Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Monday, April 10, 2017

জাকির নায়েক নাস্তিকদের 'মাথাব্যথা'র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিশ্চিত: আরিফ আজাদ


জাকির নায়েক আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক, ওয়ার্ল্ডওয়াইড নাস্তিকদের 'মাথাব্যথা'র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিশ্চিত।
বাংলা নাস্তিকরা কোন মুসলিমকে কটাক্ষ করার আগে তাকে সরাসরি 'জাকির নায়েকের চ্যালা' 'জাকির নায়েকের মুরিদ' বলে থাকে।
জাকির নায়েকের নামকে বিকৃত করে তাকে 'জোকার নায়েক', এবং তার ছবিকে বিকৃত করে অসংখ্য কার্টুনও তারা বানিয়েছে এবং বানাচ্ছেও।
সে যাইহোক, জাকির নায়েক এবং উনার প্রতিষ্ঠিত 'পিস টিভি' কে গতবছর ভারত এবং বাংলাদেশে ব্যান করা হয় খুব সিলি একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে।
ইস্যুটা ছিলো- ঢাকার গুলশানের জঙ্গী হামলার সাথে জড়িতদের কোন একজন টুইটার বা ফেইসবুকে জাকির নায়েকের ফলোয়ার ছিলো এবং কোন একসময়, জাকির নায়েকের কোন একটি লেকচার সে শেয়ার করেছিলো।
এ থেকে ধারণা করা হয় যে, সেই জঙ্গীটা ডক্টর জাকির নায়েক দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে জঙ্গী কর্মকান্ডে জড়িয়েছে। মোদ্দাকথা, সেই জঙ্গীর সূত্র ধরে, জাকির নায়েক এবং উনার 'পিস টিভি' কে জঙ্গী কর্মকান্ডে উস্কানিদাতা হিসেবে দেখিয়ে ব্যান করে দেওয়া হয়।
জাকির নায়েক এবং উনার পিস টিভি ব্যান হওয়ার পর এদেশের মুক্তমনাদের মনে খুশির বন্যা বয়ে গেলো। সবাই খুশিতে বাক বাকুম বাক বাকুম করতে লাগলো। আহা! এতোদিনে সরকার একটা কাজের কাজ করেছে। এদেশের একজন নামকরা প্রফেসর, যিনি আবার নিজেকে বাক স্বাধীনতার পক্ষের লোক, অবাধ মত প্রকাশের (সে যার মত-ই হোক) পক্ষের লোক বলে জাহির করেন, যিনি নাস্তিক ব্লগারদের জন্য সবসময় মায়াকান্নায় ভেঙে পড়েন, তিনিও জাকির নায়েক এবং উনার টিভি ব্যান হওয়ার পর খুশিতে একখানা আর্টিকেল প্রসব করেছিলেন।
যাহোক, পয়েন্ট হলো- জাকির নায়েকের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই ছেলেটা জঙ্গী হয় এবং গুলশানে জঙ্গী কর্মকান্ডে জড়িয়ে এতোগুলো মানুষ খুন করে।
পয়েন্ট টু বি নোটেড- ছেলেটা জাকির নায়েককে ফলো করতো, এবং কোন এককালে জাকির নায়েকের একটা লেকচারের ভিডিও লিঙ্ক শেয়ার করেছিলো সোশ্যাল মিডিয়ায়।ছেলেটা যেহেতু জাকির নায়েককে ফলো করতো, সুতরাং, এখানে জাকির নায়েকও সমানভাবে দোষী। সুতরাং নাস্তিকদের অভিমত- জাকির নায়েক এবং তার টিভি চ্যানেল ব্যান হওয়াটা যৌক্তিক, ঠিক কাজ।
কারণ, জাকির নায়েক জঙ্গী কর্মকান্ডে উস্কানি দেয়।
এবার আরেকটা পয়েন্টে আসুন। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকে তো চিনেন, তাই না?
হ্যাঁ, সেই চার্লস ডারউইন তার বিখ্যাত (যেটাকে বিবর্তনবাদের 'বাইবেল' গন্য করা হয়) বই 'The Origin Of Species: By means Of Natural Selection' এ পৃথিবীতে কীভাবে একটি এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাণী এবং উদ্ভিদের বিবর্তন ঘটেছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
যাহোক, সেই বইতে কোন কোন প্রাণীরা পরিবেশে টিকে থাকবে, সেটাও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এটার নাম দিয়েছিলেন- 'Natural Selection'। বলা চলে, এই ন্যাচারাল সিলেকশানই তার পুরো থিওরির মূলমন্ত্র। এজন্যই, বইয়ের নামের সাথেই উনি এই নামটাও জড়িয়ে দিয়েছিলেন (By means Of Natural Selection)
Natural Selection এর মূল বক্তব্য হচ্ছে- 'প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলছে। এই সংগ্রাম হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। দিনশেষে, প্রকৃতিতে তারাই টিকবে, যারা যোগ্য। অযোগ্য, দূর্বলরা বিলুপ্ত হবে- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। যারা দূর্বল, যারা সংগ্রামে টিকে থাকার অযোগ্য, তারা প্রকৃতিতে টিকে থাকবে না।
এটাকে Survival Of the Fittest বলা হয়।
আমি যখন একদিন এডলফ হিটলারের Mein Kampf ( My Struggle) বইটা পড়ছি, তখন ঠিক একদম এরকম, হুবহু ডারউইনের কথার মতোই কিছু বক্তব্য খুঁজে পেলাম।
তিনি তার বই Mein Kampf এর ২৩৯-২৪০ পৃষ্টায় লিখেছেন- ' If nature doesn't wish that weaker individuals should mate with the stronger, she wishes even less that a superior race should intermingle with an inferior one; because in such cases all her efforts, throughout hundreds of thousands of years, to establish an evolutionary higher stage of being, may thus be rendered futile.
But, such a preservation goes hand-in-hand with the inexorable law that it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure. he who would live, must fight. he who doesn't wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn't the right to exist'
খেয়াল করুন, Hitler লিখেছে 'If Nature doesn't wish'
Nature বলতে তিনি ঠিক কী বুঝালেন? ডারউইন যে Natural Selection এর কথা বলে গেছেন, সেটা নয়তো? Hitler এখানে স্পষ্টতই একটি Superior Race এবং Inferior Race এর কথা উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, প্রকৃতিতে এটি বলবৎ আছে। দূর্বল আর সবলের মধ্যে সংঘাত।
ঠিক যে কথাগুলো ডারউইন তার 'Origin Of Species' এ বলেছে।
Hitler এরপরে বলেছে, - ' it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure.'
অর্থাৎ, যারা সবল এবং সর্বোৎকৃষ্ট, তারাই টিকে থাকবে এবং থাকা উচিত।
(যে কথাগুলো একইভাবে ডারউইনেরও)
Hitler আরো লিখেছে- 'he who doesn't wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn't the right to exist'
অর্থাৎ, সংগ্রামই যেখানে Law Of Life (Naturally) , সেখানে যারা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবেনা, তাদের বেঁচে থাকার আদতে কোন অধিকার নেই।
Hitler ভাবতো, ইহুদীরা যেহেতু ম্লেচ্ছ, Inferior (তার দৃষ্টিতে), তাই প্রকৃতিতে তাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকারই নেই। তাই সে সমানভাবে ৬০ লক্ষ ইহুদীকে গনহত্যার মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত করে দেয়।
তাহলে, আমরা যদি দাবি করি, ডারউইনের The Origin Of Species: By means Of Natural Selection' বই পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে Hitler এরকম গনহত্যা করেছে, তাহলে কি তা খুব যুক্তিবিরুদ্ধ হয়ে যাবে? যেখানে সে নিজেই Evolutionary higher Stage এর কথা উল্লেখ করেছে।
এরকম আমরা যদি Hitler এর এই অপরাধের জন্য ডারউইনকে দোষী সাব্যস্ত করি, তার মরণোত্তর (যদিও ইম্পসিবল) মৃত্যুদন্ড দাবি করি, কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে Theory Of Evolution পড়ানো বন্ধের দাবি তুলি, আমাদের নাস্তিক বন্ধুরা কি আমাদের সাথে একমত হবেন যেভাবে জঙ্গী কর্মকান্ডের সাথে জাকির নায়েকের Link করেছিলেন আপনারা? উত্তরের আশায় রইলাম।
(আমি বলছি না যে, হিটলারের কাজের জন্য ডারউইন দোষী। কিন্তু, একজন জঙ্গীর একটি সিলি ম্যাটার যদি জাকির নায়েককে বিচারের আওতায় আনে, হিটলারের ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যার জন্য ডারউইনকেও বিচারের আদালতে তোলা যায়)
'নাস্তিকদের অসততা- একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ'/ আরিফ আজাদ

বিশ্বাস করাতে হবে আব্বু আমার আপন

মুহাম্মাদ আবদুর রহমান:

ছোট্ট শিশুরা খেলা-ধুলা করে। কখনো একা একা,
কখনো কয়েকজন মিলে। কিন্তু সবার কাছে তো খেলনা থাকে না। তখন কয়েকজন মিলে একটা দিয়ে খেলে। একজনের কাছে হয়তো একটা গাড়ি আছে। মানব-চালিত গাড়ি। ‘মালিক’ শিশুটি তাতে চড়ে। আর অন্যরা ধাক্কা দেয়। কখনো অন্যরাও তাতে চড়ার ও চালনার সুযোগ পায়। এতেই ওদের আনন্দ।
শিশুর নির্মল মন এতে কোনো আপমান বোধ করে না। কিন্তু বড়দের মনে এই দৃশ্যটি কখনো গ্লানির সৃষ্টি করে।
কখনো সবার সামনেই ধমক দিয়ে বলে ওঠেন- এই! তোরে কি ও কামলা রেখেছে? যা, বাড়ি যা! শিশুটি তখন লজ্জা পায়। নিজেকে ছোট মনে হয়। সে তো শুধু খেলছিল, কামলা তো খাটছিল না! কখনো বা ঘরে এনে বলেন, জান! তোমার ছেলে পরের কামলা দেয়! একদম শরম নেই।
এইভাবে শাসন করে শিশুর মনে বপন করা হয় হিংসার বীজ। ধীরে ধীরে দানা বাধে জেদ ও দর্প। খোলা মনের খিড়কি বন্ধ হতে থাকে। এক সময় তা বের হয়ে আসে জিঘাংসা ও পরশ্রীকাতরতার রূপে। তাই অভিভাবককে সতর্ক হতে হবে। সচেতন হতে হবে নিজের ভেতরের জগৎ সম্পর্কে। শাসনে-সোহাগে আসলে প্রকাশিত হয় আমাদেরই ভেতরের রূপ।
শিশুর হৃদয়ভূমি উর্বর শস্যক্ষেত্র। তাতে যা বপন করা হবে তা-ই উৎপন্ন হবে। তাই বাবার প্রথম কর্তব্য নিজের চিন্তা ও হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা। এরপর সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
শিশুকে শেখাতে হবে কোমল ভাষায়। নরম কথায়। হিংসা বিদ্বেষ নয়, তাকে সচেতন করতে হবে ভদ্রতা ও আত্মমর্যাদা সম্পর্কে। ধীরে ধীরে; কখনো আব্বু ডেকে, কখনো আদর সোহাগ করে, কখনো চকোলেট দিয়ে, আবার কখনো ঈষৎ ধমক দিয়ে।
শিশু যেন বিশ্বাস করে ইনি আব্বা। আমার আপন,
আমাকে কত আদর করেন। শিশু তখন বাবাকে দেখে পালিয়ে যাবে না। বাইরে থেকে এলে দৌড়ে কাছে আসবে। কাছে থাকতে ভালবাসবে। সামনে যা কিছু করা হবে কৌতূহলী হয়ে দেখবে, বোঝার চেষ্টা করবে। এই আগ্রহ, স্পৃহা, এই কৌতূহল ও স্বতস্ফূর্ততা অনেক বড় সম্পদ!

শিশুর মন

আবু মাইসারা মুনশী মুহাম্মদ মহিউদ্দীন

ইবতিদায়ী মাদরাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে শিশুশ্রেণীর ক’জন তালিবে ইলমের সাথে দেখা। সকলেরই বয়স পাঁচের কিছু বেশি। আমাকে দেখে সবাই সালাম দিল। ‘আসসালামু আলাইকুম’। আমিও উচ্চস্বরে উত্তর দিলাম- ‘ওয়াআলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ’। ওদের একজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘অনেকে সালামের উত্তর চুপে চুপে দেন’। হাসিমুখে এ কথা বলে শিশুছেলেটি হাটতে শুরু করল।
কিছুদিন আগে এক তালিবে ইলমকে দেখলাম মাদরাসার দরসের সময় বাসার সামনে খেলা করছে। সে শিশুশ্রেণীতে নতুন ভর্তি হয়েছে। তাকে খেলতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মাদরাসায় যাওনি তুমি? কেন যাওনি?’ শিশুটির আনমনা উত্তর, ‘মাদরাসায় গেলে আমাকে শুধু মারে’। পাশ থেকে একজন বলল, ‘হুযুররা তোমাকে মারে?’ ছোট্ট শিশুটি রাগত স্বরে তাড়াতাড়ি উত্তর দিল, ‘না, হুযুররা মারে না। আমার ক্লাসের ছেলেরা মারে’। ... ছেলেটির উত্তরে আমি অবাক হলাম।
***
উভয় দৃশ্যে যে বিষয়টি ফুটে উঠে তা হচ্ছে, শিশুরাও বুঝে। ওদেরও রয়েছে বোধ ও অনুভূতি। আছে ভাল-মন্দের মাঝে তফাৎ করার সাহস। তাই তাদের অনুভূতিগুলোর মূল্যায়ন করা দরকার। তাদের কথা ও কাজের গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমরা অনেকেই মনে করি শিশুকালটা তরবিয়তের সময় নয়। এটা তো
‘ছেলেবেলা’। আসলে শিশুকালটাই হচ্ছে তারবিয়াতের শ্রেষ্ঠ সময়। কারণ, জীবনের এ সময়টা হচ্ছে শূন্য ক্যানভাসের মত, নির্মল ও পবিত্র। এখন তার সামনে যা কিছুই দেখানো হবে, তাকে যা শিখানো হবে তা-ই সে গ্রহণ করবে এবং স্মরণশক্তি যতদিন আছে ততদিন তা লালন করবে।
ইমাম গাজালী রাহ. বলেন, ‘শিশু বাবা-মা’র কাছে আমানত। তার অন্তর মূল্যবান মণিমুক্তার মত নির্মল ও নিষ্কলংক। শূন্য ক্যানভাসের মত পবিত্র ও নির্মল। তা যে কোনো চিত্রের জন্যই উপযোগী এবং তাকে যে দিকে ইচ্ছে ফেরানো যায়। তাকে যদি ভালো কাজে অভ্যস্ত কর তাহলে সে এর উপরই গড়ে উঠবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যবান হবে। ... আর যদি তাকে মন্দ কাজে অভ্যস্ত কর, পশুর মত অবজ্ঞা ও উপেক্ষা কর তবে সে হতভাগ্য ও ধ্বংস হবে।’ ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন,
৩/১০৪-১০৫
জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর বয়স যখন দেড় থেকে দুই বছর তখন থেকেই সে বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্যদের অনুসরণ করতে শুরু করে। তখন থেকেই সে শিখতে শুরু করে। এ সময়ের শিক্ষা-দীক্ষা অন্য যে কোনো সময়ের শিক্ষা-দীক্ষার চেয়ে কম গুরুত্বের নয়।
আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে, দুই বছরের একটি শিশু মাঝে মাঝে তার বাবা-মাকে নাম ধরে ডাকে। এটা আর কিছু নয় শুধুমাত্র অনুসরণ। সে যখন দেখে দাদা-দাদি তার আব্বুকে নাম ধরে ডাকে, সেও আব্বুকে ‘আব্বু’ না বলে দাদা-দাদির মত নাম ধরে ডাকতে শুরু করে। এই যে শিশুর অনুসরণপ্রিয়তা, তা শুধু ভালোর ক্ষেত্রেই হবে তা নয়। ভালো-মন্দ সব ক্ষেত্রেই তা হতে পারে। ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝার যোগ্যতা তার নেই। সে এখন শুধু অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারে। মানুষের স্বভাবজাত যোগ্যতা এটি। তাই এ সময় থেকেই যদি আমরা শিশুকে ভালো কাজে অভ্যস্ত করতে পারি তাহলে সন্তানের তরবিয়াতের পথে অনেকটাই অগ্রসর হতে পারব।
এর পরের বয়সটাতে সে ভালো-মন্দের তফাৎ করতে পারে ঠিকই কিন্তু অনুসরণপ্রিয়তাকে ছাড়তে পারে না। তাই মন্দ কাজেও সে অন্যের অনুসরণ করে। আর যেহেতু বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই তার শেখা ও বুঝা শুরু হয়, তাই তাদের আচার-আচরণই সন্তানকে সবচে’ বেশি প্রভাবিত করে। বাবা-মা’র চিন্তাচেতনা, কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক-আশাক এমনকি খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত সন্তানের মন ও মননে গভীর রেখাপাত করে। তাই শিশুকাল থেকেই সন্তানের যত্ন, প্রতিপালন ও তারবিয়াতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

গোল্ডেন রেশিও এবং কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না- এ প্রসঙ্গ

মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন

“গোল্ডেন রেশিও” (Golden ratio) অর্থ সোনালী অনুপাত/স্বর্ণানুপাত। এটা হচ্ছে একটা চমৎকার গাণিতিক অনুপাত যা কোন চিত্রকর্ম,
স্থাপত্যকলা ইত্যাদিতে প্রয়োগ করা হলে সেই চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের চমৎকারিত্ব বৃদ্ধি পায়। মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, আইফেল টাওয়ার, হোয়াইট হাউজ ইত্যাদিতে এই “গোল্ডেন রেশিও” তথা সোনালী অনুপাতের প্রয়োগ ঘটেছে বলেই বোদ্ধাদের কাছে এগুলোর চমৎকারিত্বই ভিন্ন। এতে নাকি আরকিটেকচারাল ডিজাইনের সৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্যামিতির অনেক কিছুতেও এই গোল্ডেন রেশিও” - এর প্রয়োগ থাকে।
অনেকে সৃষ্টির মধ্যে গাছপালা, ফল-ফুল, বিভিন্ন প্রাণী, মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, এমনকি উর্ধ্ব জগতের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) - এর বাহুগুলোর মাঝেও এই “গোল্ডেন রেশিও” বা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। এমনকি শামুকের খোলস,
ঘূর্ণিঝড়ের ঘুর্ণন, বৃক্ষের কাণ্ড-বিন্যাস, ফল, ফুল ইত্যাদিতেও এই “গোল্ডেন রেশিও” বা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। উদাহরণ স্বরূপ মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত অংশের মধ্যে মাথা থেকে নাভি এবং নাভি থেকে পা পর্যন্ত যে মানটি পাওয়া যাবে তা হল ১.৬১৮ অর্থাৎ, সোনালী অনুপাত। কনুই থেকে আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত এবং আঙ্গুলের মাথা থেকে কবজি পর্যন্ত এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। কাঁধ থেকে হাঁটু এবং হাঁটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত দূরত্বের মাঝেও এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। এমনিভাবে চেহারা হৃদপি-সহ অন্যান্য অনেক অঙ্গের বিভিন্ন অংশে এই অনুপাত পাওয়া যায়। মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ প্রকৃতির অনেক কিছুর মাঝে এই অনুপাত পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এটাকে Divine proportion (স্বর্গীয় অনুপাত বা ঐশ্বরিক অনুপাত) বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। গোল্ডেন রেশিওকে “গোল্ডেন মিন” (Golden mean) , “গোল্ডেন সেকশন” (Golden section) ও বলা হয়।
খ্রিস্টের জন্মেরও পাঁচশ বছর পূর্বে এই গোল্ডেন রেশিও বা সোনালী অনুপাত প্রথমে আবিস্কার করেন পিথাগোরাস। তারপর প্লেটো, ইউক্লিড,
ফিবোনাক্কি, কেপলারসহ অনেকে এই সোনালী অনুপাতের জগতে গবেষণায় অগ্রসর হন।
আমরা “গোল্ডেন রেশিও” - এর বিষয়টা আলোচনায় আনছি এজন্য যে, অনেককে ইদানিং বলতে শোনা যাচ্ছে, পৃথিবীর মাঝে বায়তুল্লাহ বা কা‘বা শরীফের যে অবস্থান তাতেও এই অনুপাত রক্ষা করা হয়েছে। তারা বলতে চান, গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি। এ সম্পর্কিত প্রচুর লেখা নেটে দেখতে পাওয়া যায়। বিচিত্র নয় যে, এই ধারায় অনেক বইয়েও বিষয়টা এসে থাকবে বা এসে যাবে।
তা বক্তব্য যদি এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত যে,
কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভির অবস্থানে রয়েছে তাহলে তা আমাদের তেমন কিছু উদ্বেগের কারণ ছিল না। কিন্তু যেহেতু অনেকে বক্তব্যকে আরও আগে বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছেন, কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি আর নাভি হচ্ছে শরীরের মাঝখান, অতএব সেই কা‘বা শরীফ যে মক্কায় অবস্থিত সেই মক্কাকে কেন্দ্র করেই সারা পৃথিবীর রোযা রাখা ও ঈদ করার প্রবর্তন হওয়া চাই,
সোজা কথায় বলতে গেলে তারা বলতে চান, মক্কা শরীফের সাথেই একসাথে রোযা ও ঈদ করতে হবে। একারণেই এ বিষয়টার প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
এটা ভিন্ন কথা যে, কা‘বা শরীফ বা মক্কা রোযা রাখা ও ঈদ করার ভিত্তি কি না - এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার কথা হল শরীয়তে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়েছে কেবল হেলাল (নতুন চাঁদ) দেখাকে। কা‘বা শরীফ বা মক্কা মুকাররমাকে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়নি। তা ছাড়া পৃথিবীর কোন একটা স্থান নাভির স্থলে হলেই সে স্থানকে সকলের জন্য অন্য কোন আমলের ভিত্তি বানাতে হবে এর পেছনে কোন যুক্তিও নেই। (এমন বলাটা কি যুক্তিযুক্ত হবে যে, মক্কা শরীফ যেহেতু নাভি তাই সকলের বিয়ে-শাদি মক্কাতেই হতে হবে, সকলের কবরও সেখানেই হতে হবে, ইত্যাদি?) আরও কথা হল নাভি তো প্রস্থের মাঝখানে হয়, অথচ কা‘বা শরীফ পৃথিবীর প্রস্থের দিকের মাঝখানে তথা বিষুব রেখাতে অবস্থিত নয়। আল্লাহ পাক যদি কা‘বা শরীফকে নাভির স্থলেই রাখতেন তাহলে কা‘বা শরীফ হত বর্তমান দ্রাঘিমার বরাবর দক্ষিণে বিষুব রেখায় তথা আফ্রিকার কেনিয়ায়। এখন কা‘বা শরীফ তথা নাভি এক সাইডে হয়ে গেল এটা কি বেখাপ্পা হয়ে যায় না? এতে কি আল্লাহর শিল্প ডিজাইন জ্ঞানের ত্রুটি প্রকাশ পায় না? নাউযু বিল্লাহ! যাহোক আমি এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত আর কিছু এখানে লিখতে চাই না। এখানে শুধু গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না - এ প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে চাই। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে যারা গোল্ডেন রেশিও সন্বন্ধে মোটেই জানেন না, তাদের সুবিধার্থে প্রথমে গোল্ডেন রেশিও - এর পরিচয় সম্বন্ধে কিছু কথা বলে নিতে চাই।
সহজে “গোল্ডেন রেশিও”-এর পরিচয় হল গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে একটি বিশেষ গাণিতিক অনুপাত। সেই অনুপাতটি হল ১.৬১৮। একটা রেখাকে যদি এমন দুই ভাগে ভাগ করা হয় যার বড় অংশকে ছোট অংশ দ্বারা ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায় উভয় অংশের যোগফলকে বড় অংশ দ্বারা ভাগ করলেও সেই ফল পাওয়া যায়, আর সেই ভাগফল হবে ১.৬১৮ (প্রকৃত সংখ্যা হচ্ছে ১.৬১৮০৩৩৯৮৮৭৫) তাহলে সেটা হচ্ছে গোল্ডেন রেশিও। যেমন ৬১০ ইঞ্চি একটা রেখাকে দুই ভাগে ভাগ করুন। বড় অংশ (এটাকে বলা যায় A অংশ) ধরুন৩৭৭ ইঞ্চি আর ছোট অংশ (এটাকে বলা যায় B অংশ) ধরুন২৩৩ইঞ্চি। এবার বড় অংশ তথা A অংশকে ছোট অংশ তথা B অংশ দ্বারা ভাগ দিন ফল হবে ১.৬১৮ (৩৭৭÷২৩৩=১.৬১৮) আবার A+ B- র টোটালকে অর্থাৎ ৬১০ কে A অংশ দ্বারা ভাগ দিন তাহলেও ফল হবে ১.৬১৮ (৬১০÷৩৭৭=১.৬১৮)। তাই সংক্ষেপে গোল্ডেন রেশিওর পরিচয় এভাবেও দেয়া হয় - a+b is to a as a is to bঅর্থাৎ, a+b÷a= a÷b । বিষয়টিকে চিত্রে এভাবে দেখানো যায় -
আবার চিত্রে এভাবেও দেখানো যায় -
গোল্ডেন রেশিওকে সাধারণত তিন প্রকারে ভাগ করা হয়। (এক) সাধারণ গোল্ডেন রেশিও। এ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। (দুই) ১.৬১৮ রেশিও রক্ষা করে কোন আয়তক্ষেত্র তৈরি করলে (যে আয়তের দৈর্ঘ প্রস্থ উভয়টার রেশিও হবে ১.৬১৮) সেটাকে বলে গোল্ডেন রেকট্যাংগ্ল্
(Golden Rectangle) বা আয়তক্ষেত্রের গোল্ডেন রেশিও। যেমন দ্বিতীয় চিত্রে দেখানো হয়েছে। (উল্লেখ্য, চার সমকোণবিশিষ্ট চতুর্ভূজকে আয়তক্ষেত্র বলা হয়।) (তিন)আবার যদি উভয় আয়তক্ষেত্রের পিঠে ফিবোনাক্কি ক্রম অনুযায়ী (এ বিষয়ে পরে বর্ণনা আসছে।) আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়, তারপর সবগুলোর পিঠে অনুরূপভাবে আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়। এভাবে কয়েকটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করার পর সবগুলো আয়তের কোণা একের পর এক প্যাঁচানো রেখা দিয়ে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেটাকে বলে গোল্ডেন স্পাইরাল (Golden Spiral) বা শঙ্খিল গোল্ডেন রেশিও।এই স্পাইরালের বক্ররেখাতেও গোল্ডেন রেশিও থাকে।
স্পাইরাল হল সমুদ্রের এক ধরনের শামুক যা প্যাঁচানো আকৃতিতে গড়ে ওঠে। সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি এবং হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলের ছাপের দিকে লক্ষ্য করলেও এই গোল্ডেন স্পাইরাল দেখতে পাওয়া যায়। নিচের ছবিতে গোল্ডেন স্পাইরাল লক্ষ্য করুন।
গোল্ডেন রেশিওর সঙ্গে ফিবোনাক্কি
(Fibonacci কেউ কেউ উচ্চারণ লেখেন ফিবোনেসি/ ফিবোনাচ্চি/ ফিবোনোচ্চি) সিরিজের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ফিবোনাক্কি সিরিজ সম্বন্ধেও কিছু কথা জানতে হয়।
ইটালিয়ান গণিতবিদ লিওনার্দ ফিবোনাক্কি
(Leonardo Fibonacci) এই সিরিজটি আবিস্কার করেন বলে একে “ফিবোনাক্কি সিরিজ” বলা হয়। এই সিরিজে কতগুলো সংখ্যা দেখানো হয়, যেগুলোর প্রতিটি সংখ্যা তার আগের দুইটি সংখ্যার যোগফলের সমান। সিরিজভুক্ত সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকটিকে তার আগের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে ভাগফল ১.৬১৮ - এর কাছাকাছি হবে এবং ১৩ তম সংখ্যা এর পরে (৬১০ থেকে)সবগুলোর ভাগফল হুবহু ১.৬১৮ হবে।
এবার “ফিবোনাক্কি সিরিজটি লক্ষ্য করুন- ১, ১, ২,
৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, ২৩৩, ৩৭৭,
৬১০, ৯৮৭, ১৫৯৭, ২৫৮৪, ৪১৮১ ...। এর পরবর্তী আরও সংখ্যা আপনি বের করতে পারবেন। শেষ সংখ্যাকে তার পূর্বের সংখ্যার সাথে যোগ দিলেই পরবর্তী সংখ্যা বের হবে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, প্রতিটি সংখ্যার A ও B অংশ কি হবে তা বের করা আজকাল সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেটে Golden ratio calculator পাওয়া যায়, তার সহযোগিতা নিলেই হয়। এমনকি একটা চিত্রে গোল্ডেন রেশিও কীভাবে অবস্থিত তা বের করাও এখন সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“ফাইমেট্রিক্স - এর সহযোগিতা নিন। ফাইমেট্রিক্স হচ্ছে এক ধরনের সফটওয়ার যা দ্বারা কোন ছবির গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট মাপা হয়।
গোল্ডেন রেশিও বোঝানোর জন্য Φ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এরূপ লেখা হয় Φ ১.৬১৮ । Φ হচ্ছে একটি ল্যাটিন ভাষার অক্ষর। এটাকে বলা হয় Phi (ফাই) এটা হচ্ছে বড় হাতের ফাই। আবার ছোট হাতের ফাই অর্থাৎ, φ ও ব্যবহৃত হয়। তখন লেখা হয়
φ ০.১৬৮। দেখা গেল ছোট হাতের ফাই ব্যবহার করলে দশমিকের পূর্বের ১ লেখা হয় না। কখনও কখনও এরূপও লেখা হয় Phi ১.৬১৮ আবার এরূপও লেখা হয় G ১.৬১৮ এই G হচ্ছে Golden ratio- এর সংক্ষেপ। তবে বেশিরভাগ Phiই লেখা হয়।
এতক্ষণ গোল্ডেন রেশিও - র পরিচয় সম্বন্ধে মোটামুটি বর্ণনা পেশ করা হল। এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি। যারা কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর নাভি বলতে চান তারা অক্ষের বিচারে দুইভাবে গোল্ডেন রেশিও দেখান এবং দ্রাঘিমার বিচারে দুইভাবে তা দেখান। এ ছাড়াও আরও একভাবে (কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে) তা দেখান। সর্বমোট ৫টা পদ্ধতিতে তারা কা‘বা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে দেখাতে চান। আর কেউ কেউ একভাবে কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান বলে দেখাতে চান। এই মোট ৬টা পদ্ধতি। নিম্নে পদ্ধতি ষষ্ট ও সে সম্বন্ধে পর্যালোচনা পেশ করা গেল।
১ম পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)
A অংশ ১১১.৮২/১৮০=১.৬০৯।
পর্যালোচনা :
এখানে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হয়নি। কেননা নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হতে হলে দু’টো অনুপাতই (B/ A এবং A /A+ B) ১.৬১৮হতে হবে। এখানে দ্বিতীয় অংশে অনুপাতটি কাছাকাছি হলেও প্রথমটি গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ১১১.৮২ হলে B অংশ হবে (১৮০-১১১.৮২=) ৬৮.১৮। অতএব
A অংশকে B অংশ দ্বারা ভাগ দিলে হবে (১১১.৮২÷৬৮.১৮=) ১.৬৪০। ১.৬৪০ কে কাছাকাছি ধরা হলেও উভয় অনুপাত এক সমান হয়নি অতএব সঠিক গোল্ডেন রেশিও হল না। সঠিক গোল্ডেন রেশিও হতে গেলে উভয় অনুপাত সমান হতে হবে। এতএব অক্ষের বিচারে এখানে গোল্ডেন রেশিও দেখানোর যে চেষ্টা করা হয়েছে তা নিখুঁত নয়। আল্লাহ পাক কা‘বা শরীফকে পরিকল্পিতভাবে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখলে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিওই থাকত। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন খুঁত থাকে না।
বস্তুত মক্কার সঠিক অবস্থান (২১.৪২২ºউত্তর অক্ষাংশ) হিসাবে A অংশ হওয়া চাই ১১১.৪২ এবং B অংশ হওয়া চাই ৬৮.৫৮। তাহলে ১১১.৪২÷৬৮.৫৮=১.৬২৪ এবং ১৮০÷১১১.৪২= ১.৬১৫। দেখা গেল কোনভাবেই সঠিক গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে না।
২য় পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)
দক্ষিণ মেরু থেকে কা‘বার দূরত্ব ১২৩৪৮.৩২ কি. মি। এটা হচ্ছে A অংশ। আর উত্তর মেরু থেকে কা‘বা শরীফের দূরত্ব হচ্ছে ৭৬৩১.৬৮ কি. মি। এটা হচ্ছে B অংশ। টোটাল - ১৯৯৮০ কি. মি। এখানে সবভাবেই গোল্ডেন রেশিও তথা ১.৬১ পাওয়া যায়।
পর্যালোচনা:
কা‘বা শরীফের উত্তর দক্ষিণে যে দূরত্ব দেখানো হয়েছে, (১২৩৪৮.৩২+৭৬৩১.৬৮=১৯৯৮০ কি. মি) তা ভুল। প্রকৃত দূরত্ব হচ্ছে ১২৪২৯.৯ মাইল= ২০০০৩.৯৩ কি. মি। (নেটে Length of Prime meridian সাইটে সার্চ দিলে বিষয়টি পাওয়া যাবে।) সম্ভবত তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ ভুল তথ্য দিয়ে গোল্ডেন রেশিওর নামে ধোঁকা দিতে চেয়েছে।
৩য় পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)
অ অংশ ২১৯.৮২/৩৬০=১.৬১
(অর্থাৎ, তারা বোঝাতে চান কা‘বা শরীফ যেহেতু ৩৯.৮২৬ºঊ য়ে অবস্থিত তাহলে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা থেকে আমেরিকা আফ্রিকার দিক হয়ে কা‘বা শরীফ পর্যন্ত হয় ২১৯.৮২º)
পর্যালোচনা:
(এক) হিসাবে ভুল হয়েছে। সঠিক ফলাফল হবে ১.৬৩৭ আর এটা সঠিক গোল্ডেন রেশিও নয়।
(দুই) এখানে দ্বিতীয় অংশে ১.৬৩৭ তথা গোল্ডেন রেশিওর কাছাকাছি হলেও প্রথম অংশে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ২১৯.৮২ হলে B অংশ হবে (৩৬০-২১৯.৮২=) ১৪০.১৮আর ২১৯.৮২÷ ১৪০.১৮=১.৫৬৮। তাহলে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও গেল না। এ জন্যই সম্ভবত তারা এই প্রথম অংশ হিসেবে দেখান না। অথচ নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও প্রমাণ করতে হলে উভয় অংশেই সমান অনুপাত ১.৬১৮ (বা অন্তত এর কাছাকাছি) থাকতে হবে।
বস্তুত সঠিক গোল্ডেন রেশিওর হিসাব মিলাতে হলে কা‘বার শরীফের অবস্থান হতে হবে ২২২.৪৯২º E তথা ৪২.৪৯º E । তাহলে A অংশ হবে ২২২.৪৯২ আর
B অংশ হবে ১৩৭.৫০৮। তাহলে ৩৬০÷২২২.৪৯২=১.৬১৮ এবং ২২২.৪৯২÷১৩৭.৫০৮=১.৬১৮। উল্লেখ্য, উক্ত ৪২.৪৯º E (এবং ২১.২৪º N )- এর অবস্থানে রয়েছে তুরবা ও রনিয়্যা নামক দুটো অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থান। এ স্থানটি মক্কা শরীফ থেকে তায়েফের অবস্থান যত দূরে তায়েফ থেকে তার চেয়ে প্রায় দেড়গুন দূরে পূর্বদিকে অবস্থিত। আল্লাহ তাআলা যদি কা‘বা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখার পরিকল্পনা রাখতেন তাহলে গোল্ডেন রেশিওর এই নিখুঁত পয়েন্টেই কা‘বা শরীফকে রাখতেন।
(তিন) দ্রাঘিমার বিচারে কা‘বা শরীফকে নাভির স্থানে দেখাতে গিয়ে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নেয়া হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু - এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দু’টো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসেবের সুবিধের জন্য মেনে নেয়া হয়েছে।। কেউ এটা না মেনে ভিন্ন রকম মানচিত্রও দাঁড় করাতে পারে। যেমন ফ্রান্স প্যারিসের উপর দিয়ে অতিক্রান্ত দ্রাঘিমা রেখাকেই মূল মধ্যরেখা গণ্য করে থাকে।
৪র্থ পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)
শোনা যায় তাদের অনেকে প্রশান্ত মহাসাগরকে চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল বলতে চায়। এ হিসেবে তারা কা‘বা শরীফকে নাভি প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন।
পর্যালোচনা:
তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে, চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল ১৭৭.৩৩৪ পূর্ব দ্রাঘিমায়। কেননা পূর্ব দ্রাঘিমার ই অংশ হতে হবে ১৩৭.৫০৮। আর ক’বা শরীফ ৩৯.৮২৬º E তে অবস্থিত। অতএব ৩৯.৮২৬+১৩৭.৫০৮=১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটতে হবে। অথচ ১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটার বিষয় না শরয়ীভাবে প্রমাণিত না বৈজ্ঞানিকভাবে।
৫ম পদ্ধতি
তারা বলতে চান, কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে কা‘বা শরীফ গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে অবস্থিত। তারা বলতে চান, পূর্ব দ্রাঘিমাংশ + ৩৯.৮২ এবং উত্তর অক্ষাংশ + ২১.৪২। এতে কা‘বা শরীফে গোল্ডেন রেশিও প্রমাণিত হয়। এভাবে - ৯০+৩৯.৮২ = ১১১.৪২
সুতরাং ১১১.৮২/১৮০= ০.৬১...
এবং ১৮০+৩৯.৮২ = ২১৯.৮২
সুতরাং ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১...
পর্যালোচনা:
(এক) পুরো হিসেবটাই ভুলে ভরা। কারণ, (১) ৯০ + ৩৯.৮২ = ১১১.৪২ ভুল বরং সঠিক হল ৯০ + ৩৯.৮২ = ১২৯.৮২ (২) অতএব অনিবার্য কারণে পরবর্তী লাইন ১১১.৮২/১৮০ = ০.৬১... এটাও ভুল। বরং এটা হবে ১২৯.৮২/১৮০ = ১.৩৮৬। তাহলে গোল্ডেন রেশিও পাওয়া গেল না। (৩) শেষ লাইনে দেখানো হয়েছে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১... এটাও ভুল। হবে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬৩৭...।
(দুই) ৩য় পদ্ধতির পর্যালোচনায় যা বলা হয়েছিল আবারও তাই বলতে চাই যে, এখানে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নিয়ে হিসেব দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু -
এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দুটো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসাবের সুবিধার জন্য মেনে নেয়া হয়েছে। অতএব এই কল্পিত বিষয়কে কেন্দ্র করে যে গোল্ডেন রেশিও দেখানো হচ্ছে তা কাল্পনিক গোল্ডেন রেশিও হতে পারে বাস্তব গোল্ডেন রেশিও নয়।
৬ষ্ঠ পদ্ধতি
কা‘বা শরীফ পৃথিবীর মাঝখান। কেননা -
(এক) কা‘বা শরীফ থেকে আলাস্কা এবং নিউজিল্যান্ড মাপলে সমান দূরত্ব পাওয়া যায়।
(দুই) কা‘বা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত।
পর্যালোচনা :
১. নিউজিল্যান্ড ছাড়াও তো তার পূর্বে চ্যাথাম দ্বিপ, বাউন্টি দ্বিপ ইত্যাদি রয়েছে, সেগুলোকে হিসেবে কেন ধরা হল না। তাছাড়া আলাস্কা কা‘বা শরীফ থেকে (গ্লোবে) সোজা উত্তরে - এদিকটা ধরা হল,
সোজা দক্ষিণের মাপ কেন আনা হল না। কা‘বা শরীফ থেকে সোজা পূর্ব পশ্চিমের মাপও কেন আনা হল না?
২. কা‘বা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হলে তার বিপরীত দিকের অঞ্চলও তো ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হবে, তাহলে সেটাকেও কি পৃথিবীর মাঝখান বলতে হবে?
সারকথা, কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর নাভি দেখাতে গিয়ে গোল্ডেন রেশিওর যে বর্ণনাগুলো পেশ করা হয়ে থাকে তা হয় ভুল না হয় খুঁতযুক্ত, যা পূর্বে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। আর কা‘বা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান দেখানোর যে প্রচেষ্টা দেখানো হয়েছে তা একটা খাপছাড়া বিষয়।

অমঙ্গলের পথে শোভা-যাত্রা?

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
.
হামদ ও ছানার পর :
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﺍﻟَّﯿْﻞَ ﻭَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭَ ﺧِﻠْﻔَﺔً ﻟِّﻤَﻦْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺍَﻥْ ﯾَّﺬَّﻛَّﺮَ ﺍَﻭْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺷُﻜُﻮْﺭًﺍ .
ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ : ﻛُﻞُّ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻳَﻐْﺪُﻭ ﻓَﺒَﺎﺋِﻊٌ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﻓَﻤُﻌْﺘِﻘُﻬَﺎ ﺃَﻭْ ﻣُﻮﺑِﻘُﻬَﺎ .
[তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন; তারজন্য, যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিটি মানুষ প্রত্যুষে উপনীত হয়ে নিজেকে বিক্রয় করে। এরপর সে হয়ত নিজেকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩]
হিজরী নববর্ষ শুরু হয়েছে এক দু’মাস আগে। তখন কিন্তু পয়লা মুহাররমের কোনো অনুষ্ঠান করেননি। আসলে ইসলামে থার্টি ফার্স্ট নাইট, পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ নামে কিছু নেই। কারণ এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতায় যদি ভালো কিছু থাকে, তা বছরে একবার করার বিষয় নয়; তা হওয়া দরকার প্রতিদিন। ইসলাম শুধু নববর্ষের কদর করতে বলে না; বরং নব দিন, নবরাত, নবসকাল, নবদুপুর- সকল সময়েরই কদর করতে বলে; এ সবই তো নতুন। সবগুলোই তো আমার ইবাদতের অংশ। এ সবকিছুরই আমার কদর করতে হবে। এ সব কিছুর জন্য আমাকে মুহাসাবা করে ভালোর জন্যে শোকর আদায় করতে হবে, মন্দের জন্যে ইস্তিগফার করতে হবে।
সূরা ফুরকানের উক্ত আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
ﻭَ ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﯼْ ﺟَﻌَﻞَ ﺍﻟَّﯿْﻞَ ﻭَ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭَ ﺧِﻠْﻔَﺔً ﻟِّﻤَﻦْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺍَﻥْ ﯾَّﺬَّﻛَّﺮَ ﺍَﻭْ ﺍَﺭَﺍﺩَ ﺷُﻜُﻮْﺭًﺍ .
তিনিই সেই সত্তা যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন তার জন্যে যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২
তো এই যিক্র ও ফিক্র এবং হামদ ও শোকর সময়ের প্রতিটি পরিবর্তনের সময় কাম্য। এই যে দিন রাত আরবীতে কিন্তু এ দুটিকে একসঙ্গে ‘আলজাদীদান’(দুই নতুন) বলা হয়। কারণ প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন। পেছনের কোনো দিন আবার কিন্তু ঘুরে আসছে না। তো যদি আমরা নতুন-এর জন্য কিছু করতে চাই- প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন; প্রতিটি সকাল নতুন, প্রতিটি সন্ধ্যা নতুন। শরীয়তে ইবাদতের বিধান, যিকির ও দুআর অযীফা সেভাবেই দেওয়া হয়েছে। হাদীস শরীফে মুহাসাবার যে তাকীদ করা হয়েছে, তা বছরে একবার নয় সে মুহাসাবা হতে হবে প্রতি সকালে, প্রতি সন্ধ্যায়; ২৪ ঘণ্টায় একবার তো বটেই। শোয়ার সময় তুমি হিসাব লাগাও তোমার দিন কেমন কেটেছে। আজকে কার উপর যুলুম করেছ, কার হক নষ্ট করেছ। তোমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছ কি না। আল্লাহর হকগুলো পালন করেছ কি না। বান্দার হকগুলো আদায় করেছ কি না। দৈনিক কমছেকম একবার তোমার হিসাব মিলাও। শুধু দোকানের খাতার হিসাব নয়, এটাও মিলাও। তোমার নিজের আমলের, নিজের আখলাকের, নিজের চরিত্রের, দিনরাত কার সাথে কী আচরণ করেছ- এরও হিসাব লাগাও। কোন্ আচরণে আল্লাহ খুশি হয়েছেন, কোন্ আচরণে আল্লাহ নারায হয়েছেন। এ হালখাতা বছরে একবার হয় না! এ হালখাতা দৈনিকের!
আলী রা.-এর ঘটনা কতবার শুনিয়েছি- আলী রা. কী বলেছিলেন? আমাদের মাযহাবের ইমামের কী নাম? হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানীফা রাহ.।ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আব্বার নাম ছাবিত। দাদার নাম যূতাহ। প্রথমে তিনি (দাদা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা পারস্যের ছিলেন। অগ্নি পূজক ছিলেন। তাঁর সন্তান হলেন ছাবিত, ছাবিতের সন্তান হলেন ইমাম আবু হানীফা রাহ.।ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর পিতা ছাবিতকে তার আব্বা নিয়ে গিয়েছিলেন আলী রা.-এর কাছে। কুফাতে থাকতেন তাঁরা। আলী রা.ও তাঁর খেলাফতের সময় কুফায় ছিলেন। তিনি ছাবিতকে আলী রা.-এর কাছে নিয়ে বললেন- এ আমার ছেলে। ছাবিত রাহ.-এর জন্য দুআ করে দিয়েছেন আলী রা.।দুআর সময় শুধু ছাবিতের জন্য দুআ করেন নি; ছাবিত এবং তার বংশধরের জন্য করেছেন। ওই দুআর সবচেয়ে বেশি ভাগ পেয়েছেন ইমাম আবু হানীফা রাহ.।যেহেতু আলী রা.-এর সাথে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর দাদার সম্পর্ক ছিল, তাই বিভিন্ন উপলক্ষে যাতায়াত ছিল। তাঁরা যেহেতু পারস্য থেকে এসেছেন, নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এখনও ইসলামের সব বিধিবিধান আয়ত্তে আসেনি। তাই আগের তালে তালে মনে হল যে, আজকে তো আমাদের নওরোয, এটা একটা সুযোগ, তিনি আলী রা.-এর জন্য কিছু হাদিয়া নিলেন। হাদিয়া নিলেন নববর্ষ উপলক্ষে। আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, এটাকী? তিনি বললেন, আজকে তো আমাদের ওখানো (পারস্যে) নওরোয, সে হিসেবে কিছু হাদিয়া আনলাম। এ কথা শুনে আলী রা. বললেন, ‘নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম’(প্রতিটি দিনই আমাদের নববর্ষ)।তুমি তো মুসলিম, ইসলাম গ্রহণ করেছ; জান মুসলিমের নওরোয কী? প্রতিটি দিনই মুসলিমের নওরোয। এটা বছরে একবার আসে না, প্রতিদিন আসে।
এখন আমরা সেই ইসলামী শিক্ষা ভুলে গিয়েছি। যখন আমার প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বাঙালী’, তো বাঙালী নববর্ষ আমি পালন করব। এখন প্রশ্ন হল, বাঙালী নববর্ষ কোন্টা? ২০ বছর আগে আমরা যেটা দেখিছি ওটা? ৫০ বছর আগে যেটা দেখেছি ওটা, নাকি বছর বছর এর সাথে যুক্ত হওয়া সবকিছু? কোন্টার নাম বাঙালী নববর্ষ? আপনারা মুরব্বিরা বলেন আমাদেরকে, কোনটার নাম? আমরা তো ছোট, কালো দাড়িওয়ালা, আপনারা যারা মুরুব্বী আপনারা বলেন, আপনারা কী নববর্ষ দেখেছেন? মুরুব্বীদের দায়িত্বে পড়ে নতুন প্রজন্মকে জানানো, বুঝানো- এটা কি আসলে নববর্ষ পালন, না ঈমান ও আখলাক নষ্ট করা। পশ্চিম বঙ্গে যারা আসা যাওয়া করেন, অনেকের তো বাড়িও আছে পশ্চিম বঙ্গে। এখানে থাকেন, জন্ম হয়েছে পশ্চিম বঙ্গে। কিছু দিন পশ্চিম বঙ্গে কাটিয়েছেন। পশ্চিম বঙ্গে নববর্ষের কথা বলুন। যে ভয়াবহ অবস্থা হয় এখানে, ওখানেও কি ঠিক এরকম?
শুভ নববর্ষ। মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? মঙ্গল-কল্যাণ দান করবেন কে? আল্লাহ। আল্লাহ তাআলার বিধান কি আপনি শোনেন? মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে কি রহমত আছে, কল্যাণ-মঙ্গল আছে? এর সাথে কোনো রহমত নেই, কল্যাণ নেই। আমার নববর্ষ যদি মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে যুক্ত হয়, রহমত আসবে কোত্থেকে? মঙ্গল হবে কীভাবে? আমার বছর শুভ হবে কীভাবে?
যত অশ্লীলতা আছে, আল্লাহ তা অপছন্দ করেন। আল্লাহ কোনো ধরনের অশ্লীলতা পছন্দ করেন না। ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻔُﺤْﺶَ، ﻭَﻟَﺎ ﺍﻟﺘَّﻔَﺤُّﺶَ ।রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পছন্দ করেন না। অশ্লীলতার প্রতি আল্লাহ তাআলার ক্রোধ অনেক বেশি। পৌত্তলিকতার সাথে, অশ্লীলতার সাথে, পর্দাহীনতার সাথে যে যাত্রা হবে সেই যাত্রায় মঙ্গল হবে কীভাবে? এর মাধ্যমে আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? আর যদি আমাদের আকিদা হয় -নাউযুবিল্লাহ- হিন্দুদের মতো! এক একটা দেব-দেবী এক একটার মালিক। ওরা যেভাবে মঙ্গল কামনা করে আমরাও...।তাহলে তো আর ‘লা-ইলাহা ইল্লাহ’থাকল না। শুভ-অশুভর মালিক যদি আল্লাহ হন, লাভ-ক্ষতির মালিক যদি আল্লাহ হন, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক যদি আল্লাহ হন, আমার বছর শুভ হবে কীভাবে তা আল্লাহর কাছ থেকে জানতে হবে। আল্লাহর দ্বীন থেকে আল্লাহর শরীয়ত থেকে জানতে হবে।
আমি মুরুব্বীদের কাছে অনুরোধ করব, সামনের প্রজন্মকে আমরা জানাই- এটা আসলে নববর্ষ নয়, এটা আমাদের ঈমান ও আখলাককে নষ্ট করা। একেকবার একেক ধরনের অশ্লীলতা যোগ হচ্ছে, একেক ধরনের পৌত্তলিকতা যোগ হচ্ছে, আর সব নববর্ষের নাম দিয়ে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। কেউ কিছু বলতে পারবে না; কারণ, বললেই তো শেষ। কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাবে। যে বলল, সে দেশের সভ্যতার বিরুদ্ধে বলল নববর্ষের বিরুদ্ধে বলল। আমরা তো ভয় পাই না। আমরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় পাই। একমাত্র আল্লাহকে ভয় করি। আমরা এসব ফাঁক-ফোঁকর আল্লাহর রহমতে বুঝি। কোন্টা বাঙালী সংস্কৃতি আর কোন্টা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, বাংলার সভ্যতা বলে আমাদেরকে খাইয়ে দিবেন, খেয়ে খেয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম নষ্ট হবে, আমরা কিছু বলতেও পারব না, এই কি তাহলে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ? এটা কী স্বাধীনতা যে, হক কথা বলতে পারব না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সুন্নত মোতাবেক চলার তাওফিক দান করুন। মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলের সুন্নাহ। বাংলার মুমিন হোক, হিন্দুস্তানের মুমিন হোক, পাকিস্তানের মুমিন হোক, আমেরিকার-লন্ডনের মুমিন হোক, যেই জায়গার মুমিন হোক, মুসলিম হোক; মুসলিম আর মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ।
ﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺃُﺳْﻮَﺓٌ ﺣَﺴَﻨَﺔٌ
রাসূলুল্লাহ্র কালচার যা, আমাদের কালচারও তা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সহীহ সমঝ নসীব করুন। আল্লাহ বলেছেন- ﺇِﻥْ ﺗَﻜُﻮﻧُﻮﺍ ﺻَﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
তোমরা যদি উপযুক্ত হয়ে যাও, ভালো হয়ে যাও। ভালো মানে? এমনি বলে দিলাম, সে ভালো মানুষ। এটাকে ভালো বলে না। ভালো মানে, সব দিক থেকে আল্লাহ্র বিচারে, আল্লাহ্র আদালতে আমি উপযুক্ত হই তাহলেই আমি ছালেহ-ভালো। ভালো হলে কী পাওয়া যাবে? আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালেহ হও, আমি চাই তোমরা ছালেহ হয়ে যাও। ছালেহ হলে তোমাদের দোষত্রুটি যা হয়েছে তওবা করে ফেল, ক্ষমা করে দিব। কিন্তু হতে তো হবে! নিয়ত তো করতে হবে ছালেহ হওয়ার, উপযুক্ত হওয়ার, আমরা তো নিয়তই করছি না। হিম্মত করতে হবে, নিয়ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাওফিক নসীব করুন। আমীন!
ﻭﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ .
[ধারণ : মাওলানা যুবায়ের আহমাদ
অনুলিখন : খায়রুল বাশার]
.
[ মাসিক আলকাউসার » রজব ১৪৩৮ . এপ্রিল ২০১৭ ]

কওমী স্বীকৃতি: শংকা ও সম্ভাবনা-মুহাম্মাদ মামুনুল হক


কওমী মাদরাসা শিক্ষা সনদের সরকারী স্বীকৃতি আবার লাইমলাইটে ৷ ১১ই এপ্রিলের ডেটলাইনকে কেন্দ্র করে অজানা শংকা-সম্ভাবনার দোলাচলে দুলছে কওমী মহল ৷ এই বিষয়ে পূর্বেকার প্রতিটি আলোচিত পর্বে আমি ও আমরা স্বোচ্চার ছিলাম আলহামদুলিল্লাহ ৷ বর্তমান প্রেক্ষিতেও আমরা বিষয়টিতে নজর রাখছি ৷
কওমী স্বীকৃতির ইস্যুতে আমাদের দুটি বক্তব্য দ্ব্যার্থহীন ছিল-
এক, আমরা কওমীর স্বীকৃতি চাই ৷ এ বিষয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ ছিল না, এখনও নেই ৷
দুই, স্বীকৃতির নামে সরকারী খবরদারীর কোনো প্রক্রিয়ার সাথে আপোষ চলবে না ৷ স্বীকৃতি কোনোভাবেই যেন স্বকীয়তা-স্বাধীনতার মূল্যে না হয় ৷
শেষোক্ত সরকারী নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়াই ছিল সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৷ এটা নিয়েই ছিল আমাদের তর্ক-বিতর্ক ৷ পক্ষ-বিপক্ষের ইজতেহাদী লড়াই ৷ আমরা বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষে আমাদের পক্ষ থেকে দুটি পয়েন্ট এক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছিলাম-
ক, কওমী মাদরাসাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী, পরীক্ষা গ্রহনকারী কর্তৃপক্ষ সরকার কর্তৃক গঠিত হতে পারবে না ৷ সেটা গঠন করবে এককভাবে ওলামায়ে কেরাম ৷ সরকারের এতে কোনো ভূমিকা বা অংশ থাকতে পারবে না ৷
খ, কর্তৃপক্ষ বা বোর্ড যে নামেই হোক, তার নেতৃত্ব নির্বাচনে সরকারের কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা তো দূরে থাক, সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারবে না ৷
আমরা আশ্বাসবাণী শুনছি-
আমাদের উপরোক্ত শর্ত রক্ষা করেই স্বীকৃতির ঘোষনা ও তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে দেওয়া হয়েছে ৷ সে মতেই সব আয়োজন হচ্ছে ৷
এখন আমাদের বক্তব্য হচ্ছে-
আমরা যেভাবে শুনছি যদি সেভাবেই ঘোষনা আসে এবং বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আমরা সর্বোতভাবে তার পক্ষে আছি ৷
আল্লাহ না করুন, যদি এর কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে মুহতারাম হেফাজত মহাসচিবের যুদ্ধের ঘোষনা বহাল থাকবে ৷ আমরা স্বীকৃতির আওতায় যাবো না ৷ বরং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে যত দূর সম্ভব সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ!

Sunday, April 9, 2017

মুসলিম মনীষী ইবরাহিম ইবনে সিনান


ইবরাহিম ইবনে সিনান অসাধারণ মানুষ। তিনি ছিলেন ইসলামি সোনালি যুগের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি; তার সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। লিখেছেন মুহাম্মদ রোকনুদ্দৌলাহ্
অঙ্কশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ হিসেবে তিনি খ্যাতিমান। তবে পেশায় তিনি ছিলেন চিকিৎসক। আর পছন্দ করতেন বিজ্ঞান সাধনায় মগ্ন থাকতে। কণিক ও সূর্যঘড়ি প্রস্তুত সম্পর্কে তিনি বই লিখেন। জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি সম্পর্কে অনেক তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধও লেখেন তিনি। অধিবৃত্তের সমপরিমাণ বিশিষ্ট বর্গক্ষেত্রফল বের করতে তিনি বিশেষ ধরনের প্রণালী আবিষ্কার করেন, যা অঙ্কশাস্ত্রে উচ্চস্তরের অবদান। আর্কিমিডিসের প্রচলিত প্রণালী থেকে এটি সহজ এবং নানা দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। ইবরাহিম ইবনে সিনানের জন্ম বাগদাদে, ৯০৮ সালে। মৃত্যুও বাগবাদে, ৯৪৬ সালে। এ সময় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তিতে মুসলমানেরা বিশ্বে শ্রেষ্ঠ ছিল।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ইবরাহিম ইবনে সিনানের মৃত্যু হয়। অল্প বয়সেই তিনি বিশ্বসভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন। বর্তমান যুগেও তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়।