।
২. কোন হক্বপন্থী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন, তা একদিন সত্যরূপে প্রকাশিত হবেই এবং ষড়যন্ত্রকারীরা লজ্জিত হবে।
৩. আমরা যাকে ভাল মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে ভাল নাও হ’তে পারে। পক্ষান্তরে যাকে খারাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সে খারাপ নাও হ’তে পারে।
৪. সর্বদা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে

Wednesday, March 29, 2017

তোরা আমাকে বানাস পর!



আমার
এক কাঁধে 'জমিয়ত'
আর
এক কাঁধে 'খেলাফত'
এই
বুকজুড়ে 'হেফাজত'
আর
দু'চোখে 'আন্দোলন'।
...
আমার
আঙুলে আঙুলে দল
তাই
দু'হাতে পাই না বল
দেখি
দলে দলে কোন্দল
আর
চুঁপি চুঁপি কাঁদে মন।
...
আমি
কারও সাথে নই ভাগ
আমি
কারও প্রতি নই রাগ
আমি
সকলেরে বলি- 'জাগ্!
গড়ে
একতার বন্ধন'।
...
আমি
দলকে করি না দ্বীন
আমি
প্রতীকে হই না লীন
আমি
'মিনাল মুসলিমীন'
করি
কালেমা উত্তোলন।
...
বলি
সকলেরে 'ওরে আয়!
এই
কালেমার পতাকায়
যারে
দূরে ঠেলে দিলি হায়!
তারে
করে নে আলিঙ্গন।'
...
আমি
তাবলীগে দিই সাল
আমি
ময়দানে হই লাল
আমি
রাজপথে উত্তাল
আমি সব মিলে একজন।
...
আমি
সকলের মাঝে রই
আমি
সকলের কথা কই
কারও
পকেটের কবি নই
রবো
এভাবেই আমরণ।
...
তোরা
আমাকে বানাস পর!
কর্
যা খুশি তোদের কর্
তোরা
কাঁদবি জনমভর
করে
আমার কথা স্মরণ।

Tuesday, March 28, 2017

আদর্শ পরিবার গঠনে চল্লিশটি নসীহত

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ওমর:

সকল প্রশংসা সেই মহান রাব্বুল আলামীনের তরে, যিনি অসীম নিয়ামত দান করেছেন আমাদেরকে। তন্মধ্যে বড় নিয়ামত হল বাড়ী-ঘর ও পরিবার। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন- “আর আল্লাহ্ করে দিয়েছেন তোমাদের গৃহকে অবস্থানের জায়গা।” (সরা নাহল- ৮০)।
অগণিত দরূদ ও সালাম সেই মহান বার্তাবাহকের প্রতি, যিনি ইরশাদ করেছেন- “ফিত্নার সময় পুরুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হল তার বাড়ী।” তিনি আরও ইরশাদ করেছেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করবেন, সে তার কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করেছে কি-না। আরো জিজ্ঞেস করবেন পুরুষদেরকে তার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে।” আর রহ্মত ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর পবিত্র আল্ ও আসহাবগণের উপর এবং সকল অনুসরণকারীদের উপর।
বর্তমানে মুসলমানরা পরিবার পদ্ধতিকে দরে ঠেলে দিয়ে বিজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি অবলম্বনের নামে উলঙ্গ ও বেহায়াপনা গ্রহণ করে মহাবিপদ জাহান্নামের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এহেন বিপদ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে কুরআন-হাদীসের আলোকে নিজ নিজ পরিবার পরিচালনার উদ্দেশ্যে চল্লিশটি নসীহত বর্ণনা করা হচ্ছে।
(১) বাড়ীঃ পরিবার গঠনের একটি অপরিহার্য অংশ হচ্ছে বাড়ী। তাই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- বাড়ী করার পূর্বে প্রতিবেশীর নৈতিকতা দেখা প্রয়োজন। কারণ, এক প্রতিবেশীর প্রভাব অপর প্রতিবেশীকে প্রভাবান্বিত করে। এ জন্য রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দোয়া পাঠ করতেন- “হে আল্লাহ্! আপনার নিকট পানাহ্ চাই মন্দ প্রতিবেশী থেকে স্থায়ী বসত বাড়ীতে।” (বুখারী শরীফ)। বাড়ীটি মসজিদের সন্নিকটে হওয়া উত্তম। এতে করে অনেক নেক আমল করা সহজ হয়। যেমন, জামাআতে নামায পড়া, বাচ্চাদের কুরআন শিক্ষা দেওয়া, আযান শুনে মহিলাদের সময় মত নামায পড়তে পারা ইত্যাদি। বাড়ীতে পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহে মহিলাদের নামাযের জন্য ১টি স্থান নির্ধারিত করে নেওয়া উচিত। বাড়ীর পরিবেশকে পরিস্কার রাখা বাঞ্ছনীয়।
(২) বাড়ীর কর্তাঃ আদর্শ পরিবার গঠনে যেমন বাড়ী অপরিহার্য তেমনি একজন আদর্শ কর্তাও অপরিহার্য। কর্তাকে পরিবার পরিচালনায় একজন বিচক্ষণ অতন্দ্র প্রহরির ন্যায় সজাগ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআনী ইল্মই একমাত্র সঠিক পথনির্দেশনা দিতে পারে। তাই কর্তাকে কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
(৩) আদর্শ রমণীঃ আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য একজন আদর্শ রমণী অপরিহার্য। কুরআন-হাদীসে আদর্শ নারীকে বিবাহ করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সর্বোত্তম সম্পদ হল নেক আমলধারী স্ত্রী। তোমরা এমন মহিলাকে বিবাহ কর যে মুসলিমা, মু’মিনা, ধৈর্যশীলা, তাওবা কারীনী, নামাযী, পর্দানশীলা, পরহেযগার। ফলশ্রুতিতে এরূপ স্ত্রী তোমার অনুপস্থিতিতে তার নিজের নফ্স এবং তোমার সম্পদ হিফাযত করবে নিঃসন্দেহে। এরূপ স্ত্রী থেকে ভাল সন্তান আশা করা যায়।
(৪) আদর্শ সন্তানঃ আদর্শ সন্তান পেতে হলে আদর্শ শিক্ষা দিতে হবে। আর সন্তানের প্রথম শিক্ষার স্থান হল মা। তাই মাকে যেমন নিজের আমল ভাল করতে হবে তেমনি সন্তানকেও আদর্শ শিক্ষা দিতে হবে। অন্যথায় হাশরের দিন মা-বাবাকে দায়ী করা হবে। তাই সন্তানের প্রতি সর্বদা তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে অসৎ সংস্পর্শে না পারে। অবশ্যই তাদেরকে নামাযী বানাতে হবে। একমাত্র দ্বীনি শিক্ষাই পারে শিশুকে আদর্শ চরিত্রের অধিকারী ও আমলী করে গড়ে তুলতে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে আদর্শ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। আজকের আদর্শ শিশু দ্বারাই আগামী দিনে সমাজ-রাষ্ট্রে শান্তি আসবে। তাই পরিবারের কর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, “হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই কঠোর অগ্নি হতে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর।” (সরা তাহরীম- ৬)।
(৫) যিকরঃ সর্বদা আল্লাহ্র যিক্র দ্বারা আপন গৃহকে যিন্দা রাখতে হবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে গৃহে আল্লাহ্র যিক্র হয় না আর যে গৃহে যিক্র হয়, এতদুভয় গৃহ মুর্দা ও যিন্দার ন্যায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আজ অনেক মুসলিম পরিবারেই আল্লাহ্র যিক্র নেই, আছে নাচ-গান আর শয়তানী কর্মকান্ডের সমাহার। কাজেই গৃহকে যিন্দা করতে হলে তাতে কুরআনের তিলাওয়াত, নামায, তা’লীম, ইসলামী বই-পুস্তকের পাঠ চালু করতে হবে।
(৬) বলা বানানোঃ বসত গৃহকে ক্বিবলা বানানোর অর্থ হল, গৃহের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট স্থানে নামায চালু করা। আল্লাহ্ তাআলা বলেন- “তোমাদের গৃহগুলোকে ক্বিবলা বানাও এবং তাতে নামায কায়েম কর।” (সরা ইউনুস- ৮৭)। হাদীস শরীফে আছে, তোমাদের গৃহকে কবর বানিয়ো না। যেমন- কবর ১টি গৃহ, তাতে মানুষ আছে কিন্তু কোন যিকর নেই। আমাদের গৃহ যেন এমন না হয়। ফরয নামায মসজিদে আদায়ের পর সুন্নাত-নফল নিজ নিজ গৃহে আদায় করবে।
(৭) বিসমিল্লাহ আমলঃ প্রতিটি কাজ বিসমিল্লাহ্ বলে আরম্ভ করলে তাতে বরকত হয়। হাদীসে আছে, কোন ব্যক্তি যখন বিসমিল্লাহ্ বলে গৃহে প্রবেশ করে, গৃহের যাবতীয় কর্ম বিসমিল্লাহ্ পাঠের মাধ্যমে আরম্ভ করে, শয়তান বলে সে গৃহে আমার স্থান নেই, আমার খাবার নেই। বিসমিল্লাহ্র আমল না থাকলে শয়তান বলে সেই গৃহে আমার স্থানও আছে, খাবারও আছে। কাজেই প্রত্যেকটি কাজের প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ্ পাঠ করা উচিত।
(৮) প্রস্থানের সময় দোয়াঃ নিুোক্ত দোয়াটি পড়ে যে ব্যক্তি আপন গৃহ থেকে বের হবে আল্লাহ্ তআলা তাকে হিফাযতের যিম্মাদার হয়ে যান। দোয়া- “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্।”
(৯) মিসওয়াকঃ মিসওয়াকের অপরিহার্যতা অনেক ব্যাপক। দাঁত পরিস্কারের অপরিহার্যতা আমরা যেমন অনুভব করি ঠিক তেমনি মিসওয়াক। মিসওয়াক দ্বারা দাঁতের অনেক উপকার হয়। সাথে সাথে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি সুন্নাত যিন্দা হয়। রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই গৃহে প্রবেশ করতেন প্রথমে মিসওয়াক করতেন। মিসওয়াক করে নামায আদায় করলে নামাযের মর্তবা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
(১০) সরা বাক্বারাহ্র তিলাওয়াতঃ যে গৃহে সরা বাক্বারাহ্ নিয়মিত তিলাওয়াত করা হয় শয়তান সে গৃহ থেকে দরে অবস্থান করে। এক হাদীসে আছে, ঐ গৃহে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না। বিশেষ করে সরা বাক্বারাহ্র শেষ দুই আয়াত অবশ্যই প্রতি দিন পাঠ করা উচিত।
(১১) পারিবারিক শিক্ষাঃ পরিবারের কর্তার দায়িত্ব হল সবাইকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজে নিষেধ করা। ইমাম কাতাদাহ্ (রাহ্.) বলেন, আল্লাহ্র ইবাদতের দিকে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবে, সৎকাজের আদেশ করবে। পাপ কাজে বাধা প্রদান করবে। ইমাম যাহ্হাক (রাহ্.) বলেন, মুসলমানের দায়িত্ব হল, নিজ নিজ পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্র বিধি-বিধানগুলো শিক্ষা দেওয়া। হযরত আলী (রাযি.) বলেন, পরিবারের লোকদের ইল্মে দ্বীন শিক্ষা দাও এবং আদব শিক্ষা দাও।
(১২) ইসলামী পাঠাগারঃ ইসলামী শিক্ষার সহায়ক হিসেবে বাড়ীতে একটি ইসলামী পাঠাগার থাকা অতিব প্রয়োজন। সে পাঠাগারে ইসলামের সহীহ্ আক্বীদা, তাফ্সীর, হাদীস, জীবনী, ইতিহাস, ফিক্বাহ্ প্রভৃতি বিষয়ক প্রয়োজনীয় বই-কিতাব এবং ইসলামী পত্রপত্রিকা থাকা আবশ্যক। বই-পুস্তক এমনভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে, যেন সহজেই হাত বাড়ালে পাওয়া যায়।
(১৩) দৈনন্দিন তা’লীমঃ প্রতিটি গৃহে দৈনিক একবার কিতাবী তা’লীম চালু করা উচিত। পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে বসে ধর্মীয় বই-পুস্তক বিশেষ করে সাহাবায়ে কিরামের ঘটনাবলী পড়ে শোনানোর নিয়ম চালু করা বাঞ্ছনীয়।
(১৪) আলেমে দ্বীনের আগমনঃ সময় সময় হক্কানী আলেম ও বুযুর্গানে দ্বীনের বাড়ীতে আগমন ঘটলে বাড়ীতে নর বৃদ্ধি পায়। তাদের নিকট থেকে দ্বীনের অনেক বিষয় অবগত হওয়া যায়।
(১৫) অনুমতিঃ কারো বাড়ীতে বা গৃহে প্রবেশ কালে প্রথমে মালিকের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন এবং এটি সুন্নাত। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যে পর্যন্ত না আলাপচারিতা বা সালামের মাধ্যমে অনুমতি প্রদত্ত হয়।” (সরা নরঃ ২৭)।
(১৬) পানাহারের অনুমতিঃ বিনা অনুমতিতে কারো কিছু খাওয়া বা ব্যবহার করা নাজায়েয। তবে এমন কিছু আত্মীয়-স্বজনের গৃহে বিনা অমুতিতে খাওয়া জায়েয যারা এতে অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হবে না। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ “তোমরা খেতে পারবে তোমাদের গৃহে, তোমাদের পিতা-মাতাদের গৃহে, তোমাদের ভাই-বোনদের গৃহে, তোমাদের চাচা-ফুফুদের গৃহে, তোমাদের খালা-মামাদের গৃহে, সেসব গৃহে যেগুলোর চাবির মালিক তোমরা অথবা তোমাদের সেসব বন্ধুদের গৃহে যারা এতে নারাজ হবে না।” (সরা নরঃ ৬১)।
(১৭) তিন সময়ে অন্যের কক্ষে প্রবেশ নিষেধঃ এই তিনটি সময় সাধারণতঃ নিদ্রার সময়। নিদ্রা অবস্থায় বেপর্দা হওয়ার আশঙ্কা আছে তাই সতর্কতা হিসেবে তখন প্রবেশ করা নিষেধ। এগুলো হল, (১) ফজরের পূর্বে, (২) দুপুর বেলা নিদ্রার সময়, (৩) ঈশার পর নিদ্রার সময়। এর কারণ হল, যেন কারো অশোভনীয় অবস্থার উপর নজর না পড়ে। তবে বেশী প্রয়োজন হলে তিন বার অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে।
(১৮) কারো গৃহে উঁকি দেওয়াঃ কারো গৃহে উঁকি দেওয়া নিষেধ। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, কেউ যদি বিনা অনুমতিতে উঁকি দেয়, তার চক্ষু নষ্ট করে দাও। এতে কোন ক্বিছাছ নেই, জরিমানাও নেই।
(১৯) স্ত্রীর প্রতি শাসনঃ স্ত্রী যদি দুষ্টু প্রকৃতির হয়, তাকে আদর করে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতে চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে বিছানা পৃথক করে দিবে। এমনকি মৃদু প্রহার করবে। তবে চেহারায় যেন কোন দাগ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
(২০) খোলা আকাশের নীচে শয়নঃ খোলা আকাশের নীচে শয়ন করা উচিত নয়। কারণ এতে যে কোন বিপদ আসতে পারে বিশেষ করে দুশমন সুযোগ পেয়ে আঘাত হানতে পারে। একইভাবে খোলা ছাদে ঘুমানো নিষেধ। বিশেষ করে যে ছাদের চার পাশ দেওয়াল ঘেরা নয় তাতে নিদ্রা যাওয়া নিষেধ। কারণ, নিদ্রা অবস্থায় গড়িয়ে নীচে পড়ে যেতে পারে। হাদীসের ভাষ্য মতে এরূপ ব্যক্তি কারো দায়িত্বে নয়।
(২১) পরামর্শ করাঃ যে কোন বিষয়ে পরামর্শ করা সুন্নাত। সরা শরার ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ মু’মিনদের প্রত্যকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিবে। পরিবারের কর্তার উচিত, যখন কোন কাজ সামনে আসে, তখন পরিবারের সচেতন সদস্যদেরকে নিয়ে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এতে আল্লাহর রহমত আসবে।
(২২) মতানৈক্যঃ অনেক সময় সংসারে মতানৈক্য দেখা দেয়। তখন সেই মতানৈক্য অত্যন্ত নম্রতা-ভদ্রতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মিমাংসা করা উচিত। ধৈর্যের সাথে নিজের ক্রোধ সংবরণ করে নিলেই শান্তি স্থাপিত হবে।
(২৩) শালীনতাঃ ইজ্জত-সম্ভ্রম ও শালীনতা রক্ষার্থে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখবে। অশালীন ও অশ্লীল বাক্য প্রকাশ করবে না। কারণ গৃহে ছোট বাচ্চরা থাকে, তারা অতি অনুকরণ প্রিয়। তাই সতর্ক থাকতে হবে যেন তাদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পড়ে। মাতা-পিতা ও বড়দের গোপনীয়তা যেন ছোটদের সামনে প্রকাশ না পায়। লজ্জা ঈমানের অঙ্গ, লজ্জাহীনতা দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
(২৪) গৃহকর্তা অতন্দ্র প্রহরীঃ বাড়ীর কর্তাকে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিচক্ষণতার সাথে সব দিক লক্ষ্য রাখতে হবে। বাড়ীতে যেন কোন বেআমল লোক প্রবেশ না করে। বিশেষ করে বেপর্দা মহিলা যারা পর্দাহীন অবস্থায় রাস্তাঘাটে চলাফেরা করে তারা যেন গৃহে প্রবেশ না করে সেদিকে খেয়াল রাখবে। এতে অনেক বিপদ আগমন করে। অনেক সময় শান্তির সংসারকে অশান্ত করে তুলে। এমনিভাবে আপন পরিবারের কেউ যেন মন্দ পরিবেশে না যায় সেটি গৃহকর্তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
(২৫) মাতা-পিতার সন্তুষ্টিঃ সবসময় মাতা-পিতাকে রাজিখুশী রাখতে চেষ্টা করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। (সরা নিসাঃ ৩৬)। রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আল্লাহ্র সন্তুষ্টি তোমার মাতা-পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত।
(২৬) গোপনীয়তাঃ রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- ক্বিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট সবচেয়ে খারাপ বলে চিহ্নিত হবে যে স্বামী- স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে। স্বামী- স্ত্রীর মতানৈক্য এবং গৃহের গোপন বিষয় প্রকাশ করতে নেই। এতে শয়তান সুযোগ পায়। যে ব্যক্তি অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করবে হাশরের দিন আল্লাহ্ তার গোপনীয়তা রক্ষা করবেন।
(২৭) মধুময় ব্যবহারঃ সবার সাথে মধুময় ব্যবহার করা উচিত। কেউ অশালীন ব্যবহার করলে ধৈর্য ও শালীনতা দিয়ে তার উত্তর দেওয়া উচিত। অশ্লীল বাক্যালাপ পরিহার করা উচিত।
(২৮) সাহায্য করাঃ পরিবারের একে অপরের কাজে সাহায্য করা উচিত। হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের বিভিন্ন কাজ নিজ হাতে করতেন। স্ত্রীদের কাজে সাহায্য করতেন। নামাযের সময় হলে নামাযের জন্য চলে যেতেন।
(২৯) বিছানা পৃথক করাঃ সাত বছর বয়সের বাচ্চাদের বিছানা পৃথক করে দিতে হবে। এক চাদরের নীচে দু’জন শয়ন করতে হাদীসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, চাই তারা পুরুষ হোক বা নারী।
(৩০) সাবধানতাঃ পরিবারের কর্তার উচিত গৃহে একটি শাসন দন্ড ঝুলিয়ে রাখা, যাতে মারের ভয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সবাই হুঁশিয়ার থাকে। হাদীসে আছে, একটি লাঠি গৃহের এমন স্থানে ঝুলিয়ে রাখবে যেন সবার নজরে পড়ে। এতে সবার জন্য আদব রয়েছে।
(৩১) ইসলামী পোশাকঃ পরিবারের সকলকেই ইসলামী পোশাক-পরিŽছদ গ্রহণ করা জরুরী। এ ব্যাপারে বিশেষ করে মহিলাদের সাবধান থাকতে হবে। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন- “…. এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে…। (সরা নূর- ৩১)। এমন কাপড় পরিধান করা নিষেধ যদ্বারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতি প্রকাশ পেয়ে যায়। যারা এরূপ কাপড় পরিধান করবে তারা বেহেশতের গন্ধও পাবে না।
(৩২) সন্তান জন্মঃ যে গৃহে সন্তান জন্ম হয় সে গৃহে রহ্মত ও বরকত নাযিল হয়। হাদীসে বর্ণিত আছে, দুর্বলদের উসীলায় তোমাদেরকে রিযিক দেওয়া হয়। কন্যা সন্তান শান্তি লাভের উপায়, জান্নাত লাভের মাধ্যম এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের উসীলা। ফেরেশ্তারা ঐ গৃহের জন্য দোয়া করে যে গৃহে কন্যা সন্তান জন্ম হয়।
(৩৩) সামর্থ অনুযায়ী খরচ করাঃ সংসারের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণার্থে সামর্থ অনুযায়ী খরচ করা উচিত। এতে রয়েছে বিরাট সাওয়াব। অপর দিকে যেমন কৃপণতা করা নিষেধ তেমনি অপব্যয় করাও নিষেধ।
(৩৪) সুস্বাস্থ্যঃ সর্বদা গৃহকর্তাকে সতর্ক থাকতে হবে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সাথে সাথে সুচিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রুষার ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারী চিকিৎসার সাথে সাথে কুরআনী চিকিৎসা চালানো উত্তম। হাদীসে আছে, কেউ অসুস্থ হলে সরা ফালাক, নাস ও ফাতেহা পাঠ করে ফুক দিবে, আল্লাহ্ শেফা দান করবেন।
(৩৫) প্রতিবেশীর হকঃ সাধ্যমত প্রতিবেশীর হক আদায় করতে হবে। তাদের সুখে-দুঃখে শামিল হতে হবে। যথাসাধ্য সাহায্য-সহায়তা করতে হবে।
(৩৬) কানাকানিঃ কয়েকজন একত্র অবস্থায় একজন আরেক জনের সাথে কানেকানে কথা বলা নিষেধ। এর দ্বারা পরস্পরের মধ্যে নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এমনভাবে কথা বলা নিষেধ যদ্বারা অন্যকে অবজ্ঞা করা হয়।
(৩৭) স্বর্ণ ব্যবহার করাঃ মহিলাদের স্বর্ণ ব্যবহার করা বৈধ। তবে পুরুষের জন্য অবৈধ। জনৈক লোকের হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আংটি খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন। আর বলেন, তোমরা কি চাও আগুনের টুকরো হাতে রাখতে?
(৩৮) প্রাণীর ছবিঃ যে কোন ধরনের প্রাণীর ছবি গৃহে রাখা যাবে না। কারণ, যে গৃহে প্রাণীর ছবি ও কুকুর থাকে সে গৃহে রহ্মতের ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না। একইভাবে মুসলমানের গৃহে অমুসলমানের স্মৃতিচিহ্ন রাখা নিষেধ।
(৩৯) গীবত-শিকায়াতঃ গীবত করা মহাপাপ। গীবত বা কারো অগোচরে তার সমালোচনা করলে নিজের নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত আছে, গীবতকারী তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত ভক্ষণ করে। অন্য এক হাদীসে আছে, কেউ অন্যের দোষ ঢেকে রাখলে হাশরের দিন আল্লাহ্ তার দোষ ঢেকে রাখবেন।
(৪০) ধমপানঃ বাড়ীতে ধমপান সর্বোতভাবে বর্জনীয়। এতে আর্থিক অপচয়, স্বাস্থ্যের ক্ষতি, পরিবেশ দষণ হয়। এছাড়াও ধমপানের বিভিন্ন প্রকার অপকারিতা রয়েছে।
শেষ কথাঃ তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হাদীসে আছে, হযরত রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সন্ধ্যার সময় ছোট বাচ্চাদের গৃহে আটকে রাখবে। এ সময় শয়তান চলাফেরা করে। এক ঘণ্টা রাত হওয়ার পর তেমন অসুবিধা নেই। রাতে ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে। বাসনপত্র ঢেকে রাখবে। ঢেকে রাখার কিছু না পেলে অন্তত এক টুকরো লাকড়ী হলেও তার উপর রেখে দিবে। বাতি নিভিয়ে দিবে। আল্লাহ্র নাম স্মরণ করবে।
হে আল্লাহ্! উপরোক্ত বিষয়গুলোর উপর আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥
http://monthlymueenulislam.com/?p=1202