Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Showing posts with label লেখক-লিখিকা. Show all posts
Showing posts with label লেখক-লিখিকা. Show all posts

Thursday, March 30, 2017

শারমিন উঠতি পোলাপানের সাথে বেলেল্লাপনায় জড়িয়ে পড়েছিল

মুনির আহমদ :
গতকাল দেশি-বিদেশী বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যমে একটা সংবাদ বেশ আলোচিত ছিল। সেটা ছিল, বাংলাদেশের পিরোজপুরের পনের বছর বয়সী এক কন্যা তার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজের গর্ভধারিনী মায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি থানায় গিয়ে মামলা করে নিজের মাকে জেলে পর্যন্ত নিয়েছিলেন। আর তার সেই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে সেটাকে অসীম বীরোচিত ও অনুকরণীয় সাহসিকতা আখ্যা দিয়ে সেই কন্যাকে আমেরিকায় উড়িয়ে নিয়ে পুরষ্কৃত করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ভিন্ন একটা সূত্রে শুনলাম, সেই মেয়েটি নাকি উঠতি পোলাপানের সাথে এত বেশি বেলেল্লাপনায় জড়িয়ে পড়েছিল যে, মা পারিবারিক মানসম্মান ও মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কিন্তু মায়ের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করে মাকে জেলে নেওয়ার এই ঘটনায় পরম পুলক ও গর্ব অনুভব করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন আরেক নারী লেখিকা; যিনি প্রায়ই ধর্মীয় বিষয় নিয়েও ইতিবাচক লেখা লিখে থাকেন। তার পোস্ট দেখে আমি রীতিমতো চমকে উঠেছি!!! অন্য কোন তথাকথিত প্রগতিবাশীল বা চেতনাজীবি নারী লিখলে স্বাভাবিকভাবেই নিতাম। কিন্তু তাঁর মতো ধর্মভীরু নারীও যদি এই ঘটনায় পুলক ও গর্ব অনুভব করেন, তাহলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আমাদের সামাজিক পচন কতটা গভীর পর্যন্ত বিস্তার করেছে। (নীচের স্কীন শট, সেই লেখিকার আলোচ্য পোস্ট থেকে নেওয়া)।
আমি অনেক সহনশীলতা ও ধৈর্যের সাথে তিনি যাতে হজম করতে পারেন, সেইভাবে ছেটেছুটে নীচের কমেন্টটা দিলাম তার সেই পোস্টে-
“ঘটনার পুরোটাই এক তরফা বর্ণনার...। সংশ্লিষ্ট মায়ের কোন বক্তব্য নেই। কেন তিনি অল্প বয়সী কন্যাকে বিয়ে দিতে এতটা উদগ্রীব ছিলেন, সেই কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট মায়ের বক্তব্য নেওয়ার তাগাদা অনুভব করেনি কেউ।
পশ্চিমারা বরাবরই আমাদের সুন্দর পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চায়। সে জন্যই তারা মালালা ইউসুফ ও শারমিনদেরকে বেছে নিয়ে পুরষ্কৃত করে মাঠে নামায়।
বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ বা বাধা দিতে গিয়ে সন্তান তার গর্ভধারিনী মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে মাকে জেল পর্যন্ত নেওয়া, গর্ব করা বা উল্লসিত হওয়ার মতো সংবাদ হতে পারে না।
এসব পুরষ্কারের পেছনে অবশ্যই পশ্চিমাদের আমাদের পরিবারিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে অবাধ যৌনতা ছড়িয়ে দিয়ে কর্পোরেট বাণিজ্য প্রসারের গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে; এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
মাকে জেলে নিয়ে সন্তান পুরষ্কার নিচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে গর্ভধারিণী সেই মা এবং অন্যসকল মায়েদের সুখকর অনুভূতি হওয়ার কথা নয়। পুরুষ হয়েও মায়েদের এমন অপমান আমাদেরকে আঘাত করে।
আপনি গর্বিত হতে পারেন, কিন্তু পুরো ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমার মতো আরো অনেকেই লজ্জিত,মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ।”
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম

নতুন জোটে ইসলামী দলগুলোর হাওয়া বদল

সাইয়েদ শামসুল হুদা:
দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। আবারও আসছে সেই ৫জানুয়ারী। তবে নতুন রূপে। ঐ সময় গেইমে একটু ভুল হয়ে গেছিল। তাই সেই ভুল আর নয়। এবার নির্বাচন হবে উৎসব মুখর। মোটামুটি সবগুলো ইসলামী দল হাতের মুটোয়। । ইসলামী দলগুলোর নেতৃত্বের প্রতি আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের মূল্যায়ন হলো আস্থাহীনতা তৈরী হয়েছে। মেধা, দূরদর্শিতা, সিদ্ধান্তগ্রহনে সক্ষমতা, স্বকীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে দৃঢ়তার যথেষ্ট অভাব আছে। ব্যতিক্রম সবসময় ছিল, এখনও আছে। কেউ মাশা আল্লাহ, অনেক যোগ্য, অনেক মেধাবী। কিন্তু সামগ্রীকভাবে যাদের হাতে দলগুলোর মূল নেতৃত্ব, যারা কোনদিকে ঝুঁকে পড়লে এরশাদের মতো পুরোটাই ঝুকে পড়ে, তাদের ব্যাপারেই আমার অনাস্থা।
তাই ইসলামী দলগুলো সুন্দর একটি নিরাপদ পথ বের করেছে। জনাব এরশাদ সাহেবের কতটুকু ক্ষমতা, তা সবারই জানা আছে। তারপরও জনাব এরশাদ সাহেবের সাথে জোট বেধে বর্তমান সরকার থেকে কয়েকটি এমপি পদ এবং মন্ত্রীত্ব নিশ্চিত করেই এগিয়ে যাচ্ছে আগামী দিনের নির্বাচনী প্লান। এরশাদ সাহেব পুরুষ মানুষ। একটি দেশের বিশেষ অনুগত মানুষ। আশির্বাদ পুষ্ট মানুষ। ৫জানুয়ারী নির্বাচনে তিনি অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে থেকে যে সুন্দর নাটকীয় সহযোগিতা করেছিলেন, প্রভুদের নির্দেশ পালন করেছিলেন সেটা পরীক্ষিত। তাই এরশাদের সামিয়ানায় যোগ দিয়ে প্রকারান্তরে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতাও করা হলো। আর দূরত্বও বজায় রাখা হলো।
এগুলো রাজনৈতিক গেম। যুগে যুগেই এগুলো হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার ইস্যুতে আজকের আওয়ামীলীগ সরকারকে শক্তিশালী করেছে। আজ নিজেরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এক সময় খেলাফত মজলিস যে কোন ভাবেই হোক আওয়ামীলীগের সাথে ৫দফার লিখিত চুক্তিভিত্তিক সহযোগিতার রাজনীতি করেছিল। পরবর্তীতে স্বভাবজাত বিষয় হিসেবে প্রয়োজন মনে না করে তা ছুঁড়ে মারা হয়। একই পদ্ধতিতে, বিকল্পরূপে ইসলামী দলগুলো বর্তমান সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা সরাসরি না গিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জনাব এরশাদ সাহেবের সাথে একটি জোট গড়ে তোলার মতো অবস্থায় রয়েছে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট প্রায়।
আমার বিশ্বাস, যদি ইসলামী দলগুলো বিভিন্ন হয়রানী থেকে বাঁচার লক্ষ্যেই এ কাজ করে থাকে, তাহলে কোন দলকেই সহযোগিতা না করে নিরব থাকাটাই হতো শ্রেয়। সুযোগ ও পরিবেশ আসলে, নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতেন তাহলে ভালো হতো। আজকে এরশাদের সাথে তথাকথিত জোট করে নির্বাচনে গিয়ে পুর্বনির্ধারিত কৌশল মোতাবেক কয়েকটি পদ-পদবী থেকে যে বিতর্কের জন্ম দিবেন, যে কৌশলগত পরাজয় স্বেচ্ছায় বরণ করে নিবেন, এর দ্বারা সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘকালীন ক্ষতির সম্ভাবনা।
ইসলামী দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে সেটা শুরুতেই বলেছি। এ কাজটি করলে তারা আরো ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। জনগণ এটা বিশ্বাস করবে যে, আপনারা এরশাদের জোটে যাবেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নয়। কিছু পাওয়ার জন্য। নির্বাচন করে কেউ পাশ করতে পারবেন না এটা নিশ্চিত। কিন্তু মাননীয় প্র্রধানমন্ত্রীর ভাষায়- একটু ট্রিকস করে নির্বাচন করলে তখন আসন নিশ্চিত। দীর্ঘমেয়াদী ফল লাভের জন্য সাময়িক ক্ষতিটুকু মেনে নিলে, নিদেনপক্ষে চুপ থাকলেও ভাল করবেন। গৃহপালিত কোন দলেরই শেষ পরিণাম সুন্দর হয়নি।
এটা আমি বিশ্বাস করি যে, জনজোয়ার এখনও বিএনপি জামাত জোটের সাথেই আছে। পরিবেশ পেলে সেটা প্রকাশের অপেক্ষায়। কিন্তু পরিবেশ না হলে ৫জানুয়ারী মার্কা নির্বাচন হলেতো কোন কথাই নেই। ইসলামী দলগুলো আশাকরি ভেবে চিন্তে আগাবেন। মানুষের হাসির খোরাক না হলে ভালো করবেন। মাননীয় এরশাদ সাহেবকে নিয়ে দেশের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা পর্যন্ত যেভাবে মূল্যায়ন করে সেটা একজন সফল মানুষের জন্য শোভনীয় নয়। আপনারা ভেবেচিন্তে পা ফেলুন। আপনাদের অনেকের প্রতি আমাদের আস্থা কমে গেলেও দেশের মানুষ আমাদেরকে আপনাদের দলেরই মনে করে। এটা বলে- হুজুররা সবই এক।

ফেইসবুকে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখুন: মুনির আহমদ




ফেসবুকে যারা নিজেদের স্বকীয়তা, বৃদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা,, ইতিবাচক আচরণ, মেধা, দায়িত্বশীলতা বা ব্যক্তিত্ববোধের প্রকাশ ঘটাতে পারেন না, অথবা যারা অরুচিকর আচরণ, দায়িত্বহীনতা, অনৈতিকতা বা ব্যক্তিত্বহীনতার প্রকাশ ঘটাতে থাকে হরহামেশা, ইতিবাচক যে কোন পোস্ট বা লেখায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারলে যারা তৃপ্তিবোধ করেন, “দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল” এই নীতি প্রয়োগ করে এমন জঞ্জাল থেকে ফ্রেন্ড লিস্ট পরিষ্কার রাখা উচিত সকলের।
উল্লেখ, প্রোফাইল নাম আসল কিনা এবং প্রোফাইল ছবি নকল কিনা, এসব নিয়ে আমি টেনশন নেই না। যেহেতু ফেসবুকে আমরা নিজের বা সন্তানদের জন্য পাত্রপাত্রি নির্বাচন করছি না, অথবা সংসার পাতছি না বা কারো সাথে বাস্তবিক বসবাস বা আড্ডা দিচ্ছি না, সুতরাং নাম ও ছবিকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকারই বা কি? আচরণটাই তো মুখ্য হওয়া উচিত।।
কাউকে কাউকে দেখা যায়, ফ্রেন্ড লিস্ট ছোট করার ঘোষণা দিয়ে, বা যারা লাইক কমেন্ট করেন না, তাদেরকে ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে রিমোভ করার হুমকি দিয়ে পোস্ট দিতে। আমি মনে করি, এটাও একদম অনুচিত। এতে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করার প্রাণান্তর চেষ্টা প্রকাশ পায়, যেটা ব্যক্তিত্ববোধের জন্য ক্ষতিকর।
ফ্রেন্ড লিস্ট ছোট করতে চাইলে অথবা অচল বা অপ্রয়োজনীয়দেরকে ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে রিমোভ করতে চাইলে চুপচাপ করে ফেলুন। প্রয়োজনে এমন একটা পোস্ট দিতে পারেন, “ফ্রেন্ড লিস্ট সম্পাদনা করতে হয়েছে। অসতর্কতায় কেউ রিমোভ হয়ে থাকলে অনুগ্রহহ করে ইনবক্সে নক করুন, রিকোয়েস্ট আমিই পাঠাব”।
কারণ, ঢালাওভাবে ফ্রেন্ড লিস্ট ছোট করার হুমকি দিলে, সেটা গড়ে কম-বেশ সব ফ্রেন্ডকেই হেয় করে, বা সম্মানহানি ঘটায়।।
লেখক,নির্বাহী সম্পাদক মাসিক মুঈনুল ইসলাম।

Wednesday, March 29, 2017

খুকি ও কাঠবেড়ালি কবিতাটি পাঠ্যবই থেকে উধাও

মেহেদী হাসান:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ কবিতাটি নেই পাঠ্যবইয়ে। কবিতাটি এক সময় পাঠ্য ছিল এবং শিশুদের কাছে তো বটেই ছেলেবুড়ো সবার কাছেই ছিল অত্যন্ত প্রিয়। স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশুরা হরমামেশা আবৃত্তি করত এ কবিতা। পাঠ্যবইয়ে কবিতাটি না থাকায় আক্ষেপ করছেন অনেক শিক্ষক অভিভাবক। তারা আক্ষেপ করছেন হৃদয়গ্রাহী, সুন্দর অর্থবোধক, ছন্দময় অনেক ছড়া কবিতার জন্য যা দীর্ঘকাল ধরে পাঠ্য ছিল কিন্তু এখন নেই। রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’, শেখ সাদীর ‘উত্তম ও অধম’, কালীপ্রসন্ন ঘোষের ‘পারিব না’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আত্মশক্তি’, বায়েজিদ বোস্তামীকে নিয়ে কালীদাস রায়ের ‘মাতৃভক্তি’, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘বাংলাদেশ’সহ অনেক কবিতার কথা এখনো ভুলতে পারছেন না অনেকে। এক সময় কবি গোলাম মোস্তফার একাধিক শিশুতোষ কবিতা পাঠ্য ছিল বিভিন্ন শ্রেণীতে। বর্তমানে শুধু নবম-দশম শ্রেণীতে গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ নামে একটি কবিতা পাঠ্য রয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের অনেক নামকরা কবির ছড়া, কবিতা পাঠ্যবই থেকে ক্রমে উধাও হয়ে গেছে যা অনেকে আজো ভুলতে পারছেন না।
অথচ বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণীতে বেশ কিছু এমন ছড়া কবিতা পাঠ্য করা হয়েছে যার কোনো অর্থ নেই, ছন্দ নেই। ফলে শিশুদের জন্য এতে যেমন নেই শিক্ষণীয় কিছু তেমনি এসব ছড়া-কবিতা মনে রাখাও কষ্টকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। পাঠ্যবইয়ের এই অবস্থা অতীতে কখনো ছিল না। এক সময় পাঠ্যবইয়ে এমনসব অর্থবহ, ছন্দময়, হৃদয়গ্রাহী ছড়া কবিতা ছিল যে, বর্তমানে ৬০-৭০ বছর বয়সী অনেক লোক ৪০-৫০ বছর আগে পড়া অনেক ছড়া কবিতা অনর্গল বলতে পারেন। কিন্তু ২৫-৩০ বছর বয়সী অনেক যুবকও সেভাবে বলতে পারে না তাদের স্কুল জীবনে পড়া ছড়া কবিতা।
পাঠ্যবই নিয়ে আলাপচারিতায় ৬০-৭০ বছর বয়সী অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক টানা আবৃত্তি করেছেন তাদের স্কুল জীবনের প্রিয় অনেক ছড়া কবিতা। খ্যাতিমান কবি আবুল হাশিমের ‘তারেকের স্বপ্ন’ আজো আন্দোলিত করে অনেককে। ৪০-৫০ বছর আগে পাঠ করা ‘পূজারী’, ‘আত্মশক্তি’, ‘মাতৃভক্তি’ এবং ষড়ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন ছড়া কবিতা আজো স্থান করে আছে অনেকের হৃদয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, সুন্দর অর্থ আর ছন্দের কারণে এখনো এসব ছড়া কবিতা তাদের মনে গেঁথে রয়েছে। এসব ছড়া কবিতা আজো তাদের আবেগ আপ্লুত করে অনুপ্রাণিত সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতার প্রতি। অনুপ্রাণিত করে অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। তিনি বলেন, এসব ছড়া কবিতা পড়ে যেমন পাওয়া যেত সাহিত্যের স্বাদ তেমনি ছিল তাতে মনুষ্যত্ব বিকাশের শিক্ষা।
বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। লাইন দু’টি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার। কবিতাটি দীর্ঘ দিন ধরে পাঠ্য ছিল। এভাবে অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি/বিচার দিনের স্বামী, বৃষ্টি এল কাশবনে, জাগল সাড়া ঘাসবনে। বকের সারি কোথায়রে লুকিয়ে গেল বাঁশবনে, সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, হে খোদা দয়াময় রহমান রহিম, হে বিরাট হে মহান হে অনন্ত অসীম প্রভৃতি পঙ্ক্তি শুনিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে এসব কবিতা আবার পাঠ্য করার অনুরোধ জানিয়েছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ছড়া
বর্তমানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর ছড়া কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা সর্বকালের জন্য উপযুক্ত এবং শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক। মাঝখানে কিছু বিরতি ছাড়া দীর্ঘ কাল ধরে এসব ছড়া কবিতা পাঠ্য ছিল। আবেদনময়ী এসব ছড়া কবিতা পাঠ্য হিসেবে বহাল রাখায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক। অন্যান্য শ্রেণীতেও এর প্রতিফলন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।
দ্বিতীয় শ্রেণীতে ‘আমাদের দেশ’, ‘আমি হব’, ‘আমাদের ছোট নদী’, ‘ট্রেন’, ‘প্রার্থনা’, ‘কাজের আনন্দ’ তৃতীয় শ্রেণীতে ‘তালগাছ’, ‘আমার পণ’, ‘আমাদের গ্রাম’, ‘আদর্শ ছেলে’ ও ‘ঘুড়ি’ প্রতিটি ছড়া শিশুদের জন্য মনকাড়া। প্রথম শ্রেণীতেও শিশুদের মনকাড়া তিনটি ছড়া রয়েছে যেমন ‘মামার বাড়ি’, ‘ভোর হলো’ ও ‘ছুটি’।
অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক জানিয়েছেন বইয়ের ছবির ছাপার মান খুব একটা আকর্ষণীয় না হলেও ছবিগুলো দেখে শিশুরা আনন্দ পাচ্ছে। ছাপার মান উন্নত হলে ছবিগুলো আরো জীবন্ত এবং আকর্ষণীয় হতো শিশুদের কাছে। বইয়ের মানও আরো বাড়ত।

ওয়াসিফুল ইসলামের সহযোগী কাকরাইলের শুরা ইউনুস শিকদার সাহেবের বিতর্কিত বয়ান


গত ১৭ই মার্চ ২০১৭ তারিখে (শুক্রবার) টঙ্গী ময়দানের টিনশেড মসজিদে ত্রৈমাসিক মশোয়ারা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১.০০ ঘটিকায় ওয়াসিফুল ইসলামের সহযোগী কাকরাইলের শুরা প্রফেসর ইউনুস শিকদার সাহেব প্রকাশ্য মজমায় বয়ানের মাধ্যমে কিছু আপত্তিকর ও বিতর্কিত কথা বলেন।
তার বয়ানের কিছু আপত্তিকর দিক শিরোনাম আকারে উল্লেখ করা হল-
(১) ‘ইলম ও জিকির’ কোন বুনিয়াদ নয় এ কাজের জন্য, এ কাজে টিকে থাকার জন্য।
(২) কুরআনে আমীর হওয়ার দলীল পাওয়া যায়; শুরা হওয়ার দলীল পাওয়া যায় না। তাই কেউ আমীর বাদ দিয়ে শুরার ওপর জোর দিলে সে কুরআনকে অসম্মান করলো। পরোক্ষভাবে কুরআনকে মানলো না।
(৩) মাওলানা সা’দ সাহেবকে টঙ্গী ইজতেমায় আনতে যারা বাধা দিয়েছেন, তাঁদের তওবা করা উচিৎ। মানে আল্লামা আহমেদ শফী সাহেব থেকে শুরু করে দেশের সমস্ত উলামা হযরতগণের তওবা করা উচিত। সা’দ সাহেবকে আসতে বাধা দেওয়া আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় হয়েছে!
(৪) উলামা হযরতগণ নিজেরা চিল্লা বা সময় লাগায় না, কিন্তু বাহির থেকে ভুল ধরে। বাহিরের লোকমা গ্রহণ করা যাবে না। (এক্ষেত্রে নামাজের উদাহরণ দিয়েছেন)
বয়ানের আপত্তিকর অংশগুলো নিচে পুরোপুরিভাবে তুলে ধরা হল-
(20:43 মিনিট পর)
তিনি বলেনঃ বাদশা আকবর যে ছিলেন বাদশা আকবর? শুনেছেন না তার নাম? মোগল বাদশাহ। দীনে ইলাহী নামে আরেকটি ধর্ম চালু করেছেন। দীনে ইলাহী। তাকে যারা গোমরাহ করেছে তারা কারা? তাকে কারা গোমরাহ করেছে? এমন একজন আলেম তাকে গোমরাহ করেছে যিনি এরকম কোরআনের তাফসীর লিখেছেন যার মধ্যে নোকতা নাই। এরকম শব্দ একেকটা শব্দ যেমন, গাইনের উপর, নূনের উপর, তায়ের উপর নোকতা আছে, জীমে নোকতা আছে। নোকতা ছাড়া হরফের শব্দ দিয়ে কোরআনের তাফসীর করেছেন। তাহলে তিনি কত বড় আলেম? কত বড় আলেম চিন্তা করেছেন? এই ব্যক্তি এই বাদশা আকবরকে গোমরাহ করেছেন। এই দিয়ে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ রহ. বুঝিয়েছেন; এই কাজের কবুলিয়াতের জন্য বড় আলেম হওয়া যোগ্যতা শর্ত নয়। অথবা এই সব দিক দিয়ে ফিট এটা বলা যাবে না।
এত বড় একজন ব্যক্তি যিনি আকবর বাদশাকে গোমরাহ করেছে। আপনারা আপনজন বলে বললাম কথাটা। এটা বড় হুশিয়ারীর বিষয়। আবার হযরত আলী রাযি. (তিন বার) তিনি হচ্ছেন ইলমের সাগর। হুজুর স. এর জামাই। যিনি বড় কাফেরদেরকে হত্যা করেছেন। এমন একজন ব্যক্তিকে কে হত্যা করেছে? আলী রাযি. এর হত্যাকারী কে? এমন একজন ব্যক্তি আলী রাযি. কে হত্যা করেছে যিনি এত বড় জাকের যে, যখন সে ধরা পড়ে গেল, হত্যাকারী যখন ধরা পড়ে গেল তখন তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এভাবে যে, তার হাত-পা কাটা হচ্ছে। জিহ্বা কাটার পরিকল্পনা চলছে। তখন সে বলতেছে যে, ভাই তোমরা আমার সব অঙ্গ কাট, জিহ্বা কাটিওনা। কারন আমি সব সময় আল্লাহর জিকিরে লিপ্ত আছি। আমার এই জিহ্বাটা তোমরা কাটিও না। কত বড় জাকের চিন্তা করেন । আমার এই জিহ্বাটা জিকিরে লিপ্ত থাকে। কত বড় জাকের।
তাহলে আমাদের তিন নম্বরে যে ‘ইলম ও জিকির’ সে ইলমের সবচেয়ে উপরে যারা-যিনি এত বড় আলেম, যিনি নোকতা ছাড়া কোরআনের তাফসীর লিখেছেন, এত বড় আলেম আর এত বড় জাকের যিনি আলী রাযি.এর কাতিল। বরং সবচেয়ে খারাপ ব্যক্তি যিনি এত বড় জিকিরি করনেওয়ালা। সুতরাং আপনার আমার এ কাজের জন্য ‘ইলম ও জিকির’ কোন বুনিয়াদ নয়। এ কাজের জন্য, এ কাজে টিকে থাকার জন্য। এ ব্যক্তি মরদূদ, যে ব্যক্তি আকবর বাদশাকে গোমরাহ করেছে, আর আলী রাযি. কে হত্যা করেছে।
প্রিয় হাজেরিন, দুস্ত ও বুজুর্গ! ইলমের সাথে সাথে আপনাকে আমাকে একাজের অনেক গভীরে যেতে হবে। অনেক গভীরে গেলে এর উসূল বুঝে আসবে। উপরে উপরে একাজের উসূল বুঝে আসবে না। খুব গভীরে, এ কথাটা আল্লাহর ফজলে এ বছর হজ্জ্বের মওসূমে তিন দেশের মুরব্বীরা যে হজ্জ্বে যায় আমিও খাদেম হিসেবে ছিলাম। আমাদের সাথে মুরব্বীদের বৈঠক হয়েছে। সে হজ্জ্বে থেকে শুরু করে বহুত মজলিস হয়েছে। বা টঙ্গীর ইজতেমায় আমাদের বহুত মজলিস হয়েছে। আমাদের কাছে তো আল্লাহর ফজলে এক এক মজলিসে কিন্তু এক এক বৈঠকে আমাদের কাছে সাফ হয়েছে, অনেক পরিস্কার হয়ে গেছে।
একটু শুনে কথা বলি, আপনারা যাচাই করেন, সেটা হচ্ছে এই যে, সেটা হচ্ছে এই যে, কোরআন হাদীসে যা পাওয়া যায়, কোরআন হাদীসে পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে যে আমীর পাওয়া যায়। আমীর পাওয়া যায়। আমীর, আমাদের কাজের জন্য আমীর লাগবে। এই যে পালাক্রমে শূরা হওয়া, পালাক্রমে ফয়সালর হওয়া, একমাস, দুই মাস, সাত দিন। আমাদের দেশেও চালু আছে। আমাদের জিলায় জিলায়ও চালু আছে। এটা কোরআন হাদীসের দলীলে পাওয়া যায় না। কোরআন হাদীসে দলীলে পাওয়া যায় আমীর। একজন আমীর। আল্লাহকে মান, রাসূলকে মান এবং জমানার আমীরকে মান;
ﺃﻃﻴﻌﻮﺍ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺃﻃﻴﻌﻮﺍ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝ ﻭﺃﻭﻟﻰ ﺍﻷﻣﺮ ﻣﻨﻜﻢ
শূরা হচ্ছে সাহায্যকারী। পরামর্শ দেওয়া। যারা কুরবানি করেছে, যাদের দিলে দুনিয়া নেই, এরকম লোক দরকার। কিন্তু আমীর, চারজনই আমীরুল মুমিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন- আবু বকর রাযি., উমর রাযি., উসমান রাযি, আলী রাযি. তাদের সাথে শূরা ছিল। পরামর্শ দাতা ছিল। কিন্তু এ রকম দলীল পাওয়া যায় না। বাকী আপনারা যাচাই করবেন। আমি তো কোন আলেম না। কিন্তু মদীনাতে ফয়সাল এক সাপ্তাহ পর এক সাপ্তাহ, এমন ছিল না। আমীর ছিল সবসময়। একথা সবাই আপনারা যাচাই করবেন। কোরআনে যখন আমীরের কথা বলা হয়েছে কোরআনে যখন শূরার কথা নাই কোরআনের যেটা সেটাকে বাদ দিয়ে কেউ যদি এটার উপর চাপ দেয়, জোড় দেয় যে শূরা হতে হবে তাহলে সে কোরআনকে অসম্মান করল, অসম্মান করল। কোরআনে যেটা বলা আছে সেটা হচ্ছে; কোরআনের হুকুম যারা আমীর মানতে রাজি আছে তাদেরকে ছোট মনে করা কোরআনকে তাওহীন করার সমান । বরং কোরআনকে না মানার সমান। আমীরের সথে শূরা থাকতে পারে এটা পরিস্কার বুঝার জিনিস।
আরেকটি বিষয় হল দোস্ত-বুজুর্গ! আমাদের পুরা বিশ্বের মানুষ দাওয়াতের কাজে লাগছে। কোন দেশ যদি আলাদা হয়ে যায়, নিযামুদ্দিন থেকে কোন দেশ যদি আলাদা হয়, বাংলাদেশ বলেন, পাকিস্তান বলেন যেই হউক, পুরা দুনিয়াকে কখনো একমত কারা যাবে না। পুরা দুনিয়া আমাদের কাছে বাংলাদেশে যে আসতেছে, পুরা দুনিয়া বাংলাদেশে আসতেছে, দুস্ত-বুজুর্গ হাজার হাজার তাবলীগী ভাইয়েরা আসতেছে এটা আপনার আমার বুনিয়াদে নয়, নিযামুদ্দিনের জামাত আসে বলে তারা আসেন। তা সেখানে যাইতে পারেন না। ভিসা সমস্যা আছে। তারা আসেন বলে এখনে আসেন। যদি একথা মনে করি যে, আমাদের বাংলাদেশ পুরা হয়ে গেছে, আমাদের মধ্যে একজন আমীর হবে, আমরা নিজেরা সব করতে পারবো। আল্লাহ পাকের যেটা মানশা সেটা হবে। পরিস্কার, আপনারা সবাই এখানে আপন মানুষ। মাও. সা’দ সাহেবকে আসতে বাধা দিয়েছে যারা তারা এ কথা ইয়াকীন হওয়া দরকার, আমাদের বাধা আল্লাহর কাছে কত অপছন্দ হয়েছে, যেহেতু আল্লাহ পাক তাকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ পাকের মর্জি এটাই। আল্লাহর মানশা ছাড়া কোন কাজ হয় না। আল্লাহর কাছে সব লেখা আছে। মাও. সা’দ সাহেব এসেছেন। আল্লাহ আনছেন। এরকম বাধার সম্মুখীন আমরা কোন দিন বাংলাদেশের শূরারা সম্মুখীন হইনি। একটা সংকটময় পরিস্থতি গিয়েছে আমাদের উপর দিয়ে যে, আমাদের বরদাশত করা সম্ভব ছিলনা। আল্লাহ করেছেন। বিশেষ ভাবে বিভিন্ন দেশের মাসাআলা থাকে, মাসআলাগুলো জিজ্ঞেস করে এইটা একমাত্র দেশ। রাইবেন্ডে এখন বিদেশী মেহমান আসা বন্ধ। কম সংখ্যক আসে। রইবেন্ডেও যাইতে পারে না। নিযামুদ্দিনেও যাইতে পারে না। সারা বছর তারা মাসআলা জমায় রাখে নিযামুদ্দিন ওয়ালারা বড় এতমিনানের সাথে জবাব দেন। ভাই আমারা টঙ্গি ইজতেমায় আসব, টঙ্গি আমাদের আপন জায়গা। এদেশের উপর থেকে শুরু করে সবাই কত হুসনে জন, কত সাহায্য করে ....
হযরত মাও. সা’দ সাহেব এসেছেন। আল্লাহ পাক আনছেন। যারা বাধা দিয়েছেন, তাঁদের তওবা করা উচিৎ। বাধা দেওয়া আল্লাহর নিকট কত অপছন্দনীয় হয়েছে!
আরো একটি কথা শুনেন। সেটা হচ্ছে দুস্ত-বুজুর্গ, মাওলানা ইলিয়াছ রহ. এর মার্কাজ মসজিদের যে দেয়াল ছিল তারা দেয়াল ভেঙ্গে দিয়েছে। তিনি বালেছেন; তারা আমার দেয়াল ভাঙ্গে নাই তারা নিযামুদ্দিনকে ভেঙ্গেছে। মাওলানা ইলিয়াছ রহ. এর কথা এটা, ‘আমার এ কাজ হচ্ছে এক শানিত তলোয়ার’। শানিত বুঝেন তো আপনারা? খুব ধার। এই শানিত তলোয়ার নিয়ে যে খেলবে সে নিজেই টুকরা টুকরা হয়ে যাবে। দু’দিকেই ধার থাকে । বাচ্চারা যে ব্লেড নিয়ে খেলে মা-বারা অস্থির হয়ে পরে। বাচ্চারা হাত কেটে ফেলে, রক্ত বের হয়। একাজ হচ্ছে শানিত তলোয়ার যে খেলবে নিজে টুকরা হয়ে যাবে। এ কাজের কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। কাম আল্লাহ পাকের কুদরতে চলতেছে। এটা পাহাড়ের মত মজবুত কাজ। এর দলীল হল, প্রত্যেক নবীর সাথে যে কওম, যে বাদশা নবীর বিরোধিতা কারেছে সে বাদশা নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা নবীর বিরোধিতা করেছে তারা ধ্বংস হয়েছে। যমানায় যমানায় একই কিচ্ছা, কোন ব্যতিক্রম পাওয়া যাবে না।
(41:27 মিনিট পর)
আমি দোস্ত আরেকটি কথা বলব, সেটা হচ্ছে এই যে, তাবলীগের কাম আমরা যেটা বুঝেছি, ছোট কাল থেকে সেটা হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় চিল্লা দেও, আল্লাহর রাস্তায় বের হও। বের হও, বের কর, নিজেও বের হও, বের করো। কি ভাই আমার কথা বুঝেছেন, না বুঝেন নাই? নিকলো-নিকালো এটা হলো তাবলীগ। নিকলো-নিকালো। যে ব্যক্তির বহু বছর যাবৎ চিল্লা কাজা, চাই আলেম হোক না কেন, বহু বছর চিল্লা দেয় না যে মনে করে তাবলীগের উপকার করার জন্য চিল্লা লাগাচ্ছি, অসম্ভব ক্ষতি গ্রস্ত সে। তাবলীগে যে সময় লাগায় না, তাবলীগে সময় লাগাবে নিজের উপকার হবে। তখন সে কিছু উপকার করবে। আর যে তাবলীগে সময় লাগায় না, মনে করে তাবলীগের উপকার করতেছি। তুমি সময় লাগাও, তোমার নিজের উপকার হউক। তাবলীগ আমাদের মুখাপেক্ষী না। তাবলীগের বাইরে থেকে যে সংশোধনের চেষ্টা করে এটা তাবলীগের মহা ক্ষতি।
ফতোয়া আমি দিতে পারব না। তবে একটা শুনা কথা বলি; যে ইমাম সাব নামাজ পড়াচ্ছেন, নামাজের এক জায়গায় সূরা পড়েছেন। যদি একজন লোক সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। সে বাইরে থেকে লোকমা দিল তাইলে আলেম-উলামারা বলেছেন, ইমামের নামাজও নষ্ট, সমস্ত মুক্তাদিদের নামাজও নষ্ট । যদিও আয়াত সহীহ হোক। তেলাওয়াত যদিও সহীহ হয়। নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি পিছনে মুক্তাদী আছে সে আলেম নয় তার সূরাটি জানা, সে যদি ধরায় দেয়, ইমাম সাহেব কবুল করে তাদের নামাজ সহীহ হবে।
এজন্য সময় লাগাইতে লাগাইতে তাবলীগের কাজে মনে হয় সময় লাগাইবে না বাইরে থেকে সংশোধন করবে, তাবলীগের কাম এতিম নয়, তাবলীগের কাম তো আল্লাহ চালাচ্ছেন। তাবলীগ তো এতিম নয় যে সময় লাগাবে না বাইরে থেকে পরামর্শ দিবে, পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এটা আল্লাহর কাম, আল্লাহর কাম, আল্লাহই করবেন। বড় গভীরে যেতে হয়, বড় গভীরে। আমাদের বহুত বৈঠক হয়েছে। হজ্জ্বের মওসূম থেকে শুরু করে বহুত বৈঠক আমাদের হয়েছে তিন দেশের- আমাদের কাম তো চিল্লা দেওয়া, তিন দিন দেওয়া, আড়াই ঘন্টার মেহনত করা। মসজিদ আবাদীর মেহনত করা। যে কাম উসূলের সাথে করা হয় নিযামুদ্দিন থেকে, কাকরাইল থেকে সে অনুসারে চলা। এজন্য ভাই মূল হচ্ছেই নিকলো; আল্লাহ কে রাস্তামে নিকলো

হক্কানী উলামাদের থেকে দূরে থাকা গোমরাহী

কুরআন সুন্নাহ ও বিজ্ঞ উলামাদের সংশ্রব থেকে গুটিয়ে থাকা হক দলকেও দ্রুত ভ্রান্ত গোমরাহ দলে পরিণত করে!

আব্দুল কাদীর জীলানী সিলসিলার বহু পীর এখন কবরপূজারী।

চিশতীয়া সিলসিলার বহু খানকা এখন শিরকের অভয়রাণ্য।

মর্দে মুজাহিদ সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদের সিলসিলার ফুলতলী জৌনপুরীরা এখন বিদআতের কর্ণদ্বার।

শিরক বিদআতের বিরুদ্ধে অতস্ত্র প্রহরী মুজাদ্দিদে আলফে সানীর অনুসারী দাবিদার বহু পীর এখন কুফর শিরকে নিমজ্জিত।
কারণ কী?

প্রধানতম কারণ মূল উৎস গ্রন্থ কুরআন সুন্নাহের তালীম রেখে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মতবাদে আবদ্ধ হয়ে পড়া।

যুগের ইলমী মার্কাযগুলোর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে নিজস্ব মতবাদের বলয়ে বন্দী থাকা।

গায়রে আলেমদের নেতৃত্ব ও পীরের আসনে আসীন হওয়া।

কূপমণ্ডুক মানসিকতায় কালের হক্কানী উলামাদের শত্রু মনে করে দূরে থাকা।
ইত্যাদিসহ আরো অনেক কারণে হক সিলসিলাও এক সময় পরিণত হয়েছে শিরক কুফর ও বিদআতের বদ্ধভূমিতে।
তাই সাবধান!
আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগতে নেই।
হক্কানী উলামাদের থেকে দূরে থাকা গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই ডেকে আনবে না।
তাই দুআ করি সর্বদাঃ
রাব্বানা লাতুজিগ কুলূবানা বা'দা ইজ হাদাইতানা, ওয়াহাবলানা মিনলা দুনকা রহমাহ! ইন্নাকা আন্তাল ওয়াহহাব।

এমনই ছিলেন আমাদের হযরত মুফতী আমিনী (রাহ্)......!!

আমার শায়েখ আমার রাহবার হযরত মুফতী আমিনী (রাহ্) একজন রাজনৈতিক নেতার আমন্ত্রণে গুশলানের একটি বাসা থেকে ফেরার পথে ছোট ছেলে আবুল হাসানাত আমিনীকে নিয়ে জুতা কেনার উদ্দেশ্যে স্থানীয় একটি মার্কেটে প্রবেশ করলেন! হুজুরের জন্যে আবুল হাসানাত খুব আগ্রহের সাথে একজোড়া কালো জুতা পছন্দ করে পাঁয়ে পড়ানোর জন্যে জোড়াজুড়ি করলে হুজুর হাসিমুখে বললেন! হাসানাত এর অন্যকোনো কালার থাকলে দেখো? কেন্ আব্বা এই জুতাজোড়া তো আপনাকে খুব সুন্দর মানাবে! নিয়ে নিন না? হুজুর আবারো বললেন অন্য কালারের আরেকজোড়া দেখো! বাবার ইচ্ছানুযায়ী হাসানাত আরেকজোড়া জুতা হুজুরের জন্যে ক্রয় করে গাড়ীতে উঠলেন!
এবার হুজুরের প্রতি ছেলের কৌতহলী প্রশ্ন, আচ্ছা আব্বু আপনি কখনোই কালো জুতা পড়তে চান না কেনো? অনেকটা অনুরুধের পর হুজুর বলতে লাগলেন! "হাসানাত" বাইতুল্লাহ শরীফের গিলাফ কালো, কোরআনমজিদের অক্ষর গুলোও কালো, আর আমি কিনা জেনেবুঝে সেই রংয়ের জুতা পাঁয়ে পরিধান করে হাটবো? সফরসংগী হাসানাত আর কোনো কথাই বাড়ালেন না! বুঝে নিলেন তিনি তো শুধু আমার আব্বাই নন? তিনিতো সময়ের আকাবির হযরতও!
আজ যখন নিজের প্রয়োজনে একজোড়া জুতা কিনতে গেলাম! আমার শায়েখের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে পছন্দ হওয়া স্বত্বেও তাঁর অনুস্বরনে খুশি মনেই অন্য কালারের আরেকজোড়া জুতা কিনলাম......!"
ফেইসবুক লিংক-
আরো পড়ুন এখানে
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1237798629669605&id=100003184389585

কুটুম

কুটুম

 কবি মূসা আল হাফিজ:

ইষ্টিকুটুম মিষ্টি কুটুম
গাছের কুটুম ঘাস
ফুলের কুটুম প্রজাপতি
বনের কুটুম বাঁশ!

নদীর কুটুম নায়ের মাঝি
হাওয়ার কুটুম ঘ্রাণ
আমার কুটুম সকল মানুষ
সকল মহৎ প্রাণ

Tuesday, March 28, 2017

কওমি মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)


আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরীঃ
[বিগত ২০১৬ইং সনের ২৯ জানুয়ারী জুমাবার
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইসলামী
শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম
হাটহাজারী মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিল ও
দস্তারবন্দী ইসলামী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত সম্মেলনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন
মুফাসসীরে কুরআন আল্লামা নূরুল ইসলাম
ওলীপুরী (দা.বা.) কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার
প্রেক্ষাপট, ইতিহাস ও গুরুত্বের উপর মূল্যবান
বয়ান পেশ করেন। একই বয়ানে তিনি কথিত
জশনে জুলুস ও মীলাদ অনুষ্ঠানে রাসূল (সা.)কে
হাযির–নাযির বলে যারা দাবী করেন, তাদের
বিভ্রান্তিকর দাবীর বিপক্ষেও জোরালো
যুক্তি–প্রমাণ দিয়ে বক্তব্য রাখেন। সময়ের
চাহিদা ও বিষয়বস্তুর গুরুত্ব উপলব্ধি করে
আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী (দা.বা.)এর
উক্ত বয়ানটি নিম্নে হুবহু পত্রস্থ করা হল। –
নির্বাহী সম্পাদক]
ﺑِﺴْﻢِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤٰﻦِ ﺍﻟﺮَّﺣِﯿْﻢِ۔ ﺍَﻟﺮَّﺣْﻤٰﻦُ ﴿ۙ۱﴾ ﻋَﻠَّﻢَ ﺍﻟْﻘُﺮْﺍٰﻥَ ﴿ؕ۲﴾ ﺧَﻠَﻖَ ﺍﻟْﺎِﻧْﺴَﺎﻥَ ﴿ۙ۳ ﴾
ﻭﻋﻦ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﻌﺬﺭﻱ ﻗﺎﻝ : ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ﻳﺤﻤﻞ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﻣﻦ ﻛﻞ ﺧﻠﻒ ﻋﺪﻭﻟﻪ ﻳﻨﻔﻮﻥ ﻋﻨﻪ ﺗﺤﺮﻳﻒ ﺍﻟﻐﺎﻟﻴﻦ ﻭﺍﻧﺘﺤﺎﻝ ﺍﻟﻤﺒﻄﻠﻴﻦ ﻭﺗﺄﻭﻳﻞ ﺍﻟﺠﺎﻫﻠﻴﻦ .
হামদ ও সালাতের পর- বাংলাদেশের প্রাচীনতম, বিশুদ্ধতম এবং বৃহত্তম মাদ্রাসা দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। এই মাদ্রাসার বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে আজকের এই মোবারক মহাসমাবেশে আমরা সমবেত হয়েছি। তাই মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের খেদমতে আরয করতে চাই। যেহেতু, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বহুমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার, মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে বহুমুখী অপবাদ রটানো হচ্ছে। তাই যে সমস্ত সরল মুসলমান অপবাদ রটনাকারীদের মিথ্যাচারে সন্দিহান হয়ে পড়েন, তারা যেন এই অপবাদ রটানাকারীদের চক্রান্ত থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যে আমি মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে কয়েকটি কথা আপনাদের খেদমতে আরজ করতে চাই।
উপমহাদেশের ইতিহাসে তিন প্রকার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া যায়। এক প্রকার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় প্রকার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ১৭৮১ খ্রিঃ থেকে চালু হয়েছিল। তৃতীয় প্রকার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ১৮৬৬ খ্রিঃ থেকে চালু হয়েছে।
বিলুপ্ত হওয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা ছিল, ঐ সময়ে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের আগে মোগল শাসকদের আমলে ভারত উপমহাদেশে প্রায় ১২ লক্ষ মাদ্রাসা ছিল। সবগুলো মাদ্রাসার ব্যয়ভার বহন করার জন্য উপযোগী মাদ্রাসার নামে ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল। মাদ্রাসার নিজস্ব ওয়াকফ সম্পত্তির আয়ের দ্বারা মাদ্রাসার বছর ব্যাপী ব্যয়ভার বহন করা হতো। ইংরেজরা বাণিজ্যের বাহানায় আমাদের উপমহাদেশে প্রবেশ করতঃ দেশের শাসন ক্ষমতা জবর দখল করে নেওয়ার পর মাদ্রাসার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। যার ফলে ইংরেজ শাসন আমলে উপমহাদেশের ১২ লক্ষ মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়।
তারপর, উপমহাদেশে যখন ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ভারতের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন শাহ্ ওলী উল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ.)। তার সুযোগ্য বড় ছেলে ছিলেন শাহ্ আবদুল আজিজ (রাহ.)। শাহ্ আবদুল আজিজ (রাহ.)এর একজন কৃতি ছাত্র ছিলেন মোল্লা মাজেদুদ্দীন (রাহ.)। তিনি কলিকাতার বাসিন্দা ছিলেন। কলিকাতা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ছিল। কলিকাতার মুসলমানদের অনুরোধে মোল্লা মাজেদুদ্দীন (রাহ.) ইংরেজ সরকারের কাছে সরকারি খরচে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। সে আবেদন মঞ্জুর করে তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্ণর লর্ড ওয়্যারেন হেস্টিংস ১৭৮১ খ্রীস্টাব্দে কলিকাতায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দেন। সেই মাদ্রাসাকে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা নামে নামকরণ করা হয়। আর এটাই আমাদের উপ মহাদেশের সর্বপ্রথম আলীয়া মাদ্রাসা।
মোল্লা মাজেদুদ্দীনের মতো বুযূর্গ লোক কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার সাথে জড়িত থাকার ফলে একসময়ে শাহ্ আবদুল আজিজ (রাহ.) যখন ইংরেজ সরকারের কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করা ফরয ঘোষণা দিলেন, তখন সেই স্বাধীনতা যুদ্ধে উপমহাদেশের সমস্ত আলেম-ওলামা এবং সর্বস্তরের জনসাধারণ অংশ গ্রহণ করেন। সেই সূত্রে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা পড়–য়ারাও ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেজ সরকার আলিয়া মাদ্রাসাকে শায়েস্তা করার জন্য কয়েকটা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রথম ব্যবস্থা হিসেবে কলিকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে একাধারে ২৬ জন প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করা হয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে। উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে যত আলিয়া মাদ্রাসা আছে, তার উৎপত্তি কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকেই।
আচ্ছা বলুন তো, কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা খ্রিস্টানদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলে দেখুন- প্রথম নম্বর প্রিন্সিপাল খ্রিস্টান, দ্বিতীয় নম্বর প্রিন্সিপাল খ্রিস্টান, তৃতীয় নম্বর প্রিন্সিপাল খ্রিস্টান; এভাবে একাধারে ২৬ জন প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করা হয় খ্রিস্টান। এবার ভাবুন তো, মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল যদি খ্রিস্টান হয়, সেই মাদ্রাসার লেখা-পড়ার দশা কী হতে পারে?
এরপর দ্বিতীয় ব্যবস্থা হিসেবে ইংরেজ সরকার কলিকতা আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকায় আঘাত হানে। যেমন প্রতিষ্ঠার পর এখানে হাদীসের মিশকাত শরীফ, তাফসীরে বায়যাবী শরীফ পাঠ্য তালিাকায় অর্ন্তভুক্ত ছিল। কিন্তু কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্ররা সরকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার কারণে তখন ইংরেজ সরকার কলিকতা আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে মিশকাত শরীফ এবং তাফসীরে বায়যাবী শরীফ বাতিল করে দেয়। মুসলমানদের ছেলে-মেয়েরা ইসলামের যাই কিছু শিখুক অন্তত আল্লাহর কুরআনের তাফসীর, নবীর হাদীস শেখার সুযোগ যেন না পায়, তার ব্যবস্থা কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজ সরকার করে দিল।
তিন নম্বর ব্যবস্থা- এক পর্যায়ে ইংরেজ সরকার আইন পাস করে, যেসব ছাত্র আরবী বা ফার্সী ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করবে, এরা সরকারীভাবে মূর্খ বলেই গন্য হবে। এই আইন পাশ করে নেওয়ার মাধ্যমে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা পড়ুয়াদেরকে অশিক্ষিত, মূর্খ সাব্যস্ত করে।
এদিকে ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ দিনকে দিন তীব্র হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার আরো কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো- (১) মুসলমানরা কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করে আলেম হয়। কাজেই মুসলিম সন্তানরা যাতে আলেম হতে না পারে, সে জন্য মূদ্রিত সমূদয় কুরআন শরীফ ধ্বংস করে দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইংরেজ সরকার ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছরে লক্ষ লক্ষ কুরআন শরীফের মূদ্রিত কপি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। (নাঊযুবিল্লাহ)। আর পবিত্র কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে যারা আলেম হয়ে গিয়েছিলেন, এ রকম ১৪ হাজার আলেমকে পর্যায়ক্রমে ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই তিন বছরে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবেই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা যুদ্ধকে বানচাল করে দেওয়ার জন্য ইংরেজ সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
ইতিহাসের এই অংশটুকু বুঝে থাকলে এবার আপনারা একটু দয়া করে বলুন, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার মূলে আবেদনকারী মোল্লা মাযেদুদ্দীনের মতো বুযুর্গ থাকলেও, মোল্লা মাযেদুদ্দীনের প্রিন্সিপালের দায়িত্বে পরিচালিত হতো আলিয়া মাদ্রাসা, নাকি ইংরেজ কর্তৃক নিয়োগকৃত খ্রিস্টান প্রিন্সিপালের দায়িত্বে পরিচালিত হতো? এভাবে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক আলী মাদ্রাসাসমূহ থেকে ইংরেজ সরকার মৌলিক ইসলামী শিক্ষাকে উচ্ছেদ করে দেয়।
এ পর্যায়ে ইতিহাসের বাস্তবতা আপনারা অনুধাবন করতে পারলে বলুন, ঠিক এই মুহূর্তে মাদ্রাসার নতুন কোনো সংস্কারের অপরিহার্যতা দেখা দিল কি-না? কারণ, এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয় বুঝেছেন যে, তখন কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা কেবল সাইনবোর্ডেই মাদ্রাসা নামে অবশিষ্ট ছিল, দ্বীনি শিক্ষার কিছুই তখন আর সেখানে ছিল না। এমন প্রেক্ষাপটে সেই সংস্কারের কাজে এগিয়ে আসলেন উপমহাদেশের আরেকজন কৃতি সন্তান আল্লামা কাসেম নানুতুভী (রাহ.)।
সর্বপ্রথম কাসেম নানুতুভী (রাহ.)এর কিছু পরিচয় আমাদের জেনে নেয়া দরকার। তাঁর শিক্ষাগত পরিচয়, বংশগত পরিচয় এবং রাজনৈতিক পরিচয়।
কাসেম নানুতুভী (রাহ.)এর শিক্ষাগত পরিচয় হল- তিনি ছিলেন দিল্লীর সুপ্রসিদ্ধ আলেম হযরত মাওলানা মামলুক আলী (রাহ.)এর ছাত্র। মাওলানা মমলুক আলী (রাহ.) ছিলেন শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ.)এর ছাত্র। শাহ্ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ.) ছিলেন শাহ্ ওলী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ.)এর প্রথম ছেলে। শাহ্ ওলী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহ.) ছিলেন হযরত উমর ফারুক (রাযি.)এর বংশধর।
কাসেম নানুতুভীর বংশগত পরিচয় হলো- তিনি নিজে ছিলেন সরাসরি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.)এর বংশের। কাসেম নানুতুভীর রাজনৈতিক পরিচয় হলো ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের যত জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ হয়, এর মধ্যে ১৮৫৭ সালে শামেলির প্রান্তরে ইংরেজ বিরোধী যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন কাসেম নানুতুভী (রাহ.)। এসব ইতিহাস জানা থাকলে এটা সহজেই বুঝতে পারবেন যে, এই কাসেম নানুতুভী (রাহ.) উপমহাদেশের সর্বপ্রথম কওমী মাদ্রাসার ফাউন্ডার তথা ভিত্তি স্থাপনকারী ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়টা আমাদের বর্তমান সমাজের কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের জানা থাকলে তাদের মানসিক সংকীর্ণতা আর থাকবে না, তাদের মন হবে বিশাল প্রশস্ত।
এর মধ্যে হযরত কাসেম নানুতুভী (রাহ.) কয়েকজন অনুসঙ্গি নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন। ইতিহাসের এই অংশটা বুঝে থাকলে বলুন, তখনকার পরিস্থিতির বাস্তবতায় মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের অপরিহার্যতা ছিল কিনা? তার জ্বলন্ত প্রমাণ কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার দুর্দশা। আলীয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজ সরকারের হস্তক্ষেপে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ায় প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা বলে তখন আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। যে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের অপরিহার্যতা ছিল তখনকার সময়ের জোর দাবী। ইসলামী শিক্ষার দুর্দিনে সেই সংকটময় মহূর্তে জাতির সামনে এগিয়ে আসলেন জাতির মহাপুরুষ হযরত আবু বকর (রাযি.)এর বংশধর আল্লামা কাসেম নানুতুভী (রাহ.)। তিনি যে সমস্ত অনুসঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসলেন এ মহান কাজে, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন মাওলানা রফিউদ্দীন (রাহ.)।
মাওলানা রফিউদ্দীন একদিন স্বপ্নে দেখেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর হাতের লাঠি মোবারক দ্বারা ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ নামক জনপদের এক জায়গায় রেখা অংকন করে দিলেন এবং বলে দিলেন, তোমাদের পরিকল্পিত মাদ্রাসার ঘর আমার অংকিত রেখায় রেখায় নির্মাণ করবে। ঘুম ভাঙার পরে সরেজমিনেও স্বপ্নে দেখা রাসূলের লাঠি মোবারকের দেওয়া দাগ পাওয়া গেলো। সেই দাগে দাগে উপমহাদেশে সর্বপ্রথম কওমী মাদ্রাসা দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসা ১৮৬৬ খ্রীস্টাব্দে আল্লামা কাসেম নানুতুভী (রাহ.)এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পর্যায়ে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে, উপমহাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলির প্রথম বাহ্যিক প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যদিও আমরা হযরত কাসেম নানুতুভী (রাহ.)কে দেখতে পাই, কিন্তু উপমহাদেশের কওমি মাদ্রাসাসমূহের আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং। এই পয়েন্টটা স্মরণে রাখলে সামনের কথাগুলো বুঝতে সহজ হবে। উপমহাদেশের সর্বপ্রথম কওমি মাদ্রাসা ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ নামক বস্তিতে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং এই উপমহাদেশের কওমী মাদ্রাসা গুলোকে নানা রকম মিথ্যা অপবাদ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এগুলো কোনো জড়বাদি মানুষের প্রতিষ্ঠিত নয়। এগুলো স্বয়ং আল্লাহর নবী রাসূলুল্লাহ (সা.)এর আধ্যাত্মিক তাওয়াজ্জুহের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর রাসূলের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যদি কেউ ফুঁ মারে, তার মুখ পুড়ে যায়; যার ঐতিহাসিক বহু প্রমাণ আছে।
এখানে এসে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নযোগে রেখা টেনে দিলেন। সে রেখা বরাবর সর্বপ্রথম উপমহাদেশের কওমী মাদ্রাসার ঘর বানানো হয়, কথাটা কোনো মনগড়া বানানো কথা, না ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে?
এর জবাবে বলতে চাই, এটি কারো মনগড়া বানানো কথা নয়। আল্লামা সৈয়দ মাহবুব রেজভী (রাহ.)এর কয়েক হাজার পৃষ্ঠা বিশিষ্ট্য উর্দূ ভাষায় লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ’। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক এর বাংলা সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। সে বাংলা সংস্করণের ভূমিকাতেও স্বপ্নযোগে রাসূল (সা.)এর লাঠি মোবারক দ্বারা যে রেখা টেনে দিয়েছিলেন, সেই দাগ টানা রেখায় রেখায় সর্বপ্রথম কওমী মাদ্রাসার ঘর নির্মাণের কথা পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ আছে। সুতরাং তথ্যটা মনগড়া উদ্ভাবিত, নাকি ঐতিহাসিক তথ্য।
এ পর্যায়ে আবার প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মুহাম্মদ (সা.) দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসার ভিত্তিস্থলের স্থান নির্ধারনি রেখা টেনে দেওয়ার জন্য যদি দেওবন্দ আসতে পারেন, তাহলে আমাদের মীলাদুন্নবী, জশনে জুলুস ইত্যাদিতে আসতে পারবেন না কেন?
এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে বলতে চাই, মদীনার রওজা শরীফে শায়িত নবী দেওবন্দের মাটিতে রেখা টেনে দেওয়ার জন্য যদি নিজে আসতে হয়, তাহলে নবীর বুযুর্গী প্রমাণিত হবে, নাকি না এসেই যদি স্বপ্ন যোগে রেখা পৌঁছে দিতে পারেন, তাহলে বুযুর্গী হয়? সুতরাং দাগ দেওয়ার জন্য নবী এসেছিলেন বললে নবীর বুযুর্গী মানা হয় না। আর বুযুর্গী মানলে দাগ দেওয়ার জন্য এসেছিলেন বলা চলে না। যেমনভাবে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে আকাশের চন্দ্রকে আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করেছিলেন শুনেছেন তো? নবীর আঙ্গুলের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছিল কিনা? অবশ্যই চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। যে নবী জমিনে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলে আকাশের চন্দ্র দুই টুকরা হতে পারে, সে নবী রওজা শরীফে থেকে ইশারা করলে দেওবন্দের মাটিতে কি রেখা অঙ্কিত হতে পারে না? অবশ্যই পারে। সুতরং এটাও অবান্তর কথা নয়, অবাস্তব কথা নয়। তারপরও যদি কেউ এক ঘুঁয়েমি করে নবীর বুযূর্গীকে এড়িয়ে একথা বলতে চায়, মাদ্রাসার ঘর নিমার্ণের রেখা অঙ্কনের জন্য যদি নবী দেওবন্দে অসতে পারেন, তাহলে আমাদের মীলাদ শরীফেও নবী আসেন, আমাদের জশনে জুলুসেও নবী আসেন। তাহলে আমি বলবো, আমরা কেনেদিন এই দাবি করিনি করবও না যে, মাদরাসার ঘর নির্মাণের দাগ দেওয়ার জন্য নবী দেওবন্দে এসেছিলেন। কারণ, এটা বললে নবীর বুযুর্গী মানা হয় না। কিন্তু তোমরা যারা বলো, নবী তোমাদের মীলাদ শরীফে আসেন, নবী তোমাদের জাশনে জুলুসে, মীলাদুন্নবীতে আসেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, নবী আসলে তোমরা দেখ কি, দেখ না? যদি বলো- নবী আসেন কিন্তু তোমরা দেখ না, তাহলে নিশ্চয় তোমাদের চোখে দোষ আছে। আর যদি বলো- নবী আসেন তোমরা দেখ, তাহলে তোমাদের আশেপাশে যারা থাকেন তারা কেন দেখে না? তাহলে নিশ্চয় তোমরা মিথ্যাবাদী।
এই সমস্ত প্রশ্নের জওয়াব দিতে না পেরে তারা বলেন, বাস্তবেই মীলাদ শরীফ, জুলুসে নবী আসেন। তবে তারাই নবীকে দেখতে পায়, যাদের অন্তরে নবীর প্রতি মুহাব্বত আছে। আর যাদের অন্তরে নবীর মুহাব্বত নাই তারা নবী আসলেও দেখতে পায় না।
তাদের এই দাবী বাস্তবিক হতে পারে, নাকি চাতুরিপূর্ণ? আমি যদি একটু সময়ের জন্য মেনেও থাকি এই দাবী, তাহলে এর পরিণতি কী দাঁড়ায়, এটা অবশ্যই বুঝার মতো বিষয়।
আহলে সুন্নাত ওয়ালা জামাতের আক্বিদা বিষয়ে একটি কিতাব আছে, বাংলাদেশের সমস্ত কওমী মাদ্রাসায় পাঠ্য তালিকাভুক্ত এবং সমস্ত আলীয়া মাদ্রাসায়ও পাঠ্য তলিকাভুক্ত। কিতাবটির নাম “শরহে আকাইদে নাসাফী”। এই কিতাবের অনেক ব্যাখ্যা গ্রন্থও আছে। এর একটা ব্যাখ্যা গ্রন্থের নাম ‘নিবরাস’ । নিবরাসের শুরুতে এবং শেষে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা (সা.)এর সাহাবী কাকে বলা হবে, তার স্পষ্ট সঙ্গা ও নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, যে মুমিন মুসলমান নবীকে দেখেন, অথবা যে মুমিন মুসলমানকে নবী দেখেন, সেই মুমিন মুসলমানকে এক বচনে সাহাবী আর বহুবচনে সাহাবা বলা হয়।
এবার আপনারা যারা বলেন, মীলাদ শরীফে নবী আসেন, জশনে জুলুসে নবী আসেন, যদি সত্য বলেন যে নবী আসেন কিন্তু আমি নবীকে দেখি না, তাহলে আপনাদের চোখে দোষ আছে। কিন্তু আমার নবীর চোখে কোনো দোষ নাই, তিনি অবশ্যই আপনাদেরকে দেখবেন। তখন আপনারা কি হবেন? তখন আপনাদের দাবী মতে আপনারা সাহাবী!
এবার শুনুন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদাহ মতে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর যে কোন একজন সাহাবীর মর্যাদা আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে যত নবী এসেছিলেন, সমস্ত নবীর উম্মতে যত ওলী আওলিয়া ছিলেন, সমস্ত ওলী আওলীয়ার চেয়ে মহানবী (স.)এর একজন সাহাবীর মর্যাদা শ্রেষ্ঠ। যদি সাহাবীর এই মর্যাদা বিশ্বাস করতে পারেন, তাহলে আপনি খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হতে পারেন। মুহাম্মদ (সা.)এর যে কোনো একজন সাহাবীর মর্যাদা সারা দুনিয়ার সমস্ত ওলী আওলীয়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠত্ব রাখে। যারা সাহাবীদের এই উত্তম মর্যাদায় বিশ্বাস করতে পারে না, এরা খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হতে পারে না। এরা সুন্নী দাবি করলে হবে সুন্নী নামের ভেজাল।
মুহতারাম হাজেরীন!
হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো মুমিন মুসলিমকে দেখলে, সেই মুমিন মুসলিম কী হয়? সাহাবী হয়ে যায়। আর নবীর একজন সাহাবীর মর্যাদা সারা দুনিয়ার সমস্ত ওলী আওলীয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনারা এতদিন যাবৎ বলেন না কেন- নবী আমাদের মীলাদ শরীফে এসেছিলেন, আমাদেরকে দেখেছিলেন। কাজেই আমরা যারা মীলাদ শরীফ পড়ি, আমরা সবাই ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী, খাজা বাহারুদ্দীন (রাহ.)এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অন্যথায় বলুন- আমাদের জাশনে জুলুসে নবী আসলেও, আমাদেরকে দেখলেও আমরা সাহাবী হতে পারি নাই। আমরা কোনটাকে আপনাদের বক্তব্য ধরে নেব, আপনারাই ঠিক করে দিন।
যদি সাহাবী হয়ে থাকেন, তবে বলেন না কেন? আর যদি সাহাবী না হন, তবে কান পেতে শুনে রাখুন! যে নবীকে যারা দেখেছে অথচ সাহাবী হতে পারলা না, সে ব্যক্তি মুমিন মুসলমান না, সে বেঈমান। কোন পথে যাবেন, পথ ঠিক করুন।
বেঈমানকে নবী দেখলেও সে সাহাবী হয় না। এ কারণে আবু যেহেল সাহাবী হতে পারে নাই। আপনারাই বলুন, আবু লাহাবকে নবী দেখেছিলেন? অবশ্যই দেখেছিলেন। কিন্তু আবু লাহাব সাহাবী হতে পেরেছিল? পারে নাই। কেন আবু লাহাব সাহাবী হতে পারলো না? কারণ, নবী দেখলেও বেঈমান সাহাবী হয় না, নবী বেঈমানদারকে দেখলে লাহাবী হয়। আপনাদের মীলাদুন্নবীতে নবী আপনাদেরকে দেখলেন, জাশনে জুলুসে এসে আপনাদেরকে দেখলেন। অথচ আপনারা সাহাবী হতে পারলেন না? তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনারা সাহাবায়ে কেরামের মতো, নাকি আপনাদের দাবী আবু যেহেলের মতো?
দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকাকে তো আপনারা অবশ্যই চিনেন। পত্রিকাটিতে বাংলাদেশের বিদআতিদের যত খবর ছাপা হয়, বাংলাদেশের আর কোন পত্রিকায় বিদআতিদের এত খবর ছাপা হয় না। এই ইনকিলাব পত্রিকায় গত মঙ্গলবারে ৩য় পৃষ্ঠায় লিখেছে, ঈদে মীলাদুন্নবী এবং জশনে জুলুসের বিরোধীতা যারা করে, এরা শয়তানের অনুসারী। কারণ নবীর জন্মে অসন্তুষ্ট ছিল শুধু শয়তান। সুতরাং, যারা মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানের জন্য সন্তুষ্ট নয়, জাশনে জুলুসের জন্য সন্তুষ্ট নয়, তারাও শয়তান। (নাউযুবিল্লাহ)।
আমি এই ব্যাপারে কোন পর্যালোচনা করবো না। আমি শুধু মীলাদুন্নবীতে যারা সন্তুষ্ট ছিল, তাদের একজনের ইতিহাস বলবো।
বলুন নবীর মিলাদুন্নবী অর্থ কি? নবীর জন্ম। কোন মাসে হয়েছিল? কি বারে হয়েছিল? প্রসিদ্ধ মতে কোন তারিখে হয়েছিল? প্রসিদ্ধ মতে ১২ রবীউল আওয়াল সোমবারে মহানবী (স.)এর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নবীর জন্মগ্রহণের সাথে সাথে আবু লাহাবের দাসী আবু সুয়াইবা আবু লাহাবকে নবীর জন্মের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আবু লাহাব খুশী হয়ে দাসী আবু সুয়াইবাকে দুই আঙ্গুলের ইশারায় আজাদ করে দিয়েছিলেন। ঘটনা বুঝে থাকলে বলুন, মহানবী (স.)এর জন্মে আবু লাহাব সন্তুষ্ট ছিল না অসন্তুষ্ট? এ পর্যায়ে প্রশ্ন করতে চাই, আবু লাহাবের এই সন্তুষ্টি কি সারাজীবনের জন্য ছিল, নাকি শুধুই ১২ই রবীউল আউয়াল? আবু লাহাব নবীর উপর সন্তুষ্টি সারাজীবনের জন্য দেখিয়েছিল, নাকি শুধুই ১২ই রবীউল আউয়াল একদিন দেখিয়েছিল? তাহলে প্রমাণিত হল, আবু লাহাব শুধু ১২ই রবীউল আউয়াল নবীর জন্মদিনে অত্যন্ত খুশী ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। সুতরাং মনগড়া মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে যারা যায় না, এরা যদি ওহাবি হয়, তাহলে তোমরা যারা ১২ মাস নবীর জন্য মুহাব্বত দেখাও না, শুধু ১২ই রবীউল আউয়াল নবীর জন্য মুহাব্বত দেখাও, এটা হলো লাহাবী স্বভাব। মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে না যাওয়াতে যদি ওহাবী হয়, তাহলে ১২ই রবিউল আউয়ালে নবীর জন্য খুশি দেখাইলে লাহাবী হবে। সারা বছর নবীর প্রতি কোন মুহাব্বত না দেখিয়ে শুধু ১২ই রবিউল আউয়াল নবীর জন্য খুশি দেখালে লাহাবী হবে, লাহাবী হবে, লাহাবী হবে। এবার শুনুন, লাহাব কী? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
ﺑِﺴْﻢِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤٰﻦِ ﺍﻟﺮَّﺣِﯿْﻢِ
ﺗَﺒَّﺖْ ﯾَﺪَﺍۤ ﺍَﺑِﯽْ ﻟَﻬَﺐٍ ﻭَّ ﺗَﺐَّ ﴿ؕ۱﴾ ﻣَﺎۤ ﺍَﻏْﻨٰﯽ ﻋَﻨْﻪُ ﻣَﺎﻟُﻪٗ ﻭَ ﻣَﺎ ﮐَﺴَﺐَ ﴿ؕ۲﴾ ﺳَﯿَﺼْﻠٰﯽ ﻧَﺎﺭًﺍ ﺫَﺍﺕَ ﻟَﻬَﺐٍ ۖ﴿ۚ۳﴾ ﻭَّ ﺍﻣْﺮَﺍَﺗُﻪٗ ؕ ﺣَﻤَّﺎﻟَۃَ ﺍﻟْﺤَﻄَﺐِ ﴿ۚ۴﴾ ﻓِﯽْ ﺟِﯿْﺪِﻫَﺎ ﺣَﺒْﻞٌ ﻣِّﻦْ ﻣَّﺴَﺪٍ ﴿۵ ﴾
অনুবাদ- ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি। অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে। এবং তার স্ত্রীও- যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকান রজ্জু।
আবু লাহাবের পরিণতি যে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়া, সেটা সূরায়ে লাহাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। তার অপরাধ ছিল, নবীর জন্মদিনে সে খুশি প্রকাশ করে থাকলেও সারা বছর, সারা জীবন নবীর প্রতি মুহাব্বত দেখায়নি। সারা জীবন আবু লাহাব ছিল নবীর প্রতি বেজার। সুতরাং মনগড়া মীলাদের অনুষ্ঠানে যারা যায় না, তাদেরকে তোমরা যারা ওয়াহাবী বলো, তারা সারা জীবন নবীর জন্মে খুশী। আর তোমরা শুধু আবু লাহাবের মতো ১২ই রবীউল আউয়ালে খুশী। সারা জীবন খুশী থাকলে যদি ওয়াহাবী হতে হয়, তবে শুধু ১২ই রবিউল আউয়াল খুশি দেখালে লাহাবী হবে। এবার বলুন, নবীর জন্মে আপনারা কতদিন খুশি?
আমরা যারা সারা জীবন নবীর জন্মে খুশী, তাতে আমাদেরকে যদি তারা ওয়াহাবী বলে, তাহলে তাদেরকে আমরা বলবো সারা জীবন নবীর জন্মে খুশি না হয়ে শুধু ১২ই রবিউল আউয়াল খুশী হওয়ার করণে তারা হবেন লাহাবী। তার প্রমাণ, তারা সারা বছর নবীর সুন্নাত পালন করেন না, নবীর তরীক্বার ধার ধারেন না, কিন্তু ১২ই রবীউল আউয়াল নবীর জন্ম দিনেই শুধু খুশী দেখান। সুতরাং যারা শুধু ১২ই রবীউল আউয়াল নবীর জন্মে খুশি দেখান, তারা নিঃসন্দেহে, লাহাবী, লাহাবী, লাহাবী। পরকালে আবু লাহাব যাবে যেখানে, তারাও যাবেন সেখানে।
বলছিলাম, দেওবন্দ মাদ্রাসার ঘর নির্মাণে দাগ দেওয়ার জন্য যদি নবী আসতে পারেন, মীলাদ শরীফে আসতে পারবেন না কেন? আমার কথা হল, নবী দেওবন্দেও আসেননি, মীলাদেও আসেন না। আর দুটো কথা বলে আমার কথা শেষ করে দিবো।
প্রথম কথা, হযরত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.)কে যারা হাযির-নাযির বলে, এক মিনিটের জন্য যদি আমি কথাটা মেনে নেই, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়ায় শুনুন। হাযির-নাযির অর্থ উপস্থিত তথা বিরাজমান থাকা। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদের খতীব হচ্ছেন প্রফেসর সালাহ উদ্দীন। তার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, তার অন্ধ ভক্ত যারা আছে তাদের উদ্দেশ্যেও বলছি, আপনারা আমার কথা তার কানে পৌঁছে দিন। খতীব সাহেব! আপনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে হাযির-নাযির বিশ্বাস করেন কি? ইতিপূর্বেকার আপনার বিভিন্ন বক্তব্যে মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, আপনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে হাযির-নাযির বিশ্বাস করেন। এবার একটা কথা বলুন, আপনি যখন জুমার নামাযের খুতবা দিতে যান, তখন আপনার বিশ্বাসমতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) বায়তুল মুকাররমে উপস্থিত থাকেন।
এবার আপনারা বলুন, নামাযটি পড়ায় কে? সালাহ উদ্দীন নাকি রাসূলুল্লাহ (সা.)? রাসূলকে উপস্থিত রেখেও যে ব্যক্তি নামায পড়াতে যায়, তার মতো জঘন্যতম বেয়াদব আর হতে পরে না। এ রকম জঘন্য বেয়াদবকে আমরা ১৬ কোটি মুসলমানের জাতীয় মসজিদের মিম্বারে দেখতে চাই না।
ভাইয়েরা আমার! মুসলমান হিসেবে আপনাদের জানা থাকার কথা। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে রাতে মিরাজে গিয়েছিলেন, বায়তুল মুকাদ্দাসে যখন পৌঁছলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা সমস্ত নবী-রাসূলকে একত্রিত করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা সমস্ত নবী-রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছিলন, দুই রাকাত নামায জামাতের সাথে পড়ার জন্য। সেই পয়গাম্বরী নামাযের জামাতে অনেক ফেরেস্তাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে নবীদের মধ্য একজন নবীও বাদ ছিলেন না। সেই পয়গাম্বরী নামাযের জামাতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত ছিলেন। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এই জামাতে উপস্থিত থাকার কারণে আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)কেও ইমামতি করার অধিকার দেননি, নূহ (আ.)কেও ইমামতি করার অধিকার দেননি, ইবরাহীম (আ.)কেও দেননি, ইসমাইল (আ.)কেও ইমামতি করার অধিকার দেননি, মূসা, ঈসা (আ.)কেও ইমামতি করার অধিকার দেননি। কারণ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে জামাতে উপস্থিত থাকেন, সেই জামাতে প্রফেসার সালাহ উদ্দীন কোন ছার, কোন পয়গাম্বরের ইমামতি করার অধিকার থাকে না। এবার বলুন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যেখানে উপস্থিত, সেখানে সালাহ উদ্দীনের মতো মানুষের ইমামতি করার অধিকার থাকা দূরের কথা, কোন নবী রাসূলেরও ইমামতি করার অধিকার থাকে না। সুতরাং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে হাযির-নাযির জেনেও যে ব্যক্তি ইমামতি করার জন্য মিম্বারে যায়, সে কখনো আশিকে রাসূল হতে পারে না, বরং তার মতো জঘন্যতম বেয়াদব দুনিয়াতে আর হয় না।
দ্বিতীয় কথা- দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসার বাহ্যিক প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হযরত কাসেম নানুতুভী (রাহ.), আর আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। এটা মুখস্ত কোন কথা নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্য। এই জন্য উপমহাদেশের সমস্ত কওমী মাদ্রাসার বাতেনী প্রতিষ্ঠাতা তথা আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা যেহেতু স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.), তাই কওমি মাদ্রাসা সমূহে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)এর আলাদা একটা রুহানী ফয়েজ-বরকত আছে। যেটা আমি আজ আপনাদের চাক্ষুস দেখিয়ে দিতে চাই।
কওমী মাদ্রাসা সমূহে হযরত মুহাম্মাদুর রাসূল্লাহ (সা.)এর এমন কী কী রুহানী ফয়েজ-বরকত আছে, যেগুলো অন্য মাদ্রাসায় নাই? তাহলে শুনুন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রবিত্র কুরআনের এক আয়াতে ইরশাদ করেন-
ﻓَﻠَﻮْﻟَﺎ ﻧَﻔَﺮَ ﻣِﻦْ ﻛُﻞِّ ﻓِﺮْﻗَۃٍ ﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻃَﺎٓﺋِﻔَۃٌ ﻟِّﯿَﺘَﻔَﻘَّﻬُﻮْﺍ ﻓِﯽ ﺍﻟﺪِّﯾْﻦِ
এই আয়াতের মর্ম হলো, মুসলমানদের মধ্য থেকে এমন কিছু লোক বের হয়ে যাও ইসলামী শিক্ষা-দিক্ষা হাসিল করার জন্য। মুফাসসিরীন কেরাম লেখেন, আল্লাহ যদি ‘লিইয়াতাকাফাহু’ না বলে ‘লিয়াতাআল্লামূ’ বলতেন, তাহলে আয়াতের মর্ম হতো শুধু ইসলামী শিক্ষা হাসিলের জন্য বের হয়ে যাও। আল্লাহ এটা বলতে চাননি। শিক্ষার সাথে দিক্ষা লাগবে বুঝাবার জন্য লিয়াতাআল্লামূ না বলে লিয়াতাফাক্কাহু বলেছেন। সুতরাং মাদ্রাসা শিক্ষার বৈশিষ্ট্য হলো, ইলমের সাথে সাথে আমল।
এবার বলুন! শিক্ষার সাথে সাথে আমল অন্য মাদ্রাসায় বেশি পাওয়া যায়, না কওমি মাদ্রাসায় বেশি পাওয়া যায়? এবার বলুন, এটা কিসের বরকতে সম্ভব হয়েছে? কওমী মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছিলেন, তাঁর বরকতেরই ফল এটি। এই লিয়াতাফাক্কাহু শব্দের তাফসীরে মুফাক্কিহীনে কিরাম আরো লিখেছেন, কুরআন-হাদীস নিজের মতো করে শিখতে চাইলে নির্ভেজাল মুসলমান হতে পারবে না। কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা ও মর্ম নিতে হবে নবীর সুন্নাত এবং সাহাবায়ে কিরামের জীবনাচার থেকে। আর তখনই ভুল ব্যাখ্যার অবকাশ থাকবে না এবং তাতে নির্ভেজাল মুসলমান হওয়া যাবে। এই রূপরেখাতে যারা নিজেদের জীবন গড়ে নিতে পারবেন, তাদেরকেই বলা হবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত।
পৃথিবীর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে কাসসাফ। এই তাফসীরের রচয়িতার নাম জারুল্লাহ জামাখশারী। সারা পৃথিবীর সমস্ত আলেমগণ তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকেন এবং আল্লামা উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু সুন্নাতে রাসূল এবং জামাতে সাহাবাকে সত্যের মাপকাঠি রূপে গ্রহণ না করার কারণে পৃথিবীর বিখ্যাত মুফাসসীরে কুরআন হওয়া সত্ত্বেও তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
সুতরাং কুরআনের ইলম শুধু শিখলে হবে না, হাদীস মতে আমল করলেই শুধু হবে না, সুন্নাতে রাসূল এবং জামাতে সাহাবাকে সত্যের মাপকাঠিও মানতে হবে। এটাই কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার আদর্শ। এই আদর্শ অন্য মাদ্রাসা থেকে কওমী মাদ্রাসায় বেশি পাওয়া যায়। এটা হযরত মুহাম্মাদু রাসূলুল্লাহ (সা.)এর কওমি মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার বরকত।
আল্লাহ তাআলা ইরশা করেন- ﻭَﻟِﯿُﻨْﺬِﺭُﻭْﺍ ﻗَﻮْﻣَﻬُﻢْ ﺍِﺫَﺍ ﺭَﺟَﻌُﻮْۤﺍ ﺍِﻟَﯿْﻬِﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﯾَﺤْﺬَﺭُﻭْﻥَ
অর্থাৎ- “এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে; যাতে তার সতর্ক হয়”।
মাদ্রাসা শিক্ষিতদের কর্মজীবনের দায়িত্ব ডাক্তার হওয়া নয়, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হওয়া নয়, বৈজ্ঞানিক হওয়া নয়। মাদ্রাসা শিক্ষিতদের কর্মজীবনের দায়িত্ব জাতিকে পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ প্রদর্শনকারী একদল নায়েবে নবী তথা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া তৈরি করা। মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য সবচেয়ে বেশি কওমী মাদ্রাসার দ্বারাই অর্জিত হয়। হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) কওমি মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার বরকতের ফল এটা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানকে বিষয়টা যথাযথভাবে অনুধাবন করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥
অনুলিখনে- সাদিয়া আহমদ (আনিকা)

স্যারের কাছে জিজ্ঞাসা?


জাফর স্যার বা এই লাইনে আরো যারা বুযুর্গ আছেন, তাদের সকলের মধ্যে একটা ’সবজান্তা’ ভাব বিদ্যমান। তাদেরটা তো তাঁরা জানেনই। ভাব দেখান আমাদেরটাও আমাদের থেকে বেশি জানেন। কারণে-অকারণে মাদরাসাশিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। প্রশ্ন তো আমরাও তুলতে পারতাম। জাফর স্যারকেই প্রশ্ন করতে পারতাম,
.
১. আপনি পিএইচডি করলেন ফিজিক্সে আর দায়িত্ব নিয়েছেন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের! কেনোগো স্যার! যে সাবজেক্টে উচ্চতর ডিগ্রি নিলেন, সেটাই না পড়াবেন।
২. আপনি বিজ্ঞানের মানুষ। তো বিজ্ঞান বিষয়ে আপনার মৌলিক বই কই! আপনি কেনো পড়ে আছেন কল্প বিজ্ঞান নিয়ে!
৩. ইসলাম পাড়ায় পান থেকে চুন খসলে সাথে সাথেই আপনি আপনার কীবোর্ড নিয়ে বসে যান। মুহূর্তের মধ্যে কতকিছু আবিস্কার করে ফেলেন। ভালো। আপনি লেখক মানুষ। লিখতেই পারেন। কিন্তু পরিমলরা যখন ধর্ষণ করে, আপনি তখন মৌনব্রতি হয়ে যান! শ্যামলরা যখন উলটা-পাল্টা করে, আপনি তখন কোথায় থাকেন!
৪. আপনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জিহাদে লিপ্ত। আপনাদের তৈরি শিক্ষা সিলেবাসে দেশের ছেলেমেয়েরা এক একজন মহাপণ্ডিত হয়ে বেরুবে, তেমন স্বপ্নের কথাই আপনি ফেরি করে বেড়ান। এতই আস্থা আপনার দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়, তাহলে নিজের ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়ালেখা করান কেনো?
৫. কোনো বিষয়ে পুরোটা না জেনে কথাবলা তো অন্যায়। তাই না? আপনি ইসলাম এবং মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। আপনি কি ইসলামের অপরিহার্য মৌলিক বিষয়গুলো সম্বন্ধে গবেষণা করেছেন? আপনি কি জানেন কোনটা ইসলাম আর কোনটা বিকৃতি? তাহলে এ নিয়ে আপনি জ্ঞান দেন কোন যুক্তিতে!
৬. আপনি যুদ্ধাপরাধের বিচার চান। কিন্তু আদালতে সাক্ষ্য দিতে যান না। একাত্তরে না-হয় যুদ্ধে গেলেন না। অবস্থা প্রতিকূল বলে। এখন তো অনুকূল ছিল। তাহলে? অন্তত নিজের বাবার জন্য হলেও কি যাওয়া উচিত ছিল না?
৭. আগস্ট দু’হাজার পনেরোতে আপনার একবার ইচ্ছা হয়েছিল গলায় দড়ি দিতে। না, মাদরাসাওলাদের কারণে নয়। নিজের ছাত্রদের কারণে। যোগাসনি হয়ে শাবির পুকুরপাড়ে বৃষ্টিতে বসে রয়েছিলেন কয়েক ঘণ্টা, মিডিয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত। অতি সম্প্রতি আপনার নয়নের মনি বদরুল খাদিজা নামের মেয়েটিকে কোপানোর পর আপনার আবার নতুন করে বিষটিশ খেতে ইচ্ছে করেছিল কিনা...
.
কিন্তু আমরা এসব প্রশ্ন তুলি না। আমরা এসব প্রশ্ন করি না।
ভাবি, যার যার মাথা, তাঁর তাঁর বেদনা।
খামাখা নাক গলানোর দরকার কী!
\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\
_______ পাগলের মাথা খারাপ, পৃষ্ঠা-২২


Thursday, March 2, 2017

পোড়ানো নয় কবরই পরিবেশবান্ধব

আলি হাসান তায়ব

একদিন দুই নারী সাংবাদিক কথা বলছেন।
মুসলিম সাংবাদিকা হিন্দু সাংবাদিকাকে বলছেন, তোমাদের মৃত পোড়ানোর ব্যবস্থাটাই ভালো। চারদিকে জায়গার সংকট। কবর দিলে জায়গা নষ্ট হয়। হিন্দু সাংবাদিকা চওড়া হাসি দিয়ে প্রশংসা রিসিভ করলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, আপা, আমি কি আপনাদের কথায় একটু এন্টারফেয়ার করতে পারি? অনুমতি দিলে বললাম, দেখুন-
ধর্মের বিধান হিসেবে সবার কাছেই নিজেরটা ভালো। আপনারা যেহেতু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন তাই আপনাদের উভয়ের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে আমিও বলি, আগুন পুড়লে পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ইট ভাটায় আগুন পোড়ানোর বিরুদ্ধে আপনারা প্রায়ই রিপোর্ট করেন। পক্ষান্তরে কবরস্থ করলে যে ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এতে কেউ দ্বিমত করতে পারবেন না। আপনার কী বলেন?
এবার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সাংবাদিকা বলে উঠলেন, আরে ভাই আমরা যাই বলি আল্লাহর বিধানের কি কিছু হয়! হিন্দু সাংবাদিকা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, আসলে ধর্মের বিষয়ে যুক্তি-তর্ক তো অবান্তর।

তাফসির করার জন্য আলাদা ট্রেনিং করা দরকার

সাইমুম সাদি 
মাদ্রাসার দায়িত্ব পালন করতে হলে ওয়াজ করতে হয়। ওয়াজ করতে না পারলে পাবলিক আপনাকে তেমন কাজের হুজুর বলে মনে করবেনা।
কয়েক জায়গায় বাধ্য হয়ে ওয়াজ করলাম। খুব যে খারাপ হয় তেমন না। শুধু সুর করে ওয়াজ করতে একটু লজ্জা লাগে এই আরকি। লজ্জা এজন্য যে সুর যদি সেরকম না হয়ে বেসুরো হয়ে যায়!
প্রাকটিস করলে হয়ে যাবে, বললেন একজন।
প্রথম দিন ওয়াজের পর আয়োজক এগিয়ে দিলেন একটা খাম। ভেতরে দেড় হাজার টাকা। আমি আপত্তি করতে গেলে তিনি বললেন, দেখেন আপনি আমাদের নিজের লোক তাই কম টাকা দিলাম। আপত্তি করে লাভ নেই। আপনার গলায় যে সুর লাইনে উঠে গেলে কম টাকায় যাবেনই না ওয়াজে।
আমি বললাম কন কি মিয়া?
তিনি জানালেন, প্রথম প্রথম সবাই লজ্জা করে, পরে বেশীই নেয়।
বললাম, সবার ক্ষেত্রে সঠিক না। আমি কয়েকজন বক্তাকেই জানি যারা টাকা ছাড়াও ওয়াজ করেন। দিলে নেন না দিলে ডিমান্ড করেন না।
যাইহোক, দ্বিতীয় দিন ওয়াজের পর খাম খুলে দেখি পাঁচশো টাকার একটি নোট চকচক করছে। ভাবতে লাগলাম ওয়াজ কি খারাপ হয়ে যাচ্ছে? দেড় হাজার থেকে পাচশোতে চলে এসেছে কেনো?
কাউকে কিছুই বললাম না। সবার অজান্তে নোটটি ওই এলাকার মসজিদের দান বাক্সে রেখে দিলাম।
তৃতীয় দিন দিল দুই হাজার। পরের দিন এক হাজার। বুঝলাম, আমাদের মত নতুন লোকদের অবস্থা অনেকটা শেয়ার বাজারের মত উঠানামা করে।
মাঠে ময়দানে যে পরিমাণে ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে তাতে প্রচুর পাবলিকলি ওয়াজ করার মত লোক দরকার। কিন্তু নির্ভুল ও ইসলাহের নিয়তে বক্তৃতা করার মত লোকের অভাব প্রচুর।
একজন লোক তাফসির করতে হলে তাকে প্রায় পনেরোটা সাবজেক্ট জানতে হবে। কিন্তু তা ত নেই বললেই চলে। ইদানিংকার কোন কোন বক্তারা তেলাওয়াত করেন এক স্থান থেকে, অর্থ বলেন অন্যকিছু আর ব্যাখা ঠিক কোনখান থেকে করেন তিনি নিজেও বোধহয় জানেননা।
এজন্যই বলছিলাম তাফসির করার জন্য আলাদা ট্রেনিং করা দরকার। অন্তত একটা ডিপ্লোমা করার ব্যাবস্থা রাখতে হবে। সেই ব্যাবস্থা বেফাক কিংবা অন্য কেউ করতে পারেন।
আবারো বলছি যারা বর্তমানে মাঠে ওয়াজ করছেন তাদেরকে খাটো করে নয়, তাদের অবদানকে শ্রদ্ধাচিত্তে স্মরণ করেই বলব, আমাদের প্রচুর পরিমাণে মুফাসসির প্রয়োজন।
সেই চাহিদা পুরণের জন্য কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি এগিয়ে আসবেন?

Tuesday, February 28, 2017

আহলে হাদীসের ভ্রান্ততার প্রমাণ

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ওমর মেখলী

সুপ্রিয় পাঠককে উদ্দেশ্য করে বলছি,
আপনি যদি হক নাহক, সত্য অসত্য বুঝার
মানসিকতা রাখেন, তবে সামান্য
কথাতেই আপনি বুঝতে পারবেন, কথিত
আহলে হাদীস কি? কাউকে ঘায়েল
করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আমার
গবেষণায় যেটুকু উপলব্ধিতে আনতে
পেরেছি, তাই প্রকাশ করতে চেষ্টা
করছি। যদি কোন দ্বিধাগ্রস্ত বা
বিভ্রান্ত ব্যক্তি হিদায়াত প্রাপ্ত
হয়ে থাকেন, তার সওয়াব নিশ্চয়ই
আল্লাহ তাআলা আমার বেলায়ও বরাদ্দ
করবেন।
১। আহলে হাদীসদের দাবী হলো,
তাক্বলীদ করা যাবে না। তাক্বলীদ
যারা করে, তারা মুশরিকের
পর্যায়ভুক্ত। তবে ইত্তিবা করা যাবে।
তাদের এমন উক্তির জবাবে বলা যায়,
তাক্বলীদ আর ইত্তিবার মধ্যে পার্থক্য
কি? তাক্বলীদ অর্থ অনুসরণ, ইত্তিবা
অর্থও অনুসরণ।
২। তারা বুঝাতে চায়, তাক্বলীদ অর্থ
অন্ধ অনুসরণ। আর ইত্তিবা অর্থ দলীল
প্রমাণ দেখে আমল করা।
তাদের এ উক্তিতে খুব রস দেখা যায়।
অর্থাৎ- দলীল প্রমাণ দেখেই আমল করার
নাম ইত্তিবা। তারা সহীহ হাদীস
দেখে আমল করেন, এটি তাদের মুখ্য
দাবী। আচ্ছা হাদীসটা যে সহীহ, তা
কি রাসূল (সা.) বলেছেন, নাকি
আল্লাহ তাআলা বলেছেন। নাকি
হাদীসগুলো নবী (সা.) দিনের কোন এক
সময়ে তাদেরকে এসে বলে গেছেন?
বরং হাদীস সহীহ হওয়া আর জয়ীফ হওয়া,
সবই মুহাদ্দিসের কথার উপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ- মুহাদ্দিসগণ অন্য লোক থেকে
হাদীসটি গ্রহণ করার সময় দেখেছেন
সে লোকের চরিত্র কি, তার মেধা কী
রকম? সে আহলে সুন্নাত ওয়াল
জামাতের লোক কি না? না কি সে
শিয়া বা খারেজী ইত্যাদি বাতিল
ফেরকার লোক? (সে সময় অবশ্য আহলে
হাদীস নামে কিছু ছিল না, তাই
মুহাদ্দিসগণ সে বিষয়ে যাচাই
করেননি। বর্তমানের কথিত আহলে
হাদীসরা যদি সে যুগে থাকতো, তবে
তাদেরকেও ঐরূপ বাতিল ফিরকায়
শামিল করে তাদের বর্ণিত হাদীসকে
শুধু জয়ীফ নয়, বরং মওজু বলতেন)। এসব
দিকসমূহ কঠোরভাবে যাচাই করার পর
যার কাছে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী
সে লোককে ভাল পেয়েছেন, তার
কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন।
সেরূপ হাদীস সংরণকারী লোকদের
চরিত্র ইত্যাদি বিবেচনা করে যে
মুহাদ্দিস যাকে ভাল পেয়েছেন, তার
উপর নির্ভর করে হাদীসকে সহীহ বা
জয়ীফ বলে মত প্রকাশ করেছেন।
তাহলে বুঝা যায়, হাদীস জয়ীফ বা
সহীহ হওয়ার মাপকাঠি হলো একমাত্র
মুহাদ্দিসগণের মত। সে মতের
ভিত্তিতেই হাদীস সহীহ বা জয়ীফ
নির্ধারিত হয়ে থাকে। এটি এমন বিষয়,
যার কোন দলীল-প্রমাণ নেই। সেরূপ
মতকে অন্ধ বিশ্বাস করে কথিত আহলে
হাদীসরা হাদীস মানছে। তা কি অন্ধ
বিশ্বাস নয়? তা যদি অন্ধ বিশ্বাস না
হয়, তাহলে অন্ধ বিশ্বাস আর কাকে
বলা হবে?
কোন হাদীস তো এমন নেই যে,
বর্তমানেও আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল
এসে বলে দিচ্ছেন যে, এই হাদীসটি
সহীহ, এটি জয়ীফ। তাহলে কোন
দলীলের ভিত্তিতে তারা
হাদীসগুলোকে সহীহ বা জয়ীফ বলছেন।
যেহেতু হাদীছ জয়ীফ হওয়া এবং সহীহ
হওয়া মুহাদ্দিসের মতের উপর নির্ভর, সে
কারণে একই হাদীস এক মুহাদ্দিসের
কাছে সহীহ আরেক মুহাদ্দিসের কাছে
জয়ীফ বলে বিবেচিত। এখানেও
মতানৈক্য। এর ভিতর কথিত আহলে
হাদীসরা যদি যে কোন একজনের
হাদীস গ্রহণ করে, তাহলে বুঝা যায়
তারা যে কোন একটি মাযহাব বা মত
গ্রহণ করল। কারণ মাযহাব মানে হলো মত।
এই আলোচনা থেকে বুঝা গেল, আহলে
হাদীসরা মাযহাবও মানে আবার
অন্ধবিশ্বাস তথা তাক্বলীদও করে।
আচ্ছা দেখুন, তাদের তাক্বলীদটা
বেশি অন্ধ বিশ্বাস, নাকি মাযহাব
যারা মানেন তাদের তাক্বলীদটা
অন্ধ বিশ্বাস। মাযহাব যারা মানেন,
তারা শরয়ী মাসআলার দলীল অনুসন্ধান
করতে গেলে কুরআন হাদীস সামনে
আছে। সেখান থেকে দলীল খুঁজে তার
মাযহাবের মতটা সঠিক, না বেঠিক;
তা বিচার করতে পারেন।
কিন্তু তথাকথিত আহলে হাদীসরা
কোন দলীলের ভিত্তিতে হাদীস
মানেন? কারণ যে সকল বর্ণনাকারীর
চরিত্র ও মেধা ইত্যাদির উপর নির্ভর
করে মুহাদ্দিসগণ হাদীসকে সহীহ বা
জয়ীফ বলেছেন, সে সকল রাবী তো
একজনও জীবিত নেই। তাহলে তারা ঐ
রাবী ভাল ছিলেন কি খারাপ
ছিলেন, তা জানার কোন উপায়ও নেই।
তাহলে বুঝা যায় কথিত আহলে
হাদীসরা যাদের মত অনুসরণ করে,
যাদের কথার অধীনে চলে, যাদের অন্ধ
তাক্বলীদ করে, তাদের মত প্রমাণ করার
জন্য কোন দলীল পাওয়াও সম্ভব নয়। বরং
দলীল প্রমাণ ছাড়াই খালেস অন্ধ
বিশ্বাসের মাধ্যমেই মুহাদ্দিসের কথা
মান্য করতে হচ্ছে।
এখন পাঠক মহোদয় বিচার করুন, যারা
মাযহাব মানে তাদের তাক্বলীদটা
অন্ধ বিশ্বাস, নাকি কথিত আহলে
হাদীসদের তাক্বলীদটা পুরোপুরি অন্ধ
বিশ্বাস?
এখন আপনি নিজেই বলুন, তাদের ভাষায়
যদি তাক্বলীদ করা শিরক হয়, তাহলে বড়
শিরিক কারা করে থাকেন? আহলে
হাদীস না মাযহাবীগণ?
আরো দেখুন, বর্তমানে আহলে
হাদীসরা হাদীসের বেলায় জনাব
আলবানী সাহেবকেই মানেন। কারণ
যে সকল হাদীসকে আলবানী সাহেব
সহীহ বলেছেন সেগুলোকেই তারা
সহীহ বলেন। বাকী সবগুলোকে তারা
জয়ীফ বলে উপহাস করেন।
এক. হাদীস নিয়ে উপহাস করা ঈমান
বিধ্বংসী। দুই. তারা ইসলাম ধর্মের
চৌদ্দশ বছর পরে এসে এহেন ফিতনার
যুগের কোন একজন লোককেই নিজেদের
ইমাম মানছেন। আর যারা মাযহাব
মানে তারা তাবেয়ী, তাবে-
তাবেয়ীদের যুগের লোকদেরকেই
মানেন। যাদের কাছে হাদীস
পৌঁছেছে মাত্র এক বা দুই মাধ্যমের
দ্বারা। যারা নবী (সা.) ও সাহাবী
যুগের একেবারে সন্নিকটে। যাদের যুগ
যুগ ধরে ধর্মের ব্যাপারে সঠিক ও আহলে
হক্ব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের
ইমাম বলে সর্বজন স্বীকৃতি দিয়ে
আসছে। যারা ইসলাম বিরোধী
যাবতীয় শক্তির সাথে মোকাবেলা
করে সঠিক ইসলাম বর্তমান যুগ পর্যন্ত
মুসলমানদের কাছে পৌঁছার ব্যবস্থা
করে গেছেন।
ইসলামের সে সোনালী ব্যক্তিদেরকে
কলুষিত করতে কথিত আহলে হাদীসদের
এক মিনিট সময় লাগে না। এমনকি কথিত
আহলে হাদীসরা সাহাবায়ে
কেরামকে পর্যন্ত মানতে নারাজ। এক
দিকে ১৩/১৪ শত বছর পরের লোকের
তাক্বলীদ করা, অপর দিকে ইসলামের
সোনালী যুগের ব্যক্তিদের
সমালোচনা করা, অধিকন্তু সাহাবায়ে
কেরামকে না মানা। এসবের মাধ্যমে
তারা যে ইসলামের মধ্যে ষড়যন্ত্রমূলক
একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছে, তার
অকাট্য দলীল নয় কি?
আচ্ছা, যারা তাক্বলীদ বা অন্ধ
বিশ্বাস করে এবং কথায় কথায় মিথ্যা
বলে তাক্বলীদ করার কথা অস্বীকার
করে, এটাই কি তাদের গোমরাহীর
দলীল নয়? তারা যেসকল মাসআলা
নিয়ে বিতর্ক করে, সেগুলোর সকল
প্রকার দলীল দেয়ার পর হুকুম বের হয়
হয়তো সুন্নাত বা মুস্তাহাব। একটা
মুস্তাহাবের জন্য পুরো মুসলিম দুনিয়ায়
মতপার্থক্য সৃষ্টির মতো কবীরা গোনাহ
করতে পারবে, এর প্রমাণ কোন সহীহ
হাদীসে আছে?
কথিত আহলে হাদীসরা বলেন, মাযহাব
মানে মতভেদ করা। আচ্ছা চার মাযহাব
দীর্ঘ দিন থেকে চলে এসেছে।
সেখানে পঞ্চম আরেকটি দল করে
মতভেদ বৃদ্ধি করা কোন ধরনের
যৌক্তিকতা বা কোন ধরনের ইসলাম
পালন? এটা মুসলমানদের বুঝা উচিত।
সামান্য একথাগুলো একটু চিন্তা করলে
আপনি একজন মুসলমান হিসেবে এ
সিদ্ধান্ত নিতে বাধা কোথায় যে,
আহলে হাদীস মুসলমানদের মধ্যে নতুন
করে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যই জন্ম
হয়েছে? মিথ্যা কথা বলাই এদের
স্বভাব। যারা সব সময় মিথ্যার মধ্যে
ডুবে থাকবে, যারা ইসলামের কর্ণধার
সাহাবায়ে কেরামকে পর্যন্ত মানতে
রাজি হবে না, এরা আবার কি করে
সঠিক ইসলামের দাবীদার হতে
পারবে?
প্রিয় পাঠক! আশা করি কথাগুলো
চিন্তা করবেন। আহলে হাদীসদের কাছ
থেকে এসবের জবাব চাইবেন। তখন
বুঝতে পারবেন, এরা কি সঠিক ইসলামে
আছে? নাকি ইসলামের নামে
মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য
মাঠে ময়দানে কাজ করছে।
আমার মতে আহলে হাদীস যে একটি
ভ্রান্ত দল, তা বুঝার জন্য এর চাইতে
বেশি দলীল-প্রমাণ ও বক্তব্যের প্রয়োজন
পড়ে না। এর বাইরে দেখতে চাইলে
তাদের ইতিহাসও দেখা যায়। এরা
ইংরেজ সৃষ্ট কাদিয়ানীদের মতই
ইংরেজ কর্তৃক সৃষ্ট। সেটা দেখলে তো
আর বলতেই হয় না যে, এরা ভ্রান্ত দল।
বরং নিজে নিজেই বুঝে আসে। ওয়মা
আলাইনা ইল্লাল বালাগ। #

Monday, February 27, 2017

গায়রে মুকাল্লিদদের ইমাম মরহুম আলবানী সাহেবের প্রকৃত পরিচয়



আলবানী সাহেবের আসল নাম নাসিরুদ্দীন।
সিরিয়ার অ ন্তর্গত আলবেনিয়ার অধিবাসী
হওয়ায় তাঁকে আলবানী বলা হয়। এ নামেই
তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত। ১৩৩৩ হিজরী
মোতাবেক ১৯১৪ ঈসাঈতে তিনি
আলবেনিয়ার আশকুদারাহ শহরে জন্মগ্রহণ
করেন। কিছু সমস্যার কারণে তাঁর পিতা
আলবেনিয়া ছেড়ে সপরিবারে দামেস্ক চলে
যান সাথে আলবানীকেও নিয়ে যান।
আলবানী সাহেব দামেস্ক থাকাকালীন
পিতার কাছে কোরআনে কারীম হিফজ
করেন। দামেস্কের মাদরাসায় ইস’আফ আল
খায়রিয়া’তে প্রাথমিক পড়াশোনা করেন।
কিন্তু পিতৃ পেশা ঘড়ি মেরামতের কাজে
সময় দেওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
বা শাস্ত্রাভিজ্ঞ কোনো আলেমের
তত্ত্বাবধানে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক
স্তরের কিতাবাদি ও তাফসীর, হাদীস, উসূলে
হাদীসের কোনো কিতাবের পাঠ গ্রহণ করার
সুযোগ তাঁর হয়নি। এ বিষয়টি তাঁরই সুপরিচিত
আরবের বিখ্যাত আলেমেদীন শাইখ মুহাম্মদ
আওয়ামা তাঁর রচিত ‘আসারুল-হাদীস’ গ্রন্থে
এভাবে ব্যক্ত করেছেন।
ﻣﻊ ﺍﻥ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻟﻴﺲ ﻟﻪ ﻣﻦ ﺍﻟﺸﻴﻮﺥ ﺍﻻ ﺷﻴﺦ ﻭﺍﺣﺪ
ﻣﻦ ﻋﻠﻤﺎﺀ ﺣﻠﺐ ﺑﺎﻹﺟﺎﺯﺓ ﻻ ﺑﺎﻟﺘﻠﻘﻰ ﻭﺍﻷﺧﺪ ﻭ ﺍﻟﻤﺼﺎﺣﺒﺔ
ﻭﺍﻟﻤﻼﺯﻣﺔ ، ‏( ﺍﺛﺮ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ 15 - )
পাশাপাশি এই ব্যক্তির কোনো উস্তাদ ও
নেই (যাঁর কাছে তিনি হাদীস পড়েছেন)
শুধুমাত্র সিরিয়ার হালাব’ শহরের জনৈক
আলেম তাঁকে হাদীস চর্চার মৌখিক অনুমতি
দিয়েছেন। তবে তাঁর কাছেও তিনি
নিয়মতান্ত্রিকভাবে হাদীস অধ্যয়ন
করেননি।” (আসারুল হাদীস, পৃ. ১৫)
তাঁর এই বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত যে, তিনি
উলূমুল হাদীসের জ্ঞান কোনো বিজ্ঞ
পন্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি। এ
ব্যাপারে নিজের অধ্যয়নই তাঁর মূল ভিত্তি।
অথচ শাস্ত্রীয় ব্যাপারে সর্বজনস্বীকৃত একটি
মূলনীতি, অভিজ্ঞতাও যার সাক্ষ্য প্রদান
করে তা হলো যেকোনো শাস্ত্রে পরিপক্বতা
অর্জনের জন্য সে শাস্ত্রের পন্ডিত
ব্যক্তিদের সাহচর্য অবলম্বন করা অনিবার্য।
ব্যক্তিগত অধ্যয়নে জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হতে
পারে, কিন্তু শাস্ত্রীয় পরিপক্বতা শাস্ত্রীয়
পন্ডিতের সাহচর্য ছাড়া অর্জিত হওয়া
বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব। কিন্তু আলবানী
সাহেব এই স্বীকৃত বিষয়টির কোনো
তোয়াক্কা না করে নিজস্ব অধ্যয়নেই তিনি
উলূমুল হাদীসের ইমাম বনে গেছেন, এমনকি
তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের সকল হাদীস ও হাদীসের সকল
ইমামের বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ
হয়েছেন।
চিন্তা করুন, কোনো এইট পাস ব্যক্তি যদি
বাজার থেকে আইনের কিছু বইপত্র ক্রয় করে
নিজে নিজে অধ্যয়ন করে আন্তর্জাতিক
বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কী ধরনের নৈরাজ্য ও
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে!
এমনিভাবে কোনো এইট পাস ছেলে যদি
ডাক্তারি বইপত্র ক্রয় করে নিজে নিজে
অধ্যয়ন করে বিশ্বমানের ডাক্তারের
ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে গোরস্তান
আবাদ করা ছাড়া আর কী হওয়ার সম্ভাবনা
আছে? ঠিক এই অবস্থাটাই হয়েছে জনাব
আলবানী সাহেবের।
ইলমে ওয়াহীর মতো স্পর্শকাতর ও
সংবেদনশীল বিষয়ে নিজস্ব অধ্যয়নের
ভিত্তিতে সকলের ইমাম বনে যাওয়া ও সকল
হাদীস ও হাদীসের ইমামগণের বিচারক বনে
যাওয়ার ফলে ইলমী ময়দানে যে অরাজকতা ও
নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে এবং দুনিয়ায় যে
ফেতনা-ফ্যাসাদ জন্ম নিয়েছে তা খুবই
দুঃখজনক ও মুসলিম উম্মাহর জন্য
অশনিসংকেত।
এজন্য সকল মুসলিমের জন্য আলবানী
সাহেবের ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তিকর দিকগুলো
সম্পর্কে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে
মুখরোচক কোনো স্লোগান শুনে আমরা ভ্রান্ত
পথের পথিক না হয়ে যাই। নি¤েœ আলবানী
সাহেবের ভুল-ভ্রান্তির কিছু দিক তুলে ধরা
হলো :
১.
হাদীসের সহীহ-যয়ীফ, জরাহ-তাদীল ও এ
শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে
স্ববিরোধী বক্তব্য :
হাদীসের সহীহ-যয়ীফ, জরাহ-তাদীল ও এ
শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে
তার স্ববিরোধী বক্তব্য সংখ্যায় প্রচুর।
দেখা যায়, এক স্থানে তিনি একটি
হাদীসকে সহীহ বলেছেন তো অন্য স্থানে
সেটিকেই হাসান বা যয়ীফ বলেছেন। আবার
এক স্থানে কোনো বর্ণনাকারীকে
নির্ভরযোগ্য বলেছেন তো অন্য স্থানে তাকে
যয়ীফ (দুর্বল) বলেছেন।
তার এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্য একত্রিত
করে শায়েখ হাসান সাক্কাফ
ﺗﻨﺎﻗﻀﺎﺕ ﺍﻻﻟﺒﺎﻧﻰ ﺍﻟﻮﺍﺿﺤﺎﺕ (আলবানীর স্পষ্ট
স্ববিরোধিতাসমূহ) নামে ২ খ-ের একটি গ্রন্থ
রচনা করেছেন।
আবার দেখা গেছে, কোনো বর্ণনাকারীর
ব্যাপারে তাঁর ধারণা পূর্বে এক রকম ছিল;
কিন্তু পরে তাতে পরিবর্তন এসেছে। এ
জাতীয় বিষয়াদিকে শায়খ আবুল হাসান
মুহাম্মদ তাঁর
ﺗﺮﺍﺟﻊ ﺍﻟﻌﻼﻣﺔ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻓﻴﻤﺎ ﻧﺺ ﻋﻠﻴﻪ ﺗﺼﺤﻴﺤﺎ ﻭﺗﻀﻌﻴﻔﺎ
কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এ জাতীয়
স্ববিরোধিতা সর্বমোট ২২২টি হাদীসের
ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে।
২.
ইজতেহাদী বিষয়াদিতে অসহিষ্ণুতা :
শাস্ত্রজ্ঞ ইমামগণ এ বাপ্যারে ঐকমত্য
পোষণ করেছেন পূর্ণভাবে স্বীকৃত যে, হাদীস
ভা-ারে বিদ্যমান হাদীসসমূহ সহীহ বা যয়ীফ
হওয়ার বিবেচনায় তিন ভাগে বিভক্ত :
এক.
যেসব হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে সকল
ইমাম একমত হয়েছেন।
দুই.
যেসব বর্ণনা যয়ীফ বা মাতরুক (পরিত্যাজ্য)
হওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত হয়েছেন ।
তিন.
যেসব বর্ণনা সহীহ বা যয়ীফ হওয়ার ব্যাপারে
ইমামগণের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
বাস্তবতার নিরিখেও হাদীসের এই প্রকার
তিনটি সুস্পষ্ট। এর মধ্যে প্রথম দুই প্রকার
হাদীসের বিষয়টি সহজ ও পরিষ্কার। কিন্তু
আলবানী সাহেব তাঁর ‘সিলসিলাতুল
আহাদীস’কে এই দুই প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ
রাখেননি। তিনি তাঁর কিতাবে যথারীতি
শেষোক্ত প্রকারের হাদীস প্রচুর পরিমাণে
উল্লেখ করেছেন। অথচ এই তৃতীয় শ্রেণীর
হাদীসের ব্যাপারে শাস্ত্র ও বিবেকের
সিদ্ধান্ত হলো শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি তাহকীক ও
গবেষণার ভিত্তিতে যে মতটিকে সঠিক বা
বিশুদ্ধ মনে করবেন, তিনি সেই মতটি অবলম্বন
করবেন। আর যারা শাস্ত্র বিষেশজ্ঞ নন,
তাঁরা কোনো শাস্ত্রজ্ঞের তাকলীদ বা
অনুসরণ করবেন। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে লক্ষ
রাখতে হবে, মতটি যেন কোনো প-িতের
পদস্খলন না হয়।
ইমাম বাইহাকী (রহ.) (মৃত্যু ৪৫৮হি.) তাঁর
‘দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ’-এর ভূমিকায় এ বিষয়টি
নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ করেছেন :
ﻭﺃﻣﺎ ﺍﻟﻨﻮﻉ ﺍﻟﺜﺎﻟﺚ ﻣﻦ ﺍﻷﺣﺎﺩﻳﺚ ﻓﻬﻮ ﺣﺪﻳﺚ ﻗﺪ ﺍﺧﺘﻠﻒ
ﺍﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺑﺎﻟﺤﺪﻳﺚ ﻓﻰ ﺛﺒﻮﺗﻪ ﻓﻬﺬﺍ ﺍﻟﺬﻯ ﻳﺠﺐ ﻋﻠﻰ ﺃﻫﻞ
ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺑﺎﻟﺤﺪﻳﺚ ﺑﻌﺪﻫﻢ ﺃﻥ ﻳﻨﻈﺮﻭﺍ ﻓﻰ ﺍﺧﺘﻼﻓﻬﻢ
ﻭﻳﺠﺘﻬﺪﻭﺍ ﻓﻰ ﻣﻌﺮﻓﺔ ﻣﻌﺎﻧﻴﻬﻢ ﻓﻰ ﺍﻟﻘﺒﻮﻝ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﺛﻢ
ﻳﺨﺘﺎﺭﻭﺍ ﻣﻦ ﺃﻗﺎﻭﻳﻠﻬﻢ ﺍﺻﺤﻬﺎ ﻭﺑﺎﻟﻠﻪ ﺍﻟﺘﻮﻓﻴﻖ
উম্মাহর আলেমগণের কর্মনীতিও সর্বযুগে এই
ছিল যে, এ প্রকারের হাদীসসমূহে
বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য যেহেতু সাধারণ
ব্যাপার, তাই প্রত্যেকেই অপরের মতের
ব্যাপারে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছেন। যাঁর
বিচার-বিবেচনায় হাদীসটিকে সহীহ মনে হয়
তিনি হাদীসটিকে মাস’আলার ভিত্তিরূপে
গ্রহণ করেন আর যাঁর বিবেচনায় হাদীসটিকে
সহীহ মনে হয় না, তিনি একে মাস’আলার
ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন না। এ ক্ষেত্রে
গ্রহণ-অগ্রহণ উভয়টিই ইজতিহাদের ভিত্তিতে
হয়ে থাকে। আর এ জন্যই প্রত্যেককে অপরের
মতের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল ও সহিষ্ণু হতে হয়।
আমাদের পূর্ববর্তী ইমামগণ এমনই ছিলেন।
আলোচ্য ক্ষেত্রে নিজের মতটিকে চূড়ান্ত
মনে করা বা যথাযথ দলিলভিত্তিক
সমালোচনার ব্যাপারে অসহিষ্ণু হওয়া এবং
সমালোচককে কটাক্ষ ও গালাগাল করা
কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে অন্য সকলের
ওপর চাপিয়ে দেওয়ার
মানসিকতা পোষণ করা যে অত্যন্ত গর্হিত
কাজ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আলবানী সাহেব ও
তাঁর বিশিষ্ট ভক্ত-অনুরক্ত সকলেই এ গর্হিত
কাজটিতে লিপ্ত হয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর
তুলেছেন। সিলসিলাতুয যয়ীফা সিলসিলাতুস
সহীহা এবং তাঁর অন্যান্য রচনার ভূমিকা
পড়লে একজন নিরপেক্ষ পাঠকের মনে এ
ধারণাই সৃষ্টি হয় যে, তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে
একমত না হওয়াই অমার্জনীয় অপরাধ এবং এই
অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি তাঁর পক্ষ থেকে
যেকোনো ধরনের (শ্রব্য-অশ্রাব্য) সম্বোধনের
উপযুক্ত হতে পারে।
৩.
যয়ীফ হাদীসের ব্যাপারে আলবানী
সাহেবের যয়ীফ অবস্থান :
আলবানী সাহেব যয়ীফ হাদীসকে একদম
অনর্থক মনে করেন। তাঁর মতে, যয়ীফ
হাদীসের যতগুলো প্রকার আছে তার
কোনোটিই কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি তাঁর কিতাবে যয়ীফ ও মওযু (দুর্বল ও
জাল) উভয়টিকে একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত
করেছেন এবং উচ্চ কণ্ঠে এ ঘোষণা
দিয়েছেন যে, যয়ীফ সর্বক্ষেত্রেই
পরিত্যাজ্য। অর্থাৎ এটা না ফাজায়েলের
ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, না মুস্তাহাব বিষয়াদির
ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, আর না অন্য কোনো
ক্ষেত্রে। সহীহুল জামিইস সগীর ওয়া
যিয়াদাতিহী, পৃ. ১৫০
অথচ এই মতটি সালাফ ও সালাফের সর্ববাদী
নীতিমালার সুস্পষ্ট বিরোধী। জমহুরে সালাফ
ও খালাফের ইজমা বা ঐকমত্যের খেলাফ
হওয়া তো অতি স্পষ্ট এবং সর্বজনবিদিত;
বাস্তব কথা হলো, তা সকল সালাফ ও
খালাফের ইজমারই পরিপন্থী। যয়ীফ হাদীস
কোনোক্রমেই কাজের নয়; বরং তা বিলকুল
অকেজো আলবানী সাহেবের এই মতটি
অবলম্বন করেছেন সালাফ ও খালাফের
কারো থেকেই প্রমাণিত নয়। তাঁরা সকলেই
যয়ীফ হাদীসকে ফজীলতের ব্যাপারে গ্রহণ
করেছেন। এমনকি কোনো বিষয়ে সহীহ
হাদীস না থাকলে যয়ীফ হাদীস দ্বারা
বিধিবিধান প্রমাণ করেছেন এবং যয়ীফ
হাদীসকে কিয়াসের ওপরে মর্যাদা
দিয়েছেন। Ñআল কাউলুল বদি ফিস সালাতি
আলাল হাবিবিশ শাফিঈ, হাফেয সাখাবী, পৃ.
৪৭৩
৪.
শুযুয তথা উম্মতের ঐকমত্য থেকে বিচ্যুতি :
আলবানী সাহেবের আলোচনা পর্যালোচনা
শুধু হাদীসের তাসহীহ ও তাযয়ীফের মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তিনি তাঁর
রচনাসমূহের বিভিন্ন স্থানে ফিকহ, আকাঈদ
ও অন্যান্য শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীন
এমনকি এক ধরনের বিচারকসুলভ পর্যালোচনা
করেছেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো
বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করতে বা কোনো মনীষীর
ভ্রান্তি বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তকে জীবিতও
করতে কোনো দ্বিধা করেননি। অথচ ইজমায়ে
উম্মত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকে
চলে আসা উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা
থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মত পোষণ করা
অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এ ব্যাপারে শরীয়তের
প্রমাণাদি, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং
পরবর্তী আসলাফে উম্মাহর সিদ্ধান্ত ও
বক্তব্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের অজানা নয়। এ
প্রসঙ্গে ইবনে আব্দুল বার (রহ.) প্রণীত ﺟﺎﻣﻊ
ﺑﻴﺎﻥ ﺍﻟﻌﻠﻢ ২/১৩০ এবং
ইবনে রজব দামেশ্কী (রহ.)-এর ﺷﺮﺡ ﻋﻠﻞ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯ
বিশেষভাবে অধ্যয়নযোগ্য।
যেসব ভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্ন মতের উদ্ভাবন বা
পৃষ্ঠপোষকতা আলবানী সাহেব করেছেন তার
কিছু দৃষ্টান্ত লক্ষ করুন!
১.
তাঁর মতে, মহিলাদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও
অন্যান্য স্বর্ণবালা ব্যবহার করা হারাম
অথচ মহিলাদের জন্য স্বর্ণের সব ধরনের
অলংকার বৈধ, চাই তা বলয়াকৃতির হোক বা
অন্য আকৃতির হোক।
২.
তাঁর মতে তারাবীর নামায ৮ রাক’আত সুন্নাত
আর ২০ রাক’আত বিদ’আত।
অথচ উম্মতের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারার মাধ্যমে
তারাবীর নামায ২০ রাক’আত প্রমাণিত, যা
১৪০০ বছর যাবত হারামাইন শরীফাইনসহ
বিশ্বের বড় বড় সব শহরে প্রচলিত আছে।
৩.
তাঁর মতে, এক মজলিসে তিন তালাক দিলে
এক তালাক গণ্য হবে
অথচ এই মতটি সহীহ হাদীস ও ইজমা
পরিপন্থী।
৪.
তাঁর মতে, সুব্হাহ (তাসবিহ) দ্বারা যিকির-
আযকার গণনা করা বিদ’আত।
অথচ এটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
ফিকহ, ইলমে হাদীস ও অন্যান্য বিষয়ে
আলবানী সাহেবের বিচ্ছিন্ন মতামতের
সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু কিছু স্থূলদৃষ্টি
ব্যক্তিবর্গ ও তাঁর কিছু অন্ধ ভক্ত তাঁর এই
বিচ্ছিন্ন মতামতগুলোকে মুসলিম সমাজের
মাঝে প্রচার করে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি
করছে। আল্লাহ তা’আলা সবাইকে সহীহ বুঝ
দান করুন।
শাইখ মাহমুদ রচিত তাম্বীহুল মুসলিম গ্রন্থের
২০৫ নং পৃষ্ঠায় আলবানী সাহেবের ভুল-
ভ্রান্তির ফিরিস্তি এভাবে বর্ণিত আছে :
ﺍﻗﻮﻝ ﻫﺬﺍ ﺑﻤﻨﺎﺳﺒﺔ ﻋﺎﺩﺓ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻣﻊ ﻣﺨﺎﻟﻔﻴﺔ
মর্মার্থ: আলবানী সাহেব তাঁর মতাদর্শের
বিরোধী ব্যক্তির সঙ্গে যে আচরণ করেন সে
প্রসঙ্গে কিছু বলা জরুরি মনে করছি।
আলবানী সাহেব যখন কাউকে তাঁর প্রতিপক্ষ
ভাবেন তখন তাঁর কথা সামনে এলে তিনি
দাঁড়াবেন, বসবেন, কাঁপতে থাকবেন, ধমক
দেবেন। তাঁর বই পড়তে গেলে আপনারা এ
সত্যতার প্রমাণ পাবেন এবং তাঁর আক্রমণের
স্বরূপ দেখবেন। তিনি প্রতিপক্ষ বিজ্ঞ
আলেমদের ধ্বংসের দু’আ করেন। তাঁদের
মিথ্যুক, মুশরিক, প্রতারক বলেও গালি দেন।
কোনো কোনো প্রতিপক্ষকে কাফেরও বলে
ফেলেন। আবার কাউকে তিনি চক্রান্তকারী,
মুনাফিক, খবিশ, গোমরাহ ইত্যাদি বলতে
কুণ্ঠাবোধ করেন না। তাঁর ন্যক্কারজনক
কর্মকা-ের শীর্ষে রয়েছে, ইমাম আহমাদ
(রহ.)-কে বিদ’আতী বলে গালি দেওয়া।
আলবানী সাহেব তার এই বিতর্কিত
কর্মপদ্ধতি ও গর্হিত আচার আচরণের কারণে
সিরিয়ার মুসলিম জনতার আন্দোলনের মুখে
সিরিয়া থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি
সৌদি আরবে চলে যান এবং সেখানেও এই
একই কারণে আলেম-ওলামা ও জনগণের
রোষানলে পড়েন। তাদের আন্দোলনের মুখে
সৌদি আরব থেকেও তিনি বিতাড়িত হন।
১৯৯১ ইং সালে সরকারি নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার
মধ্যে তাঁকে সৌদি আরবের মাটি ছাড়তে হয়।
এরপর তিনি জর্ডানে আশ্রয় নেন এবং
জর্ডানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জর্ডানের সচেতন আলেমগণও তাঁর ভ্রান্ত
কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে
উঠেছিলেন। (আল ইত্তিজাহাতুল
হাদীসিয়্যাহ, মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ মুহাম্মদ)
আলবানী সাহেবের ভ্রান্তিসমূহের খ-নে
নির্ভরযোগ্য আলেমগণের কিছু কিতাব :
এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আলবানী সাহেবের
সব ভুলভ্রান্তি তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর
পরিমাণ এত বেশি যে এগুলোর সংকলনে
বিজ্ঞ আলেমগণ হাজার হাজার পৃষ্ঠার
স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ ব্যাপারে
বিস্তারিত জানতে নিম্নোক্ত কিতাবগুলো
পড়া যেতে পারে।
ﺍﻻﺑﺎﻧﻰ ﺷﺬﻭﺫﻩ ﻭﺃﺧﻄﺎﺋﻪ
মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আযমী।
ﺗﺼﺤﻴﺢ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﺘﺮﺍﻭﻳﺢ ﻋﺸﺮﻳﻦ ﺭﻛﻌﺔ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ
ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻓﻰ ﺗﻀﻌﻴﻔﻪ
শায়খ ইসমাঈল আনসারী (রহ.) সাবেক গবেষক,
দারুল ইফতা, সৌদি আরব।
ﺇﺑﺎﺣﺔ ﺍﻟﺘﺤﻠﻰ ﺑﺎﻟﺬﻫﺐ ﺍﻟﻤﻌﻠﻖ ﻟﻠﻨﺴﺎﺀ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻓﻰ ﺗﺤﺮﻳﻤﻪ
ﻋﻠﻰ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ
শায়খ ইসমাঈল আনসারী (রহ.)
ﺍﻟﺼﺎﺭﻡ ﺍﻟﻤﺸﻬﻮﺭ ﻋﻠﻰ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺘﺒﺮﺝ ﻭﺍﻟﺴﻔﻮﺭ ﻭﻓﻴﻪ ﺍﻟﺮﺩ
ﻋﻠﻰ ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺤﺠﺎﺏ ﻟﻸﻟﺒﺎﻧﻰ
শায়খ হামুদ তুযাইজারী, সৌদি আরব।
ﺍﻟﻨﻘﺪ ﺍﻟﺒﻨﺎﺀ ﻟﺤﺪﻳﺚ ﺃﺳﻤﺎﺀ ﻓﻰ ﻛﺸﻒ ﺍﻟﻮﺟﻪ ﻭﺍﻟﻜﻔﻴﻦ
ﻟﻠﻨﺴﺎﺀ
আবু মুয়াজ তারিক বিন আউযুল্লাহ, বিশেষ
ছাত্র, শায়খ আলবানী।
ﻭﻳﻠﻚ ﺁﻣﻦ
আহমাদ আব্দুল গফুর
ﻭﺻﻮﻝ ﺍﻟﺘﻬﺎﻧﻰ ﺑﺈﺛﺒﺎﺕ ﺳﻨﻴﺔ ﺍﻟﺴﺒﻌﺔ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
ﺗﻨﺒﻴﻪ ﺍﻟﻤﺴﻠﻢ ﺇﻟﻰ ﺗﻌﺪﻯ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ ﻋﻠﻰ ﺻﺤﻴﺢ ﻣﺴﻠﻢ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
ﺍﻟﺘﻌﺮﻳﻒ ﺑﺄﻭﻫﺎﻡ ﻣﻦ ﻗﺴﻢ ﺍﻟﺴﻨﻦ ﺇﻟﻰ ﺻﺤﻴﺢ ﻭﺿﻌﻴﻒ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
১০
ﺍﻟﻘﻮﻝ ﺍﻟﻤﻘﻨﻊ ﻓﻰ ﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ ﺍﻟﻤﺒﺘﺪﻉ
শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে সিদ্দীক আল গুমারী
(রহ.)

Sunday, February 26, 2017

দ্বীন শিক্ষায় জিজ্ঞাসার গুরুত্ব : শৈথিল্য ও সীমালংঘন

মাওলানা আবুল বাশার 
মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

আজকাল বাংলাভাষায় ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর লেখাজোখা হচ্ছে। ইসলামী প্রকাশনা শিল্পের ক্রমবিস্তার আমাদের মনে বেশ আশার সঞ্চার করছে। অনেকেই দ্বীনী বই-পুস্তক কিনছে। দ্বীন সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ছে। নতুন-নতুন পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে। অংকের হিসাবে বলা যায় একটা বড়-সড় পাঠকমহল গড়ে উঠেছে। সেই সংগে নানা-আংগিকে দ্বীনের আলোচনাও চলছে। ওয়াজ-মাহফিলের পরিমাণ বাড়ছে। তাবলীগ জামাতের মাধ্যমেও প্রচুর দ্বীনী আলোচনা হচ্ছে। মসজিদসমূহে জুমুআর দিন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। বস্ত্তনিষ্ঠ আলোচনার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বাড়ছে। জুমুআ ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষে দ্বীনী আলোচনা হচ্ছে। ঘরোয়া পরিবেশেও আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে। হক্কানী পীর মাশায়েখের সংখ্যাও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। পীর-মুরীদির ধারায়ও দ্বীনের আলোচনা হচ্ছে এবং এভাবেও লোকজন দ্বীন শিখছে। নিঃসন্দেহে এসব এ যুগের এক লক্ষণীয় দিক। দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী শিক্ষার বিস্তারে এ সবগুলোরই ভূমিকা সাধুবাদ পাওয়ার উপযুক্ত। এই বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ভাবা যায় কি মানুষের ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র তথা দ্বীনের সর্বাঙ্গনে কী ভয়াবহ অবক্ষয় দেখা দিত? আল্লাহ তাআলা সেই পরিণতি থেকে এ দেশবাসীকে রক্ষা করুন এবং সে লক্ষ্যে এসব প্রচেষ্টাকে আরও বলিষ্ঠতার সাথে অব্যাহত রাখার তাওফীক দান করুন।
তবে এই একরৈখিক পরিসংখ্যান নিয়ে তুষ্ট হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর বিপরীত চিত্রেও নজর দেওয়া দরকার। এসব মাধ্যমে যারা দ্বীন শিখছে তারা সমাজের কত শতাংশ? যারা এখনও পর্যন্ত এর আওতায় আসেনি, তারা কত শতাংশ? নিশ্চয়ই পার্থক্যটা অনেক বড়। সমাজের সিংহভাগ মানুষই এমন, যারা এসব মাধ্যমের কোনও একটির ধরা ছোঁয়াকে কবুল করেনি। তারাও মুসলিম। অন্ততপক্ষে নিজেদের সেই পরিচয়ই দিয়ে থাকে। সেই পরিচয়ের তাগিদেই হয়ত বা জুমুআর নামায পড়ে। ঈদের মাঠে আসে। জানাযায় শামিল হয়। এবং এরকম আরও কিছু ইসলামী লক্ষণ-আলামত আলগোছে ধরে রেখেছে। তারা ইসলাম সম্পর্কে বলা যায় কিছুই জানে না। আকীদা-বিশ্বাসের কোনও খবর নেই। মুমিন হতে হলে কী বিশ্বাস রাখতে হয় সে নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। কি-কি কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যায় তা তাদের ভাবনায়ই আসে না। ওযূ-গোসল, হালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অজ্ঞতার কোনও সীমা নেই। গোটা ইসলাম সম্পর্কেই তারা বেখবর। বাপ-দাদা মুসলিম, ব্যস সেই সুবাদে নিজে মুসলিম। এর বাইরে ইসলাম সম্পর্কে জানার কোনও গরজ তারা বোধ করে না। সুতরাং পরিতুষ্টির সুযোগ কোথায়?
কথা আছে অন্যখানেও। যারা কোনও না কোনওভাবে দ্বীনের সাথে জড়িত, দেখতে-শুনতে দ্বীনদার, নামায-রোযা করে, মসজিদে আসে, হয়ত বা কোনও পীরের মুরীদও কিংবা কোনও দ্বীনী খেদমত ও দাওয়াতী কর্মকাণ্ডর সাথে জড়িত- দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে তাদের জানা শোনার অবস্থা কী? অবস্থা যে সন্তোষজনক নয় একটু দৃষ্টিপাত করলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
এদের আকছারেরই সুন্নত-বিদআতের কোনও ধারণা নেই। বরং তাওহীদ ও শিরকের প্রভেদ সম্পর্কেও তারা সচেতন নয়। শাহজালাল রাহ.-এর দরগাহ ও আজমীরে মানত কেবল কবর পূজারীই নয়, কবরপূজা হারাম জানা লোককেও করতে দেখা যায়। বেঈমানী কথা বলে বা শিরকী কাজ করে ঈমানহারা হয়ে গেছে, অথচ সে নিয়ে কোনও ভাবনা-চিন্তা নেই, এমন লোক কথিত দ্বীনদারদের মধ্যেও ঢের আছে। নিয়মিত তাসবীহ আদায় করে অথচ সহীহ-শুদ্ধভাবে নামায পড়তে জানে না- এমন লোকের কি কোনও অভাব আছে? এমন বহু লোক আছে, যে দাওয়াতী কর্মে সদা তৎপর, অথচ সে জানে না, তার উপর হজ্ব ফরয হয়ে আছে। এ রকম অজ্ঞতার ফিরিস্তি দিতে থাকলে খতিয়ান অনেক লম্বা হয়ে যাবে। সারকথা এটাই যে, আজ দ্বীনদারদেরও বড় অংশ দ্বীন সম্পর্কে জানে বড় কম। সর্বগ্রাসী জাহালাতের গরাস হয়ে আছে সমাজের প্রতিটি স্তর। অতি নগণ্য সংখ্যাই তা থেকে মুক্ত আছে।
এই সর্ববিস্তৃত অজ্ঞতার কারণ কী? কারণ তো এই যে, অজ্ঞতা এক কঠিন ব্যাধি। এ ব্যাধি নিরাময়েরও ওষুধ আছে। কিন্তু যারা এতে আক্রান্ত তারা নিজেদের রোগী মনে করছে না। তারা যে রোগী সেই বোধ তাদের নেই। আর বোধ নেই বলে নিরাময়ের কথা ভাবছে না এবং ওষুধ সেবনের চিন্তা করছে না।
ওষুধ সেবনের চিন্তা করত, যদি নিজেদের রোগী ভাবতে পারত। তাই এখন বড় দরকার তাদের মধ্যে রোগ-সচেতনতা সৃষ্টি করার। অজ্ঞতা যে তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, তাদের ঈমান-আমল বরবাদ করছে, তাদের মানবিকতা ধ্বংস করছে এবং মানুষ হিসেবে তাদের জন্মগ্রহণ ব্যর্থ করে দিচ্ছে- সেই চেতনা ও অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগ্রত করা ছাড়া এই মহাব্যধির চিকিৎসা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি দরাকার ওষুধ সরবরাহ করা এবং তা সেবনে তাদের উদ্বুদ্ধ করা।
তা অজ্ঞতা নামক ব্যাধি নিরাময়ের কী উপায়? উপায় মূলত তিনটি-
এক. উলামায়ে কিরামের কাছে দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা;
দুই. দ্বীনী রচনাবলী পাঠ করা।
তিন. উলামা-মাশায়েখের সাহচর্য গ্রহণ করা।
এ লেখার উদ্দেশ্য মূলত দ্বীনী জ্ঞান আহরণের এই তিন মাধ্যম সম্পর্কে সামাজিক শৈথিল্য ও সীমালংঘনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সর্বপ্রথম আলোচনা করা যাক উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞাস করা সম্পর্কে। এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
ﻓَﺴْـَٔﻠُﻮْۤﺍ ﺍَﻫْﻞَ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺍِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﻟَﺎ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ
তোমাদের জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩; সূরা আম্বিয়া (২১) : ৭
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺷِﻔَﺎﺀُ ﺍﻟْﻌِﻲِّ ﺍﻟﺴُّﺆَﺍﻝُ
অজ্ঞতার দাওয়াই তো জিজ্ঞেস করা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩০৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১০৭৫
কিন্তু এ দাওয়াই আজ চরমভাবে আবহেলিত। অধিকাংশ মানুষই এটি ব্যবহার করে না আবার যারা ব্যবহার করে তাদেরও অধিকাংশ ভুল ব্যবহার করে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে দু’রকম প্রান্তিকতাই বিদ্যমান। হয় এর প্রতি শৈথিল্য করা হয়, নয়ত করা হয় সীমালংঘন।
.
জিজ্ঞেস করতে শৈথিল্য ও অবহেলা
.
আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত লেনদেন, পারস্পরিক আচার-ব্যবহার ও আখলাক-চরিত্র- এই যাবতীয় বিষয়েই রয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা, কিন্তু তা জানে ক’জন? যারা জানে না তাদেরই বা ক’জন এ সম্পর্কে জ্ঞানীজনদের জিজ্ঞেস করে? অধিকাংশেই করে না। হয়ত একটা ভুল বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করছে, সেই বিশ্বাসের উপর তার বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, তাও কাউকে জিজ্ঞেস করে না বিশ্বাসটি সঠিক কি না। সেই বিশ্বাসটি শিরক ও কুফর পর্যায়েরও হতে পারে। একটু বিবেক-বুদ্ধি খাটালে সে সম্পর্কে অন্তরে খটকা লাগারই কথা। তা সত্ত্বেও দেখা যায় সেই বিশ্বাস নিয়ে কবরে যাচ্ছে, জীবনে একটিবারও কারও কাছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার গরজ বোধ করে না। একজন নামাযী মানুষ যদি শাহজালালের দরগায় মানত করে তাকে আমরা কী হিসেবে নেব? দরগায় মানত করা যে শিরকী কাজ- নামাযীর মনে সে প্রশ্ন কেন জাগবে না? এমন বহু নামাযীকেই এ জাতীয় মানত করে তা পূরণ করতে দেখা যায়। একবারও জিজ্ঞেস করে না, তার এ কাজটি জায়েয হচ্ছে কি না! এ জাতীয় মানত তো বিশ্বাসের বিভ্রান্তি থেকেই করা হয়ে থাকে। দরগার পীর-ফকীর মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে পারে বলে যে নামাযী বিশ্বাস করে সে ঠিক কতটুকু নামাযী এবং তার ঈমানের কী অবস্থা, মুমিন হয়ে থাকলে এ প্রশ্ন তার মনে কেন জাগবে না? ইসলাম যে ঈমানের শিক্ষা দেয় তার কণামাত্রও যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে এ প্রশ্ন জাগা উচিত বৈকি। কিছু কিছু লোককে প্রশ্ন করতে দেখাও যায়। কিন্তু অধিকাংশেই তা করে না। আকীদা বিষয়ে এটা একটা উদাহরণ। এ রকম উদাহরণ বিস্তর আছে। ভুলের উপর মানুষ জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেই বিশ্বাস শুদ্ধ করে ফেলা যায়। তাও জিজ্ঞেস করবে না। তাদের কাছে জিজ্ঞেস’নামক দাওয়াইয়ের কোনও মূল্য নেই।
এই যে নামাযীদের কথা বললাম, তারা নামায কতটুকু সহীহ-শুদ্ধ পড়ছে তাও কখনও খতিয়ে দেখে না। মসজিদে এসে দেখে ইমাম সাহেব রুকূ থেকে উঠে সিজদায় যেতে উদ্যত। এক নামাযী নিজে-নিজে রুকূ দিয়ে জামাতে শামিল হয়ে গেল এবং ইমামের সাথে একত্রে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করল। আপনি তার পাশেই নামায পড়েছেন। রুকূ আপনিও পাননি। ফলে সালামের পর আপনি আরেক রাকআত নিজে-নিজে পড়ে নিলেন। ওই লোক পাশেই তা দেখছে। কিন্তু একটি বার জিজ্ঞেস করছে না, তার নামায হল কি না।
এমন বহু মালদার আছে, যারা নিজেরাই ফয়সালা নিয়ে নেয় তার উপর যাকাত ফরয হয়নি। কাউকে তার সম্পদের হিসেব দিয়ে জিজ্ঞেস করে না যে, তার উপর যাকাত ফরয কি না।
বাবা কি মায়ের ইন্তিকাল হয়ে গেল, এখন মীরাছ কিভাবে বণ্টন করতে হবে, বহু নিয়মিত মুসল্লী আছে, যারা কোনও আলেমকে তা জিজ্ঞেস করে না। এরকম রাশি-রাশি উদাহরণ দেওয়া যাবে। এরা নিজ ইচ্ছামত চলে। কিংবা সমাজের প্রচলনই তাদের কাছে শেষ কথা। তাই কোনও আলেমকে জিজ্ঞেস করে না তাদের চলাটা ঠিক হচ্ছে কি না। ফলে অজ্ঞানতার গভীর অন্ধকারেই তারা পড়ে থাকে। ভুল-ভ্রান্তি ও কুসংস্কারের ভেতর দিনাতিপাত করে আর মনে করে বেশ ধর্মজীবন যাপন করছে। এরাও তো কুরআন মাজীদের এই ইরশাদের মধ্যে পড়ে যায়-
ﻗُﻞْ ﻫَﻞْ ﻧُﻨَﺒِّﺌُﻜُﻢْ ﺑِﺎﻟْﺎَﺧْﺴَﺮِﯼْﻥَ ﺍَﻋْﻤَﺎﻟًﺎ ﺍَﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﺿَﻞَّ ﺳَﻌْﯿُﻬُﻢْ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺤَﯿٰﻮﺓِ ﺍﻟﺪُّﻧْﯿَﺎ ﻭَ ﻫُﻢْ ﯾَﺤْﺴَﺒُﻮْﻥَ ﺍَﻧَّﻬُﻢْ ﯾُﺤْﺴِﻨُﻮْﻥَ ﺻُﻨْﻌًﺎ .
বল, আমি কি তোমাদের সংবাদ দেব কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের? তারা সেই সব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা উত্তম কাজ করছে। -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ১০৩-১০৪
এ ক্ষতি থেকে তাদের উদ্ধারের উপায় দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণ করা আর সে লক্ষ্যে দ্বীন শিক্ষার এই অন্যতম প্রধান মাধ্যম (উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞেস করা’-কে) অবলম্বন করা।
এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামও স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা আপন-আপন স্থান থেকে মানুষের ভেতর এই বোধ চাপিয়ে দিতে পারেন যে, দ্বীন শেখার জন্য আলেমদের কাছে প্রশ্ন তাদের করতেই হবে। ভুলের উপর থাকা চলবে না। প্রকৃত মুমিন ও মুসলিম হতে হলে দ্বীনের সহীহ-শুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতেই হবে আর তার এক প্রকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে প্রশ্ন করা’।
.
জিজ্ঞেস করতে লজ্জা যেন বাধা না হয়
.
অনেকেই জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে। এ লজ্জা পরিত্যাজ্য। যে লজ্জা মানুষকে দ্বীন শেখা হতে বঞ্চিত রাখে প্রকৃতপক্ষে তা লজ্জাই নয়। তা ভীরুতা, পলায়নপরতা ও জড়ত্ব। একে যে প্রশ্রয় দেয় সে চির জাহেল হয়েই থাকে। নিঃসন্দেহে লজ্জাশীলতা এক প্রশংসনীয় গুণ এবং তা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংগও বটে, কিন্তু যে লজ্জা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখে, তা অতি নিন্দনীয়। তা ঘৃণাভরে ঝেড়ে ফেলা উচিত।
দেখুন লজ্জা নারীর ভূষণ’বলে একটা কথা আছে, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা নর-নারী নির্বিশেষে প্রত্যেক মুমিনের ভূষণ, সেই লজ্জাকে দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে প্রশ্রয় না দেওয়ার কারণে আনসারী নারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। আমাদের বিদূষী মা হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন,
ﻧِﻌْﻤَﺎﻟﻨِّﺴَﺎﺀُﺀﺎَﺴِﻧُ ﺍﻟْﺄَﻧْﺼَﺎﺭِ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ ﻳَﻤْﻨَﻌُﻬُﻦَّ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺀُ ﺃَﻥْ ﻳَﺘَﻔَﻘَّﻬْﻦَ ﻓِﻴﺎﻟﺪِّﻳﻦِ .
আনসারী নারীগণ কতই না ভালো। দ্বীনের জ্ঞানার্জনে লজ্জা তাদের বাধা দিতে পারেনি। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৩২২, ৩৩২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫১৪৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬৪২
এ প্রশংসার কারণ তারা একান্ত নারী সংক্রান্ত বিষয়েও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মাসাইল জিজ্ঞেস করতেন। তিনিও পরম মমত্বের সাথে তাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। সাধারণভাবে সাহাবায়ে কিরামের নীতি এটাই ছিল যে, তারা দ্বীনী বিষয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করতেন না। তাঁর ওফাতের পর তারা পরস্পর একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতেন। বহু মাসআলায় তারা উম্মাহাতুল-মুমি
নীনের শরণাপন্ন হয়েছেন। উম্মুল-মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে তো তারা অনেক বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছেন, এমন কি যাকে লজ্জার মনে করা হয়ে থাকে এমন বিষয়েও। বস্ত্তত এটাই নিয়ম। আমার যে বিষয় জানা নেই তা যে ব্যক্তি জানে তার কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচবোধ কেন করব? অজ্ঞতা তো কিছু গৌরবের বিষয় নয় যে, লজ্জাকে প্রশ্রয় দিয়ে তা ধরে রাখতে হবে! জ্ঞানস্পৃহা তো মানুষের স্বভাবগত। জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বই হযরত আদম আলাইহিস সালামকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পরিয়েছিল। সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য জ্ঞানাহরণ করতেই হবে। লজ্জা যদি তাতে বাধা হয়, তবে সেই অবাঞ্ছিত লজ্জাকেই পরিষ্কার করতে হবে, জ্ঞানাহরণ থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে ভালো জানে অসংকোচে তার কাছে নিজ অজানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা চাই।
.
জিজ্ঞেস করবে কাকে?
.
হাঁ, জিজ্ঞেস করতে হবে যথার্থ জ্ঞানীজনকেই। এ ব্যাপারেও মারাত্মক শিথিলতা লক্ষ করা যায়। ব্যস টুপি-দাড়ি থাকলেই তাকে মৌলভী সাহেব মনে করা হয়। এটা যেন মৌলভী হওয়ার নিদর্শন। ইসলামে মৌলভী সাহেবের জন্য তো আলাদা কোনও পোশাক ও পৃথক কোনো বেশ-ভূষা নেই। দাড়ি রাখা সুন্নত সকলেরই জন্য। সালিহীন ও নেক বান্দাদের পসন্দের পোশাক মুসলিম মাত্রেরই পছন্দনীয় হওয়া উচিত। উলামা-মাশায়েখ যে লেবাস ব্যবহার করেন, তা যদি কেউ ভালোবাসে সে ধন্যবাদার্হ। কিন্তু তাই বলে সে আলেম হয়ে যায় না। তাকে আলেম মনে করা উচিত না। কিন্তু সমাজ তাই মনে করছে। টুপি-দাড়ি থাকলেই তাকে হুজুর ডাকছে এবং তার কাছে মাসআলা জিজ্ঞেস করছে। একটু খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না যে, আসলেই সে আলেম কি না। আবার সেই লোকও কম যায় না। প্রশ্ন করা হচ্ছে দেখে নিজের প্রকৃত অবস্থান যেন ভুলে যায়। মনে মনে নিজেকে আলেমের মসনদে বসিয়ে উত্তর একটা দিয়ে দেয়। এ জাতীয় লোকদের অনেক উত্তর আমার সরাসরি নিজ কানেই শোনা আছে। তা রীতিমত ভয়ংকর, দুঃখজনক, হতবুদ্ধির ও কলঙ্কজনক। তার এ দুঃসাহসিক হরকতের জন্য সাধারণের নির্বিচার জিজ্ঞাসাও কম দায়ী নয়।
আম-সাধারণ কেন এ জাতীয় শৈথিল্য দেখাবে? এটা তো হাতুড়ে ডাক্তার দ্বারা জটিল রোগের চিকিৎসা করানোর চেয়ে কম আত্মঘাতী নয়। ওই চিকিৎসায় যদি ভবলীলা সাঙ্গ হয় তো এ জিজ্ঞাসায় আখিরাত বরবাদ যায়। এরচে’বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে! ইদানীং অবশ্য হাতুড়ে ডাক্তার দেখানোর প্রবণতা অনেক কমে গেছে। কিন্তু বে-এলেম আবেদের কাছে জিজ্ঞাসার প্রবণতায় বিশেষ কমতি পরিলক্ষিত হয় না। সত্যিকারের আবেদ হলেও না হয় কথা ছিল। জিজ্ঞেস করা হয় কেবলই জাহিরী পোশাক দেখে। আকছার খাদেম মুআযযিনকেও মানুষ মুফতী মর্যাদা দিয়ে বসে। সন্দেহ নেই মসজিদের খেদমত অনেক বড় ফযীলতের কাজ। মুআযযিনের মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে। কিন্তু আমাদের সমাজ তো মুআযযিনকে সেই মর্যাদা দেয় না এবং এ পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতাও খোঁজে না। কেবল কণ্ঠস্বরই মানদ-। তাই সুরেলা কণ্ঠের বে-এলেম মুআযযিন হয়ে যায়। ব্যতিক্রম হয়ত আছে, কিন্তু সাধারণ অবস্থা বড় দুঃখজনক। হাঁ যদি তাদেরকে আলেম গণ্য করা না হয়, এবং তারাও নিজ অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক থাকে এবং মহবক্ষত ও পরম শ্রদ্ধাবোধের সংগে এ পদের দায়িত্ব পালনে রত থাকে, তবে নিঃসন্দেহে হাশরের ময়দানে এ রকম মুআযযিনগণ বহু লোকের ঈর্ষার পাত্র হবে। সন্দেহ নেই এ রকম মুআযযিন এ দেশে অনেক আছে। আল্লাহ তাআলা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন এবং দুনিয়ায়ও তাদেরকে ইজ্জতের জীবন দান করুন।
কথা হচ্ছিল- দ্বীনী বিষয় যারে-তারে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। কুরআন মাজীদ তো নির্দেশনা দিয়েছে- (তরজমা) তোমার জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর’[সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩]। সুতরাং দ্বীন সম্পর্কে যার ভালো জানা আছে জিজ্ঞেস তাকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল সনদ ও সার্টিফিকেট থাকাই যথেষ্ট নয়। চর্চায় নিয়োজিত আছে কি না তাও লক্ষ রাখা উচিত। সেই সংগে তাকওয়া-পরহেযগারীও। জিজ্ঞেস যখন দ্বীন সম্পর্কে তখন দ্বীনদার আলেমকেই সন্ধান করা উচিত। আমি যা জানতে চাই তার উপর আমার আখিরাতের নাজাত নির্ভর করে। আমি তার কাছে চাই নাজাতের পথ জানতে, কিন্তু অজ্ঞতাবশত সে যে পথ দেখাল তা নাজাতের নয়; বরং ধ্বংসের পথ। তাই সতর্কতা জরুরি। জিজ্ঞেসও অবশ্যই করতে হবে এবং সে জন্য উপযুক্ত লোকেরও সন্ধান করতে হবে। সন্ধান করলে পাওয়াও অবশ্যই যাবে। হয়ত খানিকটা সময় দিতে হবে। একটু পথ চলতে হবে, কিন্তু উদ্দেশ্য যখন নিজ দ্বীনের হিফাজত ও আখিরাতের নাজাত, তখন এতটুকু কষ্ট তো করতেই হবে। বড় চমৎকার বলেছেন মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ.-
ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢَ ﺩِﻳﻦٌ، ﻓَﺎﻧْﻈُﺮُﻭﺍ ﻋَﻤَّﻦْ ﺗَﺄْﺧُﺬُﻭﻥَ ﺩِﻳﻨَﻜُﻢْ
এই ইলম তো দ্বীন, সুতরাং লক্ষ করে দেখ কার নিকট থেকে নিজ দ্বীন নিচ্ছ।
-সহীহ মুসলিম, ; সুনানে দারেমী, বর্ণনা ৩৯৯; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, বর্ণনা ১৫৩
.
তলাবা ও উলামাও জিজ্ঞাসা থেকে বেনিয়ায নয়
.
জিজ্ঞাসাকে জ্ঞানাহরণের মাধ্যম তো সর্বাপেক্ষা বেশি বানানো উচিত তলাবা ও উলামার। সত্যিকারের উলামাও প্রকৃতপক্ষে তলাবাই। তালিবুল-ইলম অর্থ যখন জ্ঞানের সন্ধানী, তখন জিজ্ঞাসা অর্থাৎ জানার ইচ্ছা তো তার মজ্জাগতই থাকবে। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি লোমকূপে উঠবে অদম্য কৌতূহলের আকুলতা। সেই আকুলতা নিবারণের জন্য সে জিজ্ঞাসার আশ্রয় নেবে। আমি জিজ্ঞাসা’শব্দটিকে সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি। প্রশ্ন অপেক্ষা এ শব্দটিই আলোচ্য বিষয়ের পক্ষে বেশি ব্যঞ্জনাময়। আমার বড় ভালোবাসার শব্দ এটি। এর ঝঙ্কার বাজুক প্রত্যেক তালিবুল-ইলমের অন্তরে। আজ এর বড় অভাব দেখি। এক ছাত্র যেন আরেক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে। এরূপ লজ্জাশ্রয়ী ছাত্র ইলমের রাজ্য কিভাবে বিচরণ করতে পারে। জিজ্ঞাসায় সপ্রতিভ থাকাই তো হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর শান। এই শান যে অবলম্বন করতে পারবে সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের উচ্চতায় সে না পৌঁছে যায় না। খুব সম্ভব ইমাম আজম ইমামুল-আইম্মতিল-ফুকাহা আবূ হানীফা -রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়া আলা আসহাবিহী- সম্পর্কে কোথাও পড়েছিলাম, তাঁর জ্ঞানের সাগর হয়ে ওঠার উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, আমি যা জানি না, সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে কখনও লজ্জাবোধ করিনি। একই রকম জিজ্ঞাসার জবাবে হিবরুল-উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবক্ষাস রা. বলেছিলেন, জিজ্ঞাসাপ্রিয় রসনা ও সমঝদার অন্তঃকরণের কারণে’(-ই যা কিছু শিখেছি)। আমি যত বড় আলেম দেখেছি তাদের সকলকেই এ ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ ও অনাড়ষ্ঠ পেয়েছি। আর নিঃসন্দেহে তাদের বড় হয়ে ওঠার পেছনে এ গুণের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং জ্ঞানের রাজ্যে যারা অবাধ বিচরণ করতে চায়, তাদের এ গুণ অর্জন করতেই হবে। তাফাক্কুহ-ফীদ-দ্বীন তথা দ্বীনের স্বচ্ছ ও গভীর জ্ঞানার্জন যাদের লক্ষ্য তাদের এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনও অবকাশ নেই। এর মাধ্যমে তারা পারে অন্যের সাধনালব্ধ জ্ঞানের অংশীদার হতে। অন্যের কাছে প্রশ্ন করা ও মতবিনিময়ের দ্বারা বিষয়ের আগাপাছতলা পরিস্ফুট হয়, নজর প্রসারিত হয় এবং অচিন্তিত দিকের দ্বারোম্মোচন হয়। এত বড় উপকারী জিনিসকে অবহেলা করা যায়, না করা উচিত? তা ছাড়া প্রশ্ন করা যায় আপন মনেও। অন্যের কাছে জিজ্ঞাসার আগে নিজে নিজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সকল দিকে নজর বোলালে ও আপন মনে প্রশ্ন তুলে তার জবাব হাতড়াতে থাকলে বিষয়টির প্রসার ও গভীরতার সন্ধান পাওয়া যায়। তালিবুল-ইলমের তলব’-এর সেটাই তো প্রথম যাত্রা। অগ্রযাত্রাকে সচল রাখার পক্ষে যে প্রাণশক্তি দরকার এ কৌতূহল দ্বারাই তা অর্জিত হতে পারে।
.
বাড়াবাড়িমূলক প্রশ্ন
.
এমন বহু লোকও আছে, যারা দরকারি বিষয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না অথচ অহেতুক বিষয়ে প্রশ্ন করতে বেজায় উৎসাহ বোধ করে। এমন সব বিষয়ে তারা প্রশ্ন করে, যাতে না আছে কোনও দ্বীনী ফায়দা, না দুনিয়াবী উপকার। এরকম নিরর্থক বিষয় নিয়ে তারা বাকশক্তির অপচয় করে, সময় নষ্ট করে ও অন্যকে করে বিব্রত। একে তো অহেতুক বিষয়ে লিপ্ত হওয়া মুসলিমের শান নয়। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
ﻣِﻨْﺤُﺴْﻦِ ﺇِﺳْﻠَﺎﻡِ ﺍﻟْﻤَﺮْﺀِ ﺗَﺮْﻛُﻪُ ﻣَﺎ ﻟَﺎ ﻳَﻌْﻨِﻴﻪِ
অহেতুক বিষয় পরিহার করা ইসলামের এক সৌন্দর্য। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩১৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৯৭৬
তদুপরি এটা অন্যের পক্ষে বিব্রতকর। যেমন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামাতা জান্নাতে যাবে কি না, এ প্রশ্নের পেছনে পড়ার কোনও দরকার আছে? এটা জানা কি ঈমানের অংগ। না জানলে কি ইসলাম ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবে? যাকে প্রশ্ন করা হয় সে এর কী উত্তর দেবে? যদি বলে জান্নাতী, তবে কুরআন-হাদীসে যাদের সুনির্দিষ্টভাবে জান্নাতী বলা হয়নি, তাদের জান্নাতী হওয়ার সার্টিফিকেট কে দিতে পারে? আর যদি বলে জান্নাতী নয়, তবে নবীপ্রেমে উজ্জীবিত এক বক্তা ও শ্রোতার পক্ষে এরকম কথার উচ্চারণ হৃদয়ে শরাঘাত অপেক্ষাও কঠিন নয় কি? হাঁ, তারা জান্নাতে যাবেন এই আশাবাদ তো ব্যক্ত করাই যেতে পারে, কিন্তু এরূপ প্রশ্নের কর্তা তো অতটুকুতেই সন্তুষ্ট হওয়ার নয়। তো যেই প্রশ্নের উত্তর তাকে সন্তুষ্ট করবে না, তার পেছনে তার পড়াই বা কেন? এ জাতীয় এক প্রশ্ন করা হয়েছিল ইমাম আবূ হানীফা রাহ.-কে। জিজ্ঞাসা ছিল হযরত আলী রা. ও হযরত মুআবিয়া রা.-এর মধ্যে কে সঠিক ছিলেন এবং সিফফীনের যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিলেন, আখিরাতে তাদের কী হবে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন-
ﺇﺫﺍ ﻗَﺪِﻣْﺖُ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻳﺴﺄﻟﻨﻲ ﻋﻤﺎ ﻛَﻠَّﻔَﻨِﻲ ﻭﻻ ﻳﺴﺄﻟﻨﻲ ﻋﻦ ﺃﻣﻮﺭﻫﻢ .
আমার তো ভয় নিজের সম্পর্কে যে, না জানি আল্লাহ তাআলা আমাকে কোন্ কোন্ বিষয়ে সওয়াল করেন। কিয়ামতে যখন আমাকে তাঁর সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তাদের কোনও বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হবে না। প্রশ্ন তো করা হবে তাঁর প্রদত্ত বিধানাবলী সম্পর্কে যে, আমি তা কতটুকু পালন করেছি। কাজেই তাতে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। (উকূদুল জুমান) অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতের লাভ-লোকসান যে বিষয়ের সাথে জড়িত নয়, তা নিয়ে প্রশ্নোত্তরে লিপ্ত হওয়া কিছু বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এরকম অহেতুক বিষয়ে প্রশ্ন করতে কুরআন মাজীদেই নিষেধ আছে। যখন হজ্ব ফরয করা হয় এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, হজ্ব কি প্রতি বছর ফরয? উত্তরে তিনি বললেন, যদি আমি হাঁ’বলি তবে তাই হবে। যে বিষয়ে তোমাদেরকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করো না। । এরই পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﺍٰﻣَﻨُﻮْﺍ ﻟَﺎ ﺗَﺴْـَٔﻠُﻮْﺍ ﻋَﻦْ ﺍَﺷْﯿَﺂﺀَ ﺍِﻥْ ﺗُﺒْﺪَ ﻟَﻜُﻢْ ﺗَﺴُﺆْﻛُﻢْ .
হে মুমিনগণ! তোমরা সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশিত হলে তোমরা দুঃখিত হবে। [সূরা মায়িদা (৫) : ১০১] -জামে তিরমিযী, হাদীস ৮১৪
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে সতর্ক করে দেন যে, দেখ, তোমাদের আগের জাতিসমূহ বাড়তি প্রশ্নের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তাদেরকে তাদের নবী যখন কোনও বিষয়ে হুকুম করতেন, তারা তার বিপরীতে নানা প্রশ্ন করে তাকে উত্ত্যক্ত করত। (সাবধান তোমরা সে রকম করো না। তবে) তোমরা যদি আমাকে কোনও বিষয়ে জিজ্ঞেস কর আমি অবশ্যই তা তোমাদের বলে দেব। তখন বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা রা. প্রশ্ন করে বসলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কে? বললেন, তোমার পিতা হুযাফা ইবনে কায়স। তারপর তিনি নিজ মায়ের কাছে গিয়ে এ বৃত্তান্ত জানালেন। তার মা তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ছি বাবা! এ কথা কেন জিজ্ঞেস করলে? আমরা জাহিলী যুগে ছিলাম। কত রকম খারাপ কাজ করতাম। সে মতে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কাউকে তোমার বাবা বলতেন কিয়ামত পর্যন্ত আমার মুখে চুনকালি পড়ত। অন্য এক বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আমার প্রবেশ কোথায় হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জাহান্নামে। এ অবস্থা দেখে হযরত উমর রা. সচকিত হয়ে উঠলেন। তিনি হাটু ভেংগে বসে পড়লেন এবং বললেন-
ﺭَﺿِﻴﻨَﺎ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﺭَﺑًّﺎ، ﻭَﺑِﺎﻟْﺈِﺳْﻠَﺎﻡِ ﺩِﻳﻨًﺎ، ﻭَﺑِﻤُﺤَﻤَّﺪٍ ﺭَﺳُﻮﻟًﺎ .
আমরা রাযী ও সন্তুষ্ট যে, আমাদের রব আল্লাহ, আমাদের দ্বীন ইসলাম এবং আমাদের রাসূল ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৫৯; সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৬৫৯, ১০৫৩১
কুরআন মাজীদের এ সতর্কবাণী ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবিয়তের ফলে সাহাবায়ে কিরামের পরিপূর্ণ ইসলাহ সাধিত হয়েছিল, যে কারণে দু’চারটি ঘটনার বাইরে তাদের জীবনে বাড়তি প্রশ্নের কোনও নজীর পাওয়া যায় না।
কিন্তু পরবর্তীকালের মানুষের মধ্যে যারা সাহাবায়ে কিরামের প্রত্যক্ষ তরবিয়ত পায়নি এবং তারও পরে যারা তাবিঈগণের সাহচর্য থেকে জীবন গড়েনি, তারা ক্রমে নববী শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়। তাই তাদের প্রশ্নের ধরন-ধারণও পাল্টে যায়। অনেকে অহেতুক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়েও প্রশ্ন করতে শুরু করে। এরূপ সীমালংঘন যে ঘটবে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। যেমন এক বর্ণনায় আছে, প্রখ্যাত তাবিঈ মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ. বলেন, একদা আমি হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর কাছে বসা ছিলাম। এসময় এক ব্যক্তি তাকে একটা বিষয়ে প্রশ্ন করে। আমি জানি না বিষয়টা কী? হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার! এ বিষয়ে এর আগে আরও দু’জন প্রশ্ন করেছে। এই হচ্ছে তৃতীয়জন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, একদল লোক খুব বেশি প্রশ্ন করবে এবং তাদের প্রশ্নের মাত্রা এ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে যে, জিজ্ঞেস করে বসবে, আল্লাহ তাআলা সব মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, তা আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৫, ২১৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৭৯০
সহজেই বোঝা যায় এটা এক অবান্তর প্রশ্ন। কারণ সকলের যিনি স্রষ্টা তিনি তো মাখলুক হতে পারেন না যে, তার কোনও সৃষ্টিকর্তা থাকবে। তা থাকলে তিনি স্রষ্টাই হতে পারতেন না আর তখন কোনও সৃষ্টিরই অস্তিত্ব লাভ হত না। তো এই যে অবান্তর প্রশ্নের সূচনা হয়েছে তখন থেকে কালক্রমে এর বিস্তার ঘটতে থেকেছে। আর আজ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ দরকারি বিষয়ে প্রশ্ন করে না, অথচ এমন সব বেদরকারি বিষয়ে প্রশ্ন করে, দুনিয়া ও আখিরাতে যার কোনও ফায়দা নেই। সে সম্পর্কে না কবরে, হাশরে প্রশ্ন হবে আর না তা অজানা থাকলে কোনও জ্ঞানী লোক তাকে অজ্ঞ ঠাওরাবে।
এই সীমালংঘন অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কাজের কথা ছেড়ে অকাজে লিপ্ত হওয়া কোনও আকলমন্দী নয়। আকেল ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার জীবনের সীমিত এ সময় কেবল প্রয়োজনীয় কাজেই খরচ করবে। সে হিসেবে যা জানা দরকার সে সম্পর্কে সে অবশ্যই বিজ্ঞজনকে জিজ্ঞেস করবে আর যা জানা অপ্রয়োজনীয়, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকবে। প্রশ্নোত্তর ও সওয়াল-জওয়াবের ক্ষেত্রে এটাই মধ্যপন্থা। আল্লাহ তাআলা সকলকে এ পন্থা ধরে রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।
.
[ মাসিক আলকাউসার » জুমাদাল উলা ১৪৩৮ . ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ]