Latest Post

কওমীর স্বীকৃতি ও দেবিমূর্তি বিরোধী বক্তব্য আর রাজনৈতিক স্বার্থের ভেল্কিবাজি: মুহাম্মাদ মামুনুল হক

ঢাকা ১৩ই এপ্রিল'১৭ আজকের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম দেখে মনে পড়ছে দুই হাজার ছয়ের কথা ৷ যখন হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর দলের...

Tuesday, February 28, 2017

নামাযে হাত বাঁধা ও নাভীর নিচে বাঁধা

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ
প্রশ্ন : কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে নামাযের নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘নামাযে বুকের উপর হাত রাখা সুন্নাহ। হাদীস শরীফে এই নিয়মটিই আছে। অন্য কোনো নিয়ম নেই। সহীহ বুখারীতে সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে, সহীহ ইবনে খুযায়মায় ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এবং মুসনাদে আহমদে হুলব আতত্বয়ী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে বুকের উপর হাত বাঁধার কথা আছে। এছাড়া তাউস রাহ. থেকে একটি মুরসাল হাদীসে এবং হযরত আলী রা. থেকে সূরায়ে কাওসারের তাফসীরে নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার কথা বর্ণিত হয়েছে।
‘পক্ষান্তরে নাভীর নীচে হাত বাঁধার কোনো প্রমাণ সহীহ হাদীসে নেই। এ সম্পর্কে যত হাদীস ও আছার আছে সব জয়ীফ।’
আমার বন্ধুটি একজন আলেম। আমারও উলূমুল হাদীস বিষয়ে কিছু পড়াশোনা আছে। তার সাথে আলোচনার পর আমি বিষয়টির উপর কিছু পড়াশোনাও করেছি।
নামাযে হাত বাঁধার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এবং উপরোক্ত বিষয়ে ইলমী সমাধান আপনাদের নিকট কামনা করছি। আল্লাহ তাআলা আপনাদের জাযায়ে খায়ের দান করুন।
রাইয়ান ইবনে লুৎফুর রহমান
পল্লবী, ঢাকা-১২১৬
উত্তর : নামাযে হাত বাঁধা সুন্নত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে হাত বেঁধেছেন। তাঁর ডান হাত থাকত বাম হাতের কব্জির উপর। সাহাবায়ে কেরামকে এভাবেই নামায পড়ার আদেশ করা হত এবং তাঁরাও এভাবেই হাত বেঁধে নামায পড়তেন।
নামাযে হাত বাঁধা
হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর দিয়ে দুই হাত তুললেন। রাবী বলেন, দুই কান বরাবর। এরপর পরিধানের চাদর গায়ে জড়িয়ে নিলেন, এরপর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন ...।
ﻋﻦ ﻭﺍﺋﻞ ﺑﻦ ﺣﺠﺮ : ﺃﻧﻪ ﺭﺃﻯ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺭﻓﻊ ﻳﺪﻳﻪ ﺣﻴﻦ ﺩﺧﻞ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻛﺒﺮ، ﻭﺻﻒ ﻫﻤﺎﻡ ﺣﻴﺎﻝ ﺃﺫﻳﻨﻪ، ﺛﻢ ﺍﻟﺘﺤﻒ ﺑﺜﻮﺑﻪ، ﺛﻢ ﻭﺿﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ...
- সহীহ মুসলিম ১/১৭৩
হযরত হুলব আতত্বয়ী রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইমাম হতেন এবং তাঁর ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরতেন।
ﻛﺎﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺆﻣﻨﺎ ﻓﻴﺄﺧﺬ ﺷﻤﺎﻟﻪ ﺑﻴﻤﻴﻨﻪ . ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ﻭﻗﺎﻝ : ﺣﺪﻳﺚ ﺣﺴﻦ .
-জামে তিরমিযী ১/৩৪; ইবনে মাজাহ ৫৯
হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. বলেন, লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন নামাযে ডান হাত বাম বাহুর উপর রাখে।’-সহীহ বুখারী ১/১০৪
ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻳﺆﻣﺮﻭﻥ ﺃﻥ ﻳﻀﻊ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﺍﻟﻴﺪ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺫﺭﺍﻋﻪ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ . ﻗﺎﻝ ﺃﺑﻮ ﺣﺎﺗﻢ : ﻻ ﺃﻋﻠﻤﻪ ﺇﻻ ﻳﻨﻤﻰ ﺫﻟﻚ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ .
হযরত জাবির রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নামাযরত ব্যক্তির নিকট দিয়ে গমন করছিলেন, যিনি ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে নামায পড়ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত খুলে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫০৯০
ﻣﺮ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺑﺮﺟﻞ ﻭﻫﻮ ﻳﺼﻠﻲ ﻗﺪ ﻭﺿﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻓﺎﻧﺘﺰﻋﻬﺎ ﻭﻭﺿﻊ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ . ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻬﻴﺜﻤﻲ ﻓﻲ ﻣﺠﻤﻊ ﺍﻟﺰﻭﺍﺋﺪ
٢ / ٢۷٥ : ﺭﺟﺎﻟﻪ ﺭﺟﺎﻝ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ .
আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আমরা নবীগণ আদিষ্ট হয়েছি দ্রুত (সময় হওয়ামাত্র) ইফতার করতে, বিলম্বে (সময়ের শেষের দিকে) সাহরী খেতে এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে।’
ﺳﻤﻌﺖ ﻧﺒﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﻘﻮﻝ : ﺇﻧﺎ ﻣﻌﺎﺷﺮ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ﺃﻣﺮﻧﺎ ﺑﺘﻌﺠﻴﻞ ﻓﻄﺮﻧﺎ ﻭﺗﺄﺧﻴﺮ ﺳﺤﻮﺭﻧﺎ ﻭﺃﻥ ﻧﻀﻊ ﺃﻳﻤﺎﻧﻨﺎ ﻋﻠﻰ ﺷﻤﺎﺋﻠﻨﺎ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ . ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻬﻴﺜﻤﻲ
ﻓﻲ ﻣﺠﻤﻊ ﺍﻟﺰﻭﺍﺋﺪ ١ / ٢۷٥ : ﺭﺟﺎﻟﻪ ﺭﺟﺎﻝ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ .
-সহীহ ইবনে হিববান ৩/১০১, হাদীস : ১৭৬৬; আলমুজামুল কাবীর ১১/১৫৯, হাদীস : ১১৪৮৫
হারিছ ইবনে গুতাইফ রা. বলেন, ‘আমি এটা ভুলিনি যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতে দেখেছি, অর্থাৎ নামাযে।’
ﻣﻬﻤﺎ ﺭﺃﻳﺖ ﻧﺴﻴﺖ ﻟﻢ ﺃﻧﺲ ﺃﻧﻲ ﺭﺃﻳﺖ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﺿﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻳﻌﻨﻲ : ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ .
-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৫৬; মুসনাদে আহমদ ৪/১০৫, হাদীস : ১৬৯৬৭-৬৮, ২২৪৯৭
মোটকথা, নামাযে হাত বেঁধে দাঁড়ানো সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক সাহাবী তা বর্ণনা করেছেন। এ কারণে নামাযে হাত ছেড়ে দাঁড়ানো, যা মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো ইমাম গ্রহণ করেছেন, মূল সুন্নাহ নয়।
মালেকী মাযহাবের প্রাচীন গ্রন্থ ‘‘আলমুদাওয়ানাতুল কুবরা’’য় আছে, আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম রাহ. ইমাম মালিক রাহ. থেকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার বিষয়ে বর্ণনা করেছেন যে, ‘ফরয নামাযে এই নিয়ম আমার জানা নেই এবং তিনি তা অপছন্দ করতেন। তবে নফল নামাযে কিয়াম যখন দীর্ঘ হয় তখন হাত বাঁধতে বাঁধা নেই।’
ﻗﺎﻝ : ﻭﻗﺎﻝ ﻣﺎﻟﻚ ﻓﻲ ﻭﺿﻊ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻗﺎﻝ : ﻻ ﺃﻋﺮﻑ ﺫﻟﻚ ﻓﻲ ﺍﻟﻔﺮﻳﻀﺔ ﻭﻛﺎﻥ ﻳﻜﺮﻫﻪ، ﻭﻟﻜﻦ ﻓﻲ ﺍﻟﻨﻮﺍﻓﻞ ﺇﺫﺍ ﻃﺎﻝ ﺍﻟﻘﻴﺎﻡ ﻓﻼ ﺑﺄﺱ ﺑﺬﻟﻚ ﻳﻌﻴﻦ ﺑﻪ ﻧﻔﺴﻪ .
কিন্তু এ রেওয়ায়েত উল্লেখ করার পর সুহনূন (গ্রন্থকার) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব রাহ. সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর সূত্রে একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে দেখেছেন।
ﻗﺎﻝ ﺳﺤﻨﻮﻥ ﻋﻦ ﺍﺑﻦ ﻭﻫﺐ ﻋﻦ ﺳﻔﻴﺎﻥ ﺍﻟﺜﻮﺭﻱ ﻋﻦ ﻏﻴﺮ ﻭﺍﺣﺪ ﻣﻦ ﺃﺻﺤﺎﺏ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺃﻧﻬﻢ ﺭﺃﻭﺍ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﺍﺿﻌﺎ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ .
- আলমুদাওয়ানাহ ১/৭৬
ইমাম মালেক রাহ.-এর অন্য অনেক শাগরিদ তাঁর থেকে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণনা করেছেন। মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত মনীষীদের অনেকেই তাঁর এই রেওয়ায়েতকেই বিশুদ্ধ ও অগ্রগণ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
ইমাম মালিক রাহ.-এর ‘আলমুয়াত্তা’য় এ নিয়মই বর্ণিত হয়েছে।
‘আততাজ ওয়াল ইকলীল লিমুখতাসারিল খালীল’ কিতাবে ইমাম মালেক রাহ. থেকে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণনা করার পর ইবনে রুশদ মালেকীর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘এটিই অগ্রগণ্য ও শক্তিশালী। কারণ প্রথম যুগে মানুষকে এরই আদেশ করা হত।’
ﺍﺑﻦ ﺭﺷﺪ : ﻭﻫﺬﺍ ﻫﻮ ﺍﻷﻇﻬﺮ، ﻷﻥ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻛﺎﻧﻮﺍ ﻳﺆﻣﺮﻭﻥ ﺑﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﺰﻣﺎﻥ ﺍﻷﻭﻝ .
তদ্রূপ কাযী ইয়ায মালেকী রাহ. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আমাদের শায়খগণ ডান হাতের পাতা বাম হাতের কব্জির উপর মুঠ করার নিয়মই গ্রহণ করেছেন।’
ﻋﻴﺎﺽ : ﺍﺧﺘﺎﺭ ﺷﻴﻮﺧﻨﺎ ﻗﺒﺾ ﻛﻒ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺭﺳﻎ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ .
-আততাজ ওয়াল ইকলীল, আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আলমাওওয়াক আলমালেকী (৮৯৭ হি.) মাওয়াহিবুল জালীলের সাথে মুদ্রিত ২/২৪০
ইমাম কুরতুবী মালেকী রাহ.ও (৬৭১ হি.) হাত বাঁধার রেওয়ায়েতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করে বলেন, ‘এটিই সঠিক। কারণ হযরত ওয়াইল রা. ও অন্যান্য সাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাত বাম হাতের উপর রেখেছেন।’ -আলজামি লিআহকামিল কুরআনিল কারীম ২০/১৫০ এ প্রসঙ্গে মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত মনীষী ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. (৪৬৩ হি.) শক্তিশালী আলোচনা করেছেন। তিনি হাত বাঁধার নিয়মকে শুধু অগ্রাধিকারই দেননি; বরং এর বিপরীতে ইমাম মালেক রাহ. থেকে যা কিছু বর্ণনা করা হয় তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় খন্ডনও করেছেন। তাঁর আলোচনার কিছু অংশ মূল পাঠসহ তুলে দেওয়া হল।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে (নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ভিন্ন কিছু বর্ণিত হয়নি এবং কোনো সাহাবী এ নিয়মের বিরোধিতা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। শুধু আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়, তিনি নামাযে হাত ছেড়ে রাখতেন, তবে এর বিপরীত কথাও তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইতিপূর্বে আমরা তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করেছি যে,
‘সুন্নাহ হচ্ছে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা।’
জুমহূর তাবেয়ীন ও মুসলিম উম্মাহর আহলুর রায় ও আহলুল আছর উভয় ঘরানার অধিকাংশ ফকীহ এই নিয়মই গ্রহণ করেছেন।’
ﻟﻢ ﺗﺨﺘﻠﻒ ﺍﻵﺛﺎﺭ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻲ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺒﺎﺏ ﻭﻻ ﺃﻋﻠﻢ ﻋﻦ ﺃﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺼﺤﺎﺑﺔ ﻓﻲ ﺫﻟﻚ ﺧﻼﻓﺎ ﺍﻻﺷﻲﺀ ﺭﻭﻱ ﻋﻦ ﺍﺑﻦ ﺍﻟﺰﺑﻴﺮ ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﺮﺳﻞ ﻳﺪﻳﻪ ﺇﺫﺍ ﺻﻠﻰ ﻭﻗﺪ ﺭﻭﻯ ﻋﻨﻪ ﺧﻼﻓﻪ ﻣﻤﺎ ﻗﺪﻣﻨﺎ ﺫﻛﺮﻩ ﻋﻨﻪ ﻭﺫﻟﻚ ﻗﻮﻟﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ‏( ﻛﺬﺍ ‏) ﻭﺿﻊ ﺍﻟﻴﻤﻴﻦ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺸﻤﺎﻝ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﻨﺔ، ﻭﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍ ﺟﻤﻬﻮﺭ ﺍﻟﺘﺎﺑﻌﻴﻦ ﻭﺃﻛﺜﺮ ﻓﻘﻬﺎﺀ ﺍﻟﻤﺴﻠﻤﻴﻦ ﻣﻦ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺮﺃﻱ ﻭﺍﻷﺛﺮ .
- আততামহীদ ২০/৭৪-৭৫
তিনি আরো বলেন, ‘ইবনুল কাসিম ছাড়া অন্যরা ইমাম মালেক রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ফরয-নফল কোনো নামাযেই হাত বাঁধতে বাধা নেই। আর এটিই তাঁরা মদীনাবাসী শাগরিদদের বর্ণনা।’
... ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻨﻪ ‏( ﺃﻱ ﻋﻦ ﻣﺎﻟﻚ ‏) ﻏﻴﺮ ﺍﺑﻦ ﺍﻟﻘﺎﺳﻢ : ﻻ ﺑﺄﺱ ﺑﺬﻟﻚ ﻓﻲ ﺍﻟﻔﺮﻳﻀﺔ ﻭﺍﻟﻨﺎﻓﻠﺔ، ﻭﻫﻲ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺍﻟﻤﺪﻧﻴﻴﻦ ﻋﻨﻪ .
প্রাগুক্ত-
এরপর কোনো কোনো তাবেয়ী থেকে নামাযে হাত ছেড়ে রাখার যে বর্ণনা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি বলেন, ‘এই হচ্ছে কতিপয় তাবেয়ীর (আমলের) কিছু বিবরণ। তবে তা (আলোচিত সুন্নাহর) খিলাফ ও বিরোধিতা নয়। কারণ তাদের কেউ (হাত বাঁধা) অপছন্দ করতেন এমনটা পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও তা দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যেত না। কারণ সুন্নাহর অনুসারীদের জন্য সুন্নাহই হচ্ছে দলীল। আর যারা এর বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধেও দলীল হচ্ছে সুন্নাহ, বিশেষত যে সুন্নাহয় কোনো সাহাবীর ভিন্নমত নেই।
ﻓﻬﺬﺍ ﻣﺎ ﺭﻭﻱ ﻋﻦ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﺘﺎﺑﻌﻴﻦ ﻓﻲ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺒﺎﺏ ﻭﻟﻴﺲ ﺑﺨﻼﻑ، ﻷﻧﻪ ﻻ ﻳﺜﺒﺖ ﻋﻦ ﻭﺍﺣﺪ ﻣﻨﻬﻢ ﻛﺮﺍﻫﻴﺔ، ﻭﻟﻮ ﺛﺒﺖ ﺫﻟﻚ ﻣﺎ ﻛﺎﻧﺖ ﻓﻴﻪ ﺣﺠﺔ، ﻷﻥ ﺍﻟﺤﺠﺔ ﻓﻲ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻟﻤﻦ ﺍﺗﺒﻌﻬﺎ، ﻭﻣﻦ ﺧﺎﻟﻔﻬﺎ ﻓﻬﻮ ﻣﺤﺠﻮﺝ ﺑﻬﺎ، ﻭﻻ ﺳﻴﻤﺎ ﺳﻨﺔ ﻟﻢ ﻳﺜﺒﺖ ﻋﻦ ﻭﺍﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﺼﺤﺎﺑﺔ ﺧﻼﻓﻬﺎ .
- প্রাগুক্ত ২০/৭৬
তিনি আরো বলেন, ‘(হাত বাধার ক্ষেত্রে) ফরয-নফলে পার্থক্য করার কোনো যুক্তি নেই, যদিও কেউ বলে থাকেন যে, হাত বাঁধার নিয়মটি নফল নামাযের ক্ষেত্রে, ফরযের ক্ষেত্রে নয়। কারণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত নফল নামায ঘরে আদায় করতেন। সুতরাং এটা যদি তাঁর ঘরের নামাযের নিয়ম হত তাহলে তা বর্ণনা করতেন তাঁর স্ত্রীগণ। কিন্তু তাঁরা এ বিষয়ে কিছুই বর্ণনা করেননি। যাঁরা বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন তাঁরা তাঁর নিকট রাত্রিযাপন করতেন না এবং তাঁর ঘরেও প্রবেশ করতেন না। তাঁরা তো তা-ই বর্ণনা করেছেন, যা তাঁকে করতে দেখেছেন তাঁর পিছনে ফরয নামায আদায়ের সময়।’
ﻭﻛﺬﻟﻚ ﻻ ﻭﺟﻪ ﻟﻠﺘﻔﺮﻗﺔ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻨﺎﻓﻠﺔ ﻭﺍﻟﻔﺮﻳﻀﺔ، ﻭﻟﻮ ﻗﺎﻝ ﻗﺎﺋﻞ ﺇﻥ ﺫﻟﻚ ﻓﻲ ﺍﻟﻔﺮﻳﻀﺔ ﺩﻭﻥ ﺍﻟﻨﺎﻓﻠﺔ، ﻷﻥ ﺃﻛﺜﺮ ﻣﺎ ﻛﺎﻥ ﻳﺘﻨﻔﻞ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻲ ﺑﻴﺘﻪ ﻟﻴﻼ، ﻭﻟﻮ ﻓﻌﻞ ﺫﻟﻚ ﻓﻲ ﺑﻴﺘﻪ ﻟﻨﻘﻞ ﻋﻨﻪ ﺫﻟﻚ ﺃﺯﻭﺍﺟﻪ ﻭﻟﻢ ﻳﺄﺕ ﻋﻨﻬﻦ ﻓﻲ ﺫﻟﻚ ﺷﻲﺀ، ﻭﻣﻌﻠﻮﻡ ﺃﻥ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺭﻭﻭﺍ ﻋﻨﻪ ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻀﻊ ﻳﻤﻴﻨﻪ ﻋﻠﻰ ﻳﺴﺎﺭﻩ ﻓﻲ ﺻﻼﺗﻪ ﻟﻢ ﻳﻜﻮﻧﻮﺍ ﻣﻤﻦ ﻳﺒﻴﺖ ﻋﻨﺪﻩ، ﻭﻻ ﻳﻠﺞ ﺑﻴﺘﻪ، ﻭﺇﻧﻤﺎ ﺣﻜﻮﺍ ﻋﻨﻪ ﻣﺎ ﺭﺃﻭﺍ ﻣﻨﻪ ﻓﻲ ﺻﻼﺗﻬﻢ ﺧﻠﻔﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﻔﺮﺍﺋﺾ، ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﻋﻠﻢ .
- প্রাগুক্ত ২০/৭৯
হাত কোথায় বাঁধা হবে
তো এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে হাত বাঁধতেন এবং সাহাবায়ে কেরামও হাত বাঁধতেন। এখন প্রশ্ন হল, কোথায় তাঁরা হাত বাঁধতেন? মৌখিক বর্ণনায় হাত বাঁধার মূল প্রসঙ্গ যত পরিষ্কারভাবে এসেছে কোথায় বাঁধতেন তা সেভাবে আসেনি। কেন আসেনি? আসার প্রয়োজন হয়নি। কারণ সবাই হাত বাঁধছেন। কোথায় বাঁধছেন তা সবার সামনেই পরিষ্কার। কাজেই তা মুখে বর্ণনা করার প্রয়োজন হয়নি। তো যে সুন্নাহ কর্মে ও অনুসরণে ব্যাপকভাবে রয়েছে তা মৌখিক বর্ণনায় সেভাবে নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে পরের যুগের লোকদের জন্য সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁরা ঐ সময়ের কর্ম ও অনুশীলনের প্রত্যক্ষদর্শী।
নামাযে হাত বাঁধার সুন্নাহর উপর সাহাবা-তাবেয়ীন কীভাবে আমল করেছেন-এ বিষয়ে ইমাম তিরমিযী রাহ. (২৭৯ হি.) বলেন-
ﻭﺍﻟﻌﻤﻞ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍ ﻋﻨﺪ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﻣﻦ ﺃﺻﺤﺎﺏ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﺍﻟﺘﺎﺑﻌﻴﻦ ﻭﻣﻦ ﺑﻌﺪﻫﻢ، ﻳﺮﻭﻥ ﺃﻥ ﻳﻀﻊ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻳﻤﻴﻨﻪ ﻋﻠﻰ ﺷﻤﺎﻟﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻭﺭﺃﻯ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﺃﻥ ﻳﻀﻌﻬﻤﺎ ﻓﻮﻕ ﺍﻟﺴﺮﺓ، ﻭﺭﺃﻯ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﺃﻥ ﻳﻀﻌﻬﻤﺎ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ، ﻭﻛﻞ ﺫﻟﻚ ﻭﺍﺳﻊ ﻋﻨﺪﻫﻢ .
অর্থাৎ আহলে ইলম সাহাবা-তাবেয়ীন ও তাঁদের পরবর্তী মনীষীগণ এই হাদীসের উপর (ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরা) আমল করেছেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে, নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে হবে। তাঁদের কেউ নাভীর উপর হাত রাখার কথা বলতেন, আর কেউ নাভীর নিচে রাখাকে (অগ্রগণ্য) মনে করতেন। (তবে) দুটো নিয়মই তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল।-জামে তিরমিযী ১/৩৪
বস্ত্তত এটা হচ্ছে হাত বাঁধার হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক পদ্ধতি। সাহাবা-তাবেয়ীনের যমানা থেকে এ দুটি নিয়মই চলে আসছে। পরবর্তীতে জুমহূর ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমামগণ এ দুই নিয়ম গ্রহণ করেছেন। এভাবে উম্মাহর তাওয়ারুছ ও ব্যাপক চর্চার মাধ্যমে নামাযে হাত বাঁধার যে নিয়ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছেছে তা উল্লেখিত হাদীসসমূহেরই ব্যবহারিক রূপ। এ কারণে পরবর্তী যুগে বিচ্ছিন্ন কোনো নিয়ম আবিষ্কার করে তাকে হাদীস শরীফের উপর আরোপ করা হাদীসের তাহরীফ ও অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।
নাভীর নিচে হাত বাঁধা
উপরোক্ত দুই নিয়মের মাঝে নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মটি রেওয়ায়েতের বিচারে অগ্রগণ্য। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. (২৩৮ হি.) বলেছেন, ‘নাভীর নিচে হাত বাঁধা রেওয়ায়েতের বিচারে অধিক শক্তিশালী এবং ভক্তি ও বিনয়ের অধিক নিকটবর্তী।’
ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ ﺃﻗﻮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ ﺃﻗﻮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻭﺃﻗﺮﺏ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﺘﻮﺍﺿﻊ
তাবেয়ী আবু মিজলায লাহিক ইবনে হুমাইদ রাহ. (মৃত্যু : ১০০ হি.-এর পর) নামাযে কোথায় হাত বাঁধবে-এ প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬৩
এই রেওয়ায়েতের সনদ সহীহ।
সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই -
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻳﺰﻳﺪ ﺑﻦ ﻫﺎﺭﻭﻥ ﻗﺎﻝ : ﺃﺧﺒﺮﻧﺎ ﺍﻟﺤﺠﺎﺝ ﺑﻦ ﺣﺴﺎﻥ ﻗﺎﻝ : ﺳﻤﻌﺖ ﺃﺑﺎ ﻣﺠﻠﺰ ـ ﺃﻭ ﺳﺄﻟﺘﻪ ـ ﻗﺎﻝ : ﻗﻠﺖ ﻛﻴﻒ ﺃﺻﻨﻊ؟ ﻗﺎﻝ : ﻳﻀﻊ ﺑﺎﻃﻦ ﻛﻒ ﻳﻤﻨﻴﻪ ﻋﻠﻰ ﻇﺎﻫﺮ ﻛﻒ ﺷﻤﺎﻟﻪ ﻭﻳﺠﻌﻠﻬﺎ ﺃﺳﻔﻞ ﻣﻦ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.ও (মৃত্যু : ৯৬ হি.) এই ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬০
এই রেওয়ায়েতের সনদ হাসান। সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই-
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻭﻛﻴﻊ، ﻋﻦ ﺭﺑﻴﻊ، ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻣﻌﺸﺮ، ﻋﻦ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﻗﺎﻝ : ﻳﻀﻊ ﻳﻤﻴﻨﻪ ﻋﻠﻰ ﺷﻤﺎﻟﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশশাইবানী রাহ. (১৮৯ হি.) বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. নাভীর নিচে হাত বাঁধতেন। এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা এই নিয়মই অনুসরণ করি এবং এটিই (ইমাম) আবু হানীফার সিদ্ধান্ত।’-কিতাবুল আছার, হাদীস : ১২১
সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
ﻗﺎﻝ ﻣﺤﻤﺪ : ﺃﺧﺒﺮﻧﺎ ﺍﻟﺮﺑﻴﻊ ﺑﻦ ﺻﺒﻴﺢ، ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻣﻌﺸﺮ، ﻋﻦ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ : ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻀﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ . ﻗﺎﻝ ﻣﺤﻤﺪ : ﻭﺑﻪ ﻧﺄﺧﺬ ﻭﻫﻮ ﻗﻮﻝ ﺃﺑﻲ ﺣﻨﻴﻔﺔ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ . ‏( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻗﺎﻋﺪﺍ ﻭﺍﻟﺘﻌﻤﺪ ﻋﻠﻰ ﺷﻲﺀ ﺃﻭ ﻳﺼﻠﻲ ﺇﻟﻰ ﺳﺘﺮﺓ ‏)
প্রসঙ্গত আগেই বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল হচ্ছে হাত বাঁধা সংক্রান্ত মারফূ হাদীসসমূহের ব্যবহারিক রূপ। এ কারণে মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ-এর সূত্রে হাত বাঁধার মরফূ হাদীস বর্ণনা করার পর এই নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।
রেওয়ায়েতটি এই-
ﺃﺧﺒﺮﻧﺎ ﺃﺑﻮ ﺣﻨﻴﻔﺔ، ﻋﻦ ﺣﻤﺎﺩ ﻋﻦ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻛﺎﻥ ﻳﻌﺘﻤﺪ ﺑﺈﺣﺪﻯ ﻳﺪﻳﻪ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺧﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻳﺘﻮﺍﺿﻊ ﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ . ﻗﺎﻝ ﻣﺤﻤﺪ : ﻭﻳﻀﻊ ﺑﻄﻦ ﻛﻔﻪ ﺍﻷﻳﻤﻦ ﻋﻠﻰ ﺭﺳﻐﻪ ﺍﻷﻳﺴﺮ، ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ، ﻓﻴﻜﻮﻥ ﺍﻟﺮﺳﻎ ﻓﻲ ﻭﺳﻂ ﺍﻟﻜﻒ، ‏( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻷﺛﺎﺭ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻗﺎﻋﺪﺍ ﻭﺍﻟﺘﻌﻤﺪ ﻋﻠﻰ ﺷﻲﺀ ﺃﻭ ﻳﺼﻠﻲ ﺇﻟﻰ ﺳﺘﺮﺓ ‏)
ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে এক হাতের উপর অন্য হাত বাঁধতেন। এভাবে তিনি আল্লাহর সামনে বিনীত হতেন।’
(ইমাম) মুহাম্মাদ বলেন, ‘ডান হাতের তালু বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে, নাভীর নিচে; সুতরাং কব্জি থাকবে হাতের তালুর মাঝে।’-কিতাবুল আছার, হাদীস : ১২০
খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণও নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করেছেন।
ইমাম ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. (৬২০ হি.) বলেন, নামাযে কোথায় হাত বাঁধা হবে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা আছে। (ইমাম) আহমদ রাহ. থেকে বর্ণিত, দুই হাত নাভীর নিচে রাখবে। এটি (হযরত) আলী রা., আবু হুরায়রা রা., আবু মিজলায রাহ., ইবরাহীম নাখায়ী রাহ., (সুফিয়ান) ছাওরী রাহ., ইসহাক (ইবনে রাহুয়াহ) রাহ. থেকে বর্ণিত।-আলমুগনী ২/১৪১
উল্লেখ্য, ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. ‘আলমুগনী’তে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. থেকে মোট তিনটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। তবে মূল মতন অর্থাৎ
‘মুখতাসারুল খিরাকী’তে শুধু নাভীর নিচে হাত বাঁধার কথাই বলা হয়েছে।
আরবী পাঠ- ﻭﻳﺠﻌﻞ ﻫﻢﺍ ﻭﻳﺠﻌﻠﻬﻤﺎ ﺗﺤﺖ ﺳﺮﺗﻪ
‘মুখতাসারে’র ভূমিকায় লেখক ইমাম আবুল কাসিম উমার ইবনুল হুসাইন আলখিরাকী (৩৩৪ হি.) বলেছেন,
‘আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-এর মাযহাব অনুসারে (শরীয়তের মাসাইল) এই কিতাবে সংকলন করেছি।’
ﺍﺧﺘﺼﺮﺕ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ ﻟﻴﻘﺮﺏ ﻋﻠﻰ ﻣﺘﻌﻠﻤﻪ ﻋﻠﻰ ﻣﺬﻫﺐ ﺃﺑﻲ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﺃﺣﻤﺪ ﺑﻦ ﻣﺤﻤﺪ ﺑﻦ ﺣﻨﺒﻞ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ .
-আলমুগনী ১/৭-৮
শায়খ আবুল হুসাইন ইয়াহইয়া ইবনে আবুল খায়ের রাহ. (মৃত্যু ৫৫৮ হি.) বলেন, (ইমাম) আবু ইসহাক (আলমারওয়াযী) রাহ. বলেছেন, ‘এক হাত অন্য হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-আলবায়ান ফী মাযাহিবিল ইমামিশ শাফেয়ী ২/১৭৫
উল্লেখ্য, ইমাম আবু ইসহাক আলমারওয়াযী রাহ. শাফেয়ী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ মনীষী। ইমাম শাফেয়ী রাহ. নাভীর উপর (বুকের নিচে) হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করলেও আবু ইসহাক মারওয়াযী নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মকেই অগ্রগণ্য মনে করেছেন।
ইমাম নববী রাহ. (৬৭৬ হি.) বলেন, (ইমাম) আবু হানীফা, (সুফিয়ান) ছাওরী ও ইসহাক (ইবনে রাহুয়াহ) বলেন, ‘দুই হাত নাভীর নিচে রাখবে। আমাদের (শাফেয়ী মাযহাবের) মনীষীদের মধ্যে আবু ইসহাক আলমারওয়াযী রাহ.ও তা গ্রহণ করেছেন। আর ইবনুল মুনযির তা বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা, (ইবরাহীম) নাখায়ী ও আবু মিজলায রাহ. থেকে।
তিনি আরো বলেন, ‘আলী ইবনে আবী তালিব রা. থেকে দুটি রেওয়ায়েত আছে : এক. নাভীর উপর হাত বাঁধা, দুই. নাভীর নিচে হাত বাঁধা।
-আলমাজমূ শরহুল মুহাযযাব ৪/৩৩০
উল্লেখ্য, জনৈক গবেষক একটি রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তার এই প্রয়াস যথার্থ নয়। কারণ হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত মনীষীগণ ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করেছেন। ইবনুল মুনযির রাহ. (৩১৮ হি.) স্বয়ং ইসহাক ইবনে রাহুয়াহর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে,
‘নাভীর নিচে হাত বাঁধা রেওয়ায়েতের বিচারে শক্তিশালী এবং ভক্তি ও বিনয়ের অধিক নিকটবর্তী।’
সুতরাং এখানে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। আর যে রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, তিনি বুকের উপর হাত বাঁধতেন ঐ রেওয়ায়েতেও তা নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি। বলা হয়েছে, তিনি বিতর নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধতেন বা বুকের নিচে।
আরবী পাঠ-
ﻛﺎﻥ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﻳﻮﺗﺮ ﺑﻨﺎ ... ﻭﻳﻀﻊ ﻳﺪﻳﻪ ﻋﻠﻰ ﺛﺪﻳﻴﻪ ﺃﻭ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺜﺪﻳﻴﻦ .
আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে, নাভীর নিচে ও নাভীর উপরে (বুকের নিচে) দু’ জায়গায় হাত বাঁধার নিয়মই সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল। তাঁরা একটিকে অগ্রগণ্য মনে করলেও কেউ অন্যটিকে অনুসরণযোগ্য মনে করতেন। তো ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. যদি নাভীর নিচে হাত বাঁধাকে অগ্রগণ্য মনে করার পর কখনো কখনো নাভীর উপরে হাত বাঁধার নিয়ম অনুসরণ করে থাকেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই একটি অস্পষ্ট রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে কোনো একটি বিচ্ছিন্ন মত কারো উপর আরোপ করার অবকাশ নেই। এটি বরং আরোপকারীর দলীল-প্রমাণের দৈন্য এবং শুযূয ও বিছিন্নতাকেই প্রকটভাবে প্রকাশিত করে দেয়।
মূল আলোচনায় ফিরে আসি। এ পর্যন্ত আমরা খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণের ফতোয়া ও আমল লক্ষ্য করেছি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের যমানায় নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছে, যা হাত বাঁধার মরফূ হাদীসমূহেরই ব্যাখ্যা ও ব্যবহারিক রূপ।
নাভীর নিচে হাত বাঁধা যেমন সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া দ্বারা প্রমাণিত তেমনি মারফূ রেওয়ায়েতের সূত্রেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত।
নাভীর নিচে হাত বাঁধার মারফূ রেওয়ায়েত
১. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নীচে রেখেছেন।
সনদসহ রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻭﻛﻴﻊ، ﻋﻦ ﻣﻮﺳﻰ ﺑﻦ ﻋﻤﻴﺮ، ﻋﻦ ﻋﻠﻘﻤﺔ ﺑﻦ ﻭﺍﺋﻞ ﺑﻦ ﺣﺠﺮ، ﻋﻦ ﺃﺑﻴﻪ ﻗﺎﻝ : ﺭﺃﻳﺖ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﻀﻊ ﻳﻤﻴﻨﻪ ﻋﻠﻰ ﺷﻤﺎﻟﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৫১
এই বর্ণনার সনদ সহীহ। ইমাম কাসেম ইবনে কুতলূবুগা রাহ. (৮৭৯ হি.) বলেন- ﻭﻫﺬﺍ ﺇﺳﻨﺎ ﺩ ﺟﻲ ﺩ এটি একটি উত্তম সনদ।-আততা’রীফু ওয়াল ইখবার রিতাখরীজি আহাদীছিল ইখতিয়ার-হাশিয়া শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা
উল্লেখ্য, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবার একাধিক পান্ডুলিপিতে হাদীসটি এভাবেই অর্থাৎ ﺓﺡ ﺓ ﺍﻟﺴﺮ ﺓ
(নাভীর নিচে) কথাটাসহ আছে। এর মধ্যে ইমাম মুরতাযা আযাবীদী-এর পান্ডুলিপি ও ইমাম আবিদ আসসিন্দী রাহ.-এর পান্ডুলিপি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম কাসিম ইবনে কুতলূবুগা রাহ., আল্লামা আবদুল কাদির ইবনে আবু বকর আসসিদ্দীকি ও আল্লামা মুহাম্মাদ আকরাম সিন্ধীর পান্ডুলিপিতেও হাদীসটি এভাবে আছে। পক্ষান্তরে অন্য কিছু পান্ডুলিপিতে এই বর্ণনায় ﺓﺡ ﺓ ﺍﻟﺴﺮ ﺓ (নাভীর নিচে) কথাটা নেই। এ কারণে ভারতবর্ষে মুদ্রিত মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবার পুরানো সংস্করণে এই হাদীসে
ﺓﺡ ﺓ ﺍﻟﺴﺮ ﺓ (নাভীর নিচে) অংশটি ছিল না। বর্তমানে মদীনা মুনাওয়ারার বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামার তাহকীক-সম্পাদনায় মুসান্নাফের যে মুদ্রণ পাঠক-গবেষকদের কাছে পৌঁছেছে তাতে হাদীসটি ﺓﺡ ﺓ ﺍﻟﺴﺮ ﺓ (নাভীর নিচে) অংশসহ রয়েছে। কারণ শায়খের সামনে প্রথমোক্ত পান্ডুলিপি দুটিও ছিল। এ বিষয়ে
বিস্তারিত আলোচনার পর শায়খ বলেন-
ﻭﻣﻦ ﻧﻘﻞ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻣﻦ ﺇﺣﺪﻯ ﺍﻟﻨﺴﺦ ﺍﻷﺭﺑﻊ ﺥ . ﻅ . ﻥ . ﺵ . ﺍﻟﺘﻲ ﻟﻴﺴﺖ ﻓﻴﻬﺎ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺠﻤﻠﺔ : ﻣﻌﺬﻭﺭ ﻓﻲ ﻋﺪﻡ ﺇﺛﺒﺎﺕ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺰﻳﺎﺩﺓ، ﻭﻟﻜﻨﻪ ﻟﻴﺲ ﻣﻌﺬﻭﺭﺍ ﻓﻲ ﻧﻔﻲ ﻭﺭﻭﺩﻫﺎ، ﻭﻣﻦ ﻧﻘﻠﻪ ﻋﻦ ﺇﺣﺪﻯ ﺍﻟﻨﺴﺨﺘﻴﻦ ﺍﻟﻠﺘﻴﻦ ﻓﻴﻬﻤﺎ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺰﻳﺎﺩﺓ ﻫﻮ ﻣﻌﺬﻭﺭ ﻓﻲ ﺇﺛﺒﺎﺗﻬﺎ، ﺑﻞ ﻭﺍﺟﺐ ﻋﻠﻴﻪ ﺫﻟﻚ ﻭﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﻟﻬﺎ ﺣﺬﻓﻬﺎ ﻓﻌﻠﻰ ﻡ ﺍﻟﺘﻨﺎﺑﺰ ﻭﺍﻟﺘﻨﺎﺑﺬ؟
উৎসাহী আলিমগণ শায়খের পূর্ণ আলোচনা মুসান্নাফের টীকায় দেখে নিতে পারেন।
উল্লেখ্য, যারা মুআম্মাল ইবনে ইসমাইলের মুনকার রেওয়ায়েত অবলীলায় গ্রহণ করেন তাদের তো এই রেওয়ায়েত গ্রহণে দ্বিধা থাকার কথা নয়। কারণ এক. এই রেওয়ায়েতের সনদ ইবনে খুযায়মার ঐ রেওয়ায়েতের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। দুই. ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে অন্য সূত্রে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়েতেও এর বেশ সমর্থন পাওয়া যায়। ইমাম তবারানী রাহ. হুজর আবুল আম্বাসের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর এই বিবরণ উল্লেখ করেছেন। তাতে আছে, ‘তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন এবং তা রাখলেন পেটের উপর।’
সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﺃﺑﻮ ﻣﺴﻠﻢ ﺍﻟﻜﺸﻲ ﺛﻨﺎ ﺣﺠﺎﺝ ﺑﻦ ﻧﺼﻴﺮ ﺛﻨﺎ ﺷﻌﺒﺔ ﻋﻦ ﺳﻠﻤﺔ ﺑﻦ ﻛﻬﻴﻞ ﻗﺎﻝ : ﺳﻤﻌﺖ ﺣﺠﺮﺍ ﺃﺑﺎ ﺍﻟﻌﻨﺒﺲ ﻳﺤﺪﺙ ﻋﻦ ﻭﺍﺋﻞ ﺍﻟﺤﻀﺮﻣﻲ ﺃﻧﻪ ﺻﻠﻰ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ... ، ﺛﻢ ﻭﺿﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻭﺟﻌﻠﻬﺎ ﻋﻠﻰ ﺑﻄﻨﻪ .
-আলমুজামুল কাবীর ২২/৪৪, হাদীস : ১১০
তেমনি সুনানে দারেমী ও আলমু’জামুল কাবীর তবারানীতে আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইলের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর যে বিবরণ বর্ণিত হয়েছে, তাতে আছে, ‘তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর কব্জির কাছে রাখলেন।’ সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
ﻗﺎﻝ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺍﻟﺪﺍﺭﻣﻲ ﻓﻲ ﺍﻟﺴﻨﻦ ‏( ﺑﺎﺏ ﻭﺿﻊ ﺍﻟﻴﻤﻴﻦ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺸﻤﺎﻝ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ‏) : ﺃﺧﺒﺮﻧﺎ ﺃﺑﻮ ﻧﻌﻴﻢ، ﺛﻨﺎ ﺯﻫﻴﺮ، ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺇﺳﺤﺎﻕ، ﻋﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺠﺒﺎﺭ ﺑﻦ ﻭﺍﺋﻞ، ﻋﻦ ﺃﺑﻴﻪ ﻗﺎﻝ : ﺭﺃﻳﺖ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﻀﻊ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻗﺮﻳﺒﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺮﺳﻎ . ﺍﻧﺘﻬﻰ
ﻭﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﻄﺒﺮﺍﻧﻲ ﺑﻄﺮﻳﻖ ﻋﺒﺪﺍﻥ ﺑﻦ ﺃﺣﻤﺪ، ﺛﻨﺎ ﻋﻤﺮﻭ ﺑﻦ ﻋﺜﻤﺎﻥ ﺍﻟﺤﻤﺼﻲ، ﺛﻨﺎ ﺇﺳﻤﺎﻋﻴﻞ ﺑﻦ ﻋﻴﺎﺵ، ﻋﻦ ﻳﻮﻧﺲ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺑﻪ .
-সুনানে দারেমী ১/২২৮; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২২/২৫, হাদীস : ৫২
এই রেওয়ায়েতগুলো সামনে রাখলে বোঝা যায়, আসিম ইবনে কুলাইবের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর যে বিবরণ যাইদা ইবনে কুদামা বর্ণনা করেছেন, যাতে ‘ডান হাত বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর’ রাখার কথা আছে, তার অর্থ ‘বাহু বাহুর উপর’ রাখা নয়; বরং ডান হাতের পাতা এমনভাবে রাখা যে, তা বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর থাকে। এ সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বুকের উপর হাত বাঁধার মতটি পর্যালোচনা করার সময় ইনশাআল্লাহ।
নাভীর নিচে হাত বাঁধার বিষয়ে জয়ীফ সনদে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়েতও আছে। তবে রেওয়ায়েতগুলোর বিষয়বস্ত্ত উপরে বর্ণিত হাদীস, আছার ও আমলে মুতাওয়ারাছ দ্বারা সমর্থিত।
২. হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সুন্নাহ হচ্ছে নামাযে হাতের পাতা হাতের পাতার উপর নাভীর নিচে রাখা।’-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৮৭৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৬; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬৬
সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই-
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻣﺤﻤﺪ ﺑﻦ ﻣﺤﺒﻮﺏ، ﺣﺪﺛﻨﺎ ﺣﻔﺺ ﺑﻦ ﻏﻴﺎﺙ، ﻋﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺑﻦ ﺇﺳﺤﺎﻕ، ﻋﻦ ﺯﻳﺎﺩ ﺑﻦ ﺯﻳﺪ، ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺟﺤﻴﻔﺔ ﺃﻥ ﻋﻠﻴﺎ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻗﺎﻝ : ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﺿﻊ ﺍﻟﻜﻒ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻜﻒ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻤﺰﻱ ﻓﻲ ﺗﺤﻔﺔ ﺍﻷﺷﺮﺍﻑ ٨ / ٤٥٨ ، ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻓﻲ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺍﺑﻲ ﺳﻌﻴﺪ ﺑﻦ ﺍﻷﻋﺮﺍﺑﻲ، ﻭﺍﺑﻦ ﺩﺍﺳﺔ ﻭﻏﻴﺮ ﻭﺍﺣﺪ ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺩﺍﻭﺩ، ﻭﻟﻢ ﻳﺬﻛﺮﻩ ﺃﺑﻮ ﺍﻟﻘﺎﺳﻢ .
৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,
‘নামাযে হাতের পাতাসমূহ দ্বারা হাতের পাতাসমূহ নাভীর নীচে ধরা হবে।’
সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻣﺴﺪﺩ، ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻮﺍﺣﺪ ﺑﻦ ﺯﻳﺎﺩ، ﻋﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺑﻦ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺍﻟﻜﻮﻓﻲ، ﻋﻦ ﺳﻴﺎﺭ ﺃﺑﻲ ﺍﻟﺤﻜﻢ، ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻭﺍﺋﻞ ﻗﺎﻝ : ﻗﺎﻝ ﺃﺑﻮ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺃﺧﺬ ﺍﻷﻛﻒ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﻛﻒ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৮, তাহকীক : শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ; তুহফাতুল আশরাফ, হাদীস : ১৩৪৯৪
এই দুই রেওয়ায়েতের সনদে আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক নামক একজন রাবী আছেন। ইমাম তিরমিযী রাহ. তার সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসকে হাসান বলেছেন। দেখুন : জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩৪৬২; আরো দেখুন : হাদীস ২৫২৭
আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের সূত্রে হাদীসটি (২৫২৬) বর্ণনা করার পর ইমাম তিরমিযী বলেন, কোনো কোনো মনীষী এই আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন। আরবী পাঠ-
ﺍ ﻫﺬﺍ ﺣﺪﻳﺚ ﻏﺮﻳﺐ ﻭﻗﺪ ﺗﻜﻠﻢ ﺑﻌﺾ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﻓﻲ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﻫﺬﺍ ﻣﻦ ﻗﺒﻞ ﺣﻔﻈﻪ ﻭﻫﻮ ﻛﻮﻓﻲ، ﻭﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺑﻦ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺍﻟﻘﺮﺷﻲ ﻣﺪﻳﻨﻲ ﻭﻫﻮ ﺃﺛﺒﺖ ﻣﻦ ﻫﺬﺍ . ﺍﻧﺘﻬﻰ
উল্লেখ্য, শায়খ আলবানী রাহ.ও আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসকে শাওয়াহেদের (অন্যান্য বর্ণনার সমর্থনের) কারণে সিলসিলাতুস সহীহায় উল্লেখ করেছেন। দেখুন : সিলসিলাতুস সহীহা হাদিস
৪. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘তিনটি বিষয় (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) নবী-স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত: ইফতারে বিলম্ব না করা, সাহরী শেষ সময়ে খাওয়া এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখা।’
ﺛﻼﺙ ﻣﻦ ﺃﺧﻼﻕ ﺍﻟﻨﺒﻮﺓ : ﺗﻌﺠﻴﻞ ﺍﻷﻓﻈﺎﺭ، ﻭﺗﺄﺧﻴﺮ ﺍﻟﺴﺤﻮﺭ، ﻭﻭﺿﻊ ﺍﻟﻴﺪ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺗﺤﺖ ﺍﻟﺴﺮﺓ .
-আলমুহাল্লা ৩/৩০; আলজাওহারুন নাকী ২/৩১
উল্লেখ্য, ইবনে হাযম রাহ. (৪৫৬ হি.) তাঁর নামাযে হাত বাঁধার আলোচনায় নাভীর নিচে হাত বাঁধার একটি মারফূ হাদীস ও একটি আছর উল্লেখ করেছেন। তবে সেগুলোর সনদ উল্লেখ করেননি।
পক্ষান্তরে এ আলোচনায় বুকের উপর হাত বাঁধার একটি রেওয়ায়েতও উল্লেখ করেননি, না সনদসহ না সনদ ছাড়া। তদ্রূপ হাত বাঁধার নিয়ম উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘মুস্তাহাব হল, নামাযী তার ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে।’
ﻭﻳﺴﺘﺤﺐ ﺃﻥ ﻳﻀﻊ ﺍﻟﻤﺼﻠﻲ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﻤﻨﻰ ﻋﻠﻰ ﻛﻮﻉ ﻳﺪﻩ ﺍﻟﻴﺴﺮﻯ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻓﻲ ﻭﻗﻮﻓﻪ ﻛﻠﻪ ﻓﻴﻬﺎ .
-আলমুহাল্লা ৩/২৯
সারসংক্ষেপ : নামাযে হাত বাঁধা সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক সাহাবী তা বর্ণনা করেছেন। এই সুন্নাহর ব্যবহারিক রূপ খাইরুল কুরূনে কী ছিল তা সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া এবং সে যুগ থেকে চলে আসা
‘আমলে মুতাওয়ারাছ’ দ্বারা প্রমাণিত, যা ইবাদত-বন্দেগীর সঠিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী সূত্র। এ সূত্রে নামাযে হাত বাঁধার দু’টি নিয়ম পাওয়া যায় : নাভীর নিচে হাত বাঁধা ও নাভীর উপর (বুকের নীচে) হাত বাঁধা। দু'টো নিয়মই আহলে ইলম সাহাবা-তাবেয়ীনের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল, যা ইমাম তিরমিযী রাহ. জামে তিরমিযীতে বর্ণনা করেছেন। তবে রেওয়ায়েতের বিচারে নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মটি অগ্রগণ্য। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. তা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন।
খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস-ফিকহের বড় বড় ইমাম এই নিয়ম গ্রহণ করেছেন। এঁদের মধ্যে ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপরন্তু বেশ কিছু মরফূ হাদীসেও নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং এটি নামাযে হাত বাঁধার মাসনূন তরীকা। এ সম্পর্কে দ্বিধা ও সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। 
(চলবে ইনশাআল্লাহ)
আগামী সংখ্যায় পড়ুন : বুকের উপর হাত বাঁধা : বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা ।

মাযহাব সম্পর্কিত ১২টি পোস্ট

মাযহাব সম্পর্কিত
১ হাদীস দেখে আমল হবে নাকি মাযহাব
দেখে
----------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=821343227971822&id=443628
572409958&_rdr
২ মাযহাব মানার অর্থ কী?
---------------------------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=821910521248426&id=443628
572409958&_rdr
৩ সহীহ হানাফী মাযহাব মানতে হবে
----------------------------------------------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=822527864520025&id=443628
572409958&_rdr
৪ একই সাথে চার মাযহাবের উপর আমল
কীভাবে হবে?
-----------------------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=823318767774268&id=443628
572409958&_rdr
৫ চার মাযহাব দ্বারা কি ইসলামকে চার
ভাগে বিভক্ত করা হচ্ছে না?
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=823812987724846&id=443628
572409958&_rdr
৬ চার মাযহাব থেকে যে কোন একটি
মাযহাব মানলে এবং
অন্য তিন মাযহাব না মানলে কোন
অসুবিধা আছে কি?
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=824382294334582&id=443628
572409958&_rdr
৭ নির্দিষ্টভাবে কোন একটি মাযহাবের
অনুসরণ না করে যদি বিভিন্ন সময়ে
বিভিন্ন মাযহাবের উপর আমল করা হয়,
এতে কোন অসুবিধা আছে কি?
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=824981814274630&id=443628
572409958&_rdr
৮ এক মাযহাবের অনুসারী হয়ে কোন
মাসআলায় অন্য মাযহাবের উপর
আমল করা যাবে না কেন?
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=827082067397938&id=443628
572409958&_rdr
৯ মাযহাব সবাই মানেন--তবে কেউ
স্বীকার করে এবং কেউ অস্বীকার করে
-------------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=828052653967546&id=443628
572409958&_rdr
১০ কোন মুসলমান লা-মাযহাবী হতে
পারেন না
-------------
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=828640603908751&id=443628
572409958&_rdr
১১ কোন মুসলমান কি আহলে হাদীস হতে
পারেন?
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=829419847164160&id=443628
572409958&_rdr
১২ একই সাথে চার মাযহাব মানবো কী
করে?
””””””””””””””””””””
https://mobile.facebook.com/story.php?story_
fbid=830041300435348&id=443628
572409958&_rdr

আহলে হাদীসের ভ্রান্ততার প্রমাণ

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ওমর মেখলী

সুপ্রিয় পাঠককে উদ্দেশ্য করে বলছি,
আপনি যদি হক নাহক, সত্য অসত্য বুঝার
মানসিকতা রাখেন, তবে সামান্য
কথাতেই আপনি বুঝতে পারবেন, কথিত
আহলে হাদীস কি? কাউকে ঘায়েল
করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আমার
গবেষণায় যেটুকু উপলব্ধিতে আনতে
পেরেছি, তাই প্রকাশ করতে চেষ্টা
করছি। যদি কোন দ্বিধাগ্রস্ত বা
বিভ্রান্ত ব্যক্তি হিদায়াত প্রাপ্ত
হয়ে থাকেন, তার সওয়াব নিশ্চয়ই
আল্লাহ তাআলা আমার বেলায়ও বরাদ্দ
করবেন।
১। আহলে হাদীসদের দাবী হলো,
তাক্বলীদ করা যাবে না। তাক্বলীদ
যারা করে, তারা মুশরিকের
পর্যায়ভুক্ত। তবে ইত্তিবা করা যাবে।
তাদের এমন উক্তির জবাবে বলা যায়,
তাক্বলীদ আর ইত্তিবার মধ্যে পার্থক্য
কি? তাক্বলীদ অর্থ অনুসরণ, ইত্তিবা
অর্থও অনুসরণ।
২। তারা বুঝাতে চায়, তাক্বলীদ অর্থ
অন্ধ অনুসরণ। আর ইত্তিবা অর্থ দলীল
প্রমাণ দেখে আমল করা।
তাদের এ উক্তিতে খুব রস দেখা যায়।
অর্থাৎ- দলীল প্রমাণ দেখেই আমল করার
নাম ইত্তিবা। তারা সহীহ হাদীস
দেখে আমল করেন, এটি তাদের মুখ্য
দাবী। আচ্ছা হাদীসটা যে সহীহ, তা
কি রাসূল (সা.) বলেছেন, নাকি
আল্লাহ তাআলা বলেছেন। নাকি
হাদীসগুলো নবী (সা.) দিনের কোন এক
সময়ে তাদেরকে এসে বলে গেছেন?
বরং হাদীস সহীহ হওয়া আর জয়ীফ হওয়া,
সবই মুহাদ্দিসের কথার উপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ- মুহাদ্দিসগণ অন্য লোক থেকে
হাদীসটি গ্রহণ করার সময় দেখেছেন
সে লোকের চরিত্র কি, তার মেধা কী
রকম? সে আহলে সুন্নাত ওয়াল
জামাতের লোক কি না? না কি সে
শিয়া বা খারেজী ইত্যাদি বাতিল
ফেরকার লোক? (সে সময় অবশ্য আহলে
হাদীস নামে কিছু ছিল না, তাই
মুহাদ্দিসগণ সে বিষয়ে যাচাই
করেননি। বর্তমানের কথিত আহলে
হাদীসরা যদি সে যুগে থাকতো, তবে
তাদেরকেও ঐরূপ বাতিল ফিরকায়
শামিল করে তাদের বর্ণিত হাদীসকে
শুধু জয়ীফ নয়, বরং মওজু বলতেন)। এসব
দিকসমূহ কঠোরভাবে যাচাই করার পর
যার কাছে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী
সে লোককে ভাল পেয়েছেন, তার
কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন।
সেরূপ হাদীস সংরণকারী লোকদের
চরিত্র ইত্যাদি বিবেচনা করে যে
মুহাদ্দিস যাকে ভাল পেয়েছেন, তার
উপর নির্ভর করে হাদীসকে সহীহ বা
জয়ীফ বলে মত প্রকাশ করেছেন।
তাহলে বুঝা যায়, হাদীস জয়ীফ বা
সহীহ হওয়ার মাপকাঠি হলো একমাত্র
মুহাদ্দিসগণের মত। সে মতের
ভিত্তিতেই হাদীস সহীহ বা জয়ীফ
নির্ধারিত হয়ে থাকে। এটি এমন বিষয়,
যার কোন দলীল-প্রমাণ নেই। সেরূপ
মতকে অন্ধ বিশ্বাস করে কথিত আহলে
হাদীসরা হাদীস মানছে। তা কি অন্ধ
বিশ্বাস নয়? তা যদি অন্ধ বিশ্বাস না
হয়, তাহলে অন্ধ বিশ্বাস আর কাকে
বলা হবে?
কোন হাদীস তো এমন নেই যে,
বর্তমানেও আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল
এসে বলে দিচ্ছেন যে, এই হাদীসটি
সহীহ, এটি জয়ীফ। তাহলে কোন
দলীলের ভিত্তিতে তারা
হাদীসগুলোকে সহীহ বা জয়ীফ বলছেন।
যেহেতু হাদীছ জয়ীফ হওয়া এবং সহীহ
হওয়া মুহাদ্দিসের মতের উপর নির্ভর, সে
কারণে একই হাদীস এক মুহাদ্দিসের
কাছে সহীহ আরেক মুহাদ্দিসের কাছে
জয়ীফ বলে বিবেচিত। এখানেও
মতানৈক্য। এর ভিতর কথিত আহলে
হাদীসরা যদি যে কোন একজনের
হাদীস গ্রহণ করে, তাহলে বুঝা যায়
তারা যে কোন একটি মাযহাব বা মত
গ্রহণ করল। কারণ মাযহাব মানে হলো মত।
এই আলোচনা থেকে বুঝা গেল, আহলে
হাদীসরা মাযহাবও মানে আবার
অন্ধবিশ্বাস তথা তাক্বলীদও করে।
আচ্ছা দেখুন, তাদের তাক্বলীদটা
বেশি অন্ধ বিশ্বাস, নাকি মাযহাব
যারা মানেন তাদের তাক্বলীদটা
অন্ধ বিশ্বাস। মাযহাব যারা মানেন,
তারা শরয়ী মাসআলার দলীল অনুসন্ধান
করতে গেলে কুরআন হাদীস সামনে
আছে। সেখান থেকে দলীল খুঁজে তার
মাযহাবের মতটা সঠিক, না বেঠিক;
তা বিচার করতে পারেন।
কিন্তু তথাকথিত আহলে হাদীসরা
কোন দলীলের ভিত্তিতে হাদীস
মানেন? কারণ যে সকল বর্ণনাকারীর
চরিত্র ও মেধা ইত্যাদির উপর নির্ভর
করে মুহাদ্দিসগণ হাদীসকে সহীহ বা
জয়ীফ বলেছেন, সে সকল রাবী তো
একজনও জীবিত নেই। তাহলে তারা ঐ
রাবী ভাল ছিলেন কি খারাপ
ছিলেন, তা জানার কোন উপায়ও নেই।
তাহলে বুঝা যায় কথিত আহলে
হাদীসরা যাদের মত অনুসরণ করে,
যাদের কথার অধীনে চলে, যাদের অন্ধ
তাক্বলীদ করে, তাদের মত প্রমাণ করার
জন্য কোন দলীল পাওয়াও সম্ভব নয়। বরং
দলীল প্রমাণ ছাড়াই খালেস অন্ধ
বিশ্বাসের মাধ্যমেই মুহাদ্দিসের কথা
মান্য করতে হচ্ছে।
এখন পাঠক মহোদয় বিচার করুন, যারা
মাযহাব মানে তাদের তাক্বলীদটা
অন্ধ বিশ্বাস, নাকি কথিত আহলে
হাদীসদের তাক্বলীদটা পুরোপুরি অন্ধ
বিশ্বাস?
এখন আপনি নিজেই বলুন, তাদের ভাষায়
যদি তাক্বলীদ করা শিরক হয়, তাহলে বড়
শিরিক কারা করে থাকেন? আহলে
হাদীস না মাযহাবীগণ?
আরো দেখুন, বর্তমানে আহলে
হাদীসরা হাদীসের বেলায় জনাব
আলবানী সাহেবকেই মানেন। কারণ
যে সকল হাদীসকে আলবানী সাহেব
সহীহ বলেছেন সেগুলোকেই তারা
সহীহ বলেন। বাকী সবগুলোকে তারা
জয়ীফ বলে উপহাস করেন।
এক. হাদীস নিয়ে উপহাস করা ঈমান
বিধ্বংসী। দুই. তারা ইসলাম ধর্মের
চৌদ্দশ বছর পরে এসে এহেন ফিতনার
যুগের কোন একজন লোককেই নিজেদের
ইমাম মানছেন। আর যারা মাযহাব
মানে তারা তাবেয়ী, তাবে-
তাবেয়ীদের যুগের লোকদেরকেই
মানেন। যাদের কাছে হাদীস
পৌঁছেছে মাত্র এক বা দুই মাধ্যমের
দ্বারা। যারা নবী (সা.) ও সাহাবী
যুগের একেবারে সন্নিকটে। যাদের যুগ
যুগ ধরে ধর্মের ব্যাপারে সঠিক ও আহলে
হক্ব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের
ইমাম বলে সর্বজন স্বীকৃতি দিয়ে
আসছে। যারা ইসলাম বিরোধী
যাবতীয় শক্তির সাথে মোকাবেলা
করে সঠিক ইসলাম বর্তমান যুগ পর্যন্ত
মুসলমানদের কাছে পৌঁছার ব্যবস্থা
করে গেছেন।
ইসলামের সে সোনালী ব্যক্তিদেরকে
কলুষিত করতে কথিত আহলে হাদীসদের
এক মিনিট সময় লাগে না। এমনকি কথিত
আহলে হাদীসরা সাহাবায়ে
কেরামকে পর্যন্ত মানতে নারাজ। এক
দিকে ১৩/১৪ শত বছর পরের লোকের
তাক্বলীদ করা, অপর দিকে ইসলামের
সোনালী যুগের ব্যক্তিদের
সমালোচনা করা, অধিকন্তু সাহাবায়ে
কেরামকে না মানা। এসবের মাধ্যমে
তারা যে ইসলামের মধ্যে ষড়যন্ত্রমূলক
একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছে, তার
অকাট্য দলীল নয় কি?
আচ্ছা, যারা তাক্বলীদ বা অন্ধ
বিশ্বাস করে এবং কথায় কথায় মিথ্যা
বলে তাক্বলীদ করার কথা অস্বীকার
করে, এটাই কি তাদের গোমরাহীর
দলীল নয়? তারা যেসকল মাসআলা
নিয়ে বিতর্ক করে, সেগুলোর সকল
প্রকার দলীল দেয়ার পর হুকুম বের হয়
হয়তো সুন্নাত বা মুস্তাহাব। একটা
মুস্তাহাবের জন্য পুরো মুসলিম দুনিয়ায়
মতপার্থক্য সৃষ্টির মতো কবীরা গোনাহ
করতে পারবে, এর প্রমাণ কোন সহীহ
হাদীসে আছে?
কথিত আহলে হাদীসরা বলেন, মাযহাব
মানে মতভেদ করা। আচ্ছা চার মাযহাব
দীর্ঘ দিন থেকে চলে এসেছে।
সেখানে পঞ্চম আরেকটি দল করে
মতভেদ বৃদ্ধি করা কোন ধরনের
যৌক্তিকতা বা কোন ধরনের ইসলাম
পালন? এটা মুসলমানদের বুঝা উচিত।
সামান্য একথাগুলো একটু চিন্তা করলে
আপনি একজন মুসলমান হিসেবে এ
সিদ্ধান্ত নিতে বাধা কোথায় যে,
আহলে হাদীস মুসলমানদের মধ্যে নতুন
করে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যই জন্ম
হয়েছে? মিথ্যা কথা বলাই এদের
স্বভাব। যারা সব সময় মিথ্যার মধ্যে
ডুবে থাকবে, যারা ইসলামের কর্ণধার
সাহাবায়ে কেরামকে পর্যন্ত মানতে
রাজি হবে না, এরা আবার কি করে
সঠিক ইসলামের দাবীদার হতে
পারবে?
প্রিয় পাঠক! আশা করি কথাগুলো
চিন্তা করবেন। আহলে হাদীসদের কাছ
থেকে এসবের জবাব চাইবেন। তখন
বুঝতে পারবেন, এরা কি সঠিক ইসলামে
আছে? নাকি ইসলামের নামে
মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য
মাঠে ময়দানে কাজ করছে।
আমার মতে আহলে হাদীস যে একটি
ভ্রান্ত দল, তা বুঝার জন্য এর চাইতে
বেশি দলীল-প্রমাণ ও বক্তব্যের প্রয়োজন
পড়ে না। এর বাইরে দেখতে চাইলে
তাদের ইতিহাসও দেখা যায়। এরা
ইংরেজ সৃষ্ট কাদিয়ানীদের মতই
ইংরেজ কর্তৃক সৃষ্ট। সেটা দেখলে তো
আর বলতেই হয় না যে, এরা ভ্রান্ত দল।
বরং নিজে নিজেই বুঝে আসে। ওয়মা
আলাইনা ইল্লাল বালাগ। #

Monday, February 27, 2017

গায়রে মুকাল্লিদদের ইমাম মরহুম আলবানী সাহেবের প্রকৃত পরিচয়



আলবানী সাহেবের আসল নাম নাসিরুদ্দীন।
সিরিয়ার অ ন্তর্গত আলবেনিয়ার অধিবাসী
হওয়ায় তাঁকে আলবানী বলা হয়। এ নামেই
তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত। ১৩৩৩ হিজরী
মোতাবেক ১৯১৪ ঈসাঈতে তিনি
আলবেনিয়ার আশকুদারাহ শহরে জন্মগ্রহণ
করেন। কিছু সমস্যার কারণে তাঁর পিতা
আলবেনিয়া ছেড়ে সপরিবারে দামেস্ক চলে
যান সাথে আলবানীকেও নিয়ে যান।
আলবানী সাহেব দামেস্ক থাকাকালীন
পিতার কাছে কোরআনে কারীম হিফজ
করেন। দামেস্কের মাদরাসায় ইস’আফ আল
খায়রিয়া’তে প্রাথমিক পড়াশোনা করেন।
কিন্তু পিতৃ পেশা ঘড়ি মেরামতের কাজে
সময় দেওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
বা শাস্ত্রাভিজ্ঞ কোনো আলেমের
তত্ত্বাবধানে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক
স্তরের কিতাবাদি ও তাফসীর, হাদীস, উসূলে
হাদীসের কোনো কিতাবের পাঠ গ্রহণ করার
সুযোগ তাঁর হয়নি। এ বিষয়টি তাঁরই সুপরিচিত
আরবের বিখ্যাত আলেমেদীন শাইখ মুহাম্মদ
আওয়ামা তাঁর রচিত ‘আসারুল-হাদীস’ গ্রন্থে
এভাবে ব্যক্ত করেছেন।
ﻣﻊ ﺍﻥ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻟﻴﺲ ﻟﻪ ﻣﻦ ﺍﻟﺸﻴﻮﺥ ﺍﻻ ﺷﻴﺦ ﻭﺍﺣﺪ
ﻣﻦ ﻋﻠﻤﺎﺀ ﺣﻠﺐ ﺑﺎﻹﺟﺎﺯﺓ ﻻ ﺑﺎﻟﺘﻠﻘﻰ ﻭﺍﻷﺧﺪ ﻭ ﺍﻟﻤﺼﺎﺣﺒﺔ
ﻭﺍﻟﻤﻼﺯﻣﺔ ، ‏( ﺍﺛﺮ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺸﺮﻳﻒ 15 - )
পাশাপাশি এই ব্যক্তির কোনো উস্তাদ ও
নেই (যাঁর কাছে তিনি হাদীস পড়েছেন)
শুধুমাত্র সিরিয়ার হালাব’ শহরের জনৈক
আলেম তাঁকে হাদীস চর্চার মৌখিক অনুমতি
দিয়েছেন। তবে তাঁর কাছেও তিনি
নিয়মতান্ত্রিকভাবে হাদীস অধ্যয়ন
করেননি।” (আসারুল হাদীস, পৃ. ১৫)
তাঁর এই বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত যে, তিনি
উলূমুল হাদীসের জ্ঞান কোনো বিজ্ঞ
পন্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি। এ
ব্যাপারে নিজের অধ্যয়নই তাঁর মূল ভিত্তি।
অথচ শাস্ত্রীয় ব্যাপারে সর্বজনস্বীকৃত একটি
মূলনীতি, অভিজ্ঞতাও যার সাক্ষ্য প্রদান
করে তা হলো যেকোনো শাস্ত্রে পরিপক্বতা
অর্জনের জন্য সে শাস্ত্রের পন্ডিত
ব্যক্তিদের সাহচর্য অবলম্বন করা অনিবার্য।
ব্যক্তিগত অধ্যয়নে জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হতে
পারে, কিন্তু শাস্ত্রীয় পরিপক্বতা শাস্ত্রীয়
পন্ডিতের সাহচর্য ছাড়া অর্জিত হওয়া
বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব। কিন্তু আলবানী
সাহেব এই স্বীকৃত বিষয়টির কোনো
তোয়াক্কা না করে নিজস্ব অধ্যয়নেই তিনি
উলূমুল হাদীসের ইমাম বনে গেছেন, এমনকি
তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের সকল হাদীস ও হাদীসের সকল
ইমামের বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ
হয়েছেন।
চিন্তা করুন, কোনো এইট পাস ব্যক্তি যদি
বাজার থেকে আইনের কিছু বইপত্র ক্রয় করে
নিজে নিজে অধ্যয়ন করে আন্তর্জাতিক
বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কী ধরনের নৈরাজ্য ও
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে!
এমনিভাবে কোনো এইট পাস ছেলে যদি
ডাক্তারি বইপত্র ক্রয় করে নিজে নিজে
অধ্যয়ন করে বিশ্বমানের ডাক্তারের
ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে গোরস্তান
আবাদ করা ছাড়া আর কী হওয়ার সম্ভাবনা
আছে? ঠিক এই অবস্থাটাই হয়েছে জনাব
আলবানী সাহেবের।
ইলমে ওয়াহীর মতো স্পর্শকাতর ও
সংবেদনশীল বিষয়ে নিজস্ব অধ্যয়নের
ভিত্তিতে সকলের ইমাম বনে যাওয়া ও সকল
হাদীস ও হাদীসের ইমামগণের বিচারক বনে
যাওয়ার ফলে ইলমী ময়দানে যে অরাজকতা ও
নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে এবং দুনিয়ায় যে
ফেতনা-ফ্যাসাদ জন্ম নিয়েছে তা খুবই
দুঃখজনক ও মুসলিম উম্মাহর জন্য
অশনিসংকেত।
এজন্য সকল মুসলিমের জন্য আলবানী
সাহেবের ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তিকর দিকগুলো
সম্পর্কে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে
মুখরোচক কোনো স্লোগান শুনে আমরা ভ্রান্ত
পথের পথিক না হয়ে যাই। নি¤েœ আলবানী
সাহেবের ভুল-ভ্রান্তির কিছু দিক তুলে ধরা
হলো :
১.
হাদীসের সহীহ-যয়ীফ, জরাহ-তাদীল ও এ
শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে
স্ববিরোধী বক্তব্য :
হাদীসের সহীহ-যয়ীফ, জরাহ-তাদীল ও এ
শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে
তার স্ববিরোধী বক্তব্য সংখ্যায় প্রচুর।
দেখা যায়, এক স্থানে তিনি একটি
হাদীসকে সহীহ বলেছেন তো অন্য স্থানে
সেটিকেই হাসান বা যয়ীফ বলেছেন। আবার
এক স্থানে কোনো বর্ণনাকারীকে
নির্ভরযোগ্য বলেছেন তো অন্য স্থানে তাকে
যয়ীফ (দুর্বল) বলেছেন।
তার এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্য একত্রিত
করে শায়েখ হাসান সাক্কাফ
ﺗﻨﺎﻗﻀﺎﺕ ﺍﻻﻟﺒﺎﻧﻰ ﺍﻟﻮﺍﺿﺤﺎﺕ (আলবানীর স্পষ্ট
স্ববিরোধিতাসমূহ) নামে ২ খ-ের একটি গ্রন্থ
রচনা করেছেন।
আবার দেখা গেছে, কোনো বর্ণনাকারীর
ব্যাপারে তাঁর ধারণা পূর্বে এক রকম ছিল;
কিন্তু পরে তাতে পরিবর্তন এসেছে। এ
জাতীয় বিষয়াদিকে শায়খ আবুল হাসান
মুহাম্মদ তাঁর
ﺗﺮﺍﺟﻊ ﺍﻟﻌﻼﻣﺔ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻓﻴﻤﺎ ﻧﺺ ﻋﻠﻴﻪ ﺗﺼﺤﻴﺤﺎ ﻭﺗﻀﻌﻴﻔﺎ
কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এ জাতীয়
স্ববিরোধিতা সর্বমোট ২২২টি হাদীসের
ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে।
২.
ইজতেহাদী বিষয়াদিতে অসহিষ্ণুতা :
শাস্ত্রজ্ঞ ইমামগণ এ বাপ্যারে ঐকমত্য
পোষণ করেছেন পূর্ণভাবে স্বীকৃত যে, হাদীস
ভা-ারে বিদ্যমান হাদীসসমূহ সহীহ বা যয়ীফ
হওয়ার বিবেচনায় তিন ভাগে বিভক্ত :
এক.
যেসব হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে সকল
ইমাম একমত হয়েছেন।
দুই.
যেসব বর্ণনা যয়ীফ বা মাতরুক (পরিত্যাজ্য)
হওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত হয়েছেন ।
তিন.
যেসব বর্ণনা সহীহ বা যয়ীফ হওয়ার ব্যাপারে
ইমামগণের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
বাস্তবতার নিরিখেও হাদীসের এই প্রকার
তিনটি সুস্পষ্ট। এর মধ্যে প্রথম দুই প্রকার
হাদীসের বিষয়টি সহজ ও পরিষ্কার। কিন্তু
আলবানী সাহেব তাঁর ‘সিলসিলাতুল
আহাদীস’কে এই দুই প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ
রাখেননি। তিনি তাঁর কিতাবে যথারীতি
শেষোক্ত প্রকারের হাদীস প্রচুর পরিমাণে
উল্লেখ করেছেন। অথচ এই তৃতীয় শ্রেণীর
হাদীসের ব্যাপারে শাস্ত্র ও বিবেকের
সিদ্ধান্ত হলো শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি তাহকীক ও
গবেষণার ভিত্তিতে যে মতটিকে সঠিক বা
বিশুদ্ধ মনে করবেন, তিনি সেই মতটি অবলম্বন
করবেন। আর যারা শাস্ত্র বিষেশজ্ঞ নন,
তাঁরা কোনো শাস্ত্রজ্ঞের তাকলীদ বা
অনুসরণ করবেন। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে লক্ষ
রাখতে হবে, মতটি যেন কোনো প-িতের
পদস্খলন না হয়।
ইমাম বাইহাকী (রহ.) (মৃত্যু ৪৫৮হি.) তাঁর
‘দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ’-এর ভূমিকায় এ বিষয়টি
নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ করেছেন :
ﻭﺃﻣﺎ ﺍﻟﻨﻮﻉ ﺍﻟﺜﺎﻟﺚ ﻣﻦ ﺍﻷﺣﺎﺩﻳﺚ ﻓﻬﻮ ﺣﺪﻳﺚ ﻗﺪ ﺍﺧﺘﻠﻒ
ﺍﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺑﺎﻟﺤﺪﻳﺚ ﻓﻰ ﺛﺒﻮﺗﻪ ﻓﻬﺬﺍ ﺍﻟﺬﻯ ﻳﺠﺐ ﻋﻠﻰ ﺃﻫﻞ
ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺑﺎﻟﺤﺪﻳﺚ ﺑﻌﺪﻫﻢ ﺃﻥ ﻳﻨﻈﺮﻭﺍ ﻓﻰ ﺍﺧﺘﻼﻓﻬﻢ
ﻭﻳﺠﺘﻬﺪﻭﺍ ﻓﻰ ﻣﻌﺮﻓﺔ ﻣﻌﺎﻧﻴﻬﻢ ﻓﻰ ﺍﻟﻘﺒﻮﻝ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﺛﻢ
ﻳﺨﺘﺎﺭﻭﺍ ﻣﻦ ﺃﻗﺎﻭﻳﻠﻬﻢ ﺍﺻﺤﻬﺎ ﻭﺑﺎﻟﻠﻪ ﺍﻟﺘﻮﻓﻴﻖ
উম্মাহর আলেমগণের কর্মনীতিও সর্বযুগে এই
ছিল যে, এ প্রকারের হাদীসসমূহে
বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য যেহেতু সাধারণ
ব্যাপার, তাই প্রত্যেকেই অপরের মতের
ব্যাপারে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছেন। যাঁর
বিচার-বিবেচনায় হাদীসটিকে সহীহ মনে হয়
তিনি হাদীসটিকে মাস’আলার ভিত্তিরূপে
গ্রহণ করেন আর যাঁর বিবেচনায় হাদীসটিকে
সহীহ মনে হয় না, তিনি একে মাস’আলার
ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন না। এ ক্ষেত্রে
গ্রহণ-অগ্রহণ উভয়টিই ইজতিহাদের ভিত্তিতে
হয়ে থাকে। আর এ জন্যই প্রত্যেককে অপরের
মতের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল ও সহিষ্ণু হতে হয়।
আমাদের পূর্ববর্তী ইমামগণ এমনই ছিলেন।
আলোচ্য ক্ষেত্রে নিজের মতটিকে চূড়ান্ত
মনে করা বা যথাযথ দলিলভিত্তিক
সমালোচনার ব্যাপারে অসহিষ্ণু হওয়া এবং
সমালোচককে কটাক্ষ ও গালাগাল করা
কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে অন্য সকলের
ওপর চাপিয়ে দেওয়ার
মানসিকতা পোষণ করা যে অত্যন্ত গর্হিত
কাজ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আলবানী সাহেব ও
তাঁর বিশিষ্ট ভক্ত-অনুরক্ত সকলেই এ গর্হিত
কাজটিতে লিপ্ত হয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর
তুলেছেন। সিলসিলাতুয যয়ীফা সিলসিলাতুস
সহীহা এবং তাঁর অন্যান্য রচনার ভূমিকা
পড়লে একজন নিরপেক্ষ পাঠকের মনে এ
ধারণাই সৃষ্টি হয় যে, তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে
একমত না হওয়াই অমার্জনীয় অপরাধ এবং এই
অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি তাঁর পক্ষ থেকে
যেকোনো ধরনের (শ্রব্য-অশ্রাব্য) সম্বোধনের
উপযুক্ত হতে পারে।
৩.
যয়ীফ হাদীসের ব্যাপারে আলবানী
সাহেবের যয়ীফ অবস্থান :
আলবানী সাহেব যয়ীফ হাদীসকে একদম
অনর্থক মনে করেন। তাঁর মতে, যয়ীফ
হাদীসের যতগুলো প্রকার আছে তার
কোনোটিই কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি তাঁর কিতাবে যয়ীফ ও মওযু (দুর্বল ও
জাল) উভয়টিকে একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত
করেছেন এবং উচ্চ কণ্ঠে এ ঘোষণা
দিয়েছেন যে, যয়ীফ সর্বক্ষেত্রেই
পরিত্যাজ্য। অর্থাৎ এটা না ফাজায়েলের
ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, না মুস্তাহাব বিষয়াদির
ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, আর না অন্য কোনো
ক্ষেত্রে। সহীহুল জামিইস সগীর ওয়া
যিয়াদাতিহী, পৃ. ১৫০
অথচ এই মতটি সালাফ ও সালাফের সর্ববাদী
নীতিমালার সুস্পষ্ট বিরোধী। জমহুরে সালাফ
ও খালাফের ইজমা বা ঐকমত্যের খেলাফ
হওয়া তো অতি স্পষ্ট এবং সর্বজনবিদিত;
বাস্তব কথা হলো, তা সকল সালাফ ও
খালাফের ইজমারই পরিপন্থী। যয়ীফ হাদীস
কোনোক্রমেই কাজের নয়; বরং তা বিলকুল
অকেজো আলবানী সাহেবের এই মতটি
অবলম্বন করেছেন সালাফ ও খালাফের
কারো থেকেই প্রমাণিত নয়। তাঁরা সকলেই
যয়ীফ হাদীসকে ফজীলতের ব্যাপারে গ্রহণ
করেছেন। এমনকি কোনো বিষয়ে সহীহ
হাদীস না থাকলে যয়ীফ হাদীস দ্বারা
বিধিবিধান প্রমাণ করেছেন এবং যয়ীফ
হাদীসকে কিয়াসের ওপরে মর্যাদা
দিয়েছেন। Ñআল কাউলুল বদি ফিস সালাতি
আলাল হাবিবিশ শাফিঈ, হাফেয সাখাবী, পৃ.
৪৭৩
৪.
শুযুয তথা উম্মতের ঐকমত্য থেকে বিচ্যুতি :
আলবানী সাহেবের আলোচনা পর্যালোচনা
শুধু হাদীসের তাসহীহ ও তাযয়ীফের মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তিনি তাঁর
রচনাসমূহের বিভিন্ন স্থানে ফিকহ, আকাঈদ
ও অন্যান্য শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীন
এমনকি এক ধরনের বিচারকসুলভ পর্যালোচনা
করেছেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো
বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করতে বা কোনো মনীষীর
ভ্রান্তি বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তকে জীবিতও
করতে কোনো দ্বিধা করেননি। অথচ ইজমায়ে
উম্মত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকে
চলে আসা উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা
থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মত পোষণ করা
অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এ ব্যাপারে শরীয়তের
প্রমাণাদি, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং
পরবর্তী আসলাফে উম্মাহর সিদ্ধান্ত ও
বক্তব্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের অজানা নয়। এ
প্রসঙ্গে ইবনে আব্দুল বার (রহ.) প্রণীত ﺟﺎﻣﻊ
ﺑﻴﺎﻥ ﺍﻟﻌﻠﻢ ২/১৩০ এবং
ইবনে রজব দামেশ্কী (রহ.)-এর ﺷﺮﺡ ﻋﻠﻞ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯ
বিশেষভাবে অধ্যয়নযোগ্য।
যেসব ভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্ন মতের উদ্ভাবন বা
পৃষ্ঠপোষকতা আলবানী সাহেব করেছেন তার
কিছু দৃষ্টান্ত লক্ষ করুন!
১.
তাঁর মতে, মহিলাদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও
অন্যান্য স্বর্ণবালা ব্যবহার করা হারাম
অথচ মহিলাদের জন্য স্বর্ণের সব ধরনের
অলংকার বৈধ, চাই তা বলয়াকৃতির হোক বা
অন্য আকৃতির হোক।
২.
তাঁর মতে তারাবীর নামায ৮ রাক’আত সুন্নাত
আর ২০ রাক’আত বিদ’আত।
অথচ উম্মতের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারার মাধ্যমে
তারাবীর নামায ২০ রাক’আত প্রমাণিত, যা
১৪০০ বছর যাবত হারামাইন শরীফাইনসহ
বিশ্বের বড় বড় সব শহরে প্রচলিত আছে।
৩.
তাঁর মতে, এক মজলিসে তিন তালাক দিলে
এক তালাক গণ্য হবে
অথচ এই মতটি সহীহ হাদীস ও ইজমা
পরিপন্থী।
৪.
তাঁর মতে, সুব্হাহ (তাসবিহ) দ্বারা যিকির-
আযকার গণনা করা বিদ’আত।
অথচ এটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
ফিকহ, ইলমে হাদীস ও অন্যান্য বিষয়ে
আলবানী সাহেবের বিচ্ছিন্ন মতামতের
সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু কিছু স্থূলদৃষ্টি
ব্যক্তিবর্গ ও তাঁর কিছু অন্ধ ভক্ত তাঁর এই
বিচ্ছিন্ন মতামতগুলোকে মুসলিম সমাজের
মাঝে প্রচার করে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি
করছে। আল্লাহ তা’আলা সবাইকে সহীহ বুঝ
দান করুন।
শাইখ মাহমুদ রচিত তাম্বীহুল মুসলিম গ্রন্থের
২০৫ নং পৃষ্ঠায় আলবানী সাহেবের ভুল-
ভ্রান্তির ফিরিস্তি এভাবে বর্ণিত আছে :
ﺍﻗﻮﻝ ﻫﺬﺍ ﺑﻤﻨﺎﺳﺒﺔ ﻋﺎﺩﺓ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻣﻊ ﻣﺨﺎﻟﻔﻴﺔ
মর্মার্থ: আলবানী সাহেব তাঁর মতাদর্শের
বিরোধী ব্যক্তির সঙ্গে যে আচরণ করেন সে
প্রসঙ্গে কিছু বলা জরুরি মনে করছি।
আলবানী সাহেব যখন কাউকে তাঁর প্রতিপক্ষ
ভাবেন তখন তাঁর কথা সামনে এলে তিনি
দাঁড়াবেন, বসবেন, কাঁপতে থাকবেন, ধমক
দেবেন। তাঁর বই পড়তে গেলে আপনারা এ
সত্যতার প্রমাণ পাবেন এবং তাঁর আক্রমণের
স্বরূপ দেখবেন। তিনি প্রতিপক্ষ বিজ্ঞ
আলেমদের ধ্বংসের দু’আ করেন। তাঁদের
মিথ্যুক, মুশরিক, প্রতারক বলেও গালি দেন।
কোনো কোনো প্রতিপক্ষকে কাফেরও বলে
ফেলেন। আবার কাউকে তিনি চক্রান্তকারী,
মুনাফিক, খবিশ, গোমরাহ ইত্যাদি বলতে
কুণ্ঠাবোধ করেন না। তাঁর ন্যক্কারজনক
কর্মকা-ের শীর্ষে রয়েছে, ইমাম আহমাদ
(রহ.)-কে বিদ’আতী বলে গালি দেওয়া।
আলবানী সাহেব তার এই বিতর্কিত
কর্মপদ্ধতি ও গর্হিত আচার আচরণের কারণে
সিরিয়ার মুসলিম জনতার আন্দোলনের মুখে
সিরিয়া থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি
সৌদি আরবে চলে যান এবং সেখানেও এই
একই কারণে আলেম-ওলামা ও জনগণের
রোষানলে পড়েন। তাদের আন্দোলনের মুখে
সৌদি আরব থেকেও তিনি বিতাড়িত হন।
১৯৯১ ইং সালে সরকারি নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার
মধ্যে তাঁকে সৌদি আরবের মাটি ছাড়তে হয়।
এরপর তিনি জর্ডানে আশ্রয় নেন এবং
জর্ডানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জর্ডানের সচেতন আলেমগণও তাঁর ভ্রান্ত
কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে
উঠেছিলেন। (আল ইত্তিজাহাতুল
হাদীসিয়্যাহ, মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ মুহাম্মদ)
আলবানী সাহেবের ভ্রান্তিসমূহের খ-নে
নির্ভরযোগ্য আলেমগণের কিছু কিতাব :
এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আলবানী সাহেবের
সব ভুলভ্রান্তি তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ, তাঁর
পরিমাণ এত বেশি যে এগুলোর সংকলনে
বিজ্ঞ আলেমগণ হাজার হাজার পৃষ্ঠার
স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ ব্যাপারে
বিস্তারিত জানতে নিম্নোক্ত কিতাবগুলো
পড়া যেতে পারে।
ﺍﻻﺑﺎﻧﻰ ﺷﺬﻭﺫﻩ ﻭﺃﺧﻄﺎﺋﻪ
মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আযমী।
ﺗﺼﺤﻴﺢ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﺘﺮﺍﻭﻳﺢ ﻋﺸﺮﻳﻦ ﺭﻛﻌﺔ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ
ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ ﻓﻰ ﺗﻀﻌﻴﻔﻪ
শায়খ ইসমাঈল আনসারী (রহ.) সাবেক গবেষক,
দারুল ইফতা, সৌদি আরব।
ﺇﺑﺎﺣﺔ ﺍﻟﺘﺤﻠﻰ ﺑﺎﻟﺬﻫﺐ ﺍﻟﻤﻌﻠﻖ ﻟﻠﻨﺴﺎﺀ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻓﻰ ﺗﺤﺮﻳﻤﻪ
ﻋﻠﻰ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻰ
শায়খ ইসমাঈল আনসারী (রহ.)
ﺍﻟﺼﺎﺭﻡ ﺍﻟﻤﺸﻬﻮﺭ ﻋﻠﻰ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺘﺒﺮﺝ ﻭﺍﻟﺴﻔﻮﺭ ﻭﻓﻴﻪ ﺍﻟﺮﺩ
ﻋﻠﻰ ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺤﺠﺎﺏ ﻟﻸﻟﺒﺎﻧﻰ
শায়খ হামুদ তুযাইজারী, সৌদি আরব।
ﺍﻟﻨﻘﺪ ﺍﻟﺒﻨﺎﺀ ﻟﺤﺪﻳﺚ ﺃﺳﻤﺎﺀ ﻓﻰ ﻛﺸﻒ ﺍﻟﻮﺟﻪ ﻭﺍﻟﻜﻔﻴﻦ
ﻟﻠﻨﺴﺎﺀ
আবু মুয়াজ তারিক বিন আউযুল্লাহ, বিশেষ
ছাত্র, শায়খ আলবানী।
ﻭﻳﻠﻚ ﺁﻣﻦ
আহমাদ আব্দুল গফুর
ﻭﺻﻮﻝ ﺍﻟﺘﻬﺎﻧﻰ ﺑﺈﺛﺒﺎﺕ ﺳﻨﻴﺔ ﺍﻟﺴﺒﻌﺔ ﻭﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
ﺗﻨﺒﻴﻪ ﺍﻟﻤﺴﻠﻢ ﺇﻟﻰ ﺗﻌﺪﻯ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ ﻋﻠﻰ ﺻﺤﻴﺢ ﻣﺴﻠﻢ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
ﺍﻟﺘﻌﺮﻳﻒ ﺑﺄﻭﻫﺎﻡ ﻣﻦ ﻗﺴﻢ ﺍﻟﺴﻨﻦ ﺇﻟﻰ ﺻﺤﻴﺢ ﻭﺿﻌﻴﻒ
মাহমুদ সাঈদ মামদূহ, মিসর।
১০
ﺍﻟﻘﻮﻝ ﺍﻟﻤﻘﻨﻊ ﻓﻰ ﺍﻟﺮﺩ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺑﺎﻧﻰ ﺍﻟﻤﺒﺘﺪﻉ
শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে সিদ্দীক আল গুমারী
(রহ.)

কখন হয় পুত্র সন্তান এবং মেয়ে সন্তান?

আরিফ মাহমুদ 


আল হাসান ইবনু আলী আল হুলওয়ানী (রহঃ) ..... রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম সাওবান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। ইতোমধ্যেই ইয়াহুদীদের এক আলিম এসে বলল, আসসালামু 'আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ! এরপর আমি তাকে এমন এক ধাক্কা মারলাম যে, সে প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! সে বলল, তুমি আমাকে ধাক্কা মারলে কেন? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বলতে পার না। ইয়াহুদী বলল, আমরা তাকে তার পরিবার-পরিজন যে নাম রেখেছে সে নামেই ডাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার নাম মুহাম্মাদ। আমার পরিবারের লোকই আমার এ নাম রেখেছে। এরপর ইয়াহুদী বলল, আমি আপনাকে (কয়েকটি কথা) জিজ্ঞেস করতে এসেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তোমার কী লাভ হবে, যদি আমি তোমাকে কিছু বলি? সে বলল, আমি আমার কান পেতে শুনব।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে যে খড়িটি ছিল তা দিয়ে মাটিতে আঁকাঝোকা দাগ কাটতে ছিলেন। তারপর বললেন, জিজ্ঞেস কর। ইয়াহুদী বলল, যেদিন এ জমিন ও আকাশমণ্ডলী পাল্টে গিয়ে অন্য জমিন ও আকাশমণ্ডলীতে পরিণত হবে (অর্থাৎ কিয়ামাত হবে) সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা সেদিন পুলসিরাতের কাছে অন্ধকারে থাকবে।
সে বলল, কে সর্বপ্রথম (তা পার হবার) অনুমতি লাভ করবে? তিনি বললেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ! ইয়াহুদী বলল, জান্নাতে যখন তারা প্রবেশ করবে তখন তাদের তোহফা কি হবে? তিনি বললেন, মাছের কলিজার টুকরা। সে বলল, এরপর তাদের দুপুরের খাদ্য কি হবে? তিনি বললেন, তাদের জন্য জান্নাতের ষাঁড় যাবাহ করা হবে যা জান্নাতের আশেপাশে চড়ে বেড়ায়। সে বলল, এরপরে তাদের পানীয় কি হবে? তিনি বললেন, সেখানকার একটি ঝর্ণার পানি যার নাম সালসাবীল। সে বলল, আপনি ঠিক বলেছেন।
সে আরো বলল যে, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছি যা নাবী ছাড়া পৃথিবীর কোন অধিবাসী জানে না অথবা একজন কি দু'জন লোক ছাড়া। তিনি বললেন, আমি যদি তোমাকে তা বলে দেই তবে তোমার কি কোন উপকার হবে? সে বলল, আমি আমার কান পেতে শুনব। সে বলল, আমি আপনাকে সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছি। তিনি বললেন, পুরুষের বীর্য সাদা এবং মেয়েলোকের বীর্য হলুদ। যখন উভয়টি একত্রিত হয়ে যায় এবং পুরুষের বীর্য মেয়েলোকের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন আল্লাহর হুকুমে পুত্র সন্তান হয়। আর যখন মেয়েলোকের বীর্য পুরুষের বীর্যের ওপর প্রধান্য লাভ করে তখন আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান হয়।
ইয়াহুদী বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন এবং নিশ্চয়ই আপনি নাবী। এরপর সে চলে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ লোক আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করেছে, ইতোপূর্বে আমার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। আল্লাহ তা'আলা এক্ষণে আমাকে তা জানিয়ে দিলেন।
(সহীহ মুসলিম:-৬০৩ হাঃ ফাঃ ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৬০৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ৬২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ

ছাত্রদলের গান


আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের আঁধার রাতে বাধার পথে
যাত্রা নাঙ্গা পায়,
আমরা                শক্ত মাটী রক্তে রাঙাই
বিষম চলার ঘাস।
যুগে যুগে রক্তে মোদের
সিক্ত হ’ল পৃথ্বীতল।
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের কক্ষচ্যুত-ধূমকেতু-- প্রায়
লক্ষ্যহারা প্রাণ
আমরা                ভাগ্যদেবীর  যজ্ঞবেদীর
                        নিত্য বলিদান।
যখন                লক্ষ্মীদেবী  স্বর্গে উঠেন
আমরা পশি নীল অতল!
আমরা ছাত্রদল।।
আমরা ধরি মৃত্যু রাজার
যজ্ঞ-ঘোড়ার রাশ,
মোদের মৃত্যু লেখে মোদের
জীবন--ইতিহাস!
হাসির দেশে আমরা আনি
সর্বনাশী চোখের জল
আমরা ছাত্রদল।।
সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়
আমরা করি ভুল!
সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব,
আমরা ভাঙি কূল।
দারুণ-রাতে আমরা তরুণ
রক্তে করি পথ পিছল!
আমরা ছাত্রদল।।
মোদের                চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল,
বক্ষে ভরা বাক্,
কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন
নিত্য কালের ডাক।
আমরা                তাজা খুনে লাল ক’রেছি
সরস্বতীর শ্বেত কমল।
আমরা ছাত্রদল।।
ঐ                দারুণ উপপ্লবের দিনে
আমরা দানি শির,
মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে
বিংশ শতাব্দীর!
মোরা                গৌরবেরি কান্না দিয়ে
ভ’রেছি মা’র শ্যাম-আঁচল।
আমরা ছাত্রদল।
আমরা রচি ভালোবাসার
আশার ভবিষ্যৎ,
মোদের                স্বর্গ-পথের অভাস দেখায়
আকাশ-ছায়াপথ!
মোদের চোখে বিশ্ববাসীর
স্বপ্ন দেখা হোক সফল।
আমরা ছাত্রদল।।

জাগরণী


কোরাস্:—
ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!
ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,
সন্তান দ্বারে উপবাসী,
দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
জাগো গো,জাগো গো,
তন্দ্রা-অলস জাগো গো,
জাগো রে! জাগো রে!
মুক্ত করিতে বন্দিনী মা'য়
কোটি বীরসুত ঐ হেরো ধায়
মৃত্যু-তোরণ-দ্বার-পানে—
কার টানে?
দ্বার খোলো দ্বার খোলো!
একবার ভুলে ফিরিয়া চাও।
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
জননী আমার ফিরিয়া চাও!
ভাইরা আমার ফিরিয়া চাও!
চাই মানবতা, তাই দ্বারে
কর হানি মা গো বারেবারে—
দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
পুরুষ-সিংহ জাগো রে!
সত্যমানব জাগো রে।
বাধা-বন্ধন-ভয়-হারা হও
সত্য-মুক্তি-মন্ত্র গাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
লক্ষ্য যাদের উৎপীড়ন আর অত্যাচার,
নর-নারায়ণে হানে পদাঘাত
জেনেছে সত্য-হত্যা সার।
অত্যাচার! অত্যাচার!!
ত্রিশ কোটি নর-আত্মার যারা অপমান হেলা
করেছে রে
শৃঙ্খল গলে দিয়েছে মা'র—
সেই আজ ভগবান তোমার!
অত্যাচার! অত্যাচার!!
ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-নাই কি লাজ—
নাই কি আত্মসম্মান ওরে নাই জাগ্রত
ভগবান কি রে
আমাদেরো এই বক্ষোমাঝ?
অপমান বড় অপমান ভাই
মিথ্যার যদি মহিমা গাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
আল্লায় ওরে হকতা'লায়
পায়ে ঠেলে যারা অবহেলায়,
আজাদ-মুক্ত আত্মারে যারা শিখায়ে ভীরুতা
করেছে দাস—
সেই আজ ভগবান তোমার!
সেই আজ ভগবান তোমার!
সর্বনাশ! সর্বনাশ!
ছি-ছি নির্জীব পুরবাসী আর খুলো না দ্বার!
জননী গো! জননী গো!
কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ?
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!!
মঙ্গল-ঘট ভেঙে ফেলো,
সব গেল মা গো সব গেল!
অন্ধকার! অন্ধকার!
ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার!
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও।
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
ছি ছি ছি ছি
এ কি দেখি
গাহিস তাদেরি বন্দনা-গান,
দাস সম নিস হাত পেতে দান!
ছি-ছি-ছি ছি-ছি-ছি
ওরে তরুণ ওরে অরুণ!
নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্ন
মুছিয়া দাও!
ভাঙিয়া দাও,
এ-কারা এ-বেড়ি ভাঙিয়া দাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
পরাধীন বলে নাই তোমাদের
সত্য-তেজের নিষ্ঠা কি!
অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা ছি?
মরি লাজে, লাজে মরি!
এক হাতে তোরে 'পয়জার' মারে
আর হাতে ক্ষীর সর ধরি!
অপমান সে যে অপমান!
জাগো জাগো ওরে হতমান!
কেটে ফেলো লোভী লুব্ধ রসনা,
আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
ঘরের বাহির হয়ো না আর,
ঝেড়ে ফেলো হীন বোঝার ভার,
কাপুরুষ হীন মানবের মুখ
ঢাকুক লজ্জা অন্ধকার।
পরিহাস ভাই পরিহাস সে যে,
পরাজিতে দিতে মনোব্যথা—যদি
জয়ী আসে রাজ-রাজ সেজে।
পরিহাস এ যে নির্দয় পরিহাস!
ওরে কোথা যাস
বল কোথা যাস ছি ছি
পরিয়া ভীরুর দীন বাস?
অপমান এত সহিবার আগে
হে ক্লীব, হে জড়, মরিয়া যাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
পুরুষসিংহ জাগো রে!
নির্ভীক বীর জাগো রে!
দীপ জ্বালি কেন আপনারি হীন কালো অন্তর
কালামুখ হেন হেসে দেখাও!
নির্লজ্জ রে ফিরিয়া চাও!
আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
অন্ধকার! অন্ধকার!
নিশ্বাস আজি বন্ধ মা'র
অপমানে নির্মম লাজে,
তাই দিকে দিকে ক্রন্দন বাজে—
দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!
আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...

সরকার দেশে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বাস্তবায়ন করতে চায়:চরমোনাই

গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে সরকার দেশে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বাস্তবায়ন করতে চায়। আমরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে হলেও তাদের এ অপচেষ্টাকে রুখে দেবো, ইনশাআল্লাহ। ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস মসজিদ রক্ষার আন্দোলনে শহীদ হওয়ার ইতিহাস। তাই সব ধরনের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে ইশা ছাত্র আন্দোলনকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। চরমোনাই বার্ষিক মাহফিলের তৃতীয় দিন চরমোনাই ময়দানে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত ছাত্র-গণজমায়েতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) এ কথা বলেন।
পীর সাহেব চরমোনাই আরো বলেন, হিন্দুত্ববাদী সিলেবাসের বিরুদ্ধে যেভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে মূর্তি অপসারণের জন্য রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জিএম রুহুল আমীনের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি জেনারেল শেখ মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলামের উপস্থাপনায় ছাত্র-গণজমায়েতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির আল্লামা আবদুল হক আজাদ, মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, শায়খ যাকারিয়া, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকার ইফতা বিভাগের প্রধান মুফতি হিফজুর রহমান, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী আন-নদভী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক মাওলানা এ টি এম হেমায়েত উদ্দীন, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, সহকারী মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল কাদের ও মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

Sunday, February 26, 2017

পথ ও পথিকের হক

সমাজবদ্ধ জীবনে পথের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর সেই পথটি সবসময়ের জন্যেই নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে, নির্ভয়ে নিশ্চিন্ত মনে আপন সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করে সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবেÑএটি একজন পথিকের হক ও অধিকার। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষকেই পথে ধরে চলতে হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কিংবা সর্বোচ্চ বিত্তবান ব্যক্তি থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া দিনমজুর পর্যন্ত সকলকেই জীবনের তাগিদে পথে আসতে হয়। নিরাপদ পথের অধিকার তাই সকলের। আবার এ অধিকার সংরক্ষণও সমাজের মানুষকেই করতে হবে। সুন্দরতম আচরণের পূর্ণতাবিধানকারীরূপে যে নবী প্রেরিত হয়েছিলেন, আমরা তো তাঁরই উম্মত। তাঁর বাণীতেই আমরা খুঁজে পাই পথ ও পথিকের হক।
পথের অধিকার সম্পর্কে এই হাদীসটি খুবই প্রসিদ্ধÑ
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ
ﺇِﻳَّﺎﻛُﻢْ ﻭَﺍﻟْﺠُﻠُﻮﺱَ ﺑِﺎﻟﻄُّﺮُﻗَﺎﺕِ، ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍ ﻳَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ! ﻣَﺎ ﻟَﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻣَﺠَﺎﻟِﺴِﻨَﺎ ﺑُﺪٌّ، ﻧَﺘَﺤَﺪَّﺙُ ﻓِﻴﻬَﺎ، ﻓَﻘَﺎﻝَ : ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺑَﻴْﺘُﻢْ ﺇِﻻَّ ﺍﻟْﻤَﺠْﻠِﺲَ، ﻓَﺄَﻋْﻄُﻮﺍ ﺍﻟﻄَّﺮِﻳﻖَ ﺣَﻘَّﻪُ، ﻗَﺎﻟُﻮﺍ : ﻭَﻣَﺎ ﺣَﻖُّ ﺍﻟﻄَّﺮِﻳﻖِ ﻳَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ! ﻗَﺎﻝَ : ﻏَﺾُّ ﺍﻟْﺒَﺼَﺮِ، ﻭَﻛَﻒُّ ﺍﻷَﺫَﻯ، ﻭَﺭَﺩُّ ﺍﻟﺴَّﻼَﻡِ، ﻭَﺍﻷَﻣْﺮُ ﺑِﺎﻟْﻤَﻌْﺮُﻭﻑِ ﻭَﺍﻟﻨَّﻬْﻲُ ﻋَﻦِ ﺍﻟْﻤُﻨْﻜَﺮِ .
তোমরা পথে বসা থেকে বিরত থেকো। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কথাবার্তা বলার জন্যে যে আমরা পথে না বসে পারি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমাদের পথে বসতেই হয় তাহলে পথের হক আদায় করো। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পথের হক কী? তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের উত্তর দেয়া, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৬২২৯
হযরত আবু হুরায়রা রা.ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও তাঁর বর্ণিত হাদীসটিতে আরও রয়েছেÑ
ﻭَﺗَﺸْﻤِﻴﺖُ ﺍﻟْﻌَﺎﻃِﺲِ، ﻭَﺇِﺭْﺷَﺎﺩُ ﺍﻟﺴَّﺒِﻴﻞ ...
এবং হাঁচির জবাব দেয়া এবং (মানুষকে) পথ দেখিয়ে দেওয়া। Ñমুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ৬৬০৩
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বর্ণিত হাদীসে রয়েছেÑ
ﻭَﺗُﻐِﻴﺜُﻮﺍ ﺍﻟْﻤَﻠْﻬُﻮﻑَ ﻭَﺗَﻬْﺪُﻭﺍ ﺍﻟﻀَّﺎﻝَّ ...
এবং তোমরা নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করবে এবং পথ-সন্ধানীকে পথের সন্ধান দেবে। Ñসুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮১৯
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেনÑ
... ﻭَﺃَﻋِﻴﻨُﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﺤﻤُﻮﻟَﺔِ ...
এবং তোমরা বোঝা উঠিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করো। Ñমুসনাদে বাযযার, হাদীস ৫২৩২
হযরত আবু তালহা রা. বর্ণিত হাদীসে আছেÑ
... ﻭﺣﺴﻦ ﺍﻟﻜﻼﻡ ...
এবং সুন্দর কথা বলো। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৬১
উপরোক্ত হাদীসগুলোতে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথের যে অধিকারগুলো বর্ণনা করেছেন তা আমরা এভাবে উপস্থাপন করতে পারি:
.
১. দৃষ্টি অবনত রাখা
দৃষ্টিকে বলা হয় শয়তানের একটি বিষাক্ত তীর। এই দৃষ্টির মাধ্যমেই সূচনা হয় নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্কের। এর ফলশ্রæতিতে ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয় পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি। পথে চলার অধিকার নারী-পুরুষ সকলেরই রয়েছে। পথে বের হতে হলে নারীকে কীভাবে বের হতে হবে, কেমন পোশাক পরতে হবে তা একটি স্বতন্ত্র বিষয়। তবে কোনো সম্ভ্রান্ত নারী যখন পথ চলে তখন কোনো পুরুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকাকে সে নিজের জন্যে সম্ভ্রমহানিকর মনে করে। পরিচিত কিংবা অপরিচিত কোনো পুরুষ যদি তাকিয়ে থাকে তাহলে অনেক নারী পর্দাবৃত থাকা সত্তে¡ও পথ চলতে অস্বস্তি বোধ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজন্যেই নির্দেশ দিয়েছেনÑপথের ধারে বসলে দৃষ্টি অবনত রাখো। আর পবিত্র কুরআনে তো নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
ﻗُﻞْ ﻟِﻠْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ﻳَﻐُﻀُّﻮﺍ ﻣِﻦْ ﺃَﺑْﺼَﺎﺭِﻫِﻢْ .
হেনবী, তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে...। Ñসূরা মুমিনুন (২৩) : ৩০
ﻭَﻗُﻞْ ﻟِﻠْﻤُﺆْﻣِﻨَﺎﺕِ ﻳَﻐْﻀُﻀْﻦَ ﻣِﻦْ ﺃَﺑْﺼَﺎﺭِﻫِﻦَّ .
আরহেনবী, তুমি মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে...। Ñসূরা মুমিনুন (২৩) : ৩১
.
২. কাউকে কষ্ট না দেওয়া
এ বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। একজন মুসলমানের প্রাণ, সম্পদ, সম্ভ্রমÑসবকিছুই সম্মানের পাত্র। অন্যায়ভাবে কারও জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মানের ওপর হামলা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। অন্যায়ভাবে কাউকে কোনোরূপ কষ্ট দেয়া যাবে না, চাই সেটা শারীরিক হোক বা মানসিক, ধন-সম্পদের বিষয়ে হোক বা মান-সম্মানের ওপরই হোক। এক্ষেত্রে কুরআনে কারীমের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﺆْﺫُﻭﻥَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨَﺎﺕِ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﻣَﺎ ﺍﻛْﺘَﺴَﺒُﻮﺍ ﻓَﻘَﺪِ ﺍﺣْﺘَﻤَﻠُﻮﺍ ﺑُﻬْﺘَﺎﻧًﺎ ﻭَﺇِﺛْﻤًﺎ ﻣُﺒِﻴﻨًﺎ .
যারা মুমিন নারী-পুরুষদের পীড়া দেয়, এমন কোনো অপরাধের বিষয়ে যা তারা করেনি, তারা তাহলে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে নিল। Ñসূরা আহযাব (৩৩) : ৫৮
মুসলমান ভাইদের কোনোরূপ কষ্ট না দেয়াÑএ বিষয়টিকে তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মুসলমানের পরিচয় হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,
ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻢُ ﻣَﻦْ ﺳَﻠِﻢَ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻤُﻮﻥَ ﻣِﻦْ ﻟِﺴَﺎﻧِﻪِ ﻭَﻳَﺪِﻩِ .
অর্থাৎ মুসলমান তো সেই, যার যবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমানেরা নিরাপদ থাকে। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১০
প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্যে হোক কিংবা বিশ্রামের জন্যে হোক, পথের পাশে যদি কেউ বসে তাহলে অবশ্যই তাকে এমন সব কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে, যাতে কোনো পথিক কষ্ট পেতে পারে। শুধু মুসলমান নাগরিকই নয়, নিরাপদ পথের অধিকার অমুসলিমদেরও। এমনকি অন্য কোনো প্রাণীকেও তো অনর্থক কষ্ট দেয়া যাবে না।
.
৩. সালামের উত্তর দেওয়া
একজন মুসলমান যখন আরেকজন মুসলমানকে সালাম দেয় তখন সেই সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব। এই উত্তর সালামপ্রদানকারীর অধিকার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ﺣَﻖُّ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻢِ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻢِ ﺧَﻤْﺲٌ : ﺭَﺩُّ ﺍﻟﺴَّﻼَﻡِ ﻭَﻋِﻴَﺎﺩَﺓُ ﺍﻟْﻤَﺮِﻳﺾِ، ﻭَﺍﺗِّﺒَﺎﻉُ ﺍﻟْﺠَﻨَﺎﺋِﺰِ، ﻭَﺇِﺟَﺎﺑَﺔُ ﺍﻟﺪَّﻋْﻮَﺓِ، ﻭَﺗَﺸْﻤِﻴﺖُ ﺍﻟْﻌَﺎﻃِﺲِ .
পাঁচটি বিষয় এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের অধিকারÑসালামের উত্তর দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, জানাযায় শরিক হওয়া, নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে এর উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১২৪০
পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে মুসলমানগণ সালামের মাধ্যমেই অভিবাদন জানায়। একে অন্যের জন্যে আল্লাহর দরবারে শান্তি ও রহমত কামনা করে। আর পারস্পরিক এই কল্যাণ কামনা তাদের মাঝে রোপন করে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বীজ। হাদীস শরীফেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামকে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতাকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিতÑ
ﻻَ ﺗَﺪْﺧُﻠُﻮﻥَ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔَ ﺣَﺘَّﻰ ﺗُﺆْﻣِﻨُﻮﺍ، ﻭَﻻَ ﺗُﺆْﻣِﻨُﻮﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﺗَﺤَﺎﺑُّﻮﺍ، ﺃَﻭَﻻَ ﺃَﺩُﻟُّﻜُﻢْ ﻋَﻠَﻰ ﺷَﻰْﺀٍ ﺇِﺫَﺍ ﻓَﻌَﻠْﺘُﻤُﻮﻩُ ﺗَﺤَﺎﺑَﺒْﺘُﻢْ ﺃَﻓْﺸُﻮﺍ ﺍﻟﺴَّﻼَﻡَ ﺑَﻴْﻨَﻜُﻢْ .
তোমরা যতক্ষণ ঈমান না আনবে ততক্ষণ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর যতক্ষণ পরস্পরে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে না ততক্ষণ তোমাদের ঈমানও পূর্ণ হবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। নিজেদের মাঝে সালামের প্রচলন ঘটাও। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস৫৪
সালামের উত্তর দেয়াকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথের হক হিসেবে গণ্য করেছেন। পথের পাশে বসে থাকা ব্যক্তিকে পথিক যখন সালাম দেবে, তখন যেন সে পথিকের সালামের উত্তর দেয়।
.
৪. সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা
সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা এই উম্মতের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। পথে যদি কোনো অন্যায় কাজ চোখে পড়ে তখন সাধ্যমতো বাধা দিতে হবে এবং সৎ কাজের আদেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্যরে প্রতি লক্ষ রাখবে এবং নিজের সামর্থ্যটুকু যথাযথ ব্যবহারের প্রতিও যতœবান হবে। এটাই হাদীসের শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
ﻣَﻦْ ﺭَﺃَﻯ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻣُﻨْﻜَﺮًﺍ ﻓَﻠْﻴُﻐَﻴِّﺮْﻩُ ﺑِﻴَﺪِﻩِ، ﻓَﺈِﻥْ ﻟَﻢْ ﻳَﺴْﺘَﻄِﻊْ ﻓَﺒِﻠِﺴَﺎﻧِﻪِ، ﻓَﺈِﻥْ ﻟَﻢْ ﻳَﺴْﺘَﻄِﻊْ ﻓَﺒِﻘَﻠْﺒِﻪِ، ﻭَﺫَﻟِﻚَ ﺃَﺿْﻌَﻒُ ﺍﻹِﻳﻤَﺎﻥِ .
তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখে তখন যেন সে নিজ হাতে তা প্রতিহত করে। যদি তা তার পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে মুখে বাধা দেবে। যদি তাও না পারে তাহলে অন্তরে তা ঘৃণা করবে। আর এটিই ঈমানের সর্বনি¤œস্তর।Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস৪৯
.
৫. হাঁচির জবাব দেওয়া
হাঁচির পর আলহামদুলিল্লাহ বলা সুন্নত। তখন যে আলহামদুলিল্লাহ বলা শুনবে, তার কর্তব্য ‘ইয়ারহামুকাল্ল
াহ’বলা। এর মাধ্যমে যে হাঁচি দিল তার জন্যে কল্যাণের দোয়া করা হয়। এটিই হাঁচির জবাব। পথচলার সময় কোনো পথিক যদি হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে আর পথের পাশে বসে থাকা ব্যক্তি যদি তা শোনে তাহলে তার কর্তব্য ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন) বলে তার কল্যাণ কামনা করা। উপরে সালামের উত্তর দেয়া প্রসঙ্গে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে তাতে হাঁচির জবাবের বিষয়টিও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হক ও অধিকার রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেনÑসেগুলোকী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ﺇِﺫَﺍ ﻟَﻘِﻴﺘَﻪُ ﻓَﺴَﻠِّﻢْ ﻋَﻠَﻴْﻪِ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺩَﻋَﺎﻙَ ﻓَﺄَﺟِﺒْﻪُ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺍﺳْﺘَﻨْﺼَﺤَﻚَ ﻓَﺎﻧْﺼَﺢْ ﻟَﻪُ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻋَﻄَﺲَ ﻓَﺤَﻤِﺪَ ﺍﻟﻠﻪَ ﻓَﺴَﻤِّﺘْﻪُ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻣَﺮِﺽَ ﻓَﻌُﺪْﻩُ ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻣَﺎﺕَ ﻓَﺎﺗَّﺒِﻌْﻪُ .
তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে তখন তাকে সালাম দেবে, যখন সে তোমাকে নিমন্ত্রণ জানাবে তখন নিমন্ত্রণ গ্রহণ করবে, যখন সে তোমার নিকট উপদেশ চাইবে তখন তাকে উপদেশ দেবে, যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে তখন (ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে) তার জন্যে কল্যাণ প্রার্থনা করবে, সে অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখতে যাবে আর মৃত্যু বরণ করলে তার জানাযায় শরীক হবে। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৬২
.
৬. সুন্দর কথা বলা এবং পথ দেখিয়ে দেওয়া
পথচলা যেমন মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক অনুষঙ্গ, তেমনি চলার পথে পথ না চেনা কিংবা চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেলাও একটি অতি সাধারণ বিষয়। পথের সন্ধানে পথিক তখন পথে থাকা কারোর ওপরই ভরসা করে। তার কাছে সে জানতে চায় আপন গন্তব্যের ঠিকানা। যারা পথের ধারে বসে থাকে তাদের নিকট এটি পথিকের অধিকার। কেউ পথ জানতে চাইলে তাকে তার পথটি দেখিয়ে দিতে হবে। এরই পাশাপাশি তার সঙ্গে কৃত আচরণও যেন সুন্দর হয়, হাদীস শরীফে এদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং একেও পথের হক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দিষ্ট পথটি জানা থাকলে তাকে তা দেখিয়ে দিতে হবে হৃদ্যতা ও উদারতার সঙ্গে, আর জানা না থাকলেও তার সঙ্গে কোমল আচরণ করতে হবে। এটাই এ হাদীসের দাবি। কর্কশ ও অসুন্দর আচরণ করা যাবে না কিছুতেই।
এক হাদীসে এ পথ দেখানোকে ‘সদকা’হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনÑ
ﻭَﺇِﺭْﺷَﺎﺩُﻙَ ﺍﻟﺮَّﺟُﻞَ ﻓِﻲ ﺃَﺭْﺽِ ﺍﻟﻀَّﻼَﻝِ ﻟَﻚَ ﺻَﺪَﻗَﺔٌ .
তুমি কাউকে তার অচেনা পথ দেখিয়ে দিলে, এটি তোমার জন্যে একটি সদকা। Ñজামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৬
আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
ﻣَﻦْ ﻣَﻨَﺢَ ﻣَﻨِﻴﺤَﺔَ ﻟَﺒَﻦٍ ﺃَﻭْ ﻭَﺭِﻕٍ ﺃَﻭْ ﻫَﺪَﻯ ﺯُﻗَﺎﻗًﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻪُ ﻣِﺜْﻞَ ﻋِﺘْﻖِ ﺭَﻗَﺒَﺔٍ .
যে ব্যক্তি কোনো দুগ্ধবতী বকরি দান করে অথবা কাউকে ঋণস্বরূপ অর্থ প্রদান করে কিংবা কাউকে পথ দেখিয়ে দেয় সে একটি গোলাম আজাদ করার সওয়াব লাভ করবে। Ñজামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৭
.
৭. নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা
একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন আরেকজন মানুষই তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। এটি মানবতা ও নৈতিকতার দাবি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণীতে এটি আলোচিত হয়েছে পথের অধিকার হিসেবে। কোনো পথিকের ওপর যদি অন্যায়ভাবে কেউ হামলে পড়ে, কোনো সন্ত্রাসী কিংবা ছিনতাইকারীর আক্রমনে কোনো পথিকের অর্থসম্পদ প্রাণ কিংবা সম্মান-সম্ভ্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন পথের পাশে বসে থাকা ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে এই নির্যাতিত পথিকের সহযোগিতায়। আক্রান্ত ব্যক্তিটির জাত-ধর্ম এক্ষেত্রে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, সে একজন পথিক এবং নিরাপদে পথ চলার অধিকার তার রয়েছেÑএটিই মূল কথা। অন্যায় মোকাবেলার সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও কাউকে নির্যাতিত হতে দেখেও না দেখা কিংবা নীরবতা অবলম্বন করা প্রকারান্তরে অন্যায়কে সমর্থন ও সহযোগিতা করারই শামিল।
হাদীস শরীফের ভাষ্য, নির্যাতিত ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে অন্যায় থামিয়ে দেয়াÑএতে জালেম-মজলুম উভয়কেই সহযোগিতা করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালেম হোক আর মজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মজলুমকে তো আমরা সাহায্য করব ঠিক, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করব কীভাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ﺗﺄﺧﺬ ﻓﻮﻕ ﻳﺪﻳﻪ .
তুমি তার হাত ধরে ফেলবে। (অর্থাৎ তাকে তার অন্যায় থেকে ফিরিয়ে রাখাটাই তার জন্যে সহযোগিতা।) Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪৪
.
৮. বোঝা উঠিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করা
বোঝার ভারে ক্লান্ত হয়ে একজন ভারবাহী মানুষ কখনো তার বোঝাটি কিছু সময় নামিয়ে রাখে। মাথা থেকে কিংবা ভারবাহী কোনো বাহন থেকে পড়েও যেতে পারে কোনো বোঝা। ক্লান্ত শ্রান্ত সে পথিক তখন একজন মানুষের অপেক্ষায় থাকে, যে তার বোঝাটি ওঠাতে সহযোগিতা করবে। পথের পাশে বসতে হলে পথিকের এ জাতীয় সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবেÑএটিও পথের অধিকার, পথিকের অধিকার।
মোটকথা, পথের সৃষ্টিই পথিকের জন্যে। পথিক চলাচল করবেÑএতেই পথের স্বার্থকতা। তাই পথে বসে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে পথিকের পথচলা বিঘিœত হতে পারে। বরং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পথিকের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সামর্থ্য উজার করে তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, প্রথমোক্ত হাদীসটিতে পথের পাশে বসার যে বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে সেটি কেবলই একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। হাদীসটির ভাষ্য হলো, যদি পথের পাশে তোমাকে বসতেই হয় তাহলে পথের এ অধিকারগুলো আদায় করো। এর অর্থ এই নয়Ñযারা পথে পথে বসে থাকবে তারাই কেবল পথের এ অধিকারসমূহ আদায় করবে। বরং এ অধিকারসমূহ পথ ও পথিকের। যারা কথাবার্তা বলা কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে পথের পাশে বসবে তারা যেমন এ অধিকারসমূহ আদায়ে সচেষ্ট হবে, তেমনি যারা পথিক কিংবা পথের পাশের দোকানদার, তাদেরকেও এ বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হতে হবে। এটিই ইসলামের আদর্শ। নিজেকে ইসলামের সত্যিকার অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে হলে এ আদর্শ আমাদের ধারণ করতেই হবে।
.
-- মাওলানা শিব্বীর আহমদ
.
[ মাসিক আলকাউসার » মুহাররম ১৪৩৭ . নভেম্বর ২০১৫ ]

দ্বীন শিক্ষায় জিজ্ঞাসার গুরুত্ব : শৈথিল্য ও সীমালংঘন

মাওলানা আবুল বাশার 
মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

আজকাল বাংলাভাষায় ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর লেখাজোখা হচ্ছে। ইসলামী প্রকাশনা শিল্পের ক্রমবিস্তার আমাদের মনে বেশ আশার সঞ্চার করছে। অনেকেই দ্বীনী বই-পুস্তক কিনছে। দ্বীন সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ছে। নতুন-নতুন পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে। অংকের হিসাবে বলা যায় একটা বড়-সড় পাঠকমহল গড়ে উঠেছে। সেই সংগে নানা-আংগিকে দ্বীনের আলোচনাও চলছে। ওয়াজ-মাহফিলের পরিমাণ বাড়ছে। তাবলীগ জামাতের মাধ্যমেও প্রচুর দ্বীনী আলোচনা হচ্ছে। মসজিদসমূহে জুমুআর দিন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। বস্ত্তনিষ্ঠ আলোচনার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বাড়ছে। জুমুআ ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষে দ্বীনী আলোচনা হচ্ছে। ঘরোয়া পরিবেশেও আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে। হক্কানী পীর মাশায়েখের সংখ্যাও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। পীর-মুরীদির ধারায়ও দ্বীনের আলোচনা হচ্ছে এবং এভাবেও লোকজন দ্বীন শিখছে। নিঃসন্দেহে এসব এ যুগের এক লক্ষণীয় দিক। দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী শিক্ষার বিস্তারে এ সবগুলোরই ভূমিকা সাধুবাদ পাওয়ার উপযুক্ত। এই বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ভাবা যায় কি মানুষের ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র তথা দ্বীনের সর্বাঙ্গনে কী ভয়াবহ অবক্ষয় দেখা দিত? আল্লাহ তাআলা সেই পরিণতি থেকে এ দেশবাসীকে রক্ষা করুন এবং সে লক্ষ্যে এসব প্রচেষ্টাকে আরও বলিষ্ঠতার সাথে অব্যাহত রাখার তাওফীক দান করুন।
তবে এই একরৈখিক পরিসংখ্যান নিয়ে তুষ্ট হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর বিপরীত চিত্রেও নজর দেওয়া দরকার। এসব মাধ্যমে যারা দ্বীন শিখছে তারা সমাজের কত শতাংশ? যারা এখনও পর্যন্ত এর আওতায় আসেনি, তারা কত শতাংশ? নিশ্চয়ই পার্থক্যটা অনেক বড়। সমাজের সিংহভাগ মানুষই এমন, যারা এসব মাধ্যমের কোনও একটির ধরা ছোঁয়াকে কবুল করেনি। তারাও মুসলিম। অন্ততপক্ষে নিজেদের সেই পরিচয়ই দিয়ে থাকে। সেই পরিচয়ের তাগিদেই হয়ত বা জুমুআর নামায পড়ে। ঈদের মাঠে আসে। জানাযায় শামিল হয়। এবং এরকম আরও কিছু ইসলামী লক্ষণ-আলামত আলগোছে ধরে রেখেছে। তারা ইসলাম সম্পর্কে বলা যায় কিছুই জানে না। আকীদা-বিশ্বাসের কোনও খবর নেই। মুমিন হতে হলে কী বিশ্বাস রাখতে হয় সে নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। কি-কি কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যায় তা তাদের ভাবনায়ই আসে না। ওযূ-গোসল, হালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অজ্ঞতার কোনও সীমা নেই। গোটা ইসলাম সম্পর্কেই তারা বেখবর। বাপ-দাদা মুসলিম, ব্যস সেই সুবাদে নিজে মুসলিম। এর বাইরে ইসলাম সম্পর্কে জানার কোনও গরজ তারা বোধ করে না। সুতরাং পরিতুষ্টির সুযোগ কোথায়?
কথা আছে অন্যখানেও। যারা কোনও না কোনওভাবে দ্বীনের সাথে জড়িত, দেখতে-শুনতে দ্বীনদার, নামায-রোযা করে, মসজিদে আসে, হয়ত বা কোনও পীরের মুরীদও কিংবা কোনও দ্বীনী খেদমত ও দাওয়াতী কর্মকাণ্ডর সাথে জড়িত- দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে তাদের জানা শোনার অবস্থা কী? অবস্থা যে সন্তোষজনক নয় একটু দৃষ্টিপাত করলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
এদের আকছারেরই সুন্নত-বিদআতের কোনও ধারণা নেই। বরং তাওহীদ ও শিরকের প্রভেদ সম্পর্কেও তারা সচেতন নয়। শাহজালাল রাহ.-এর দরগাহ ও আজমীরে মানত কেবল কবর পূজারীই নয়, কবরপূজা হারাম জানা লোককেও করতে দেখা যায়। বেঈমানী কথা বলে বা শিরকী কাজ করে ঈমানহারা হয়ে গেছে, অথচ সে নিয়ে কোনও ভাবনা-চিন্তা নেই, এমন লোক কথিত দ্বীনদারদের মধ্যেও ঢের আছে। নিয়মিত তাসবীহ আদায় করে অথচ সহীহ-শুদ্ধভাবে নামায পড়তে জানে না- এমন লোকের কি কোনও অভাব আছে? এমন বহু লোক আছে, যে দাওয়াতী কর্মে সদা তৎপর, অথচ সে জানে না, তার উপর হজ্ব ফরয হয়ে আছে। এ রকম অজ্ঞতার ফিরিস্তি দিতে থাকলে খতিয়ান অনেক লম্বা হয়ে যাবে। সারকথা এটাই যে, আজ দ্বীনদারদেরও বড় অংশ দ্বীন সম্পর্কে জানে বড় কম। সর্বগ্রাসী জাহালাতের গরাস হয়ে আছে সমাজের প্রতিটি স্তর। অতি নগণ্য সংখ্যাই তা থেকে মুক্ত আছে।
এই সর্ববিস্তৃত অজ্ঞতার কারণ কী? কারণ তো এই যে, অজ্ঞতা এক কঠিন ব্যাধি। এ ব্যাধি নিরাময়েরও ওষুধ আছে। কিন্তু যারা এতে আক্রান্ত তারা নিজেদের রোগী মনে করছে না। তারা যে রোগী সেই বোধ তাদের নেই। আর বোধ নেই বলে নিরাময়ের কথা ভাবছে না এবং ওষুধ সেবনের চিন্তা করছে না।
ওষুধ সেবনের চিন্তা করত, যদি নিজেদের রোগী ভাবতে পারত। তাই এখন বড় দরকার তাদের মধ্যে রোগ-সচেতনতা সৃষ্টি করার। অজ্ঞতা যে তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, তাদের ঈমান-আমল বরবাদ করছে, তাদের মানবিকতা ধ্বংস করছে এবং মানুষ হিসেবে তাদের জন্মগ্রহণ ব্যর্থ করে দিচ্ছে- সেই চেতনা ও অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগ্রত করা ছাড়া এই মহাব্যধির চিকিৎসা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি দরাকার ওষুধ সরবরাহ করা এবং তা সেবনে তাদের উদ্বুদ্ধ করা।
তা অজ্ঞতা নামক ব্যাধি নিরাময়ের কী উপায়? উপায় মূলত তিনটি-
এক. উলামায়ে কিরামের কাছে দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা;
দুই. দ্বীনী রচনাবলী পাঠ করা।
তিন. উলামা-মাশায়েখের সাহচর্য গ্রহণ করা।
এ লেখার উদ্দেশ্য মূলত দ্বীনী জ্ঞান আহরণের এই তিন মাধ্যম সম্পর্কে সামাজিক শৈথিল্য ও সীমালংঘনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সর্বপ্রথম আলোচনা করা যাক উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞাস করা সম্পর্কে। এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
ﻓَﺴْـَٔﻠُﻮْۤﺍ ﺍَﻫْﻞَ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺍِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﻟَﺎ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ
তোমাদের জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩; সূরা আম্বিয়া (২১) : ৭
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺷِﻔَﺎﺀُ ﺍﻟْﻌِﻲِّ ﺍﻟﺴُّﺆَﺍﻝُ
অজ্ঞতার দাওয়াই তো জিজ্ঞেস করা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩০৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১০৭৫
কিন্তু এ দাওয়াই আজ চরমভাবে আবহেলিত। অধিকাংশ মানুষই এটি ব্যবহার করে না আবার যারা ব্যবহার করে তাদেরও অধিকাংশ ভুল ব্যবহার করে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে দু’রকম প্রান্তিকতাই বিদ্যমান। হয় এর প্রতি শৈথিল্য করা হয়, নয়ত করা হয় সীমালংঘন।
.
জিজ্ঞেস করতে শৈথিল্য ও অবহেলা
.
আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত লেনদেন, পারস্পরিক আচার-ব্যবহার ও আখলাক-চরিত্র- এই যাবতীয় বিষয়েই রয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা, কিন্তু তা জানে ক’জন? যারা জানে না তাদেরই বা ক’জন এ সম্পর্কে জ্ঞানীজনদের জিজ্ঞেস করে? অধিকাংশেই করে না। হয়ত একটা ভুল বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করছে, সেই বিশ্বাসের উপর তার বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, তাও কাউকে জিজ্ঞেস করে না বিশ্বাসটি সঠিক কি না। সেই বিশ্বাসটি শিরক ও কুফর পর্যায়েরও হতে পারে। একটু বিবেক-বুদ্ধি খাটালে সে সম্পর্কে অন্তরে খটকা লাগারই কথা। তা সত্ত্বেও দেখা যায় সেই বিশ্বাস নিয়ে কবরে যাচ্ছে, জীবনে একটিবারও কারও কাছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার গরজ বোধ করে না। একজন নামাযী মানুষ যদি শাহজালালের দরগায় মানত করে তাকে আমরা কী হিসেবে নেব? দরগায় মানত করা যে শিরকী কাজ- নামাযীর মনে সে প্রশ্ন কেন জাগবে না? এমন বহু নামাযীকেই এ জাতীয় মানত করে তা পূরণ করতে দেখা যায়। একবারও জিজ্ঞেস করে না, তার এ কাজটি জায়েয হচ্ছে কি না! এ জাতীয় মানত তো বিশ্বাসের বিভ্রান্তি থেকেই করা হয়ে থাকে। দরগার পীর-ফকীর মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে পারে বলে যে নামাযী বিশ্বাস করে সে ঠিক কতটুকু নামাযী এবং তার ঈমানের কী অবস্থা, মুমিন হয়ে থাকলে এ প্রশ্ন তার মনে কেন জাগবে না? ইসলাম যে ঈমানের শিক্ষা দেয় তার কণামাত্রও যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে এ প্রশ্ন জাগা উচিত বৈকি। কিছু কিছু লোককে প্রশ্ন করতে দেখাও যায়। কিন্তু অধিকাংশেই তা করে না। আকীদা বিষয়ে এটা একটা উদাহরণ। এ রকম উদাহরণ বিস্তর আছে। ভুলের উপর মানুষ জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেই বিশ্বাস শুদ্ধ করে ফেলা যায়। তাও জিজ্ঞেস করবে না। তাদের কাছে জিজ্ঞেস’নামক দাওয়াইয়ের কোনও মূল্য নেই।
এই যে নামাযীদের কথা বললাম, তারা নামায কতটুকু সহীহ-শুদ্ধ পড়ছে তাও কখনও খতিয়ে দেখে না। মসজিদে এসে দেখে ইমাম সাহেব রুকূ থেকে উঠে সিজদায় যেতে উদ্যত। এক নামাযী নিজে-নিজে রুকূ দিয়ে জামাতে শামিল হয়ে গেল এবং ইমামের সাথে একত্রে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করল। আপনি তার পাশেই নামায পড়েছেন। রুকূ আপনিও পাননি। ফলে সালামের পর আপনি আরেক রাকআত নিজে-নিজে পড়ে নিলেন। ওই লোক পাশেই তা দেখছে। কিন্তু একটি বার জিজ্ঞেস করছে না, তার নামায হল কি না।
এমন বহু মালদার আছে, যারা নিজেরাই ফয়সালা নিয়ে নেয় তার উপর যাকাত ফরয হয়নি। কাউকে তার সম্পদের হিসেব দিয়ে জিজ্ঞেস করে না যে, তার উপর যাকাত ফরয কি না।
বাবা কি মায়ের ইন্তিকাল হয়ে গেল, এখন মীরাছ কিভাবে বণ্টন করতে হবে, বহু নিয়মিত মুসল্লী আছে, যারা কোনও আলেমকে তা জিজ্ঞেস করে না। এরকম রাশি-রাশি উদাহরণ দেওয়া যাবে। এরা নিজ ইচ্ছামত চলে। কিংবা সমাজের প্রচলনই তাদের কাছে শেষ কথা। তাই কোনও আলেমকে জিজ্ঞেস করে না তাদের চলাটা ঠিক হচ্ছে কি না। ফলে অজ্ঞানতার গভীর অন্ধকারেই তারা পড়ে থাকে। ভুল-ভ্রান্তি ও কুসংস্কারের ভেতর দিনাতিপাত করে আর মনে করে বেশ ধর্মজীবন যাপন করছে। এরাও তো কুরআন মাজীদের এই ইরশাদের মধ্যে পড়ে যায়-
ﻗُﻞْ ﻫَﻞْ ﻧُﻨَﺒِّﺌُﻜُﻢْ ﺑِﺎﻟْﺎَﺧْﺴَﺮِﯼْﻥَ ﺍَﻋْﻤَﺎﻟًﺎ ﺍَﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﺿَﻞَّ ﺳَﻌْﯿُﻬُﻢْ ﻓِﯽ ﺍﻟْﺤَﯿٰﻮﺓِ ﺍﻟﺪُّﻧْﯿَﺎ ﻭَ ﻫُﻢْ ﯾَﺤْﺴَﺒُﻮْﻥَ ﺍَﻧَّﻬُﻢْ ﯾُﺤْﺴِﻨُﻮْﻥَ ﺻُﻨْﻌًﺎ .
বল, আমি কি তোমাদের সংবাদ দেব কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের? তারা সেই সব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা উত্তম কাজ করছে। -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ১০৩-১০৪
এ ক্ষতি থেকে তাদের উদ্ধারের উপায় দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণ করা আর সে লক্ষ্যে দ্বীন শিক্ষার এই অন্যতম প্রধান মাধ্যম (উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞেস করা’-কে) অবলম্বন করা।
এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামও স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা আপন-আপন স্থান থেকে মানুষের ভেতর এই বোধ চাপিয়ে দিতে পারেন যে, দ্বীন শেখার জন্য আলেমদের কাছে প্রশ্ন তাদের করতেই হবে। ভুলের উপর থাকা চলবে না। প্রকৃত মুমিন ও মুসলিম হতে হলে দ্বীনের সহীহ-শুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতেই হবে আর তার এক প্রকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে প্রশ্ন করা’।
.
জিজ্ঞেস করতে লজ্জা যেন বাধা না হয়
.
অনেকেই জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে। এ লজ্জা পরিত্যাজ্য। যে লজ্জা মানুষকে দ্বীন শেখা হতে বঞ্চিত রাখে প্রকৃতপক্ষে তা লজ্জাই নয়। তা ভীরুতা, পলায়নপরতা ও জড়ত্ব। একে যে প্রশ্রয় দেয় সে চির জাহেল হয়েই থাকে। নিঃসন্দেহে লজ্জাশীলতা এক প্রশংসনীয় গুণ এবং তা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংগও বটে, কিন্তু যে লজ্জা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখে, তা অতি নিন্দনীয়। তা ঘৃণাভরে ঝেড়ে ফেলা উচিত।
দেখুন লজ্জা নারীর ভূষণ’বলে একটা কথা আছে, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা নর-নারী নির্বিশেষে প্রত্যেক মুমিনের ভূষণ, সেই লজ্জাকে দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে প্রশ্রয় না দেওয়ার কারণে আনসারী নারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। আমাদের বিদূষী মা হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন,
ﻧِﻌْﻤَﺎﻟﻨِّﺴَﺎﺀُﺀﺎَﺴِﻧُ ﺍﻟْﺄَﻧْﺼَﺎﺭِ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ ﻳَﻤْﻨَﻌُﻬُﻦَّ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺀُ ﺃَﻥْ ﻳَﺘَﻔَﻘَّﻬْﻦَ ﻓِﻴﺎﻟﺪِّﻳﻦِ .
আনসারী নারীগণ কতই না ভালো। দ্বীনের জ্ঞানার্জনে লজ্জা তাদের বাধা দিতে পারেনি। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৩২২, ৩৩২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫১৪৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬৪২
এ প্রশংসার কারণ তারা একান্ত নারী সংক্রান্ত বিষয়েও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মাসাইল জিজ্ঞেস করতেন। তিনিও পরম মমত্বের সাথে তাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। সাধারণভাবে সাহাবায়ে কিরামের নীতি এটাই ছিল যে, তারা দ্বীনী বিষয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করতেন না। তাঁর ওফাতের পর তারা পরস্পর একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতেন। বহু মাসআলায় তারা উম্মাহাতুল-মুমি
নীনের শরণাপন্ন হয়েছেন। উম্মুল-মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে তো তারা অনেক বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছেন, এমন কি যাকে লজ্জার মনে করা হয়ে থাকে এমন বিষয়েও। বস্ত্তত এটাই নিয়ম। আমার যে বিষয় জানা নেই তা যে ব্যক্তি জানে তার কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচবোধ কেন করব? অজ্ঞতা তো কিছু গৌরবের বিষয় নয় যে, লজ্জাকে প্রশ্রয় দিয়ে তা ধরে রাখতে হবে! জ্ঞানস্পৃহা তো মানুষের স্বভাবগত। জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বই হযরত আদম আলাইহিস সালামকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পরিয়েছিল। সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য জ্ঞানাহরণ করতেই হবে। লজ্জা যদি তাতে বাধা হয়, তবে সেই অবাঞ্ছিত লজ্জাকেই পরিষ্কার করতে হবে, জ্ঞানাহরণ থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি দ্বীন ও শরীআত সম্পর্কে ভালো জানে অসংকোচে তার কাছে নিজ অজানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা চাই।
.
জিজ্ঞেস করবে কাকে?
.
হাঁ, জিজ্ঞেস করতে হবে যথার্থ জ্ঞানীজনকেই। এ ব্যাপারেও মারাত্মক শিথিলতা লক্ষ করা যায়। ব্যস টুপি-দাড়ি থাকলেই তাকে মৌলভী সাহেব মনে করা হয়। এটা যেন মৌলভী হওয়ার নিদর্শন। ইসলামে মৌলভী সাহেবের জন্য তো আলাদা কোনও পোশাক ও পৃথক কোনো বেশ-ভূষা নেই। দাড়ি রাখা সুন্নত সকলেরই জন্য। সালিহীন ও নেক বান্দাদের পসন্দের পোশাক মুসলিম মাত্রেরই পছন্দনীয় হওয়া উচিত। উলামা-মাশায়েখ যে লেবাস ব্যবহার করেন, তা যদি কেউ ভালোবাসে সে ধন্যবাদার্হ। কিন্তু তাই বলে সে আলেম হয়ে যায় না। তাকে আলেম মনে করা উচিত না। কিন্তু সমাজ তাই মনে করছে। টুপি-দাড়ি থাকলেই তাকে হুজুর ডাকছে এবং তার কাছে মাসআলা জিজ্ঞেস করছে। একটু খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না যে, আসলেই সে আলেম কি না। আবার সেই লোকও কম যায় না। প্রশ্ন করা হচ্ছে দেখে নিজের প্রকৃত অবস্থান যেন ভুলে যায়। মনে মনে নিজেকে আলেমের মসনদে বসিয়ে উত্তর একটা দিয়ে দেয়। এ জাতীয় লোকদের অনেক উত্তর আমার সরাসরি নিজ কানেই শোনা আছে। তা রীতিমত ভয়ংকর, দুঃখজনক, হতবুদ্ধির ও কলঙ্কজনক। তার এ দুঃসাহসিক হরকতের জন্য সাধারণের নির্বিচার জিজ্ঞাসাও কম দায়ী নয়।
আম-সাধারণ কেন এ জাতীয় শৈথিল্য দেখাবে? এটা তো হাতুড়ে ডাক্তার দ্বারা জটিল রোগের চিকিৎসা করানোর চেয়ে কম আত্মঘাতী নয়। ওই চিকিৎসায় যদি ভবলীলা সাঙ্গ হয় তো এ জিজ্ঞাসায় আখিরাত বরবাদ যায়। এরচে’বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে! ইদানীং অবশ্য হাতুড়ে ডাক্তার দেখানোর প্রবণতা অনেক কমে গেছে। কিন্তু বে-এলেম আবেদের কাছে জিজ্ঞাসার প্রবণতায় বিশেষ কমতি পরিলক্ষিত হয় না। সত্যিকারের আবেদ হলেও না হয় কথা ছিল। জিজ্ঞেস করা হয় কেবলই জাহিরী পোশাক দেখে। আকছার খাদেম মুআযযিনকেও মানুষ মুফতী মর্যাদা দিয়ে বসে। সন্দেহ নেই মসজিদের খেদমত অনেক বড় ফযীলতের কাজ। মুআযযিনের মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে। কিন্তু আমাদের সমাজ তো মুআযযিনকে সেই মর্যাদা দেয় না এবং এ পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতাও খোঁজে না। কেবল কণ্ঠস্বরই মানদ-। তাই সুরেলা কণ্ঠের বে-এলেম মুআযযিন হয়ে যায়। ব্যতিক্রম হয়ত আছে, কিন্তু সাধারণ অবস্থা বড় দুঃখজনক। হাঁ যদি তাদেরকে আলেম গণ্য করা না হয়, এবং তারাও নিজ অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক থাকে এবং মহবক্ষত ও পরম শ্রদ্ধাবোধের সংগে এ পদের দায়িত্ব পালনে রত থাকে, তবে নিঃসন্দেহে হাশরের ময়দানে এ রকম মুআযযিনগণ বহু লোকের ঈর্ষার পাত্র হবে। সন্দেহ নেই এ রকম মুআযযিন এ দেশে অনেক আছে। আল্লাহ তাআলা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন এবং দুনিয়ায়ও তাদেরকে ইজ্জতের জীবন দান করুন।
কথা হচ্ছিল- দ্বীনী বিষয় যারে-তারে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। কুরআন মাজীদ তো নির্দেশনা দিয়েছে- (তরজমা) তোমার জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর’[সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩]। সুতরাং দ্বীন সম্পর্কে যার ভালো জানা আছে জিজ্ঞেস তাকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল সনদ ও সার্টিফিকেট থাকাই যথেষ্ট নয়। চর্চায় নিয়োজিত আছে কি না তাও লক্ষ রাখা উচিত। সেই সংগে তাকওয়া-পরহেযগারীও। জিজ্ঞেস যখন দ্বীন সম্পর্কে তখন দ্বীনদার আলেমকেই সন্ধান করা উচিত। আমি যা জানতে চাই তার উপর আমার আখিরাতের নাজাত নির্ভর করে। আমি তার কাছে চাই নাজাতের পথ জানতে, কিন্তু অজ্ঞতাবশত সে যে পথ দেখাল তা নাজাতের নয়; বরং ধ্বংসের পথ। তাই সতর্কতা জরুরি। জিজ্ঞেসও অবশ্যই করতে হবে এবং সে জন্য উপযুক্ত লোকেরও সন্ধান করতে হবে। সন্ধান করলে পাওয়াও অবশ্যই যাবে। হয়ত খানিকটা সময় দিতে হবে। একটু পথ চলতে হবে, কিন্তু উদ্দেশ্য যখন নিজ দ্বীনের হিফাজত ও আখিরাতের নাজাত, তখন এতটুকু কষ্ট তো করতেই হবে। বড় চমৎকার বলেছেন মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ.-
ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢَ ﺩِﻳﻦٌ، ﻓَﺎﻧْﻈُﺮُﻭﺍ ﻋَﻤَّﻦْ ﺗَﺄْﺧُﺬُﻭﻥَ ﺩِﻳﻨَﻜُﻢْ
এই ইলম তো দ্বীন, সুতরাং লক্ষ করে দেখ কার নিকট থেকে নিজ দ্বীন নিচ্ছ।
-সহীহ মুসলিম, ; সুনানে দারেমী, বর্ণনা ৩৯৯; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, বর্ণনা ১৫৩
.
তলাবা ও উলামাও জিজ্ঞাসা থেকে বেনিয়ায নয়
.
জিজ্ঞাসাকে জ্ঞানাহরণের মাধ্যম তো সর্বাপেক্ষা বেশি বানানো উচিত তলাবা ও উলামার। সত্যিকারের উলামাও প্রকৃতপক্ষে তলাবাই। তালিবুল-ইলম অর্থ যখন জ্ঞানের সন্ধানী, তখন জিজ্ঞাসা অর্থাৎ জানার ইচ্ছা তো তার মজ্জাগতই থাকবে। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি লোমকূপে উঠবে অদম্য কৌতূহলের আকুলতা। সেই আকুলতা নিবারণের জন্য সে জিজ্ঞাসার আশ্রয় নেবে। আমি জিজ্ঞাসা’শব্দটিকে সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি। প্রশ্ন অপেক্ষা এ শব্দটিই আলোচ্য বিষয়ের পক্ষে বেশি ব্যঞ্জনাময়। আমার বড় ভালোবাসার শব্দ এটি। এর ঝঙ্কার বাজুক প্রত্যেক তালিবুল-ইলমের অন্তরে। আজ এর বড় অভাব দেখি। এক ছাত্র যেন আরেক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে। এরূপ লজ্জাশ্রয়ী ছাত্র ইলমের রাজ্য কিভাবে বিচরণ করতে পারে। জিজ্ঞাসায় সপ্রতিভ থাকাই তো হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর শান। এই শান যে অবলম্বন করতে পারবে সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের উচ্চতায় সে না পৌঁছে যায় না। খুব সম্ভব ইমাম আজম ইমামুল-আইম্মতিল-ফুকাহা আবূ হানীফা -রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়া আলা আসহাবিহী- সম্পর্কে কোথাও পড়েছিলাম, তাঁর জ্ঞানের সাগর হয়ে ওঠার উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, আমি যা জানি না, সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে কখনও লজ্জাবোধ করিনি। একই রকম জিজ্ঞাসার জবাবে হিবরুল-উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবক্ষাস রা. বলেছিলেন, জিজ্ঞাসাপ্রিয় রসনা ও সমঝদার অন্তঃকরণের কারণে’(-ই যা কিছু শিখেছি)। আমি যত বড় আলেম দেখেছি তাদের সকলকেই এ ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ ও অনাড়ষ্ঠ পেয়েছি। আর নিঃসন্দেহে তাদের বড় হয়ে ওঠার পেছনে এ গুণের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং জ্ঞানের রাজ্যে যারা অবাধ বিচরণ করতে চায়, তাদের এ গুণ অর্জন করতেই হবে। তাফাক্কুহ-ফীদ-দ্বীন তথা দ্বীনের স্বচ্ছ ও গভীর জ্ঞানার্জন যাদের লক্ষ্য তাদের এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনও অবকাশ নেই। এর মাধ্যমে তারা পারে অন্যের সাধনালব্ধ জ্ঞানের অংশীদার হতে। অন্যের কাছে প্রশ্ন করা ও মতবিনিময়ের দ্বারা বিষয়ের আগাপাছতলা পরিস্ফুট হয়, নজর প্রসারিত হয় এবং অচিন্তিত দিকের দ্বারোম্মোচন হয়। এত বড় উপকারী জিনিসকে অবহেলা করা যায়, না করা উচিত? তা ছাড়া প্রশ্ন করা যায় আপন মনেও। অন্যের কাছে জিজ্ঞাসার আগে নিজে নিজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সকল দিকে নজর বোলালে ও আপন মনে প্রশ্ন তুলে তার জবাব হাতড়াতে থাকলে বিষয়টির প্রসার ও গভীরতার সন্ধান পাওয়া যায়। তালিবুল-ইলমের তলব’-এর সেটাই তো প্রথম যাত্রা। অগ্রযাত্রাকে সচল রাখার পক্ষে যে প্রাণশক্তি দরকার এ কৌতূহল দ্বারাই তা অর্জিত হতে পারে।
.
বাড়াবাড়িমূলক প্রশ্ন
.
এমন বহু লোকও আছে, যারা দরকারি বিষয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না অথচ অহেতুক বিষয়ে প্রশ্ন করতে বেজায় উৎসাহ বোধ করে। এমন সব বিষয়ে তারা প্রশ্ন করে, যাতে না আছে কোনও দ্বীনী ফায়দা, না দুনিয়াবী উপকার। এরকম নিরর্থক বিষয় নিয়ে তারা বাকশক্তির অপচয় করে, সময় নষ্ট করে ও অন্যকে করে বিব্রত। একে তো অহেতুক বিষয়ে লিপ্ত হওয়া মুসলিমের শান নয়। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
ﻣِﻨْﺤُﺴْﻦِ ﺇِﺳْﻠَﺎﻡِ ﺍﻟْﻤَﺮْﺀِ ﺗَﺮْﻛُﻪُ ﻣَﺎ ﻟَﺎ ﻳَﻌْﻨِﻴﻪِ
অহেতুক বিষয় পরিহার করা ইসলামের এক সৌন্দর্য। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩১৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৯৭৬
তদুপরি এটা অন্যের পক্ষে বিব্রতকর। যেমন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামাতা জান্নাতে যাবে কি না, এ প্রশ্নের পেছনে পড়ার কোনও দরকার আছে? এটা জানা কি ঈমানের অংগ। না জানলে কি ইসলাম ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবে? যাকে প্রশ্ন করা হয় সে এর কী উত্তর দেবে? যদি বলে জান্নাতী, তবে কুরআন-হাদীসে যাদের সুনির্দিষ্টভাবে জান্নাতী বলা হয়নি, তাদের জান্নাতী হওয়ার সার্টিফিকেট কে দিতে পারে? আর যদি বলে জান্নাতী নয়, তবে নবীপ্রেমে উজ্জীবিত এক বক্তা ও শ্রোতার পক্ষে এরকম কথার উচ্চারণ হৃদয়ে শরাঘাত অপেক্ষাও কঠিন নয় কি? হাঁ, তারা জান্নাতে যাবেন এই আশাবাদ তো ব্যক্ত করাই যেতে পারে, কিন্তু এরূপ প্রশ্নের কর্তা তো অতটুকুতেই সন্তুষ্ট হওয়ার নয়। তো যেই প্রশ্নের উত্তর তাকে সন্তুষ্ট করবে না, তার পেছনে তার পড়াই বা কেন? এ জাতীয় এক প্রশ্ন করা হয়েছিল ইমাম আবূ হানীফা রাহ.-কে। জিজ্ঞাসা ছিল হযরত আলী রা. ও হযরত মুআবিয়া রা.-এর মধ্যে কে সঠিক ছিলেন এবং সিফফীনের যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিলেন, আখিরাতে তাদের কী হবে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন-
ﺇﺫﺍ ﻗَﺪِﻣْﺖُ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻳﺴﺄﻟﻨﻲ ﻋﻤﺎ ﻛَﻠَّﻔَﻨِﻲ ﻭﻻ ﻳﺴﺄﻟﻨﻲ ﻋﻦ ﺃﻣﻮﺭﻫﻢ .
আমার তো ভয় নিজের সম্পর্কে যে, না জানি আল্লাহ তাআলা আমাকে কোন্ কোন্ বিষয়ে সওয়াল করেন। কিয়ামতে যখন আমাকে তাঁর সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তাদের কোনও বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হবে না। প্রশ্ন তো করা হবে তাঁর প্রদত্ত বিধানাবলী সম্পর্কে যে, আমি তা কতটুকু পালন করেছি। কাজেই তাতে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। (উকূদুল জুমান) অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতের লাভ-লোকসান যে বিষয়ের সাথে জড়িত নয়, তা নিয়ে প্রশ্নোত্তরে লিপ্ত হওয়া কিছু বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এরকম অহেতুক বিষয়ে প্রশ্ন করতে কুরআন মাজীদেই নিষেধ আছে। যখন হজ্ব ফরয করা হয় এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, হজ্ব কি প্রতি বছর ফরয? উত্তরে তিনি বললেন, যদি আমি হাঁ’বলি তবে তাই হবে। যে বিষয়ে তোমাদেরকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করো না। । এরই পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়-
ﯾٰۤﺎَﯾُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﯾْﻦَ ﺍٰﻣَﻨُﻮْﺍ ﻟَﺎ ﺗَﺴْـَٔﻠُﻮْﺍ ﻋَﻦْ ﺍَﺷْﯿَﺂﺀَ ﺍِﻥْ ﺗُﺒْﺪَ ﻟَﻜُﻢْ ﺗَﺴُﺆْﻛُﻢْ .
হে মুমিনগণ! তোমরা সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশিত হলে তোমরা দুঃখিত হবে। [সূরা মায়িদা (৫) : ১০১] -জামে তিরমিযী, হাদীস ৮১৪
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে সতর্ক করে দেন যে, দেখ, তোমাদের আগের জাতিসমূহ বাড়তি প্রশ্নের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তাদেরকে তাদের নবী যখন কোনও বিষয়ে হুকুম করতেন, তারা তার বিপরীতে নানা প্রশ্ন করে তাকে উত্ত্যক্ত করত। (সাবধান তোমরা সে রকম করো না। তবে) তোমরা যদি আমাকে কোনও বিষয়ে জিজ্ঞেস কর আমি অবশ্যই তা তোমাদের বলে দেব। তখন বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা রা. প্রশ্ন করে বসলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কে? বললেন, তোমার পিতা হুযাফা ইবনে কায়স। তারপর তিনি নিজ মায়ের কাছে গিয়ে এ বৃত্তান্ত জানালেন। তার মা তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ছি বাবা! এ কথা কেন জিজ্ঞেস করলে? আমরা জাহিলী যুগে ছিলাম। কত রকম খারাপ কাজ করতাম। সে মতে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কাউকে তোমার বাবা বলতেন কিয়ামত পর্যন্ত আমার মুখে চুনকালি পড়ত। অন্য এক বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আমার প্রবেশ কোথায় হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জাহান্নামে। এ অবস্থা দেখে হযরত উমর রা. সচকিত হয়ে উঠলেন। তিনি হাটু ভেংগে বসে পড়লেন এবং বললেন-
ﺭَﺿِﻴﻨَﺎ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﺭَﺑًّﺎ، ﻭَﺑِﺎﻟْﺈِﺳْﻠَﺎﻡِ ﺩِﻳﻨًﺎ، ﻭَﺑِﻤُﺤَﻤَّﺪٍ ﺭَﺳُﻮﻟًﺎ .
আমরা রাযী ও সন্তুষ্ট যে, আমাদের রব আল্লাহ, আমাদের দ্বীন ইসলাম এবং আমাদের রাসূল ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৫৯; সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৬৫৯, ১০৫৩১
কুরআন মাজীদের এ সতর্কবাণী ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবিয়তের ফলে সাহাবায়ে কিরামের পরিপূর্ণ ইসলাহ সাধিত হয়েছিল, যে কারণে দু’চারটি ঘটনার বাইরে তাদের জীবনে বাড়তি প্রশ্নের কোনও নজীর পাওয়া যায় না।
কিন্তু পরবর্তীকালের মানুষের মধ্যে যারা সাহাবায়ে কিরামের প্রত্যক্ষ তরবিয়ত পায়নি এবং তারও পরে যারা তাবিঈগণের সাহচর্য থেকে জীবন গড়েনি, তারা ক্রমে নববী শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়। তাই তাদের প্রশ্নের ধরন-ধারণও পাল্টে যায়। অনেকে অহেতুক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়েও প্রশ্ন করতে শুরু করে। এরূপ সীমালংঘন যে ঘটবে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। যেমন এক বর্ণনায় আছে, প্রখ্যাত তাবিঈ মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ. বলেন, একদা আমি হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর কাছে বসা ছিলাম। এসময় এক ব্যক্তি তাকে একটা বিষয়ে প্রশ্ন করে। আমি জানি না বিষয়টা কী? হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার! এ বিষয়ে এর আগে আরও দু’জন প্রশ্ন করেছে। এই হচ্ছে তৃতীয়জন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, একদল লোক খুব বেশি প্রশ্ন করবে এবং তাদের প্রশ্নের মাত্রা এ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে যে, জিজ্ঞেস করে বসবে, আল্লাহ তাআলা সব মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, তা আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৫, ২১৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৭৯০
সহজেই বোঝা যায় এটা এক অবান্তর প্রশ্ন। কারণ সকলের যিনি স্রষ্টা তিনি তো মাখলুক হতে পারেন না যে, তার কোনও সৃষ্টিকর্তা থাকবে। তা থাকলে তিনি স্রষ্টাই হতে পারতেন না আর তখন কোনও সৃষ্টিরই অস্তিত্ব লাভ হত না। তো এই যে অবান্তর প্রশ্নের সূচনা হয়েছে তখন থেকে কালক্রমে এর বিস্তার ঘটতে থেকেছে। আর আজ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ দরকারি বিষয়ে প্রশ্ন করে না, অথচ এমন সব বেদরকারি বিষয়ে প্রশ্ন করে, দুনিয়া ও আখিরাতে যার কোনও ফায়দা নেই। সে সম্পর্কে না কবরে, হাশরে প্রশ্ন হবে আর না তা অজানা থাকলে কোনও জ্ঞানী লোক তাকে অজ্ঞ ঠাওরাবে।
এই সীমালংঘন অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কাজের কথা ছেড়ে অকাজে লিপ্ত হওয়া কোনও আকলমন্দী নয়। আকেল ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার জীবনের সীমিত এ সময় কেবল প্রয়োজনীয় কাজেই খরচ করবে। সে হিসেবে যা জানা দরকার সে সম্পর্কে সে অবশ্যই বিজ্ঞজনকে জিজ্ঞেস করবে আর যা জানা অপ্রয়োজনীয়, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকবে। প্রশ্নোত্তর ও সওয়াল-জওয়াবের ক্ষেত্রে এটাই মধ্যপন্থা। আল্লাহ তাআলা সকলকে এ পন্থা ধরে রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।
.
[ মাসিক আলকাউসার » জুমাদাল উলা ১৪৩৮ . ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ]