Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Showing posts with label ভাষা. Show all posts
Showing posts with label ভাষা. Show all posts

Monday, February 27, 2017

ছাত্রদলের গান


আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের আঁধার রাতে বাধার পথে
যাত্রা নাঙ্গা পায়,
আমরা                শক্ত মাটী রক্তে রাঙাই
বিষম চলার ঘাস।
যুগে যুগে রক্তে মোদের
সিক্ত হ’ল পৃথ্বীতল।
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের কক্ষচ্যুত-ধূমকেতু-- প্রায়
লক্ষ্যহারা প্রাণ
আমরা                ভাগ্যদেবীর  যজ্ঞবেদীর
                        নিত্য বলিদান।
যখন                লক্ষ্মীদেবী  স্বর্গে উঠেন
আমরা পশি নীল অতল!
আমরা ছাত্রদল।।
আমরা ধরি মৃত্যু রাজার
যজ্ঞ-ঘোড়ার রাশ,
মোদের মৃত্যু লেখে মোদের
জীবন--ইতিহাস!
হাসির দেশে আমরা আনি
সর্বনাশী চোখের জল
আমরা ছাত্রদল।।
সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়
আমরা করি ভুল!
সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব,
আমরা ভাঙি কূল।
দারুণ-রাতে আমরা তরুণ
রক্তে করি পথ পিছল!
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের                চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল,
বক্ষে ভরা বাক্,
কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন
নিত্য কালের ডাক।
আমরা                তাজা খুনে লাল ক’রেছি
সরস্বতীর শ্বেত কমল।
আমরা ছাত্রদল।।
ঐ                দারুণ উপপ্লবের দিনে
আমরা দানি শির,
মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে
বিংশ শতাব্দীর!
মোরা                গৌরবেরি কান্না দিয়ে
ভ’রেছি মা’র শ্যাম-আঁচল।
আমরা ছাত্রদল।
আমরা রচি ভালোবাসার
আশার ভবিষ্যৎ,
মোদের                স্বর্গ-পথের অভাস দেখায়
আকাশ-ছায়াপথ!
মোদের চোখে বিশ্ববাসীর
স্বপ্ন দেখা হোক সফল।
আমরা ছাত্রদল।।

জাগরণী


কোরাস্:—
ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!
ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,
সন্তান দ্বারে উপবাসী,
দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
জাগো গো,জাগো গো,
তন্দ্রা-অলস জাগো গো,
জাগো রে! জাগো রে!
মুক্ত করিতে বন্দিনী মা'য়
কোটি বীরসুত ঐ হেরো ধায়
মৃত্যু-তোরণ-দ্বার-পানে—
কার টানে?
দ্বার খোলো দ্বার খোলো!
একবার ভুলে ফিরিয়া চাও।
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
জননী আমার ফিরিয়া চাও!
ভাইরা আমার ফিরিয়া চাও!
চাই মানবতা, তাই দ্বারে
কর হানি মা গো বারেবারে—
দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
পুরুষ-সিংহ জাগো রে!
সত্যমানব জাগো রে।
বাধা-বন্ধন-ভয়-হারা হও
সত্য-মুক্তি-মন্ত্র গাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
লক্ষ্য যাদের উৎপীড়ন আর অত্যাচার,
নর-নারায়ণে হানে পদাঘাত
জেনেছে সত্য-হত্যা সার।
অত্যাচার! অত্যাচার!!
ত্রিশ কোটি নর-আত্মার যারা অপমান হেলা
করেছে রে
শৃঙ্খল গলে দিয়েছে মা'র—
সেই আজ ভগবান তোমার!
অত্যাচার! অত্যাচার!!
ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-নাই কি লাজ—
নাই কি আত্মসম্মান ওরে নাই জাগ্রত
ভগবান কি রে
আমাদেরো এই বক্ষোমাঝ?
অপমান বড় অপমান ভাই
মিথ্যার যদি মহিমা গাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
আল্লায় ওরে হকতা'লায়
পায়ে ঠেলে যারা অবহেলায়,
আজাদ-মুক্ত আত্মারে যারা শিখায়ে ভীরুতা
করেছে দাস—
সেই আজ ভগবান তোমার!
সেই আজ ভগবান তোমার!
সর্বনাশ! সর্বনাশ!
ছি-ছি নির্জীব পুরবাসী আর খুলো না দ্বার!
জননী গো! জননী গো!
কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ?
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!!
মঙ্গল-ঘট ভেঙে ফেলো,
সব গেল মা গো সব গেল!
অন্ধকার! অন্ধকার!
ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার!
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও।
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
ছি ছি ছি ছি
এ কি দেখি
গাহিস তাদেরি বন্দনা-গান,
দাস সম নিস হাত পেতে দান!
ছি-ছি-ছি ছি-ছি-ছি
ওরে তরুণ ওরে অরুণ!
নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্ন
মুছিয়া দাও!
ভাঙিয়া দাও,
এ-কারা এ-বেড়ি ভাঙিয়া দাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
পরাধীন বলে নাই তোমাদের
সত্য-তেজের নিষ্ঠা কি!
অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা ছি?
মরি লাজে, লাজে মরি!
এক হাতে তোরে 'পয়জার' মারে
আর হাতে ক্ষীর সর ধরি!
অপমান সে যে অপমান!
জাগো জাগো ওরে হতমান!
কেটে ফেলো লোভী লুব্ধ রসনা,
আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
ঘরের বাহির হয়ো না আর,
ঝেড়ে ফেলো হীন বোঝার ভার,
কাপুরুষ হীন মানবের মুখ
ঢাকুক লজ্জা অন্ধকার।
পরিহাস ভাই পরিহাস সে যে,
পরাজিতে দিতে মনোব্যথা—যদি
জয়ী আসে রাজ-রাজ সেজে।
পরিহাস এ যে নির্দয় পরিহাস!
ওরে কোথা যাস
বল কোথা যাস ছি ছি
পরিয়া ভীরুর দীন বাস?
অপমান এত সহিবার আগে
হে ক্লীব, হে জড়, মরিয়া যাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
পুরুষসিংহ জাগো রে!
নির্ভীক বীর জাগো রে!
দীপ জ্বালি কেন আপনারি হীন কালো অন্তর
কালামুখ হেন হেসে দেখাও!
নির্লজ্জ রে ফিরিয়া চাও!
আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
অন্ধকার! অন্ধকার!
নিশ্বাস আজি বন্ধ মা'র
অপমানে নির্মম লাজে,
তাই দিকে দিকে ক্রন্দন বাজে—
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!
আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...

Sunday, February 26, 2017

দয়া সূলভ ও নম্র আচরণের ব্যাপারে প্রীয় নবীর কয়েকটি বাণী

হাবিবুল্লাহ মেসবাহ

১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেন:
"আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি
দয়াশীলতাকে ভালবাসেন। নম্র আচরণে
আল্লাহ যা দেন কঠিন আচরণ বা অন্য
কোন পন্থায় তা দেন না।"(সহীহ মুসলিম)
২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম আয়েশা রা.কে বলেন: “দয়া
সুলভ আচরণ করবে। রূঢ় ও অশালীন আচরণ
থেকে দূরে থাকবে। যে কোন জিনিসে
ধীরস্থীরতা ও নম্রতা থাকলে তা
সৌন্দর্য মণ্ডিত হয়। আর কোন জিনিসে
ধীরস্থীরতা ও নম্রতা না থাকলে তার
সৌন্দর্য্যহানী ঘটে।” (সহীহ মুসলিম)
৩) “হে আয়েশা নম্র হও। আল্লাহ
তাআলা আহলে বায়ত তথা নবী
পরিবারের কল্যাণ চেয়েছেন বিধায়
তাদের মধ্যে নম্রতা দিয়েছেন।” (মুসনাদ
আহমদ-সহীহ)
৪) “যার মধ্যে নম্রতা নেই সে সব
কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (সহীহ মুসলিম)
৫) “যার ভাগ্যে নম্রতা দেয়া হয়েছে
সে বিরাট কল্যাণের অধিকারী। আর
যার ভাগ্যে নম্রতা দেয়া হয় নি সে
অনেক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (আহমদ,
তিরমিযী। আরনাবুত হাদীসটিকে
হাসান বলেছেন)
৬) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কোন কাজে সাহাবীদেরকে
প্রেরণ করলে বলতেন, “তোমরা মানুষকে
সু সংবাদ দাও। তাদেরকে দূরে সরিয়ে
দিও না। সহজ ও নম্র আচরণ কর, কঠিন
করিও না।” (বুখারী ও মুসলিম)
৭) তিনি বলেন: “আমি নামায শুরু
করার পর ইচ্ছা থাকে নামায লম্বা করব
কিন্তু যখন শিশুর কান্নার আওয়াজ কানে
আসে তখন নামায তাড়াতাড়ি শেষ
করি। কারণ আমি জানি শিশুর আওয়াজে
তার মায়ের মানসিক কত কষ্ট
হয়।” (বুখারী ও মুসলিম)

ভারী হয়ে ওঠে বনানী কবরস্থানের বাতাস

নিহত সেনা সদস্যদের স্বজনদের কান্নায়
পিলখানার ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার দাবি
স্টাফ রিপোর্টার : পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। প্রিয় সন্তান হারা মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানেরা কবর জিয়ারত করতে এসে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে গতকাল কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবার কেউ কেউ ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার দাবী জানিয়েছেন।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বনানী সামরিক কবরস্থানে এক তরুণ ও কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে একটি কবরের সামনে দাঁড়ালেন লাঠি হাতে আসা ষাটোর্ধ্ব এক নারী। সেখানে বসে থাকলেন বেশ কিছুটা সময়। কাঁদলেন, দোয়া করলেন, তারপর আবার ফিরতে শুরু করলেন প্রধান ফটকের দিকে। ষাটোর্ধ্ব ওই নারীর চোখে তখন অশ্রু। তরুণ ও কিশোর ছেলে দুটির চোখে-মুখে বেদনার ছাপ। তারা হাঁটছিলেন ধীরপায়ে। কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেই সেই বৃদ্ধার কান্নার যেন বাঁধ ভেঙে গেলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ‘আমি এক দুঃখিনী মা, ৮ বছর ধরে বুকে কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি।
৮ বছর আগে আমার নিষ্পাপ, নির্দোষ ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে।’ আলাপচারিতায় জানা গেলো, তার নাম কোহিনুর বেগম। পিলখানা ট্রাজেডিতে নিহত মেজর মিজানুর রহমানের মা তিনি। মিজানুরের দুই সন্তানকে নিয়ে পিলখানা ট্রাজেডির দিকে কবর জিয়ারত করতে এসেছিলেন তারা। সাদাকাত বিন মমিনের বয়স আট বছর। গতকাল মায়ের সঙ্গে বনানীর সামরিক কবরস্থানে এসে কাঁদছিল সে। বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে অস্ফুটস্বরে বলছে, ‘ওদের জন্য আমি আমার বাবাকে দেখতে পেলাম না।’ জন্মের পর বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি সাদাকাতের। পিলখানা ট্রাজেডির ১১ দিন পরে জন্ম নেয় সে। ওই হামলার ঘটনায় নিহত মেজর মোমিনুল ইসলামের ছেলে সে।
গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল পিলখানা ট্রাজেডির ৮ বছর। ২০০৯ সালের এই দিনে (২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি) পিলখানায় বিডিআর-এর (বর্তমানে বিজিবি-বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বিপথগামী সদস্যরা কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে নারকীয় এক হত্যাকান্ড চালায়। এসময় তারা অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটও করে। ওই দু’দিনে তারা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও নারী-শিশুসহ আরও ১৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পিলখানা ট্রাজেডির ৮ বছর পূর্তিতে সকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে নিহতদের স্মরণে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, বিজিবি প্রধানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও পরিবারের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সকাল ৯টার দিকে কোরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে নিহতদের করা শুরু হয়। এর আগে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বিউগল বাজিয়ে ও স্যালুটের মাধ্যমেও জানানো হয় শ্রদ্ধা। তারপর স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সবাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আবুল হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো ও কবর জিয়ারত শেষে নিহত মেজর মিজানের মায়ের সঙ্গে ফিরছিলেন তার দুই সন্তান তাহসিন রহমান রামি ও ফারদিন রহমান সামিও। রামি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। আর ১১ বছরের সামি পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে বনানীর একটি স্কুলে। ৮ বছর আগের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রামি বলেন, ‘সেদিন সকালে বাবার (মেজর মিজান) নতুন র্যাঙ্ক পড়ার কথা ছিল। সকালে বাবা যখন নাস্তা করে বাসা থেকে বের হন তখন আমার সঙ্গে কথা হয়। আমি তাকে বিদায় জানাই। সেদিন আমাদের জন্য ছিল শুভ দিন। কিন্তু সেটা হয়ে যায় অশুভ। র্যাঙ্ক পরার বদলে তিনি দুই দিন পর ফিরেন লাশ হয়ে।’
অশ্রসিক্ত হয়ে পড়েন রামি। চোখ মুছে আবার বলতে থাকেন, ‘এতবড় একটা ঘটনা ঘটলো। এই ঘটনার দোষীরা এখনো শাস্তি পেলো না। এই ঘটনা কেন ঘটলো তাও আমরা জানতে পারলাম না। একটি ঘটনা তো আর এমনি এমনি হয় না। কেউ আমাদের কোনও প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। আমার জানার খুব ইচ্ছা কেন আমার বাবাকে হত্যা করা হলো? পিলখানায় রামি-সামির বাবার নির্মম মৃত্যুর নয় মাস আগে মাকে হারান তারা। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মা রেবেকা ফারহানা রোজী। এখন দাদা-দাদির সঙ্গেই থাকেন দুই ভাই। পিলখানার ঘটনার সময় সামীর বয়স তিন বছর। ফলে তার সেই স্মৃতি আর মনে নেই। তবে রামির হৃদয়ে গেঁথে আছে বেদনাসিক্ত সেই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত। সামি বলেন, আমি ক্যাডেট কলেজে পড়ছি। আমার ইচ্ছা আমি আর্মিতে জয়েন করার। আমি আমার বাবার মতো হতে চাই।
রামি-সামির মতোই বাবার কবর জিয়ার করতে মা সানজানা সোনিয়ার সঙ্গে এসেছিলেন ৮ বছরের সাদাকাত বিন মমিন। পিলখানা ট্রাজেডিতে নিহত মেজর মোমিনুল ইসলামের ছেলে। জন্মের পর বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। পিলখানা ট্রাজেডির ১১ দিন পর জন্ম হয় তার। মা সানজানা সোনিয়া বলেন,‘বাবার ছবি দেখে ও গল্প শুনে সে বুঝে গেছে তার বাবার কী হয়েছে। এজন্য মাঝে মধ্যেই সে বলে আমি বড় হয়ে অফিসার হবো তারপর ওদের গুলি করে মারবো।’
নিহত মেজর মমিনুলের বাবা মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলে হারিয়েছি, ছেলেকে তো আর কোনওদিন ফিরে পাবো না। কিন্তু বিচারটা দেখে যেতে পারলে মনে শান্তি পেতাম।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে দিনাতিপাত করছি আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না।’ কান্নাজড়িতকণ্ঠে মোমিনের বোন মেহেরুন্নাহারও বলেন একই কথা। শহীদ সৈনিক জহিরুল ইসলামের স্ত্রী ফারজানা আফরিন বলেন, ‘আমরা শুধু হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এর বেশি আমাদের কোনও চাওয়া নেই।’ নিহত কর্নেল কিবরিয়ার ছোট ভাই জাফর আহমেদ বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে আমরা বাকরুদ্ধ। আমরা বছরের পর বছর কষ্ট বুকে নিয়ে আছি। আর যেন কোনও শৃঙ্খলা বাহিনীতে এমন কোনও ঘটনা না ঘটে। আমরা যেন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দেখতে পাই, এই আমাদের প্রত্যাশা।’
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নিহত কর্নেল কুদরত-ই-এলাহীর বাবা হাবীবুর রহমান। বলেন, ‘আল্লাহর কাছে বিচার চাই। আমার সন্তান সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিল। সন্তান হারিয়ে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারি না।’
এদিকে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘পিলখানা ট্রাজেডির ঘটনায় পলাতকদের খুঁজে বের করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খুঁজে বের করে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।’ পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটি দুঃখের একটি দিন। এই ঘটনার এখনো বিচার চলছে। কিন্তু ঘটনার রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। মূল পরিকল্পনাকারী বা নেপথ্য নায়ক কে? তারা কোথায়? তাদের খুঁজে বের করে এই ঘটনার ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
বিডিয়ার বিদ্রোহে বাধা দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো সুবেদার মেজর নুরুল ইসলামের পরিবার গত আড়াই বছরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্লটটি পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী সন্তান। তাঁরা বলছেন, বিদ্রোহে নিহত শহীদ সেনা সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা প্লট পেয়েছেন বহু আগেই। গত আড়াই বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নুরুলের পরিবারের জন্য বরাদ্দ প্লটের ফাইলটি বন্দি হয়ে আছে ‘লাল ফিতায়’। এমন পরিস্থিতে কবে নাগাদ তারা এই প্লট বুঝে পাবেন তাও নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
বিডিআর বিদ্রোহে নির্মমভাবে নিহত শহীদ নুরুলের ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান জানান, বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও বিডিআরের বেশকিছু সদস্য মারা যায়। এর মধ্যে তারা বাবাই সেনা অফিসারদের নির্মমভাবে হত্যার আগে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই কারণে ঘাতক বিডিআর সদস্যরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিদ্রোহে বাধা দিতে প্রাণ হারানোয় ৫৭ সেনা সদস্যের পাশপাশি তার বাবা সুবেদার মেজর নুরুল ইসলামকেও শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেন সরকার। বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ পরিবারের জন্য সরকার প্লট বরাদ্দের ঘোষণার পর ইতোমধ্যে সবাই প্লট পেয়ে গেছেন।
৫৭ সেনা কর্মকর্তার পরিবারকে যে প্লট দেওয়া হয়েছে ওই প্লটের জায়গা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছিলো। কিন্তু তার বাবা ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। তাই সেখানে প্লট দেওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় বর্তমান বিজিবিকে লিখিতভাবে জানানো হলে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গণপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়। গণপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবার নির্দেশনা দিয়ে প্লট ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়ে আদেশ পাঠান। কিন্তু গত আড়াই বছরও প্লট পাওয়া যায়নি।
হান্নান জানান, তাদের পরিবারকে প্লট ও ফ্ল্যাট সুযোগ দেওয়ার জন্য তৎকালীন উপসচিব শাহরিয়ার (প্রশা-২) স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। যার স্মারক নং প্রঃ শাঃ৬/রাজ-১৬/২০১৩/৩০৭। ১২ জুন ২০১৪ সালে পাঠানো ওই চিঠিতি ফ্যাক্সযোগ রাউজক পায় ১৬ জুন ২০১৪ সালে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৩ সালের ২৪ নভেম্বর পাওয়া ৪৪,০০,০০০০.১১৬.৩৬.০০১.১২/৪২৫ নম্বর স্মারকের কথা চিঠিতে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য নির্দেশ মোতাবেক অনুরোধ করা হয়। চিঠির পর আমি ১০ থেকে ১২ বার রাজউক চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করি। কিন্তু এখনো কোনো সুফল হয়নি।
সূত্রমতে,২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় তার মেজর নুরুল ইসলাম নাস্তা না করেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন ডিজিকে রিসিভ করার জন্য। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পিলখানায় গোলাগুলির পর থেকে নুরুল ইসলামের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর তার ছোট মেয়ে নাসরীন আক্তার ইতি এসএম কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে দেখতে পায় চার মুখোশধারী জোয়ান তার বাবাকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
শহীদ সুবেদার মেজর মো. নুরুল ইসলামের স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা শহীদ হন। সেনাদের বাঁচাতে তার স্বামী বিডিআর জওয়ানদের ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান। তার স্বামী অত্যন্ত সৎ ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ৪ বার ডিজি পদক পেয়েছিলেন। সৎ ও অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সরকার তাকে পবিত্র হজব্রত পালন করায়। স্বামী শহীদ হওয়ার পর তার সব আশা ভেঙে যায়। ৪ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সর্বদাই তিনি মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন।
আয়েশা বেগম জানান, শহীদ ৫৮ জনের মধ্যে ৫৭ শহীদ সেনা কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ৪ কাঠার প্লট বরাদ্দ পান। কিন্তু এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।qij

Friday, February 24, 2017

বাংলা ভাষার সেকাল একাল


মো জা ফ ফ র হো সে ন

মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে যে অর্থবোধক ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে সে ধ্বনিসমষ্টির নামই ভাষা। মানুষ কিভাবে ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে এবং কিভাবে ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণায় ওঠে এসেছে যে, পৃথিবীতে মানুষের আর্বিভাব যত পূর্বকালের ভাষার সৃষ্টি তত পূর্বকালের নয়। অর্থাৎ ভাষা আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষ আবির্ভাবের বহুকাল পরে। গবেষকদের ধারণা প্রাচীন মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করত বিভিন্ন উপায়ে যেমন- ইশারা বা সঙ্কেত, অর্থহীন অস্ফুট ধ্বনি, নানা রকম রেখা, নকশা ও চিত্র অঙ্কনের দ্বারা। বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ম্যাক্সমুলারের মতে, ইশারা-ইঙ্গিতের পরই এসেছিল মুখের ভাষা। ভাষা কিভাবে সৃষ্টি হলো সে ব্যাপারে যেসব থিওরির অবতারণা করা হয়েছে তাতে কোনোভাবেই ভাষার জন্মকথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে না। The Bow-Wow Theory মতে জীবজন্তুর ডাক অনুকরণ করা থেকে ভাষার সূচনা। The Pooh- Pooh Theory বলছে মানুষ আঘাত অনুভব করতে পারত এবং সেই আঘাত প্রাপ্তের ধ্বনি থেকেই ভাষার জন্ম। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে Ding-Dong Theory তে বলা হয়েছে স্পর্শকাতর মনের বহিঃপ্রকাশ থেকে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন মানুষ চোখের সামনে এক একটি বস্তু দেখে বিচিত্র শব্দ করেছে আর সেসব শব্দ থেকেই ভাষার জন্ম। Yo-he-ho Theory-এর ধারণা; মানুষ তার মনের অবসাদ দূর করার জন্য এক ধরনের শব্দ করে থাকে যেমন- কুলি-মজুরের শব্দ ‘হেইয়ো’, হুঁ হুঁ; এ থেকেও ভাষার উৎপত্তি হতে পারে। আবার Ta- ta Theory মতে মানুষ হাততালি বাজাতে গিয়ে ‘তা তা’, ‘তাই তাই’ শব্দ করতে পারে; এভাবেও ভাষার জন্ম হতে পারে। ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে এসব থিওরির ধারাবাহিকতা কিংবা যোগসূত্র শেষাবধি টিকে থাকতে পারেনি বলেই ভাষাবিজ্ঞানীরা এখন বলছেন; ভাষার উৎপত্তির সঠিক তথ্য এখন আর পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। তবে ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে একটি উৎস অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য পেশ করে এবং সেই বক্তব্যে ভাষার ইতিহাস এবং তার ধারাবাহিকতা ও যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। উৎসটি হচ্ছে পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে এই গ্রন্থের সূরা রহমানে বলা হয়েছে- ‘তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন’ [ আয়াত : ২, ৩]। পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে- ‘হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও’ [সূরা হুজরত : ১৩]। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে মানুষ যখন পৃথিবীতে এসেছে তখন কথা বলার যোগ্যতা নিয়েই পৃথিবীতে পদার্পণ করেছে। কাজেই পৃথিবীতে আগে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে এবং পরে সেই মানুষ বিভিন্ন উপায়ে ভাষা শিখেছে এমন মন্তব্য গ্রহণযোগ্য কি না তা ভাববার অবকাশ রয়েছে। পৃথিবীতে যে দু’জন মানুষ (আদম আ: ও হাওয়া আ:) প্রথম এসেছেন তাঁদের থেকেই ধ্বনি তারতম্যে বিভিন্ন ভাষার (প্রায় সাড়ে চার হাজার) জন্ম হয়েছে বলা যেতে পারে। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানও দেখিয়েছেন পৃথিবীর ভাষাগুলো মূল ভাষাগোষ্ঠী ইন্দো-ইউরোপীয় দলভুক্ত। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ২০-২২টি ভাষা এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য। কুরআনের তথ্য থেকে অনুমান করা যেতে পারে পৃথিবীর প্রধান ভাষাগুলো একটি ভাষা থেকেই সময়ের ব্যবধানে উচ্চারণ তারতম্যে ভিন্ন ভিন্ন রূপলাভ করে থাকতে পারে। কুরআনের তথ্য মতে পৃথিবীর আদি মানব-মানবী ‘আদম-হাওয়া আ:’ এবং তাঁদের ভাষা ছিল আরবি। কুরআনে উল্লিখিত তথ্যকে সামনে রেখে ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে নতুন করে গবেষণা হওয়া জরুরি হতে পারে।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলা ভাষাও ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর দু’টি শাখা হলো ‘কেন্তুম্’ ও ‘শতম’। শতম্ এর কয়েকটি শাখা রয়েছে; তার মধ্যে ইন্দো-ইরানীয় একটি শাখা। এই ইন্দো-ইরানীয়র দু’টি শাখার মধ্যে একটি হলো ভারতীয় শাখা। ভারতীয় ভাষার দু’টি শাখার মধ্যে একটির নাম প্রাকৃত। এই প্রাকৃত ভাষা আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত; এর মধ্যে মাগধি একটি শাখা। এই মাগধি কয়েকটি শাখায় বিভক্ত যেমন- ওড়িয়া, অসমিয়া, বিহারি, বাংলা। অর্থাৎ ইন্দো-ইউরোপীয় থেকে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা। সেখান থেকে প্রাকৃত, মাগধি হয়ে বাংলা ভাষার জন্ম। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে চর্যাগিতিকায়। চর্যাগিতিকা যে ভাষাতে লেখা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সে ভাষাকে বাংলা বলেছেন এবং এ মন্তব্য প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লহ প্রমাণ করেছেন চর্যাগিতিকাগুলোর ভাষা ৬৫০ থেকে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যকার ভাষা। এ সময়ের আগে বাংলা ভাষার ধ্বনিরূপ কেমন ছিল তার লিখিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। নিশ্চয় এ সময়ের আগেও বাংলা ভাষা প্রচলিত ছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আধুনিক বাংলা ভাষার একটি বাক্যকে রূপান্তরের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী পর্যন্ত বাংলা ভাষার রূপটি কোন কোন সময় কেমন ছিল। ‘তুমি ঘোড়া দেখ’ আধুনিক বাংলা ভাষার এ বাক্যটিকে শহীদুল্লাহ সাহেব রূপান্তরিত করেছেন মধ্যযুগের বাংলায় এভাবে ‘তুম্হি ঘোড়া দেখহ’ (১৩৫০-১৮০০ খ্রি:)। প্রাচীন বাংলায় ‘তুম্হে ঘোড়া দেখহ’ (৬৫০-১২০০ খ্রি:)। প্রাকৃতে ‘তুম্হে ঘোটকং দেকখধ’ (৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব-২০০ খ্রি:) প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষায় ‘য়ুয়মশ্বং স্পশ্যথ’ (১২০০-৮০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। আর ইন্দো-ইউরোপীয় রূপ হচ্ছে ‘য়ুস্ এক্ক্যোম্ স্পেক্যিএথে’ (৩৫০০-২৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। ‘তুমি ঘোড়া দেখ’ বাক্যটির বিভিন্ন সময়ের রূপান্তরিত রূপগুলো লক্ষ করলে অনুধাবন করা সহজ হয় যে, বাংলা ভাষা জন্ম থেকে আজোবধি একই রূপে প্রবাহিত হতে পারেনি। মাত্র চৌদ্দ শ’ বছর আগে বাংলা ভাষায় রচিত চর্যাগিতিকাগুলো সাধারণ বাংলা ভাষাভাষিদের জন্য পাঠ করে বুঝে ওঠা আজকাল অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ বাংলা ভাষা এতটা বদলেছে যে এ ভাষার পূর্বের শব্দরূপগুলোকে এখন বাংলা ভাষা বলে মনে করতে গিয়ে আশঙ্কা করতে হয়। যেমন- চর্যাগিতিকার ৭ নম্বর পদ ‘আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা/তা দেখি কাহ্ন বিমণা ভইলা’। চর্যাগিতিকার এই চরণটি সাধারণ বাংলা ভাষাভাষিদের নিকট এখন বুঝে ওঠা কষ্টকর হয়ে ওঠে। চরণটি আধুনিক বাংলাতে রূপান্তর করলে অর্থ দাঁড়াবে ‘আলি কালি দ্বারা রুদ্ধ হলো পথ। কানু তা দেখে দুঃখিত হলো।’ মধ্যযুগের বাংলা ভাষার লিখিত প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’। কাব্যটি চর্যাগিতিকার অনেক পরে রচিত বলে এ কাব্যের ভাষা চর্যাগিতিকা থেকে আলাদা। যেমন- ‘অঝর ঝরএ মোর নয়নের পাণী/বাঁশীর শবদেঁ বড়ায়ি হারায়িলোঁ পরাণী’ (অর্থ : অঝোরধারায় ঝরছে আমার নয়নের জল/বড়াই বাঁশির সুরে আমার প্রাণ হারালাম)। সাহিত্যের ভাষা যেভাবে কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে হয়ে এসেছে তেমনি ভাষার প্রায় প্রতিটি শব্দ এবং ধ্বনিও ভিন্নরূপ গ্রহণ করেছে। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বাংলা ভাষা পর্যন্ত শব্দের বিবর্তন লক্ষ করলে বুঝতে পারা অতি সহজ হতে পারে। যেমন- ‘তিসি’, এ শব্দটি এখন আধুনিক বাংলা ভাষার শব্দ। শব্দটি প্রাচীন বাংলার মানুষ উচ্চারণ করত ‘তসী’ রূপে। এই তসী আরো পূর্বে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষায় প্রচলিত ছিল ‘অতসী’ রূপে। আবার ‘ঘি’ আধুনিক বাংলা। প্রাচীন বাংলাতে উচ্চারণ হতো ‘ঘিঅ’; তার আগে ‘ঘত’; তারও আগে ‘ঘৃত’। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে বাংলা ভাষার শব্দগুলো বিবর্তিত হয়েছে। এ ছাড়া ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার শব্দ হু হু করে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করছে। হিন্দি সিনেমা ও তার গান বাংলা ভাষাভাষি ছেলেমেয়েদের কাছে এখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারাতে আনন্দ অনুভব করছে। ইংরেজি ভাষার শব্দগুলোকে বাংলা ভাষার বর্ণে লেখা হচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষি কিছু ছেলেমেয়ে ইংরেজি মাধ্যমের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা পর্যন্ত করছে। এসবের প্রভাব বাংলা ভাষার ওপর পড়ার কারণে ভাষা তার সঠিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। যেভাবে এ দেশের তরুণ ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিন্দি গানের চর্চা করে চলছে সে চর্চা প্রতিরোধ করতে না পারলে তা বাংলা ভাষার জন্য সুখকর হতে পারে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না। কেননা গান, কবিতা, নাটক, সিনেমা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে ভাষা চর্চা করা হয়ে থাকে।
বাংলা ভাষাকে বিবর্তন থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সে চেষ্টা কতটা সফল হবে সেটি সময় বলে দেবে। তবে আজ থেকে এক হাজার বছর পরে হয়তো এখন যে শব্দটি যেভাবে উচ্চারণ করছি, বানান করছি, লিখছি, সেটি সেভাবে না-ও থাকতে পারে। অর্থাৎ বাংলা ভাষা তার রূপ বদলিয়ে এক হাজার বছর পরে (এখন যে রূপ ব্যবহৃত হচ্ছে তার আর থাকবে না) অন্য রূপে প্রকাশিত হতে থাকবে। কেননা বাংলা ভাষারও উপভাষা রয়েছে। যেমন চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থায়ী সাধারণ মানুষ এক ধরনের বাংলা ভাষায় কথা বলে (প্রমিত বাংলা নয়) আবার সিলেট অঞ্চলের মানুষ আর এক ধরনের বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। এ দিকে রংপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষ অন্য একধরনের বাংলায় কথা বলে এবং রাজশাহী অঞ্চলের বাংলা ভাষা আর এক ধরনের। এই যে ভিন্ন ভিন্নœ অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা। এই উপভাষার উচ্চারণ ধ্বনিগুলো বাংলা ভাষাকে বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। সে জন্য নাটক সিনেমার সংলাপে যত কম উপভাষা ব্যহার করা যায় ততই মূল ভাষার জন্য মঙ্গল হতে পারে।
নাটক, সিনেমা ও সাহিত্যের মধ্যে বেশি বেশি উপভাষা ব্যবহার করা হলে সে উপভাষাগুলোর মধ্যে কোন উপভাষাটাকে বাংলা ভাষা বলা হবে? নাকি কোনোটাই বাংলা ভাষা নয়? নাকি সবগুলোই বাংলা ভাষা? এ রকম প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। এ জন্য বাংলা ভাষাকে প্রমাণস্বরূপ করে প্রমিত বাংলা করা হয়েছে যেন ভাষাকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে সহজেই চিহ্নিত করা যায় যে, এটি বাংলা ভাষা। তা না হলে বাংলা উপভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।

Thursday, February 23, 2017

মানুষের সাথে কোমল ব্যবহার ও হাসিমুখে মেলামেশা করা

রবির কিরণে উদ্ভাসিত হয়ে চাঁদ জোৎস্না ছড়ায়। স্নিগ্ধ চন্দ্রালোকে হেসে ওঠে ধরণী, মানব হৃদয়ে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। নিস্পন্দ জোৎস্না প্লাবিত রজনী ধরণীর শিয়রে জেগে থেকে চুপি চুপি ভাবের তরঙ্গ জাগিয়ে তোলে মানব হৃদয়ের শান্ত সরোবরে। একই ভাবে আল্লাহর দেয়া ‘রিফক’র আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে মানুষ তার উত্তম আখলাক ছড়িয়ে পরিবার সমাজকে অলোকিত করে, সুখময় করে গড়ে তোলে। এমন সুন্দর চরিত্রের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায় নবী জীবনে। তাই সুখী পরিবার ও সমাজ গঠনের প্রয়োজনে নবী জীবনের আদর্শকে আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। নবী জীবন কেমন ছিল, তার পরিচয় মেলে নিম্নোক্ত হাদিস খানাতে।
আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস (রাঃ) -এর সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম : তওরাতে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশেষণসমূহ সম্পর্কে আমাকে অবগত করুন। তখন তিনি বললেন: হ্যাঁ, (তাই হবে) নিঃসন্দেহে তওরাতে রসুলুল্লাহ (সঃ)-কে এমন কতিপয় বিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে -যা দ্বারা কোরআন শরীফে তিনি বিশেষিত হয়েছেন। ঃ “ হে নবী আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে পাঠিয়েছি। ” (আহযাব- ৪৫)
এবং ‘নিরক্ষরদের স্মরণ  স্থল ’, ‘আপনি আমার দাস ও আমার পয়গাম বাহী রসুল ’, আমি আপনার নাম করণ করেছি ‘মুতাওয়াক্কিল’- আল্লাহ্তে নির্ভরশীল।  রুক্ষ মেজাজ, দুর্মুখ বা হাট বাজারে শোরগোল কারী নন, দুর্ব্যবহারের দ্বারা দুর্ব্যবহারের জবাব দেন না, বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে দেন। (আল- আদবুল মুফরদ- ২৪৬ঃ১)
রাবী আতা ইবনে ইয়াসার আসল নাম আবু মোহাম্মাদ আল হিলালী আল মাদানী। তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন মাইমুনা (রাঃ)’র মুক্তদাস তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য রাবী (সিকাহ)। তিনি ৯৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।  তিনি যায়েদ ইবনে সাবেত, আবু আইউব ইবনে মাসউদ, আবু দারদা, হযরত আয়েশা (রাঃ), উসামা ইবনে যায়েদ আবু হোরায়রার সূত্রে এবং যায়েদ ইবনে আসলাম, আমর ইবনে দীনার ও আরও অনেকে তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেন।
 রসুল (সঃ) ছিলেন জ্যোতিষ্মান প্রদীপ বিশেষ। তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে এক আরব কবি বলেনঃ
ইয়া সাহিবাল জামালি ইয়া সাইয়্যিদাল বাশার
বি- ওয়াজহিকাল মুনিরি লাক্বাদ নাওয়ারাল কামার
হে জ্যোতির্ময়, হে মানব শ্রেষ্ঠ, তোমার পূত চেহারার দীপ্তি থেকেই চাঁদ আলোক প্রাপ্ত হয়েছে।
যার হৃদয় যত পবিত্র কলুষ মুক্ত তিনি হতে পারেন তত কোমল ব্যবহারের অধিকারী, সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা অধিকারী। রসুল সঃ)-এর চেয়ে পবিত্র মনের অধিকারী ধরণীতে কোন ব্যক্তির আগমন ঘটেনি তাই তার চেয়ে আকর্ষণীয় আচরণের অধিকারীও কেউ ধরাধামে আগমন করেনি, ভবিষ্যতেও করবেন ন॥
নবী করীম (সঃ) সব সময় হাসি মুখে থাকতেন, সঙ্গী সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া মাত্র হাসিমুখে অভ্যর্থনা করতেন; কিন্তু জীবনে কেউ কোনদিন তাঁকে অট্টহাসি হাসতে দেখেনি। প্রবল হাসির উদ্রেক হলে কখনও কখনও  বিদ্যুৎ চমকের মত একফালি দাঁতের ঔজ্জ্বল্য ফুটে বের হত। সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, জীবনে যতবার আমি রসুলে পাকের (সঃ) সাথে সাক্ষাত করেছি, ‘ প্রত্যেক বারই তিনি আমাকে হাসিমুখে সম্ভাষণ করেছেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আমার কথা শুনেছেন।’ “হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রাঃ) বলেছেনঃ  মা কানা দেহ্কা রসুলিল্লাহে (সঃ) ইল্লা তাবাস্ সুমা- নূরনবী (সঃ) মৃদু হাসি ব্যতিত কখনও উচ্চ হাস্য করতেন না।
পবিত্র আখলাকের সৌন্দর্য দ্বারা মানুষের প্রেম প্রীতি ও সম্মান হাসিল করা যায়। গোমরামুখী হওয়া কোন তাকওয়ার পরিচয় বহন করে না। ব্যক্তিগত জীবনে দেখা যায় অনেক সৎ চরিত্রের অধিকারীদের চরিত্রে কোমলতা কম থাকে, মেজাজ থাকে কিছুটা কর্কশ। মুমিনের এমন চরিত্র হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কিয়ামতের দিন এমন লোককেও আল্লাহর সামনে হাযির করা হবে যার আমল নামার মধ্যে নামায, রোযা, যাকাত প্রভৃতি নেক আমল থাকবে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তি তার মন্দ আচরণের জন্য আল্লাহর কাছে নালিশ করবে। তাই মিষ্টি হাসি, মধুর আচরণ ও কোমল চিত্তের অধিকারী হওয়া পরিবার প্রধান  সমাজ সংস্কারকদের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হওয়া প্রয়োজন।
রসুল (সঃ) ছিলেন এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কোরআন সাক্ষ্য দেয়ঃ ফাবিমা রহমাাতিম্ মিনাল্লাহে লিন্তা লাহুম ওয়া লাও কুনতা ফাজ্জান্ গালিজাল কালবে লান্ফাদ্দু মিন হাওলিকা- অল্লাহর অনুগ্রহে তুমি তাদের জন্য কোমল। হে মুহাম্মাদ! আর যদি তুমি কঠোর হৃদয় হতে তা হলে অবশ্য তারা তোমার পাশ থেকে সরে দাঁড়াত। ( আলে ইমরান-১৭০)
মধুর চরিত্রের অধিকারী ও মিষ্টভাষীদের জন্য জান্নাতের সুখবর রয়েছে পবিত্র হাদিসে। আনাস রাঃ) থেকে বর্ণিত : রসুলল্লাহ (সঃ) বলেছেন-  যে কথাটি প্রকৃতই মিথ্যা এবং অসঙ্গত, যে ব্যক্তি উহা বলা এবং উহা আলোচনা করা পরিত্যাগ করে, তার জন্য জান্নাতের কিনারায় স্থান নির্মিত হয়। যে ব্যক্তি সঙ্গত কারণ থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া বিবাদ পরিত্যাগ করে, তার জন্য জান্নাতের মধ্যে বাসস্থান নির্মিত হয়।  যে ব্যক্তি বাক সংযম, মিষ্টভাষণ এবং সত্য কথার প্রভৃতি সকল গুণ দ্বারা নিজের চরিত্র সৌন্দর্যমন্ডিত করে, তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে বাসস্থান নির্মিত হয়। ( মেশকাত)
যে জীবনে আনন্দ রস একবারেই নেই, সাধারণ মানুষ তেমন জীবনকে আদর্শরূপে গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু হাসি তামাশা যেন ভব্যতার সীমা ছাড়িয়ে না যায় সে জন্য সূক্ষ্ম রস বোধ ও আত্ম সংযম থাকা দরকার। নবী জীবনের হাসি তামাশার দিকটায় এই সত্যের প্রতি আলোক পাত করা হয়েছে। হয়রত আয়েশা (রাঃ) সাক্ষ্য দেনঃ রসুলুল্লাহ (সঃ) কাউকে অভিশাপ দিতে কারো নিন্দা করতে বা কারো সঙ্গে কর্কশ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলেন না।
‘নীরবতা, নির্জনতা, স্থির ও সমাজ বিচ্ছিন্ন একক জীবন ইসলাম নয়।’ তাই দেখা যায় রসুল (সঃ)-এর পারিবারিক জীবন ছিল, জীবনে হাসি তামাশা ছিল, ছিল তাঁর জীবনে তুলনা বিহীন কোমল ব্যবহার । এই কোমল ব্যবহারের গুণটি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত রূপে। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সঃ) বলেছেনঃ “কোন গৃহের কল্যাণ করার উদ্দেশ্য ছাড়া আল্লাহ তাদেরকে ‘রিফক’ দান করার ইচ্ছা করেন না এবং তাদের ক্ষতি করা ছাড়া তাদেরকে ‘রিফক’ থেকে বঞ্চিত করেন না। ”
হাদিসে ব্যবহৃত ‘রিফক’ শব্দের অর্খ ব্যাপক। শুধুমাত্র দয়া বা নম্রতা  কিংবা নরম মেজাজ দ্বারা অর্থ প্রকাশ করে শেষ করা যায় না। তাই পরিবার ও সমাজের কল্যাণ কামনায় আল্লাহর কাছে ‘রিফ্ক’র মোহতাজ হয়ে তা লাভের জন্য আবেদন করতে হবে।
এই রিফ্কের গুণে গুণান্বিত হয়ে পরিবারের সাথে, প্রতিবেশীর সাথে, সমাজের সমস্ত মানুষের সাথে হাসি মুখে, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে তাদের সাথে মিলতে হবে, কোমল আচরণ করতে হবে।এ সব যেন লোক দেখানোর না হয়। এ কথা সবার জানা, স্নেহ যত গোপনের, যত নির্জনের হয় ততই প্রবল হতে থাকে। তাই হৃদয়ের গোপন আস্তানা থেকে ভালবাসতে হবে, ভাল ব্যবহার করতে হবে। তা হলে আশা করা যায় পরিবার ও সমাজ সংশোধনের কাজ আঞ্জাম দেয়া অনেকটা সহজ হবে।
মানুষের সাথে প্রতিবেশীর সাথে সুন্দর আচরণ করা ঈমানের অন্যতম শিক্ষা। তাই সর্বাবস্থায় সর্ব স্তরের মানুষের সাথে ভদ্র আচরণ করা ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য।

Wednesday, February 22, 2017

উচ্চ আদালতে এখনো বাংলা উপেক্ষিত

মালেক মল্লিক : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ৭১ এর স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আন্দোলনের প্রতীকী দিবসে প্রতি বছর ২১ ফেব্রæয়ারি স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারাবিশ্বে দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বে প্রতিদিনই বাড়ছে বাংলা ভাষার ব্যবহার, গবেষণা ও চর্চা বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশে। কিন্তু এ দেশের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনো উপেক্ষিত। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের রুলস এখনো ইংরেজিতে রয়েছে। আদালতসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নিয়ে একটি রিটের রুল জারি প্রায় তিন বছর অতিক্রম হলে চ‚ড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা।
আইনজ্ঞরা বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতেও বাংলা ভাষার ব্যবহার সময়ের দাবি। তাদের মতে, বাংলা ভাষায় উচ্চ আদালতের রায় হলে বিচারপ্রার্থীদের জন্য অনেক সুবিধা হবে। কারণ নিজের মাতৃভাষায় যেমন কোনো বিষয় বুঝতে সুবিধা হয়, অন্য ভাষায় তা কঠিন। একই সঙ্গে আগামী দিনের নতুন নতুন আইনগুলো বাংলা ভাষায় করার দাবি জানান তার।
সুপ্রিম কোর্টের রুলসেও আদালতের ভাষা হিসেবে প্রথমে বাংলা এবং পরে অন্য ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে; কিন্তু এর পরও উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ নেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের। কয়েকজন বিচারপতি ব্যক্তিগত আগ্রহে বাংলায় কয়েকটি রায় দিলেও এর সংখ্যা খুবই নগণ্য।
সংবিধানের এ বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইনও প্রণয়ন করা হয়। আইনের ৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
এদিকে গতকাল শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকদের কাছে। তিনি বলেছেন, আমি খুবই দুঃখিত এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে এটা আমার অপারগতা, এটা আমি স্বীকার করি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক বলেছেন, জনস্বার্থে হলেও উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লেখা উচিৎ।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, আমাদের নিজেস্ব ভাষায় বিচারকার্য পরিচালনা হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী উভয়ের জন্য সুবিধা। কারণ মাতৃভাষায় কোনো বিষয় বুঝতে যতটা সহজ, অন্য ভাষায় কিছুটা কঠিন। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে এখন যেসব আইন আছে অধিকাংশও ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রণয়ন করা। এ কারণে এসব তাদের ভাষায় বিচারপতিরা চাইলেও পারেন না। বিশেষ করে নতুন আইনগুলো বাংলায় করতে হবে। এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলছেন ইনকিলাবকে বলেন, এটা একান্তই প্রধান বিচাপতির বিষয়। বিচারপতিরাই আলোচনা করে সুপ্রিম কোর্ট রুলস প্রণয়ন করেন। প্রয়োজন হলে বিষয়টি নিয়ে ফুলকোর্টে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবেন। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তিনি (প্রধান বিচারপতি) যে কোনো বিষয়ে নির্দেশনা দিলে আমরা সেটা বাস্তবায়ন করি মাত্র। তিনি আরো বলেন, বাংলায় ‘অনেক বিচারপতিই বাংলায় রায় দিচ্ছেন। তারা চাইলে অবশ্যই বাংলায় রায় দিতে পারেন।
উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় ব্যবহার নিয়ে রিটকারী আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ ইনকিলাবকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের রুলস এখনো ইংরেজিতে রয়েছে। আমি মনে করি এই রুলস বাংলায় করা উচিত। তাতে বিচারপতি ও আইনজীবীরা বাংলা ব্যবহারের উৎসাহিত হবে। এ ছাড়া তিনি আরো বলেন, বাংলা কোনো নিয়ে গেলে বর্তমানে কোর্ট একটু আদেশ দিতে কষ্টবোধ করেন বলে মনে হয়। অথাৎ যা চাই সেই আদেশ পাই না। তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালে আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করি। একই বছরের ১৭ ফেব্রæয়ারি রুল জারি করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। কিন্তু এখনো ওই রুলের চ‚ড়ান্ত শুনানি না হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
উচ্চ আদালতে বিচারপতিদের মধ্যে মরহুম সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ভাষায় কয়েকটি আদেশ ও রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু সেগুলো আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত আইন সাময়িকীর (ঢাকা ল’ রিপোর্টস ৫০ ও ৫১ ডিএলআর) তথ্যানুসারে, ওই বছরের ফেব্রæয়ারিতে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও বিচারপতি হামিদুল হক সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলায় বাংলায় রায় দিয়েছিলেন। একই সময়ে বিচারপতি হামিদুল হক অন্য একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায়ও বাংলায় রায় দেন। এ ছাড়া হাবিবুর রহমান বনাম সেরাজুল ইসলাম, সবুর আলী বনাম রাষ্ট্র এবং আবদুর রেজ্জাক বনাম রাষ্ট্র নামক তিনটি ফৌজদারি মামলায়ও বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বাংলায় রায় দিয়েছিলেন।
বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্টে থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানসহ স্থাপনা সংরক্ষণ, স্বাধীনতার ঘোষক, ঢাকার চার নদী রক্ষাসহ প্রায় দেড়শ’ উল্লেখযোগ্য মামলার রায় বাংলায় দেন। আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রæয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট করেন আইনজীবী ড. ইউনুস আলী আকন্দ। ওই রিটে একই বছরের ১৭ ফেব্রæয়ারি রুল জারি করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। কিন্তু এখনো ওই রুলের চ‚ড়ান্ত শুনানি না হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
উন্নত বিশ্বে বিচারপ্রার্থীদের শুনানি ও রায় বুঝতে পারার জন্য উচ্চ আদালতে দাফতরিক কাজসহ আদালতের রায় ও আদেশ চলে রাষ্ট্রের নিজস্ব ভাষায়। এর মধ্যে জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতে বিচারকাজ চলে তাদের মাতৃভাষায়।